আবারও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। এর আগে গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল দেশ।
গতকাল শুক্রবার বেলা ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। উৎপত্তিস্থল ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি কাঁচা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে রাত ৯টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও ভূমিকম্পের কম্পনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দীর্ঘসময় ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় অবস্থান করেন।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ দিনে মৃদু ও মাঝারি মিলিয়ে অন্তত ১০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন ভূমিকম্প বড় ধরনের দুর্যোগের পূর্বাভাস হতে পারে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের যে চক্র বা ‘সার্কেল টাইম’, তা প্রায় অতিক্রান্ত। ইতিহাস বলছে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর এবং ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর ঘটেছে। সবশেষ ১৯৩০ সালে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা ‘ধুবি ভূমিকম্প’ নামে পরিচিত। প্রায় ৯৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা সময়কালটিকে অ্যালার্মিং হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, শুক্রবারের এই ভূমিকম্পকে তিনি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এটি ‘ফোরশক’ বা পূর্বাঘাত হতে পারে, অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট ছোট কম্পন দেখা দেওয়ার একটি ধাপ। অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূকম্পন লক্ষ্য করা গেছে। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানায়, গত বৃহস্পতিবার রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম রাজ্য, যা বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি। বুধবার রাতে ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চলের মনিওয়া শহরের উত্তরে।
মাসের শুরু থেকেই কম্পনের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প দিয়ে মাসটি শুরু হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারকেন্দ্রিক দুটি কম্পন ছাড়াও সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে ৩ দশমিক ৩ ও ৪ মাত্রার দুটি কম্পন আঘাত হানে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক এলাকায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূত্বকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হলে তা ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে আংশিক মুক্ত হতে পারে। তবে দীর্ঘসময় বড় কোনো শক্তি নির্গত না হলে তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বরাবরই বেশি।
সর্বশেষ ভূমিকম্পে সাতক্ষীরা ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তালা উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামে একটি কাঁচা ঘরের টালি ভেঙে পড়ে। সাতক্ষীরা সদরের মাগুরা গ্রামে একটি ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা গেছে। কোথাও কোথাও পুকুরের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকাতেও জুমার নামাজের পরপরই কম্পন অনুভূত হলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেহেতু ভূমিকম্পের আগাম সতর্ক সংকেত নির্ভরযোগ্যভাবে দেওয়া সম্ভব নয়, তাই ভূমিকম্প-সহনীয় ভবন নির্মাণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতিই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায়।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























