ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নাহিদ-হাসনাত-সারজিস একসময় ছাত্রলীগ করতো: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জাতিসংঘে বিরল ইতিহাস গড়লেন প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শাহবাজ শরিফের সাক্ষাৎ, যা আলোচনা হলো জাতিসংঘে দূরদর্শী ভাষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে এর বিকল্প অকল্পনীয় : খলিলুর রহমান সৌদি আরবকে সহায়তায় জরুরি বৈঠকে তুরস্ক-পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘ মহাসচিবের অভিনন্দন, ভাষণে বিশ্বশান্তি ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশের রূপরেখা: মাহ্দী আমিন ৫ জেলার চরে অর্থকরী ফসল বাদাম ও কাউন প্রয়োজন সঠিক উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ বদলে যাবে কৃষকের ভাগ্য আসল ইলিশ চিনবেন যেভাবে হালান্ডের জোড়া গোলে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান নরওয়ের

মন্ত্রী ‘আটকে’ দিলেন কৃষির ১১ পিডি পাল্টানোর উদ্যোগ

নিয়ম না মেনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে হঠাৎ জুমে মিটিং করে পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান পিডিদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা তাদের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন না করেই নতুন পিডির নাম প্রস্তাব করার বিষয়টি জানতে পেরে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ তা আটকে দিয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি ডিএইর আওতায় বাস্তবায়নাধীন ১১টি প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এসব প্রকল্পের প্রতিটির জন্য নতুন পরিচালক হিসেবে তিনজন করে কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিচালকদের কেন সরানো হবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না কিংবা প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক কি না, এসব বিষয়ে প্রস্তাবনায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই।

আগে থেকে সভার নোটিশ না দিয়ে গত রোববার পিডি পরিবর্তন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে হঠাৎ একটি জুম মিটিং হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। সভায় বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে ফাইল তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। যদিও পরদিন কৃষিমন্ত্রী পুরো প্রস্তাবনা আটকে দেন।

সভায় অংশ নেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরি জীবনে এমন প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ তিনি দেখেননি। সাধারণত কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে, পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে কিংবা প্রশাসনিক কারণে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এরপর নতুন নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত দক্ষতা ও কর্মসম্পাদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার হঠাৎ করে জুম মিটিং করে পিডি পরিবর্তনের ফাইল তৈরি করা হয়েছে। সভায় নতুন যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। একইভাবে বর্তমান পরিচালকদের কেন পরিবর্তন করতে হবে, প্রকল্পের অগ্রগতি কেমন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব পায়নি।

তিনি আরও বলেন, সভাটি দেখে মনে হয়েছে, আগে থেকেই তৈরি করা একটি তালিকাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই সভাটি করা হয়। মূলত প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতাসহ দুই ব্যক্তি কৃষি সচিবের রুমে গিয়ে তাকে একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়ে পিডি পরিবর্তনের চাপ দেন। এরপর জুম মিটিং করা হয়। মন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়। পরে কৃষিমন্ত্রী বিষয়টি দেখে অসংগতি পান এবং ফাইলটি আটকে দিয়েছেন।

জানা গেছে, ডিএই থেকে পাঠানো তালিকায় একসঙ্গে পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার কম্পিটিটিভনেস, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্পসারণ প্রকল্প, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, মাশরুম প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণার পিডি নিয়োগের তালিকায় এক নম্বরে সুপারিশ করা হয়। সম্প্রতি বদলি করে রংপুরে পাঠানো হলেও মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি পদে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার প্রকল্পের পিডি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আরেক প্রকল্পে কর্মরত ডিপিডি এম এম আব্দুর রাজ্জাকের নাম সুপারিশ করা হয়েছে।

ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পিডি আব্দুল কায়ূম মজুমদার। তাকে বদলি করে তার স্থলে বান্দরবানে দায়িত্বরত অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ এই কর্মকর্তা ২০১৭ সালে আর্থিক অনিয়মের কারণে শাস্তি পেয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ওই আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করেননি। এ ছাড়া তার বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে দাখিল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকর্তার তালিকায় স্থান পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পরিচালকের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম। তিনি এই প্রকল্পে বর্তমানে যিনি মনিটরিং অফিসার এবং উপপ্রকল্প পরিচালক রয়েছেন তাদের জুনিয়র। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং বিগত সময়ে তার নানা-নানি ছিলেন ওই দলের সংসদ সদস্য।

পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসানোর জন্য ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির কথা বলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরে পিডি পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে তদবির চলছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর ১২ জন পিডি পরিবর্তন করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই পিডি পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আবার তদবির শুরু হয়েছে। এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এব) ও কৃষক দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার পিডি পরিবর্তনের তালিকাও দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে ডিএইর মহাপরিচালকের সঙ্গে গত সোমবার রাতে এবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার, সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবসহ অন্য নেতাদের বৈঠক হয়েছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। বৈঠকে পিডি পদপ্রত্যাশী কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বর্তমান একজন পিডিও উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একজন প্রকল্প পরিচালকের ওপর প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, দরপত্র ও ক্রয় কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের কাজ তদারক এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের দায়িত্ব থাকে। তাই এই পদে নিয়োগের আগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু সেগুলো করা হয়নি। মূলত রাজনৈতিক কোনো প্রভাবশালী নেতার চাপেই হঠাৎ করে পিডি বদলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি মন্ত্রী আটকে দিয়েছেন। আরও যাচাই-বাছাইয়ে পিডি বদল করা হয় কি না, সেটি আমরা বলতে পারছি না।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এতগুলো প্রকল্পের পিডি পদের একসঙ্গে পদায়ন চাওয়ায় কৃষিমন্ত্রী খানিকটা অবাকই হয়েছেন। তিনি এর বাস্তবায়ন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের বক্তব্য জানতে গতকাল সন্ধ্যায় একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কালবেলার পরিচয় দিয়ে এ প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়েছে। এর পরও তার সাড়া মেলেনি। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

নাহিদ-হাসনাত-সারজিস একসময় ছাত্রলীগ করতো: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

মন্ত্রী ‘আটকে’ দিলেন কৃষির ১১ পিডি পাল্টানোর উদ্যোগ

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

নিয়ম না মেনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে হঠাৎ জুমে মিটিং করে পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান পিডিদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা তাদের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন না করেই নতুন পিডির নাম প্রস্তাব করার বিষয়টি জানতে পেরে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ তা আটকে দিয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি ডিএইর আওতায় বাস্তবায়নাধীন ১১টি প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এসব প্রকল্পের প্রতিটির জন্য নতুন পরিচালক হিসেবে তিনজন করে কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিচালকদের কেন সরানো হবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না কিংবা প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক কি না, এসব বিষয়ে প্রস্তাবনায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই।

আগে থেকে সভার নোটিশ না দিয়ে গত রোববার পিডি পরিবর্তন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে হঠাৎ একটি জুম মিটিং হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। সভায় বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে ফাইল তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। যদিও পরদিন কৃষিমন্ত্রী পুরো প্রস্তাবনা আটকে দেন।

সভায় অংশ নেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরি জীবনে এমন প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ তিনি দেখেননি। সাধারণত কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে, পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে কিংবা প্রশাসনিক কারণে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এরপর নতুন নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত দক্ষতা ও কর্মসম্পাদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার হঠাৎ করে জুম মিটিং করে পিডি পরিবর্তনের ফাইল তৈরি করা হয়েছে। সভায় নতুন যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। একইভাবে বর্তমান পরিচালকদের কেন পরিবর্তন করতে হবে, প্রকল্পের অগ্রগতি কেমন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব পায়নি।

তিনি আরও বলেন, সভাটি দেখে মনে হয়েছে, আগে থেকেই তৈরি করা একটি তালিকাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই সভাটি করা হয়। মূলত প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতাসহ দুই ব্যক্তি কৃষি সচিবের রুমে গিয়ে তাকে একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়ে পিডি পরিবর্তনের চাপ দেন। এরপর জুম মিটিং করা হয়। মন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়। পরে কৃষিমন্ত্রী বিষয়টি দেখে অসংগতি পান এবং ফাইলটি আটকে দিয়েছেন।

জানা গেছে, ডিএই থেকে পাঠানো তালিকায় একসঙ্গে পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার কম্পিটিটিভনেস, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্পসারণ প্রকল্প, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, মাশরুম প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণার পিডি নিয়োগের তালিকায় এক নম্বরে সুপারিশ করা হয়। সম্প্রতি বদলি করে রংপুরে পাঠানো হলেও মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি পদে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার প্রকল্পের পিডি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আরেক প্রকল্পে কর্মরত ডিপিডি এম এম আব্দুর রাজ্জাকের নাম সুপারিশ করা হয়েছে।

ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পিডি আব্দুল কায়ূম মজুমদার। তাকে বদলি করে তার স্থলে বান্দরবানে দায়িত্বরত অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ এই কর্মকর্তা ২০১৭ সালে আর্থিক অনিয়মের কারণে শাস্তি পেয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ওই আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করেননি। এ ছাড়া তার বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে দাখিল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকর্তার তালিকায় স্থান পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পরিচালকের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম। তিনি এই প্রকল্পে বর্তমানে যিনি মনিটরিং অফিসার এবং উপপ্রকল্প পরিচালক রয়েছেন তাদের জুনিয়র। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং বিগত সময়ে তার নানা-নানি ছিলেন ওই দলের সংসদ সদস্য।

পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসানোর জন্য ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির কথা বলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরে পিডি পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে তদবির চলছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর ১২ জন পিডি পরিবর্তন করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই পিডি পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আবার তদবির শুরু হয়েছে। এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এব) ও কৃষক দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার পিডি পরিবর্তনের তালিকাও দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে ডিএইর মহাপরিচালকের সঙ্গে গত সোমবার রাতে এবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার, সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবসহ অন্য নেতাদের বৈঠক হয়েছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। বৈঠকে পিডি পদপ্রত্যাশী কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বর্তমান একজন পিডিও উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একজন প্রকল্প পরিচালকের ওপর প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, দরপত্র ও ক্রয় কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের কাজ তদারক এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের দায়িত্ব থাকে। তাই এই পদে নিয়োগের আগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু সেগুলো করা হয়নি। মূলত রাজনৈতিক কোনো প্রভাবশালী নেতার চাপেই হঠাৎ করে পিডি বদলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি মন্ত্রী আটকে দিয়েছেন। আরও যাচাই-বাছাইয়ে পিডি বদল করা হয় কি না, সেটি আমরা বলতে পারছি না।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এতগুলো প্রকল্পের পিডি পদের একসঙ্গে পদায়ন চাওয়ায় কৃষিমন্ত্রী খানিকটা অবাকই হয়েছেন। তিনি এর বাস্তবায়ন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের বক্তব্য জানতে গতকাল সন্ধ্যায় একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কালবেলার পরিচয় দিয়ে এ প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়েছে। এর পরও তার সাড়া মেলেনি। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।