ব্যাপারটি বেশ গোলমেলে। যখন বাগানভরা ফুল থাকে শীতকালে এবং বেশির ভাগ মানুষ বাণিজ্যিক বাগান থেকে ফুল বিক্রি করেন, তখন তিনি বাগানে ফুটে থাকা ফুলের ছবি তোলেন, কিংবা ভিডিও করেন; কিন্তু বিক্রি করেন না। বসন্ত পেরিয়ে বাগান যখন উঠে যাওয়ার কথা পরবর্তী মৌসুমের ফুল চাষের জন্য প্রস্তুত হতে, তখনই তাঁর ব্যবসা শুরু হয়। এই অদ্ভুত রকমের ব্যবসা যিনি করেন, তাঁর নাম নূর-ই-জাহান চন্দ্রিমা। বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের আভূঙ্গী চরপাড়ায়।
চন্দ্রিমা ফুল নয়, বিক্রি করেন ফুলগাছের চারা, বাল্ব, কন্দ ও কাটিং। এই ব্যবসার মৌসুম শুরু হয় মার্চ থেকে। চলে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। ফলে প্রচলিত ফুলের ব্যবসার চেয়ে এর মৌসুম অনেক বড়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি বিক্রি করেন বিভিন্ন শীতকালীন ফুলের চারা ও বীজ। পুরো শীতে তিনি বিশেষভাবে বিক্রি করেন ক্রিসমাস ক্যাকটাসের চারা।
তখন করোনাকাল। বিভিন্ন ফেসবুক পেজের ফুলগাছ দেখে দেখে আমাদের অনেকের মতো সময় কাটল চন্দ্রিমারও। কিন্তু সময় কাটালেও তিনি কিছু প্রজাতির ফুলগাছ সংগ্রহ শুরু করেন অচিরেই। বাড়ির আশপাশে সংগ্রহ করা সেসব ফুলগাছ লাগিয়ে দিতেন টবে বা মাটিতে। ধীরে ধীরে এ কাজটাই গুছিয়ে আনলেন চন্দ্রিমা। বাড়ির পাশের ১৩ শতাংশ জমির ওপর দুই বছর ধরে বাগান করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু ওই বাগানের ফুল বিক্রি করছেন না। তবে বিক্রি করছেন সেসব ফুলগাছের চারা, কন্দ ইত্যাদি।
শুরুটা শখের বশে হলেও সেটির বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছেন চন্দ্রিমা। তাঁর বাগানে রয়েছে লিলি, ডে লিলি, পদ্ম, পুর্তলিকা, ক্যালাডিয়াম, অপরাজিতাসহ বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট। তবে এসবের মধ্যে লিলির প্রতি আলাদা টান রয়েছে চন্দ্রিমার। বললেন, ‘আসলে যত জাতের লিলি আছে পৃথিবীতে, সবই আমার বাগানে রাখতে চাই।’
আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করা চন্দ্রিমা দীর্ঘদিন কাজের মাধ্যমে শিখে নিয়েছেন, বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছের চাষের ধরন এবং তার বীজ, বাল্ব, কাটিং তৈরির পদ্ধতি। এসব করতে গিয়ে আগাছামুক্ত রাখতে হয় পুরো বাগান। সেটা বেশ পরিশ্রমসাধ্য কাজ। চন্দ্রিমা বাগানে ব্যবহার করেন প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব জিনিসপত্র।
চন্দ্রিমার দুটি ফেসবুক পেজ আছে। সেগুলো হলো মুমু’স গার্ডেন ও চন্দ্রিমা’স গার্ডেন। এই পেজ দুটিতে তিনি পোস্ট করেন ফুলগাছের চারা, কন্দ বা বাল্বের ছবি এবং ভিডিও। সেই পেজগুলোতেই পছন্দের ফুলগাছের জন্য অর্ডার করতে হয়। তারপর কুরিয়ারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হয় ফুলগাছের চারা, বীজ অথবা বাল্ব বা কন্দ। এখানেও চন্দ্রিমা দিয়েছেন ক্রেতাদের এক দারুণ সুযোগ। কুরিয়ারে পাঠানোর সময় কোনো গাছ নষ্ট হয়ে গেলে তিনি আবার সেটি কুরিয়ার করে দেন। সে ক্ষেত্রে কুরিয়ার চার্জ নেন না চন্দ্রিমা।
একজন শখের ফুলবাগানি থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা কার? চন্দ্রিমা জানালেন—অনলাইন। পৃথিবী যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভয় কী? চন্দ্রিমা সব ভয় ও জড়তা কাটিয়ে অনলাইন মাধ্যমে শুরু করেছিলেন তাঁর পথচলা। ধীরে ধীরে এখন তিনি সিজন, অফ-সিজনের খেলাটাও শিখে গেছেন।
নতুনদের উদ্দেশে পরামর্শ কী? চন্দ্রিমা জানালেন তিনটি কথা—
⊲ গাছ সংরক্ষণে সতর্ক থাকতে হবে।
⊲ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজটা করে যেতে হবে।
⊲ ধৈর্য ধরে এবং সম্মান দিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
বলা হয়, মানুষ কোনো কিছুর নেশায় একবার পড়ে গেলে তা বাড়তেই থাকে। আগামী ৫ বছরে চন্দ্রিমারও তেমনি স্বপ্ন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন বিদেশ থেকে ফুলের বিভিন্ন প্রজাতির বীজ আনতে হয় আমাদের দেশে।’ কিন্তু আগামী পাঁচ বছর পর তাঁর ইচ্ছা আছে, ফুলের চারা, বীজ, কন্দ কিংবা বাল্ব আভূঙ্গী চরপাড়া থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার।
২০০ প্রজাতির লিলি আছে চন্দ্রিমার বাগানে। সরকারি কিংবা বেসরকারি যেকোনো সহায়তা পেলে সেগুলো রপ্তানিতে মন দেবেন তিনি। চন্দ্রিমা বললেন, ‘সহায়তা বলতে আমি আর্থিক সাহায্যের কথা বলছি না। অনেক দেশের মানুষ আমার কাছ থেকে এগুলো চায়। ঠিক কীভাবে ফুলের চারা বা বীজ বিদেশে পাঠাতে হয়, আমি জানি না। সে জন্যই পাঠানো হয়ে ওঠে না।’
এই সূত্রে তাঁর সঙ্গে কথা হয় আমাদের দেশের ফুল ও ফুলকেন্দ্রিক জিনিসপত্র রপ্তানির সম্ভাবনা আসলে কেমন, তা নিয়ে। চন্দ্রিমা বলেন, ‘সম্ভাবনা অনেক। আমাদের মাটিতে সোনা ফলে! আর বিদেশে ফুলের চাহিদা ব্যাপক। আমি অলরেডি ইন্ডিয়া, কাতার, জর্ডানে পাঠিয়েছি। কিন্তু সেটাকে নিয়মকানুন মেনে পাঠানো বলব না। সে জন্য অনেকে নিতে চাইলেও আমি দিতে পারি না।’ চন্দ্রিমা এখন ফুলের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সংগ্রহ করেন বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে।
আমরা চন্দ্রিমার বাগান ঘুরে দেখি। ফুল নিয়ে তাঁর আগ্রহ আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। আমরা তাঁর বাগানের বিভিন্ন প্রজাতির লিলির গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বিদায় নিই।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























