প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ল্যাপটপ ক্রয় দুর্নীতি : সরকারের পৌনে তিনশ’ কোটি টাকা লুটপাট

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ সরকারের নিজস্ব তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের অর্থে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ সরবরাহের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে ৫০ হাজার ল্যাপটপ ক্রয়ও করা হয়েছিল। কিন্তু, ক্রয়ে দুর্নীতি ও লুটপাট প্রবণতার কারণে সেই কর্মসূচি কোনও কাজে আসেনি। ল্যাপটপ ক্রয় দেখানো হয়েছে বেশ উচ্চমূল্যে, অন্যদিকে ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের। যেসব ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়েছে বিদ্যালয়গুলো তা মোটেই ব্যবহার করতে পারেনি। মাঝ থেকে সরকারের প্রায় পৌনে তিনশ’ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের এই ল্যাপটপ দুর্নীতি বিষয়ে ব্যাপক অভিযোগ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপিত হয়েছে। তার ভিত্তিতে বিলম্বে হলেও অবশেষে সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে, এই তদন্ত কমিটি আদৌ সুষ্ঠুভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কিনা কিংবা তদন্ত রিপোর্ট কখনও আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে ইতিমধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে। এর কারণ, তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর কেন্দ্রীক প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রটি বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। এরা তদন্ত কাজকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’র (পিইডিপি-৩) অধীনে সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য ৫০ হাজার ল্যাপটপ সরবরাহের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু, এই ল্যাপটপ ক্রয়ের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজচক্র সক্রিয় হয়ে উঠে। চক্রটি পরোক্ষভাবে খোদ টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জড়িয়ে পড়ে। জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে টেন্ডার ম্যানিপুলেশন করা হয়। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নিয়েছে তাদের কারো কারো দরপত্রের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টও ছিঁড়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ উঠে। সুনির্দিষ্ট এসব অভিযোগ বিশ্বব্যাংকের কাছেও যায়। বিশ্বব্যাংক বেশ কিছুদিন টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী নিজে তদবির চালিয়ে এসব অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রকল্পের অগ্রগতি পিছিয়ে পড়ছে- এমন অজুহাত দেখিয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকে তদবির চালিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন। আর সেই সুবাদে লুটপাট হয় ব্যাপকহারে।

জানা গেছে, মন্ত্রীর মেয়ের জামাই এই ল্যাপটপ ক্রয়ের পুরো টেন্ডার কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব খাটান। তারই প্রভাবে কৌশলে নথি থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলে সর্বনিম্ন দরদাতা দুটি কোম্পানিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশনেরও বাইরে রাখা হয়েছিল কোম্পানি দুটিকে। এছাড়া কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়ে দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল দেশীয় ব্র্যান্ড ‘দোয়েল’ ল্যাপটপের নির্মাতা সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থাকে (টেশিস)।

সূত্র জানায়, ৫০ হাজার ল্যাপটপ ক্রয়ের জন্য গত বছরের ২৮ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। দরপত্রের সিডিউল জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখ ছিল ২৯ জুন, ২০১৭। এ দরপত্রে মোট আটটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। পাঁচটি লটে আহ্বান করা এসব দরপত্রে দেখা যায়, বিভিন্ন লটে হায়ার ইন্টারন্যাশনাল ৩০৮ ডলার, হায়ার ইলেকট্রনিক্স অ্যাপ্লায়েন্স ৪১৬ ডলার, গ্লোবাল ব্র্যান্ড ৬৬৫ ডলার, স্মার্ট টেকনোলজি ৬৭৬ ডলার, কম্পিউটার সোর্স ৬৭২ ডলার, ফ্লোরা লিমিটেড ৬৮০ ডলার, ফ্লোরা টেলিকম ৬৭৮ ডলার ও থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেম ৬৭০ ডলার দর দেয়।

অতিরিক্ত দামে ল্যাপটপ কেনার লক্ষ্যে মূল্য তালিকায় থাকা সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান দুটিকে কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে। দরপত্রে অংশ নেওয়া দুটি কোম্পানি গণশিক্ষামন্ত্রীর কাছে লিখিত এক অভিযোগে জানিয়েছিল, দরপত্রে চাওয়া সব কাগজপত্রই তারা জমা দিয়েছেন। কিন্তু নথি থেকে তাদের কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশেষ আঁতাতের মাধ্যমে বেশি দামে ল্যাপটপ কিনতেই এ কাজ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কিন্তু মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের কাছে এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলেও তিনি এ দুর্নীতি রোধে কোনও পদক্ষেপ নেননি। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, মন্ত্রীর মেয়ের জামাই অর্থাৎ মন্ত্রী নিজেই এ দুর্নীতির সঙ্গে নেপথ্য থেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। বাদ পড়া দু’টি কোম্পানির কাছ থেকে ল্যাপটপ ক্রয় করা হলে সরকারের প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা বেঁচে যেতো। কিন্তু, তা উপেক্ষা করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়মবহির্ভুতভাবে উচ্চমূল্যে ল্যাপটপ ক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। বাদপড়া দুটি প্রতিষ্ঠানের দর প্রস্তাব ছিল গড়ে ৩১০ ও ৪১৬ মার্কিন ডলারের মধ্যে। কিন্তু বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মূল্য ৬৬০-৬৮০ মার্কিন ডলারের মধ্যে রয়েছে। এই ছয়টির সবার নির্ধারিত মূল্য খুবই কাছাকাছি যা নিজেদের মধ্যে যোগসাজশেরই প্রমাণ।

ল্যাপটপ ক্রয়ে এসব দুর্নীতির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে এই মর্মে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল যে, নিয়মবহির্ভুতভাবে আলোচ্য ছয়টি কোম্পানি থেকে ল্যাপটপগুলো কিনলে বাংলাদেশ সরকারের ন্যূনতম ১৪৩ কোটি টাকা লোকসান হবে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চালিত এ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের ঋণের বোঝাও বাড়বে। কিন্তু মন্ত্রণালয় তাতে কর্ণপাত করেনি। এই ১৪৩ কোটি টাকা দুর্নীতিবাজদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু এই ১৪৩ কোটি টাকাই নয়, ল্যাপটপ ক্রয়ের পুরো পৌনে তিনশ’ কোটি টাকাই জলে গেছে। কারণ, যেসব নিম্নমানের ল্যাপটপ সরবরাহ নেয়া হয়েছে তা কোনো কাজেই আসেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ল্যাপটপ ক্রয়ের জন্য উচ্চমূল্য পরিশোধ করা হলেও টেন্ডারের শর্ত এবং চুক্তি অনুযায়ী যে মান, যে মডেল ও যে কনফিগারেশনের ল্যাপটপ সরবরাহ করার কথা ছিল তা করা হয়নি। তারচেয়ে অনেক নিম্নমানের ও পুরাতন মডেলের ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি ল্যাপটপের সঙ্গে মাল্টিমিডিয়াসহ অন্য যেসব সরঞ্জাম সরবরাহ করার কথা তাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে করা হয়নি। পুরাতন মডেল ও নিম্নমানের হওয়ায় অনেক স্কুলই এগুলো ব্যবহার করতে পারেনি।

ল্যাপটপ ক্রয়ের টেন্ডারে দুর্নীতি ও নিম্নমানের ল্যাপটপ সরবরাহ সম্পর্কিত অনেক অভিযোগ সংসদীয় কমিটিতে জমা পড়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ অক্টোবর এসব দুর্নীতি তদন্তের জন্য সংসদীয় সাব-কমিটি গঠন করা হয়। সংসদ সদস্য আবুল কালামের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের এই সাব-কমিটিতে অন্য দু’জন সদস্য হলেন আলী আজম ও মো. ইলিয়াস। ল্যাপটপ ক্রয়ে কোনও দুর্নীতি হয়েছে কিনা, দরপত্রের শর্তানুসারে ৫০ হাজার ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়েছে কিনা, আমদানি করা ল্যাপটপ মানসম্মত কিনা- এ বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সংসদীয় সাব-কমিটিকে।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর