গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পলাতক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে যেসব প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার জবাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘তারা বলে ডিসেম্বর মাসে দেশে আসবে। আমরা অপেক্ষায় আছি। আসেন, দেখা হবে ইনশাল্লাহ রাজপথে।’
আজ বুধবার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
অতীতের স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা তো আর আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না। আওয়ামী লীগকে দেখেন, তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। এত অন্যায়-অবিচার, খুন, গুম, মানি লন্ডারিং, হত্যা, নির্যাতন, আয়নাঘর— এসবের জন্য তারা কোনো লজ্জাবোধ করে না।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের পরিবারের উদ্দেশে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের এই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জুলাইতে যারা আত্মাহুতি দিয়েছে, সেসব পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করা। এটাই সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব। যারা আহত হয়েছে, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে, অঙ্গ হারিয়েছে, তাদের সুস্থ করে তোলা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।’
তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এলেম, তাইম, নাইমা, ছোট্ট শিশু রিয়া গোপ, আহাদসহ অন্য শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের আত্মদান ও দেশপ্রেম জাতিকে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে বলে উল্লেখ করেন।
উপস্থিত জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা মন খারাপ করবেন না। এই সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়ই সম্মান আপনারা পাবেন। আমরা সেই সম্মান আপনাদের দেব। আমাদের যতটুকু সাধ্য আছে, সবকিছু উজাড় করে দেব আপনাদের কল্যাণের জন্য।’
এসময় সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, এই নির্বাচিত সরকার ভুল করলে আপনারা শুধরে দেবেন।
নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে আরেকটা করব, বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সুশাসন ও গণতন্ত্র চিরস্থায়ী করে যাব।’
তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্র আছে, কিন্তু এমন নাগরিক খুব কম আছে, যারা উদ্যত বন্দুকের সামনে আবু সাঈদের মতো দুই হাত তুলে দাঁড়াতে পারে। আমরা সেই জাতি। তাদের নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন আমাদের জাতীয় লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।’
তিনি বলেন, ‘আজ আমরা একটি নতুন যাত্রার সূচনা পর্বে দাঁড়িয়ে আছি। এই যাত্রাপথ সহজ নয়। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।’
জনগণকে সতর্ক করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে কোনো বিভাজন, কোনো বিদ্বেষ বা কোনো সংকীর্ণ স্বার্থ আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে।
এ সময় তিনি সবাইকে মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে ঐক্য, দেশপ্রেম, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আসুন, আমরা শহীদদের রক্তে অর্জিত এই নতুন সম্ভাবনাকে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করি।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। ৭১-এর জনযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। একইভাবে জুলাইয়ের যুদ্ধও ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।’

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 





















