মহিলাদের নামাজ গৃহেই উত্তম

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বর্তমানে স্কুল, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি, কেনাকাটা, দেশসেবা প্রভৃতি প্রয়োজনে মুসলিম মহিলারা সর্বত্র বিচরণ করছেন। সময়মতো নামাজ আদায়ের প্রয়োজনে তাদের জন্য পর্দা ও শালীনতাসহ মসজিদে পৃথক ব্যবস্থা রাখার পক্ষে আমরা এর আগে সুচিন্তিত প্রবন্ধ প্রকাশ করেছি। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি দৃশ্যত ভিন্নমতের হলেও যথেষ্ট উদ্ধৃতিসহ লেখক তার যুক্তি পেশ করেছেন। আমরা চাই, বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ও খোলামেলা আলোচনা হোক    বিভাগীয় সম্পাদক।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নারী-পুরুষ সবার ওপর ফরজ হলেও জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের বাধ্যবাধকতা শুধু পুরুষের জন্যই প্রযোজ্য। মহিলাদের জন্য তাদের নিজ নিজ গৃহের অভ্যন্তরে নামাজ আদায় করাই শ্রেয়। মসজিদে গিয়ে জামাতে অংশগ্রহণ মহিলাদের ওপর অপরিহার্য তো নয়ই; বরং বিভিন্ন কারণে অনুত্তম ও নিরুৎসাহিত বিষয়।

এক. মহিলাদের ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ অপরিহার্য নয়। যেমন জুমা ও ঈদ ওয়াজিব হওয়ার বিধান সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে হজরত তারিক বিন শিহাব (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, জুমার নামাজ প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অপরিহার্য। তবে চার শেণির লোকের ওপর জুমা অপরিহার্য নয়। তারা হলো পরাধীন দাস, মহিলা, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তি। (সুনানু আবি দাউদ, ১ম খ-, অধ্যায় : নামাজ, অনুচ্ছেদ : দাস-দাসি ও মহিলার জুমার নামাজ, হাদিস নং-১০৬৯)। অতএব মহিলাদের জন্য জুমা ও ঈদের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

দুই. মহিলাদের জন্য তাদের নিজ নিজ গৃহের অভ্যন্তরে নামাজ আদায় করা অতি উত্তম হওয়ার ব্যাপারে অনেক হাদিস ও সাহাবাদের আমল বিদ্যমান। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, মহিলাদের নামাজ ঘরেই উত্তম, তার বাড়িতে আদায় করার চেয়ে; আর ঘরের একান্ত স্থানেই উত্তম ঘরে নামাজ আদায় করার চেয়ে। (সুনানু আবি দাউদ,  ১ম খ-,অধ্যায় : নামাজ, অনুচ্ছেদ : মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোরতা, হাদিস নং : ৫৭০)। রাসুল (সা.) বলেছেন, মহিলাদের সর্বোত্তম মসজিদ হলো তাদের ঘরের একান্ত স্থান। (আল-মুসনাদ লি ইমাম আহমাদ : ২৬৫৮৪)।

আবদুল্লাহ ইবনে সুয়াইদ আল-আনসারী থেকে বর্ণিত, তার ফুফু উম্মে হুমাইদ (রা.) রাসুল (সা.) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমি আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে খুবই আগ্রহবোধ করি। রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার সঙ্গে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে তোমার আগ্রহ আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার নামাজ তোমার ঘরের একান্ত স্থানেই উত্তম, ঘরে আদায় করার চেয়ে। তোমার নামাজ তোমার ঘরে উত্তম, বাড়িতে আদায় করার চেয়ে। তোমার নামাজ তোমার বাড়িতে আদায় করা উত্তম, তোমার মহল্লার মসজিদে আদায় করার চেয়ে। তোমার নামাজ তোমার মহল্লার মসজিদে উত্তম, আমার মসজিদে আদায় করার চেয়ে।’ একথা শুনে উম্মে হুমাইদ (রা.) নিজ ঘরের সবচেয়ে নির্জন স্থানে নামাজের জায়গা তৈরি করার ব্যবস্থা করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই নামাজ আদায় করেন। (সহি ইবনে হিব্বান, পঞ্চম খ-, হাদিস : ২২১৭)।

তিন. মহিলাদের জন্য পর্দা রক্ষা করা অপরিহার্য এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বের না হওয়াই ইসলামসম্মত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থান করবে, মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সূরা আল-আহজাব : ৩৩)। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মহিলারা অবশ্যই সংরক্ষণযোগ্য। তারা যখনই বের হয়, শয়তান তাদের দিকে চোখ তুলে তাকায়।’ ইমাম তিরমিজি বলেন, হাদিসটি হাসান, গরিব ও  সহিহ। (জামি আত-তিরমিজি, তৃতীয় খ-, অধ্যায় : দুধ পান, অনুচ্ছেদ : স্বামীহীন মহিলাদের কাছে যাওয়া, হাদিস : ১১৭৩)।

চার. নবী (সা.) এর যুগে মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে ফেতনা-ফ্যাসাদ বৃদ্ধি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে তাদের মসজিদে যাওয়ার বিষয়টি নিষিদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উমরা বিনতে আবদুর রহমান নবী (সা.) এর স্ত্রী আয়েশা (রা.) কে বলতে শুনেছেন যে, মহিলারা যা শুরু করেছে রাসুল (সা.) জীবিত থাকলে অবশ্যই তাদের মসজিদে যেতে বারণ করতেন। যেমন বনি ইসরাইলদের নারীদের বারণ করা হয়েছিল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি উমরা বিনতে আবদুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করলাম, বনি ইসরাইলদের নারীদের মসজিদে যেতে বারণ করা হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (বোখারি : ৮৩১; মুসলিম : ১০২৭; জামি আত-তিরমিজি : ৫৪০)। আয়েশা (রা.) যদি তার সময়ই এমন মন্তব্য করে থাকেন, তাহলে পর্দা রক্ষার ব্যাপারে নারীদের শৈথিল্য, পুরুষদের তাকওয়া-পরহেজগারি লোপ পাওয়া, নীতি ও নৈতিকতার ব্যাপারে সামাজিক অবক্ষয়ের এ যুগে নারীদের মসজিদে গমন সমীচীন হতে পারে না।

পাঁচ. মহিলাদের ঈদ ও জুমার জামাতে আংশগ্রহণ করে মসজিদের ইমামদের কাছ থেকে দ্বীন শিক্ষার একটা সুযোগ হয় বটে। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির যুগে নিজ গৃহে বসেও দ্বীন শিক্ষার অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। দ্বীনি বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে দ্বীন শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত সব দেশেই মহিলাদের জন্য  দ্বীন শিক্ষার সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনেক মহিলাই আছেন যারা অনেক ইমামের চেয়ে বড় আলেম।

ছয়. সাধারণত আমাদের সমাজ ইবাদত-বন্দেগির ব্যাপারে অনেক তৎপর হলেও পর্দা-পুশিদার ব্যাপারে অনেক উদাসীন। পূর্ণ শরয়ি পর্দা রক্ষাকারী নারী-পুরুষের সংখ্যা অনেক কম। পর্দা রক্ষা করে মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার সাধারণ অনুমতির ফতোয়া দিলে মসজিদে যাওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে পর্দা রক্ষার বিষয়টি এক সময় গৌণ হয়ে যেতে পারে।

সর্বোপরি মহিলাদের নিজ গৃহের অভ্যন্তরে নামাজ আদায় করাই শ্রেয়। আর জুমা ও ঈদের নামাজ তাদের ওপর অপরিহার্যই নয়। কাজেই ধর্মীয় এই অবক্ষয়ের যুগে মহিলাদের জুমা ও ঈদের নামাজসহ অন্যান্য নামাজ আদায় করতে মসজিদে যাওয়ার ফতোয়া না দেওয়াই কি উত্তম হবে না? তবে সময়ের প্রয়োজনে শহর-বন্দরের দু-একটি মসজিদে অথবা ভিন্ন স্থানে মহিলাদের নামাজের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকতে পারে। যেন তারা শহর-বন্দরে গেলেও তাদের সুবিধামতো নামাজ আদায় করে নিতে পারে। বর্তমানে আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা শুরু হয়েছে।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর