ইতালির সরকার স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি কোনো একটি শ্রেণিতে ইতালীয় ভাষায় দুর্বল শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর সীমা আরোপের অনুমোদন দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
এতে বলা হয়, প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষে ইতালীয় নাগরিকত্ব নেই অথবা ইতালীয় ভাষায় দুর্বল—এমন শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই পদক্ষেপগুলোকে ‘সাধারণ বোধের উপায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা বিভাজন সৃষ্টি না করে প্রকৃত অর্থে একীভূত হতে সহায়তা করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, আগামী বছর সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার কট্টর ডানপন্থী ‘ফুতুরো নাজিওনালে’ দলের নীতির প্রতি তোষণ করছে।
শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা বলেছেন, এই সীমা মূলত ভাষাভিত্তিক, নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নয়। তিনি নিকাব ও বোরকা নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে লৈঙ্গিক সমতার বিষয় হিসেবেও তুলে ধরেছেন।
গত রোববার পরিকল্পনাগুলো ঘোষণা করার সময় মেলোনি বলেন, ‘আপনাকে মুখ খোলা অবস্থায় স্কুলে যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যের নামে কোনো তরুণীকে মুখ ঢেকে রাখতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত কারও নেওয়া উচিত নয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে ডিক্রিটির কয়েকটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। তবে মূল বিষয়গুলো স্পষ্ট ছিল। মুখ ঢাকার নিষেধাজ্ঞা বোরকা ও নিকাবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে হিজাব এর আওতায় পড়বে না, কারণ এতে মুখ খোলা থাকে। নিকাব হলো এমন একটি মুখঢাকা পোশাক, যাতে চোখের চারপাশের অংশ খোলা থাকে। তবে এর সঙ্গে আলাদা চোখঢাকা পর্দাও পরা হতে পারে। এটি সাধারণত মাথার স্কার্ফের সঙ্গে পরা হয়। বোরকা হলো এক ধরনের একটুকরা পর্দা, যা মুখ ও শরীর ঢেকে রাখে। চোখের সামনে প্রায়ই জালের মতো একটি অংশ থাকে, যার মধ্য দিয়ে দেখা যায়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফোন্দাজিওনে ইসমুর তথ্য অনুযায়ী, ইতালির স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ইতালীয় নাগরিক নয়।
ইতালীয় ভাষায় সীমিত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০ শতাংশের সীমা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে ভিন্নভাবে কার্যকর হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই সীমা প্রযোজ্য হবে এমন অ-ইতালীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে, যারা ইতালিতে জন্মগ্রহণ করেনি অথবা অন্তত দুই বছর প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েনি। নিম্ন ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এই সীমা প্রযোজ্য হবে এমন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, যাদের ইতালীয় নাগরিকত্ব নেই এবং যারা ইতালির স্কুল ব্যবস্থায় অন্তত তিন বছর সফলভাবে পড়াশোনা শেষ করেনি।
স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলা হবে, ইতালীয় ভাষায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের আশপাশের বিভিন্ন স্কুলে আরও সমানভাবে ভাগ করে দিতে। তা সম্ভব না হলে ছাড় দেওয়া হবে এবং অতিরিক্ত ইতালীয় ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এর লক্ষ্য হলো ‘বিচ্ছিন্ন শ্রেণিকক্ষ’ তৈরি হওয়া এড়ানো।’
বার্তা সংস্থা আনসার তথ্য অনুযায়ী, খসড়ায় অভিভাবকদের বিষয়েও আরও কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে অভিভাবকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভাষাগত বাধার কারণে কোনো শিশুর একীভূত হওয়া বাধাগ্রস্ত হয়, সেসব ঘটনা স্কুলগুলোকে সমাজসেবা বিভাগকে জানাতে হবে। বিনামূল্যে ইতালীয় ভাষার কোর্সও দেওয়া হবে। এটি একটি ডিক্রি আইন। অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হতে পারে, তবে ৬০ দিনের মধ্যে সংসদে এর অনুমোদন নিতে হবে।
ইতালির স্কুলগুলোতে ইতালীয় ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে আগে থেকেই নির্দেশনা রয়েছে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মারিয়াস্তেলা গেলমিনির অধীনে ২০১০ সালের একটি মন্ত্রণালয় নির্দেশনায় ইতালীয় নাগরিকত্ব নেই—এমন শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সাধারণ নিয়ম হিসেবে’ ৩০ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন ডিক্রির মাধ্যমে সেই সীমাকে আইনে পরিণত করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিরোধীরা বলছে, এই পরিকল্পনা স্কুলের চেয়ে রাজনীতির সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
বিরোধীরা মেলোনির বিরুদ্ধে রবার্তো ভান্নাচ্চির প্রতি তোষণ করার অভিযোগ করেছে। অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা কট্টর ডানপন্থী ‘ফুতুরো নাজিওনালে’ দলের নেতৃত্ব দেন এবং ক্ষমতাসীন জোটের ডানপন্থী অংশের জন্য হুমকি হিসেবে তাকে দেখা হয়।
মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডি) নেতা এলি শ্লেইন এই পরিকল্পনাকে প্রচারণা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। পিডির উপ-নেতা ও পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ভাইস-প্রেসিডেন্ট আন্না আসকানিও শিশুদের শিক্ষার ব্যয়ে সরকার প্রচারণা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
নিউইয়র্ক থেকে ভিডিও সংযোগে এক সংবাদ সম্মেলনে ভালদিতারা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভান্নাচ্চির পেছনে ছুটছি না; বরং সে-ই আমাদের পেছনে ছুটছে।’
ভান্নাচ্চি বলেন, তিনি এই পদক্ষেপগুলোতে একমত, তবে এগুলো আরও কয়েক বছর আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
লিগ দলের মাত্তেও সালভিনি গত বুধবার ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বলে অভিহিত করা বিষয় নিয়ে আলাদা একগুচ্ছ পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। তিনি ভান্নাচ্চির বিরুদ্ধে ‘ক্রমাগত সরকারের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার’ অভিযোগ করেন।
সালভিনি বলেন, তিনি আশা করেন ‘ফুতুরো নাজিওনালে’ লিগের নতুন প্রস্তাবগুলোকে সমর্থন করবে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























