বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ কুষ্টিয়ায় পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এনামুল হক নামে এক অপহরণকারী নিহত হয়েছে। সোমবার ভোর ৪টার দিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিণানায়নপুর বেড়ি বাঁধ এলাকায় একটি কলাবাগানের ভেতর এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। নিহত এনামুল সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকার মোস্তফা মিয়ার ছেলে।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, ২ রাউন্ড গুলি, তিনটি গুলির খোসা ও দুটি হাসুয়া উদ্ধার করেছে।
পুলিশ জানায়, নিহত এনামূল শিবপুর এলাকার প্রদীপ সাহার পুত্র অপহৃত কলেজ ছাত্র সাগর সাহা হত্যা মামলার মূল আসামী।
পুলিশ জানায়, হরিণানারায়ণপুর বেড়ি বাঁধ এলাকায় একদল অপহরণকারী অস্ত্রসহ অবস্থান করছে, এমন সংবাদের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম সেখানে অভিযানে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে উভয়ের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ বন্দুকযুদ্ধ চলে। পরে অপহরণকারী পালিয়ে গেলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আহত অবস্থায় অপহরণকারী এনামূলককে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসলে কত্যর্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। বন্দুকযুদ্ধে এনামূল নিহত হওয়ার ঘটনা জানার পর সাগরের পরিবারসহ এলাকাবাসী কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতার বিরোধের কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা শিবপুর গ্রামের কলেজছাত্র সংখ্যালঘু পরিবারের সন্তান সাগর সাহাকে।
গত বুধবার অপহরণের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে একটি বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত শৌচাগার থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
শিবপুর গ্রামে প্রায় ২০০ হিন্দু পরিবারের বসবাস। স্থানীয় হরিনারায়াণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মো. ইন্তাজ তাদের দেখভাল করেন। এই ইন্তাজ হলেন নিহত সাগরের বাবা প্রদীপ সাহার বাল্যকালের বন্ধু। ইন্তাজ শিবপুর গ্রামে ১৪ বছর ইউপি সদস্য ছিলেন। তার প্রতিপক্ষ ছিলেন জামায়াত কর্মী একই গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিকুর ইউপি সদস্য থাকাকালীন গেল বছর মারা গেছেন। তিনি নাশকতা মামলার আসামীও ছিলেন। গত জানুয়ারি উপনির্বাচন হলে সিদ্দিকুরের স্ত্রী জেসমিন আরা স্বামীর জায়গায় ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে ইন্তাজ দুই ভোটে পরাজিত হন। নির্বাচনে জেসমিনকে সর্মথন দেন হরিনারায়াণপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দীন। মহিউদ্দীন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর হিন্দু পরিবারগুলোর সঙ্গে সংঘাত থাকায় নির্বাচনে ইন্তাজের পক্ষ কাজ করেন প্রদীপ সাহা। এনিয়ে সিদ্দিকুরের ভাজিতা এনামুলসহ তাদের পরিবারের সঙ্গে প্রদীপের বিরোধ চলে আসছিল।
সাবেক ইউপি সদস্য ইন্তাজ অভিযোগ করে বাঙালী কণ্ঠকে বলেন, এনামুল ও জেসমিন জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেবার পর থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা চেয়ারম্যান মহিউদ্দীনের ছত্রছায়ায় থাকে। এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর অত্যাচার করতো।
হিন্দু সমাজপতি হৃদয় সাহা বাঙালী কণ্ঠকে বলেন, মহিউদ্দীন ইউনিয়নটাকে শেষ করে দিচ্ছে। তার সঙ্গে এনামুলরা যোগ দিয়ে আজ সাগরের মতো অবুঝ নিরীহ ছেলেকে মেরে ফেললো।
তিনি আরো বলেন, তাদের অত্যাচারে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন প্রতিদিন রাত জেগে এলাকায় পাহারা দিচ্ছে। জামায়াত আওয়ামী লীগের ভেতর ঢুকে আমাদের হিন্দুদের এলাকা ছাড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সাগরের বাবা প্রদীপ সাহা বলেন, আমার কোন শত্রু নাই। কেন আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হল। আমার একটাই অপরাধ আমি ইন্তাজের পক্ষ নিছিলাম। শনিবার রাতে লাশ উদ্ধারের পর শিবপুর গ্রামের বাসিন্দারা এনামুলের বাড়িসহ তার আত্বীয়স্বজনদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে।
এদিকে, এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে গত সকাল দশটা থেকে বেলা এগারটা পর্যন্ত খাতের আলী ডিগ্রী কলেজের সামনে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক এক ঘন্টা অবরোধ করে রাখে সাগরের সহপাঠীরা। এর সঙ্গে এলাকার বেশিরভাগ মানুষ যোগ দেন। পরে পুলিশ গিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
এদিকে, বেলা এগারটায় স্থানীয় শিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সভা করেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা। সেখানে গ্রামের বাসিন্দারা যোগ দেন। খবর পেয়ে সেখানে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাংসদ আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক মাহবুব আলম হানিফ যান। তিনি প্রতিবাদ সমাবেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের কথা শোনেন।
সমাবেশে মিন্টু সাহা ঘোষণা দেন সাগর হত্যার প্রতিবাদে আসন্ন দুর্গাপূজা শিবপুর গ্রামে করা হবে না। এসময় উপস্থিত সবাই হাস নেড়ে সমর্থন দেন। মিন্টু সাহা বলেন, চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন নব্য আওয়ামী লীগ এনামুলকে শেল্টার দিয়ে তাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। হিন্দুরা আতঙ্কের মধ্যে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতাদের পৃষ্ঠাপোষকতায় এনামুলসহ আরো কয়েকজন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সাগরকে হত্যা করেছে। সাগরকে উদ্ধারে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।
এ সময় মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, সাগরকে যারা হত্যা করেছে তারা পেশাদার খুনি। অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও নৃশংস হত্যা যারা ঘটিয়েছে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অল্প দিনের মধ্যেই আইনের মাধ্যমে চুড়ান্ত শাস্তি তাদের দেওয়া হবে। অপরাধীরা রাজনীতির কোন সম্পৃক্ততা আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। আমি কখনোই দলের কোন নেতাকর্মির অপরাধ প্রশ্রয় দেইনি। অপরাধী প্রত্যেককে শাস্তি দেওয়া হবে। তা না হলে আমি আর এখানে রাজনীতি করতে আসবো না।
পুলিশ সুপার এসএম মেহেদী হাসান বাঙালী কণ্ঠকে বলেন, আস্থা রাখেন সাগর হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আপনারা খুব দ্রুত দেখতে পাবেন। অভিযোগের ব্যাপারে হরিনারায়ানপুর ইউপি সদস্য মহিউদ্দীন বলেন, এনামুলসহ তার পরিবারের সবাই জামায়াতের রাজনীতি করতো। কয়েক বছর আগে তারা জেলার নেতাদের হাত ধরে আওয়ামী লীগের যোগ দেয়। চেয়ারম্যান হবার পর তারা আমার সঙ্গেই রাজনীতি করে। এখন তারা খুনের রাজনীতি করে ফায়দা হাসিল করছে। এর সঙ্গে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। সাগর হত্যা নিয়ে আওয়ামী লীগের আরেকটি পক্ষ কলকাঠি নাড়ছে।
গত বুধবার স্থানীয় খাতের আলী কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র প্রদীপ সাহা বাইসাইকেল নিয়ে হারিনারায়ণপুর বাজারে বাজার করতে এসে অপহরণের শিকার হন। অপহরণকারী সাগরের পরিবারের কাছে প্রথমে ৫০ লাখ এবং পরে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করেন। এর তিনদিন পর ১৯ আগস্ট হরিণানায়পুর এলাকায় একটি বিদ্যালয়ের পরিত্যাক্ত বাথরুম থেকে অপহৃতের লাশ উদ্ধার করা হয়।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























