ঢাকা , বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) তাফসির শাস্ত্রের কিংবদন্তি যিনি আগস্টের ৫ তারিখ যেভাবে ‘৩৬ জুলাই’ হলো মাটি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সংস্কারের মাধ্যমে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি)। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে বাহিনীর পক্ষ থেকে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে এই প্রত্যয় জানানো হয়। বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর খিলগাঁওয়ে আনসার ও ভিডিপি সদর দপ্তরে দিবসটি উপলক্ষে আলোচনাসভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়।  অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। দপ্তরের পাশাপাশি সারা দেশে বাহিনীর রেঞ্জ, জেলা, ব্যাটালিয়ন ও উপজেলা কার্যালয়েও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে মহাপরিচালক বলেন, ‘বিভিন্ন স্তরের অনৈতিক চর্চা, অপেশাদারি ও জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে। সততা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের সেবাই প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রধান কর্তব্য।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আনসার ও ভিডিপির প্রশাসনিক, প্রশিক্ষণ ও অপারেশনাল কার্যক্রমে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। সাম্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন কার্যক্রম ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনা হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। সকল নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাহিনীটি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে সুসংহত অবস্থান তৈরি করছে বলেও তিনি জানান। দিবসটি উপলক্ষে দেশের প্রতিটি কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়। এ ছাড়া শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, আনসার ও ভিডিপি হাসপাতালে রোগীদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশন এবং শহীদদের রুহের মাগফিরাত ও দেশ-জাতির সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও নতুন বাংলাদেশের রূপান্তরের অভিযাত্রা তুলে ধরে নির্মিত আটটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এসব প্রামাণ্যচিত্রের শিক্ষা ও মূল্যবোধ আত্মস্থ করে দায়িত্ব পালনের জন্য বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান মহাপরিচালক। অনুষ্ঠানে বাহিনীর উপমহাপরিচালক, পরিচালকসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ আর কখনো নির্ভরশীল রাষ্ট্র হবে না : পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বপ্নযাত্রায় ধীরগতি তারা বলে ডিসেম্বরে দেশে আসবে, আসেন দেখা হবে রাজপথে: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আপনার দলের লোকেরাই আপনাকে পদচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছে: প্রধানমন্ত্রীকে কর্নেল অলি সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই জাদুঘর নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণার কেন্দ্র : ড. ইউনূস

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) তাফসির শাস্ত্রের কিংবদন্তি যিনি

ইসলামের জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম যুগের গণ্ডি পেরিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞানপিপাসু মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) তাঁদেরই অন্যতম।

তিনি ছিলেন এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভা, যিনি কোরআনের তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, আকিদা, উসুল, অলঙ্কারশাস্ত্রসহ ইসলামী জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। পঞ্চদশ শতকের মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সাহিত্যকে তিনি এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁকে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বহুমুখী পণ্ডিত হিসেবে গণ্য করা হয়।ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতির পূর্ণ নাম আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর আস-সুয়ুতি। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে (৮৪৯ হিজরি) মিসরের রাজধানী কায়রোতে তাঁর জন্ম।

তবে তাঁর পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল মিসরের সয়ুত (Asyut) অঞ্চলে। সেই সূত্রেই তিনি ‘আস-সুয়ুতি’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হলেও তাঁর শিক্ষা ও প্রতিভার বিকাশ থেমে যায়নি। শৈশব থেকেই তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর।
মাত্র আট বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। পাশাপাশি তিনি হাদিস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ, সাহিত্য ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্র অধ্যয়ন করে অল্প সময়েই সমসাময়িক আলেমদের বিস্মিত করেন।তাঁর শিক্ষাজীবনের পেছনে পরিবারের, বিশেষত অভিভাবকদের উৎসাহ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে সময়ের মিসরের শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ ও ভাষাবিদদের কাছে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। ফলে খুব অল্প বয়সেই তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুল, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

তাঁর এই বহুমাত্রিক জ্ঞান তাঁকে সমকালীন আলেমদের মধ্যে অনন্য মর্যাদা এনে দেয়।শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি কায়রোর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা শুরু করেন। তাঁর পাঠদান ছিল সুসংহত, যুক্তিনির্ভর ও প্রাঞ্জল। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে জ্ঞান অর্জনের জন্য ছুটে আসতেন। একই সঙ্গে তিনি গবেষণা ও লেখালেখিকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। দিনের অধিকাংশ সময় তিনি পাঠ, গবেষণা, ফতোয়া প্রদান এবং গ্রন্থ রচনায় ব্যয় করতেন। তবে জ্ঞানীদের জীবন সব সময় নির্বিঘ্ন হয় না। জীবনের শেষ পর্যায়ে কিছু বিরূপ সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখোমুখি হন তিনি। আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন চিন্তার মূল্যায়ন করে তিনি জনজীবন থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন এবং কায়রোর নীল নদের তীরবর্তী রাওদা দ্বীপে নির্জন পরিবেশে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ সময়টুকু তিনি সম্পূর্ণভাবে ইবাদত, গবেষণা ও গ্রন্থ রচনায় অতিবাহিত করেন। ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে (৯১১ হিজরি) সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার আজও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে সমাদৃত।

ইমাম সুয়ুতির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর অসাধারণ লেখনীশক্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। ইসলামী জ্ঞানের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শাখা নেই, যেখানে তাঁর কলমের স্পর্শ পড়েনি। কোরআনের তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা, ইতিহাস, আকিদা, চিকিৎসা, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা—সব ক্ষেত্রেই তিনি মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন।

তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ, সাবলীল ও পাঠকবান্ধব ভাষা। তিনি জটিল বিষয়গুলোও এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যাতে সাধারণ পাঠক সহজেই তা বুঝতে পারেন। এ কারণেই তাঁর রচনাগুলো শুধু আলেমসমাজেই নয়, সাধারণ মুসলমানদের কাছেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ইসলামী জ্ঞানকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনন্য।

ইমাম সুয়ুতির উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘আল-ইতকান ফি উলূমিল কোরআন’ উলূমুল কোরআনের এক অনন্য বিশ্বকোষ হিসেবে সমাদৃত। ‘তাফসিরে জালালাইন’-এ তিনি ইমাম জালালুদ্দিন আল-মাহাল্লীর অসমাপ্ত তাফসির সম্পূর্ণ করে ইসলামী বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় তাফসির রচনা করেন। ‘তারিখুল খুলাফা’ ইসলামের খিলাফতের ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। এছাড়া ‘হুসনুল মুহাদারাহ ফি আখবারি মিসর ওয়াল কাহিরাহ’ মিসরের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং ‘আল-মুজহির ফি উলূমিল লুগাহ’ আরবি ভাষাতত্ত্বের অন্যতম মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর গ্রন্থগুলো পাঠ্য ও গবেষণার বিষয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর চিন্তা, গবেষণা ও সাহিত্যিক অবদান ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) ছিলেন এমন এক জ্ঞানতাপস, যিনি তাঁর মেধা, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন—জ্ঞানই একজন মানুষকে অমরত্ব দান করে। তিনি শুধু তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম নন; বরং মুসলিম জ্ঞান-সভ্যতার এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো আজও বিশ্বব্যাপী জ্ঞানসন্ধানীদের পথ আলোকিত করছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) তাফসির শাস্ত্রের কিংবদন্তি যিনি

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) তাফসির শাস্ত্রের কিংবদন্তি যিনি

আপডেট টাইম : এক মিনিট আগে
ইসলামের জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম যুগের গণ্ডি পেরিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞানপিপাসু মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) তাঁদেরই অন্যতম।

তিনি ছিলেন এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভা, যিনি কোরআনের তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, আকিদা, উসুল, অলঙ্কারশাস্ত্রসহ ইসলামী জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। পঞ্চদশ শতকের মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সাহিত্যকে তিনি এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁকে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বহুমুখী পণ্ডিত হিসেবে গণ্য করা হয়।ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতির পূর্ণ নাম আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর আস-সুয়ুতি। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে (৮৪৯ হিজরি) মিসরের রাজধানী কায়রোতে তাঁর জন্ম।

তবে তাঁর পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল মিসরের সয়ুত (Asyut) অঞ্চলে। সেই সূত্রেই তিনি ‘আস-সুয়ুতি’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হলেও তাঁর শিক্ষা ও প্রতিভার বিকাশ থেমে যায়নি। শৈশব থেকেই তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর।
মাত্র আট বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। পাশাপাশি তিনি হাদিস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ, সাহিত্য ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্র অধ্যয়ন করে অল্প সময়েই সমসাময়িক আলেমদের বিস্মিত করেন।তাঁর শিক্ষাজীবনের পেছনে পরিবারের, বিশেষত অভিভাবকদের উৎসাহ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে সময়ের মিসরের শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ ও ভাষাবিদদের কাছে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। ফলে খুব অল্প বয়সেই তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুল, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

তাঁর এই বহুমাত্রিক জ্ঞান তাঁকে সমকালীন আলেমদের মধ্যে অনন্য মর্যাদা এনে দেয়।শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি কায়রোর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা শুরু করেন। তাঁর পাঠদান ছিল সুসংহত, যুক্তিনির্ভর ও প্রাঞ্জল। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে জ্ঞান অর্জনের জন্য ছুটে আসতেন। একই সঙ্গে তিনি গবেষণা ও লেখালেখিকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। দিনের অধিকাংশ সময় তিনি পাঠ, গবেষণা, ফতোয়া প্রদান এবং গ্রন্থ রচনায় ব্যয় করতেন। তবে জ্ঞানীদের জীবন সব সময় নির্বিঘ্ন হয় না। জীবনের শেষ পর্যায়ে কিছু বিরূপ সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখোমুখি হন তিনি। আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন চিন্তার মূল্যায়ন করে তিনি জনজীবন থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন এবং কায়রোর নীল নদের তীরবর্তী রাওদা দ্বীপে নির্জন পরিবেশে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ সময়টুকু তিনি সম্পূর্ণভাবে ইবাদত, গবেষণা ও গ্রন্থ রচনায় অতিবাহিত করেন। ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে (৯১১ হিজরি) সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার আজও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে সমাদৃত।

ইমাম সুয়ুতির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর অসাধারণ লেখনীশক্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। ইসলামী জ্ঞানের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শাখা নেই, যেখানে তাঁর কলমের স্পর্শ পড়েনি। কোরআনের তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা, ইতিহাস, আকিদা, চিকিৎসা, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা—সব ক্ষেত্রেই তিনি মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন।

তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ, সাবলীল ও পাঠকবান্ধব ভাষা। তিনি জটিল বিষয়গুলোও এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যাতে সাধারণ পাঠক সহজেই তা বুঝতে পারেন। এ কারণেই তাঁর রচনাগুলো শুধু আলেমসমাজেই নয়, সাধারণ মুসলমানদের কাছেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ইসলামী জ্ঞানকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনন্য।

ইমাম সুয়ুতির উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘আল-ইতকান ফি উলূমিল কোরআন’ উলূমুল কোরআনের এক অনন্য বিশ্বকোষ হিসেবে সমাদৃত। ‘তাফসিরে জালালাইন’-এ তিনি ইমাম জালালুদ্দিন আল-মাহাল্লীর অসমাপ্ত তাফসির সম্পূর্ণ করে ইসলামী বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় তাফসির রচনা করেন। ‘তারিখুল খুলাফা’ ইসলামের খিলাফতের ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। এছাড়া ‘হুসনুল মুহাদারাহ ফি আখবারি মিসর ওয়াল কাহিরাহ’ মিসরের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং ‘আল-মুজহির ফি উলূমিল লুগাহ’ আরবি ভাষাতত্ত্বের অন্যতম মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর গ্রন্থগুলো পাঠ্য ও গবেষণার বিষয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর চিন্তা, গবেষণা ও সাহিত্যিক অবদান ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) ছিলেন এমন এক জ্ঞানতাপস, যিনি তাঁর মেধা, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন—জ্ঞানই একজন মানুষকে অমরত্ব দান করে। তিনি শুধু তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম নন; বরং মুসলিম জ্ঞান-সভ্যতার এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো আজও বিশ্বব্যাপী জ্ঞানসন্ধানীদের পথ আলোকিত করছে।