ঢাকা , সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নম্বর প্লেটেই আসল খেলা : ৬ লাখের সিএনজি ২৫ লাখ

৬ লাখ টাকা বাজারমূল্যের একটি সিএনজি অটোরিকশার দাম ২৪-২৫ লাখ টাকা— শুনলে যে কারও চমকে ওঠার কথা। ঢাকা মহানগরীর সড়কের বাস্তব চিত্র ঠিক এমনই। ৬ থেকে ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি নতুন সিএনজি অটোরিকশা কেনা সম্ভব হলেও, সেটি ঢাকার রাস্তায় নামাতে খরচ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ২৪-২৫ লাখ টাকায়। কিনতে গেলেই এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়েন ক্রেতারা, আর সেই সুযোগে সিন্ডিকেট দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে ৪-৫ গুণ। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন ‘টিনের চশমা’ পরে এই লুটপাট দেখছে।

ইতিহাস ও বর্তমান সংখ্যা

পেট্রোল বা ডিজেলের তুলনায় কম দূষণকারী হওয়ায় ২০০১ সাল থেকে ঢাকার সড়কে টু-স্ট্রোক অটোরিকশার (বেবিট্যাক্সি) পরিবর্তে সবুজ রঙের এই পরিবেশবান্ধব বাহনটির চলাচল শুরু হয়। ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ঢাকায় ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা নামানো হয়। পরে মিশুকের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আরও ২ হাজার ৬৯৬টি সিএনজির নিবন্ধন দেওয়া হয়। প্রতিটির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর।

সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদ ও ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীতে চলমান বৈধ সিএনজির সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৯৬টি। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর তথ্য বলছে, শুরু থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ২০ হাজার ৯৯৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৫ হাজার ৬৩৭টি ও ৬ হাজার ৮৩৯টি নিবন্ধন দেওয়া হয়। অথচ গত পাঁচ বছরে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৪৫টি নিবন্ধন।

dhakapost

দিন যত যাচ্ছে, সিএনজি অটোরিকশা যেন মালিকদের কাছে ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হচ্ছে। একবার কেউ একটি সিএনজি কিনতে পারলে তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় না। তবে, সেটি কিনতে গিয়ে পেরোতে হয় এক বিশাল গোলকধাঁধা।

কী এই গোলকধাঁধা?

বাংলাদেশের বাজারে একটি সিএনজি অটোরিকশার শোরুম মূল্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু কিনলেই তো আর রাস্তায় নামানোর নিবন্ধন (নম্বর প্লেট) পাওয়া যায় না। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, একটি সিএনজির ১৫ বছরের আয়ুষ্কাল শেষ হলে সেটি বাতিল করে একই মালিককে নতুন গাড়ি প্রতিস্থাপনের (রিপ্লেসমেন্ট) সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে নতুন করে কেউ সহজে নিবন্ধন নিতে পারেন না। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগেই গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ বাণিজ্য।

সিএনজির চালকরা ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন, ৬ লাখ টাকায় গাড়ি কিনে সরকারি কাগজপত্রের জন্য মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা খরচ করলেই মালিক হওয়া সম্ভব কাগজে-কলমে। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব।

কেন পারবেন না— এর জবাবে তারা জানিয়েছেন, ৬ লাখ টাকার গাড়ির দাম ২৫ লাখে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দালাল, মালিক ও ট্রাফিক পুলিশের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকায় পুরোনো একটি নম্বর বা রেজিস্ট্রেশন প্লেট কিনতেই দালালদের দিতে হয় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। দালালরা ক্রেতা ও বিক্রেতা— উভয় পক্ষ থেকেই টাকা নিয়ে এই বেআইনি বাণিজ্যের সমন্বয় করে।

যেখানে নম্বরসহ একটি নতুন সিএনজি অটোরিকশার প্রকৃত খরচ হওয়ার কথা বড়জোর ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, সেখানে শুধু পুরোনো নম্বর পেতেই খরচ পড়ছে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে পুরোনো ভাঙাচোরা গাড়িটির জন্য মূল মালিককে দিতে হয় আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে একটি নতুন সিএনজি রাস্তায় নামাতে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। মূলত সিএনজি নিবন্ধনের সুযোগ উন্মুক্ত না থাকার কারণেই এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

dhakapost

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত দুই যুগে (২০০২ থেকে ২০২৬ সাল) ঢাকা শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়লেও সিএনজির সংখ্যা বাড়েনি। সিএনজির ১৫ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর তৎকালীন প্রভাবশালী ও অসাধু শ্রমিক নেতা শাজাহান খান এবং ওসমান আলীসহ অনেকেই নতুন সিএনজি নামানোর অনুমতি না দিয়ে পুরোনো নম্বর প্লেটগুলোতেই ‘রিপ্লেসমেন্ট’ বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারা বিশ্বে পুরোনো জিনিসের দাম কমে, কিন্তু ঢাকার সিএনজির ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টো। এখানে পুরো খেলাই হচ্ছে নম্বর প্লেট নিয়ে। যে নম্বর প্লেটের সরকারি মূল্য মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা, নতুন নম্বর দেওয়া বন্ধ থাকায় সেটিই কালোবাজারে নতুন সিএনজিসহ ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

এই খাতের একজন অভিজ্ঞ চালক জানান, ২০০২ সালের দিকে যারা এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ৫০-৬০টি গাড়ির চেসিস নিয়ে এই ব্যবসায় নেমেছিলেন, তারা আজ ২০০-২৫০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। বর্তমানে ঢাকার ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মাত্র এক হাজার মালিকের হাতে। আর এই স্বল্পসংখ্যক মালিক নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রায় ৫০ হাজার চালককে।

তার মতে, এই চালকদের মাধ্যমেই প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রায় ৫০ লাখ যাত্রী। আর এই যাত্রী ভোগান্তির একটি বড় কারণ হলো, চালকদের কোনো বৈধ নিয়োগপত্র নেই।

dhakapost

সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায় ‘বিফকেস পার্টি’!

সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. বরকত উল্লাহ ভুলু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০০১ সালে আমি প্রথম সিএনজি কিনেছি এক লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকায়। সেই গাড়ির দাম এখন বাড়তে বাড়তে কোম্পানিতে প্রায় ৭ লাখ টাকার কাছাকাছি। এত বছরে চাহিদা বাড়লেও গাড়ি বাড়েনি। সরকারের ছোট গাড়িতে মনোযোগ নাই। সরকার চায় বড় গাড়ি। একটা বাসে ৫০ জন বসতে পারে, আর একটা সিএনজিতে বসতে পারে তিনজন। তিন সিএনজি সমান জায়গা লাগে একটি বাসে, যেখানে তিন সিএনজিতে বসতে পারে ড্রাইভারসহ ১২ জন, সেখানে একটি বাসে বসতে পারে ৫০ জন। তাই সরকার এটাকে বাড়তে চায় না।

সিএনজির দাম ২৪-২৫ লাখ টাকায় পৌঁছানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মানুষের হাতে এখন অনেক অবৈধ টাকা রয়েছে। সেই টাকা বৈধ করতে অনেকে সিএনজি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। তারাই পুরোনো সিএনজির নিবন্ধন লাখ লাখ টাকায় কিনছেন। বর্তমানে বৈধ গাড়ি আছে ১৫ হাজার ৬৯৬টি। এই সীমিত সংখ্যার মধ্যেই ঘুষ বাণিজ্যের অবৈধ টাকা নিয়ে ‘বিফ্রকেস পার্টি’র লোকজন বিনিয়োগ করছেন। ফলে সিএনজি এখন আর সাধারণ চালক বা মানুষের নাগালের মধ্যে নেই।”

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সিএনজি ছোট খাত হওয়ায় সরকারের তেমন মনোযোগ নেই। ফলে খাতটি দিনদিন অস্থির হয়ে উঠছে। বিশ্ব এগিয়ে গেলেও আমরা এখনও পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছি। দূষণের শীর্ষে থাকা একটি শহরে খোলা বাহন আর উপযুক্ত নয়। আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে উন্নত ট্যাক্সিক্যাব চালু করা প্রয়োজন।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সিএনজির দামের এই অস্থিরতা থামাতে হলে নীতিগতভাবে নিবন্ধনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে হবে। তা না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই হাতবদলের মাধ্যমে সিএনজির দাম ২৫-২৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে এবং পুরো খাতটি একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু নিবন্ধন চালু করলেই হবে না, সড়কের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিটি খাতেরই একটি সীমা থাকে। সরকার নিবন্ধন না দিলে কিন্তু রাজস্বও হারাচ্ছে। কারণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে নিবন্ধন ছাড়াই সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে, যা কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে না।’

মহানগরীতে যুক্ত হতে পারে নতুন এক হাজার সিএনজি : বিআরটিএ

সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর রোববার (১২ এপ্রিল) বিকালে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকা মহানগর সম্প্রসারণ হওয়াতে ঢাকা জেলার (ঢাকা-থ) চালকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা ঢাকা মেট্রোতে এক হাজার সিএনজি অটোরিকশা চান— এমন আবেদন করেছেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এক হাজার নতুন সিএনজি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।

তিনি আরও বলেন, ‘সিএনজি তো লিমিট করে দেওয়া হয়েছে। এখন মূল সমস্যা হচ্ছে অটোরিকশা। তারা রাস্তায় যানজট করে ফেলছে। চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহরে আরও কিছু সিএনজির নিবন্ধন ইজিলি দেওয়া যায়। এখন পর্যন্ত সিএনজির সিলিং ১৫ হাজার ৬৯৬টি, সেটিই আছে। আমরা নতুন করে এক হাজার সিএনজি দেওয়া প্রস্তাব পাঠিয়েছি, এখন সেটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

নম্বর প্লেটেই আসল খেলা : ৬ লাখের সিএনজি ২৫ লাখ

আপডেট টাইম : ২৫ মিনিট আগে

৬ লাখ টাকা বাজারমূল্যের একটি সিএনজি অটোরিকশার দাম ২৪-২৫ লাখ টাকা— শুনলে যে কারও চমকে ওঠার কথা। ঢাকা মহানগরীর সড়কের বাস্তব চিত্র ঠিক এমনই। ৬ থেকে ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি নতুন সিএনজি অটোরিকশা কেনা সম্ভব হলেও, সেটি ঢাকার রাস্তায় নামাতে খরচ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ২৪-২৫ লাখ টাকায়। কিনতে গেলেই এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়েন ক্রেতারা, আর সেই সুযোগে সিন্ডিকেট দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে ৪-৫ গুণ। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন ‘টিনের চশমা’ পরে এই লুটপাট দেখছে।

ইতিহাস ও বর্তমান সংখ্যা

পেট্রোল বা ডিজেলের তুলনায় কম দূষণকারী হওয়ায় ২০০১ সাল থেকে ঢাকার সড়কে টু-স্ট্রোক অটোরিকশার (বেবিট্যাক্সি) পরিবর্তে সবুজ রঙের এই পরিবেশবান্ধব বাহনটির চলাচল শুরু হয়। ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ঢাকায় ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা নামানো হয়। পরে মিশুকের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আরও ২ হাজার ৬৯৬টি সিএনজির নিবন্ধন দেওয়া হয়। প্রতিটির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর।

সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদ ও ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীতে চলমান বৈধ সিএনজির সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৯৬টি। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর তথ্য বলছে, শুরু থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ২০ হাজার ৯৯৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৫ হাজার ৬৩৭টি ও ৬ হাজার ৮৩৯টি নিবন্ধন দেওয়া হয়। অথচ গত পাঁচ বছরে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৪৫টি নিবন্ধন।

dhakapost

দিন যত যাচ্ছে, সিএনজি অটোরিকশা যেন মালিকদের কাছে ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হচ্ছে। একবার কেউ একটি সিএনজি কিনতে পারলে তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় না। তবে, সেটি কিনতে গিয়ে পেরোতে হয় এক বিশাল গোলকধাঁধা।

কী এই গোলকধাঁধা?

বাংলাদেশের বাজারে একটি সিএনজি অটোরিকশার শোরুম মূল্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু কিনলেই তো আর রাস্তায় নামানোর নিবন্ধন (নম্বর প্লেট) পাওয়া যায় না। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, একটি সিএনজির ১৫ বছরের আয়ুষ্কাল শেষ হলে সেটি বাতিল করে একই মালিককে নতুন গাড়ি প্রতিস্থাপনের (রিপ্লেসমেন্ট) সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে নতুন করে কেউ সহজে নিবন্ধন নিতে পারেন না। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগেই গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ বাণিজ্য।

সিএনজির চালকরা ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন, ৬ লাখ টাকায় গাড়ি কিনে সরকারি কাগজপত্রের জন্য মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা খরচ করলেই মালিক হওয়া সম্ভব কাগজে-কলমে। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব।

কেন পারবেন না— এর জবাবে তারা জানিয়েছেন, ৬ লাখ টাকার গাড়ির দাম ২৫ লাখে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দালাল, মালিক ও ট্রাফিক পুলিশের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকায় পুরোনো একটি নম্বর বা রেজিস্ট্রেশন প্লেট কিনতেই দালালদের দিতে হয় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। দালালরা ক্রেতা ও বিক্রেতা— উভয় পক্ষ থেকেই টাকা নিয়ে এই বেআইনি বাণিজ্যের সমন্বয় করে।

যেখানে নম্বরসহ একটি নতুন সিএনজি অটোরিকশার প্রকৃত খরচ হওয়ার কথা বড়জোর ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, সেখানে শুধু পুরোনো নম্বর পেতেই খরচ পড়ছে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে পুরোনো ভাঙাচোরা গাড়িটির জন্য মূল মালিককে দিতে হয় আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে একটি নতুন সিএনজি রাস্তায় নামাতে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। মূলত সিএনজি নিবন্ধনের সুযোগ উন্মুক্ত না থাকার কারণেই এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

dhakapost

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত দুই যুগে (২০০২ থেকে ২০২৬ সাল) ঢাকা শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়লেও সিএনজির সংখ্যা বাড়েনি। সিএনজির ১৫ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর তৎকালীন প্রভাবশালী ও অসাধু শ্রমিক নেতা শাজাহান খান এবং ওসমান আলীসহ অনেকেই নতুন সিএনজি নামানোর অনুমতি না দিয়ে পুরোনো নম্বর প্লেটগুলোতেই ‘রিপ্লেসমেন্ট’ বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারা বিশ্বে পুরোনো জিনিসের দাম কমে, কিন্তু ঢাকার সিএনজির ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টো। এখানে পুরো খেলাই হচ্ছে নম্বর প্লেট নিয়ে। যে নম্বর প্লেটের সরকারি মূল্য মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা, নতুন নম্বর দেওয়া বন্ধ থাকায় সেটিই কালোবাজারে নতুন সিএনজিসহ ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

এই খাতের একজন অভিজ্ঞ চালক জানান, ২০০২ সালের দিকে যারা এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ৫০-৬০টি গাড়ির চেসিস নিয়ে এই ব্যবসায় নেমেছিলেন, তারা আজ ২০০-২৫০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। বর্তমানে ঢাকার ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মাত্র এক হাজার মালিকের হাতে। আর এই স্বল্পসংখ্যক মালিক নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রায় ৫০ হাজার চালককে।

তার মতে, এই চালকদের মাধ্যমেই প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রায় ৫০ লাখ যাত্রী। আর এই যাত্রী ভোগান্তির একটি বড় কারণ হলো, চালকদের কোনো বৈধ নিয়োগপত্র নেই।

dhakapost

সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায় ‘বিফকেস পার্টি’!

সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. বরকত উল্লাহ ভুলু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০০১ সালে আমি প্রথম সিএনজি কিনেছি এক লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকায়। সেই গাড়ির দাম এখন বাড়তে বাড়তে কোম্পানিতে প্রায় ৭ লাখ টাকার কাছাকাছি। এত বছরে চাহিদা বাড়লেও গাড়ি বাড়েনি। সরকারের ছোট গাড়িতে মনোযোগ নাই। সরকার চায় বড় গাড়ি। একটা বাসে ৫০ জন বসতে পারে, আর একটা সিএনজিতে বসতে পারে তিনজন। তিন সিএনজি সমান জায়গা লাগে একটি বাসে, যেখানে তিন সিএনজিতে বসতে পারে ড্রাইভারসহ ১২ জন, সেখানে একটি বাসে বসতে পারে ৫০ জন। তাই সরকার এটাকে বাড়তে চায় না।

সিএনজির দাম ২৪-২৫ লাখ টাকায় পৌঁছানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মানুষের হাতে এখন অনেক অবৈধ টাকা রয়েছে। সেই টাকা বৈধ করতে অনেকে সিএনজি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। তারাই পুরোনো সিএনজির নিবন্ধন লাখ লাখ টাকায় কিনছেন। বর্তমানে বৈধ গাড়ি আছে ১৫ হাজার ৬৯৬টি। এই সীমিত সংখ্যার মধ্যেই ঘুষ বাণিজ্যের অবৈধ টাকা নিয়ে ‘বিফ্রকেস পার্টি’র লোকজন বিনিয়োগ করছেন। ফলে সিএনজি এখন আর সাধারণ চালক বা মানুষের নাগালের মধ্যে নেই।”

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সিএনজি ছোট খাত হওয়ায় সরকারের তেমন মনোযোগ নেই। ফলে খাতটি দিনদিন অস্থির হয়ে উঠছে। বিশ্ব এগিয়ে গেলেও আমরা এখনও পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছি। দূষণের শীর্ষে থাকা একটি শহরে খোলা বাহন আর উপযুক্ত নয়। আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে উন্নত ট্যাক্সিক্যাব চালু করা প্রয়োজন।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সিএনজির দামের এই অস্থিরতা থামাতে হলে নীতিগতভাবে নিবন্ধনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে হবে। তা না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই হাতবদলের মাধ্যমে সিএনজির দাম ২৫-২৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে এবং পুরো খাতটি একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু নিবন্ধন চালু করলেই হবে না, সড়কের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিটি খাতেরই একটি সীমা থাকে। সরকার নিবন্ধন না দিলে কিন্তু রাজস্বও হারাচ্ছে। কারণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে নিবন্ধন ছাড়াই সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে, যা কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে না।’

মহানগরীতে যুক্ত হতে পারে নতুন এক হাজার সিএনজি : বিআরটিএ

সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর রোববার (১২ এপ্রিল) বিকালে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকা মহানগর সম্প্রসারণ হওয়াতে ঢাকা জেলার (ঢাকা-থ) চালকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা ঢাকা মেট্রোতে এক হাজার সিএনজি অটোরিকশা চান— এমন আবেদন করেছেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এক হাজার নতুন সিএনজি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।

তিনি আরও বলেন, ‘সিএনজি তো লিমিট করে দেওয়া হয়েছে। এখন মূল সমস্যা হচ্ছে অটোরিকশা। তারা রাস্তায় যানজট করে ফেলছে। চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহরে আরও কিছু সিএনজির নিবন্ধন ইজিলি দেওয়া যায়। এখন পর্যন্ত সিএনজির সিলিং ১৫ হাজার ৬৯৬টি, সেটিই আছে। আমরা নতুন করে এক হাজার সিএনজি দেওয়া প্রস্তাব পাঠিয়েছি, এখন সেটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত।’