বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ আবারও বন্যার কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। ফলে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী, প্রাণহানিও ঘটেছে। অনেক এলাকার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। গত মাসেও বন্যার প্রকোপে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ এশিয়ার অনেক দেশে। চলমান বন্যার সঙ্গে ভূমিধস মিলে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে এ পর্যন্ত ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুসংবাদ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণাকেন্দ্রের বৈশ্বিক বন্যাসতর্কতা পদ্ধতির ১০ আগস্টের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পুরো অববাহিকা এবং গঙ্গার ভাটিতে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। আর ব্রহ্মপুত্রের উজানে গত ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে (প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০১৭)। সাধারণত আমরা ভেবে থাকি, বন্যা তো প্রাকৃতিকভাবেই আসে। এর জন্য আবার কে দায়ী হবে? কিন্তু সাম্প্রতিক কালের বন্যার পেছনে মানুষের দায় আছে। মানুষের কার্যকলাপের কারণে সংঘটিত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক মাত্রার বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নত রাষ্ট্রগুলো দায় এড়াতে পারে না।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী ৩০ বছরে এশিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল এমনিতেই এই মহাদেশের সবচেয়ে পানিবহুল আর পৃথিবীর অন্যতম পানিবহুল এলাকা। এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের গড় ১ হাজার মিলিমিটার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২০১২ সালে করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারী বর্ষণ বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ১৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ উপকূলীয় বা অভ্যন্তরীণ বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে। ১৯৫০-২০১৭ সাল পর্যন্ত উপাত্তে দেখা যায়, বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ২২ লাখ মানুষ বন্যায় প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে শুধু ১৯৫৯ সালের বন্যায় চীনে ২০ লাখ মানুষ মারা যায়।
বৈশ্বিক আবহাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব সবারই জানা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভারী বর্ষণ ঘটে চলেছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতে বন্যার সৃষ্টি হয়। বার্ষিক বৃষ্টিদিনের সংখ্যা কমে যায়, কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়ে যায়। দেখা যায়, অনেক দিন ধরে বৃষ্টি না হয় না, কিন্তু হঠাৎ এক দিনে বা এক ঘণ্টায় অতিমাত্রায় বৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শ্রাবণ মাসে এখন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির বদলে মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এটা গত কয়েক বছরের ধরন। কিন্তু সাধারণত শ্রাবণ মাসে মুষলধারে বৃষ্টি হয় না। খনার বচনে ‘শ্রাবণধারা’ উল্লেখ আছে। মানে একটানা বৃষ্টি হবে কিন্তু মুষলধারে নয়। এখন দেখা যাচ্ছে, টানা কয়েক দিন মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে তারপর আবার প্রকট উত্তাপ শুরু হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, নদী অপদখলে চলে যাওয়া ইত্যাদি যোগ হয়ে অতিবৃষ্টির পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়। ফলে তা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফসল, সম্পদ, ঘরবাড়ির সঙ্গে মানুষকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা সংগঠনের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ দেবী কিরোনো সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এশিয়াব্যাপী মানুষের জীবন শুধু যে বন্যার প্রাথমিক ধাক্কায় বিপদের মুখে পড়ে তা নয়। পানিবাহিত রোগের জীবাণু বিকশিত হওয়ার জন্য উচ্চ তাপমাত্রা আদর্শ পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বন্যা নয়, তাপমাত্রাও বৃদ্ধি করছে। ফলে বন্যায় সব ভাসিয়েই তা ক্ষান্ত হচ্ছে না, তাপমাত্রা বাড়িয়ে বন্যাপরবর্তী পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়াতেও বড় ভূমিকা রাখছে।
তাপমাত্রা বাড়ার ফলে ভারতীয় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ুপ্রবাহে তারতম্য দেখা দিচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। মৌসুমি বায়ুর আগমন বিলম্বিত হওয়া ছাড়াও অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তা অনিয়ন্ত্রিত বন্যায় রূপ নিচ্ছে। রবার্ট কয়েনরাড তাঁর ন্যাচারাল ডিজাস্টার অ্যান্ড হাউ উই কোপ গ্রন্থে দাবি করেছেন যে ২০ শতকের বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে বন্যার মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে বন্যার পৌনঃপুনিকতা বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ সরকারের ২০০৯ সালের জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ‘একটি স্বাভাবিক বছরে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ডুবে যায়। প্রতি চার-পাঁচ বছরে একটি প্রবল বন্যা আসে, যা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ডুবিয়ে দেয়।’
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু অতিবৃষ্টির মাধ্যমেই বন্যার সৃষ্টি করছে, এমন নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দ্রুত ভোগান্তিতে পড়তে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হবে বাংলাদেশ। জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে মানুষ প্রায় প্রতিবছর বানভাসি হচ্ছে। সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকীতে রবার্ট গ্লেনন বাংলাদেশ ঘুরে গিয়ে লিখেছেন যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা তিন ফুট বাড়লে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ ভূমি ডুবে যাবে এবং তিন কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। তবে বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ দাবি করেন যে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পাঁচ-ছয় ফুট বাড়তে পারে এবং তাতে সম্ভবত পাঁচ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।
এ ছাড়া হিমালয়ের হিমবাহ ও স্নোপ্যাক গলে গিয়ে নদীগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলছে, যা বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। ভারতের পানি নীতিও বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। বাঁধ দিয়ে শুকনো মৌসুমে ব্যাপক আকারে নদীর গতিপথ বদলে সেচকাজে পানি ব্যবহার করছে ভারত। কিন্তু বন্যা শুরু হলে বাঁধ ছেড়ে দিয়ে বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বন্যাকবলিত হচ্ছে।
কয়েক দিন আগে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য বাজেট সহায়তা হিসেবে তারা দুই হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশকে ঋণ দিতে চায় (প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০১৭)। তবে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ যতটা না প্রাকৃতিক কারণে ঘটছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বাংলাদেশের জনগণ এসব দুর্যোগের মধ্যে দিনরাত পার করছে। কিন্তু এর জন্য তারা আসলে কতটা দায়ী? জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন দরকার, তার মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ নির্গমন করে বাংলাদেশ। বেশির ভাগ নির্গমনের জন্য দায়ী উন্নত রাষ্ট্রগুলো, যারা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে তথাকথিত উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাই ঋণ নয়, বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে মনোযোগী হয়ে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জনে ধনী রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটা আর শুধু তাদের নৈতিক দায়ই নয়, আইনগত বাধ্যবাধকতাও।
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ
ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন
রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার
রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো
চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি
প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির
সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে। জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন
এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা
বন্যার দায় কার
-
বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক - আপডেট টাইম : ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৭
- 482
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ



























