ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

সোয়া লাখ মানুষের জন্য এক চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা দশটি, ভবন অর্ধশতাব্দী পুরোনো

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার প্রায় সোয়া লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র হলো উপজেলার ১০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নাজুক অবকাঠামো, জনবল সংকট আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

# সোয়া লাখ মানুষের জন্য একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা সংখ্যা মাত্র ১০
# ছয় বছরেও শেষ হয়নি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনের কাজ
# ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
# ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন
# সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯২৪ সালে নলখাগড়া, সিমেন্টের মিশ্রণ ও টিনের ছাউনি দিয়ে একটি ছোট ডিসপেনসারি স্থাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে  চিকিৎসাসেবার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে এটিকে ১০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নীত করা হয়। এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প গ্রহণ করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। নতুন ভবন নির্মাণের দায়িত্ব কবির ট্রেডার্স ম্যাক কনস্ট্রাকশন নামের প্রতিষ্ঠান।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছয় বছর পার হয়ে যাওয়ার পর এখনও ভবনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে জরুরিভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন থেকে ইনডোর বেড সরিয়ে নতুন ভবনের নিচতলায় আংশিকভাবে রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই এখানে। ছবি : সময়ের আলো

এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন, দীঘিনালা স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির জন্য জনবল নিয়োগ, ওষুধ সংকট নিরসন ও নতুন ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগির সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।

দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. তনয় তালুকদার বলেন, আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জনবল ও জায়গা না থাকায় মানুষের চিকিৎসাসেবার চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। ইনডোর বেডগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে সরিয়ে অসম্পূর্ণ ভবনের নিচতলায় নিয়ে মানুষকে ভর্তি রেখে কোনোরকমে সেবা দিচ্ছি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জারি সুবিধা, ওটি রুম এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবে অনেক জরুরি রোগীকে বাধ্য হয়ে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৫০ শয্যার হাসপাতালের মান অনুযায়ী ওষুধ পাওয়া উচিত হলেও এখন পর্যন্ত ১০ শয্যার হাসপাতালের বরাদ্দ অনুযায়ী ওষুধ পাই আমরা, ফলে মানুষকে আমরা সব ওষুধ দিতে পারছি না। আশা করি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনটি বুঝে পেলে এবং শূন্যপদগুলো পূরণ হলে এই উপজেলার লাখো মানুষকে মানসম্মত চিকিৎসা ও সব সেবা দিতে পারব আমরা।
দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালে ৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জায়গায় রয়েছেন মাত্র একজন। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু জনবল না থাকার কারণে ও মানুষের অসচেতনতার কারণে মাঝেমধ্যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আশা করি দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।

নতুন ভবনের নির্মাণ কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় ১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভবন নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই বছরের মধ্যে ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে না পারায় ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অপারেশন মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং দুই মাসের মধ্যেই ভবনের বাকি কাজ শুরু হওয়ার আশা রয়েছে।

মেডিকেল অফিসার ড. কেচিং মারমা বলেন, জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশার তুলনায় বহুগুণ বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। যেখানে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী দেখার কথা, সেখানে ২৫০-৩০০ রোগী দেখতে হচ্ছে প্রতিদিন। ছোট একটি কক্ষে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ডেঙ্গু রোগী মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বেড সংকটের কারণে অনেক সময় পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই রোগীর সিট কেটে দিতে হয় নতুন রোগী ভর্তি করানোর জন্য।

সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ৪৫ বছর আগের জরাজীর্ণ ভবনেই বহির্বিভাগ ও জরুরি সেবা চলছে। ভবনের দেয়ালের সিমেন্ট-বালুর আস্তরণ খসে পড়েছে, টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে কক্ষের ভেতরে পড়ে। এতে চিকিৎসকদের স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং রোগীরাও বাড়তি দুর্ভোগে পড়ছেন।

এলাকাবাসী ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরে না হওয়ায় এসব বাইরের প্রতিষ্ঠানে করাতে হচ্ছে। একইভাবে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। ফলে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনরা অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। হাসপাতালের পর্যাপ্ত সেবা, যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জনবল সংকটের কারণে তিন শিফটেই এই তিনজন চিকিৎসককে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ছোট বারান্দায় রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হন। আলাদা আলাদা বিভাগ না থাকায় গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সবার।

হাসপাতালে ১৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৭ জন, ৪৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। হাসপাতালটির ৪৪ জন মাঠকর্মীর বিপরীতে মাত্র ১৩ জন মাঠকর্মী রয়েছে। হাসপাতালটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট  হওয়ায় নেই মেডিসিন, সার্জারি, এনেস্থেসিয়া, চর্মরোগ ও শিশু বিশেষজ্ঞ। ফলে রোগীদের জটিল ক্ষেত্রে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক রোগী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। কেউ কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে অসুস্থতা নিয়েই দিন পার করছেন।

হাসপাতালে এক্সরে সেবার জন্য টেকনোলজিস্ট থাকলেও প্রয়োজনীয় জায়গা ও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ইকোকার্ডিওগ্রাফার নেই এবং ইসিজি মেশিন থাকলেও নেই টেকনোলজিস্ট। ফলে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে রোগীদের বাইরের ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।  হাসপাতালে  চিকিৎসা না পেয়ে জটিল রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। এ ছাড়া রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে হাসপাতাল। ফলে প্রান্তিক অসহায় ও গরিব মানুষদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে তাদের বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।

দীঘিনালা উপজেলার পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলা থেকে আসা রোগীদের বাড়তি চাপও সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। হাসপাতালের অসম্পূর্ণ নতুন ভবনের টয়লেটগুলো রোগীদের কেবিনের ঠিক পাশে হওয়ায় দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনরা নাজেহাল।

ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগী নবমিত্র চাকমা বলেন, আমি তিন দিন ধরে এখানে ভর্তি আছি। চিকিৎসা পেলেও টয়লেটের দুর্গন্ধে অসুস্থতা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাহেরা বেগম বলেন, আমি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে চিকিৎসা পেয়েছি। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ব্যথা আরও বেড়েছে। দুই ধরনের ওষুধ পেলেও কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়েছে। ডাক্তার আমাকে এক্সরে, ইসিজিসহ কিডনির পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেখাতে বলেছেন। পরীক্ষা করানোর মতো অর্থ ও সামর্থ্য কোনোটাই নেই আমার।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকার যেন দ্রুত ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চালু করার ব্যবস্থা করে দেয় এবং খালি থাকা শূন্যপদগুলোতে জনবল নিয়োগ দেয়। দীঘিনালার মতো প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ যেন কোনো রকম ভোগান্তির শিকার না হয়ে আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

সোয়া লাখ মানুষের জন্য এক চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা দশটি, ভবন অর্ধশতাব্দী পুরোনো

আপডেট টাইম : ০৫:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার প্রায় সোয়া লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র হলো উপজেলার ১০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নাজুক অবকাঠামো, জনবল সংকট আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

# সোয়া লাখ মানুষের জন্য একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা সংখ্যা মাত্র ১০
# ছয় বছরেও শেষ হয়নি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনের কাজ
# ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
# ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন
# সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯২৪ সালে নলখাগড়া, সিমেন্টের মিশ্রণ ও টিনের ছাউনি দিয়ে একটি ছোট ডিসপেনসারি স্থাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে  চিকিৎসাসেবার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে এটিকে ১০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নীত করা হয়। এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প গ্রহণ করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। নতুন ভবন নির্মাণের দায়িত্ব কবির ট্রেডার্স ম্যাক কনস্ট্রাকশন নামের প্রতিষ্ঠান।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছয় বছর পার হয়ে যাওয়ার পর এখনও ভবনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে জরুরিভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন থেকে ইনডোর বেড সরিয়ে নতুন ভবনের নিচতলায় আংশিকভাবে রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই এখানে। ছবি : সময়ের আলো

এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন, দীঘিনালা স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির জন্য জনবল নিয়োগ, ওষুধ সংকট নিরসন ও নতুন ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগির সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।

দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. তনয় তালুকদার বলেন, আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জনবল ও জায়গা না থাকায় মানুষের চিকিৎসাসেবার চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। ইনডোর বেডগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে সরিয়ে অসম্পূর্ণ ভবনের নিচতলায় নিয়ে মানুষকে ভর্তি রেখে কোনোরকমে সেবা দিচ্ছি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জারি সুবিধা, ওটি রুম এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবে অনেক জরুরি রোগীকে বাধ্য হয়ে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৫০ শয্যার হাসপাতালের মান অনুযায়ী ওষুধ পাওয়া উচিত হলেও এখন পর্যন্ত ১০ শয্যার হাসপাতালের বরাদ্দ অনুযায়ী ওষুধ পাই আমরা, ফলে মানুষকে আমরা সব ওষুধ দিতে পারছি না। আশা করি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনটি বুঝে পেলে এবং শূন্যপদগুলো পূরণ হলে এই উপজেলার লাখো মানুষকে মানসম্মত চিকিৎসা ও সব সেবা দিতে পারব আমরা।
দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালে ৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জায়গায় রয়েছেন মাত্র একজন। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু জনবল না থাকার কারণে ও মানুষের অসচেতনতার কারণে মাঝেমধ্যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আশা করি দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।

নতুন ভবনের নির্মাণ কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় ১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভবন নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই বছরের মধ্যে ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে না পারায় ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অপারেশন মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং দুই মাসের মধ্যেই ভবনের বাকি কাজ শুরু হওয়ার আশা রয়েছে।

মেডিকেল অফিসার ড. কেচিং মারমা বলেন, জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশার তুলনায় বহুগুণ বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। যেখানে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী দেখার কথা, সেখানে ২৫০-৩০০ রোগী দেখতে হচ্ছে প্রতিদিন। ছোট একটি কক্ষে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ডেঙ্গু রোগী মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বেড সংকটের কারণে অনেক সময় পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই রোগীর সিট কেটে দিতে হয় নতুন রোগী ভর্তি করানোর জন্য।

সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ৪৫ বছর আগের জরাজীর্ণ ভবনেই বহির্বিভাগ ও জরুরি সেবা চলছে। ভবনের দেয়ালের সিমেন্ট-বালুর আস্তরণ খসে পড়েছে, টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে কক্ষের ভেতরে পড়ে। এতে চিকিৎসকদের স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং রোগীরাও বাড়তি দুর্ভোগে পড়ছেন।

এলাকাবাসী ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরে না হওয়ায় এসব বাইরের প্রতিষ্ঠানে করাতে হচ্ছে। একইভাবে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। ফলে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনরা অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। হাসপাতালের পর্যাপ্ত সেবা, যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জনবল সংকটের কারণে তিন শিফটেই এই তিনজন চিকিৎসককে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ছোট বারান্দায় রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হন। আলাদা আলাদা বিভাগ না থাকায় গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সবার।

হাসপাতালে ১৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৭ জন, ৪৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। হাসপাতালটির ৪৪ জন মাঠকর্মীর বিপরীতে মাত্র ১৩ জন মাঠকর্মী রয়েছে। হাসপাতালটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট  হওয়ায় নেই মেডিসিন, সার্জারি, এনেস্থেসিয়া, চর্মরোগ ও শিশু বিশেষজ্ঞ। ফলে রোগীদের জটিল ক্ষেত্রে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক রোগী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। কেউ কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে অসুস্থতা নিয়েই দিন পার করছেন।

হাসপাতালে এক্সরে সেবার জন্য টেকনোলজিস্ট থাকলেও প্রয়োজনীয় জায়গা ও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ইকোকার্ডিওগ্রাফার নেই এবং ইসিজি মেশিন থাকলেও নেই টেকনোলজিস্ট। ফলে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে রোগীদের বাইরের ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।  হাসপাতালে  চিকিৎসা না পেয়ে জটিল রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। এ ছাড়া রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে হাসপাতাল। ফলে প্রান্তিক অসহায় ও গরিব মানুষদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে তাদের বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।

দীঘিনালা উপজেলার পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলা থেকে আসা রোগীদের বাড়তি চাপও সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। হাসপাতালের অসম্পূর্ণ নতুন ভবনের টয়লেটগুলো রোগীদের কেবিনের ঠিক পাশে হওয়ায় দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনরা নাজেহাল।

ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগী নবমিত্র চাকমা বলেন, আমি তিন দিন ধরে এখানে ভর্তি আছি। চিকিৎসা পেলেও টয়লেটের দুর্গন্ধে অসুস্থতা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাহেরা বেগম বলেন, আমি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে চিকিৎসা পেয়েছি। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ব্যথা আরও বেড়েছে। দুই ধরনের ওষুধ পেলেও কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়েছে। ডাক্তার আমাকে এক্সরে, ইসিজিসহ কিডনির পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেখাতে বলেছেন। পরীক্ষা করানোর মতো অর্থ ও সামর্থ্য কোনোটাই নেই আমার।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকার যেন দ্রুত ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চালু করার ব্যবস্থা করে দেয় এবং খালি থাকা শূন্যপদগুলোতে জনবল নিয়োগ দেয়। দীঘিনালার মতো প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ যেন কোনো রকম ভোগান্তির শিকার না হয়ে আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে।