ঢাকা , বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বিলের ঘাসে লেখা জীবন সংসদ অধিবেশনেও দায়িত্বে সচেতন, পত্রিকায় চোখ প্রধানমন্ত্রীর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেরপুরের গারো পাহাড়ে কফি চাষে নতুন বিপ্লব: ভাগ্য বদলের স্বপ্নে বিভোর কৃষকরা মধ্যপ্রাচ্যে হামলার জন্য ঘাঁটি ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা ইতালির আমিও ক্ষুদ্র একটি শহীদ পরিবারের সন্তান: জামায়াত আমির ড. ইউনূসকে বই উপহার দিলেন ছাত্রদল নেতা আবিদ ৩ দিন অনলাইন-অফলাইন ক্লাসের প্রস্তাব যাচ্ছে মন্ত্রিসভায় হজের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু ১৮ এপ্রিল ইরান যুদ্ধ থামাতে চীন ও পাকিস্তানের পাঁচ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা

ফয়সাল-আলমগীরকে ফেরাতে ইন্টারপোলের চিঠি, সাড়া দেয়নি ভারত

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের ফিরিয়ে আনা নিয়ে এক ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এমনকি এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা এখনও ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ পায়নি। পুলিশের চিঠিতে কাজ না হওয়ায় বিষয়টি এখন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক চ্যানেলে সুরাহার চেষ্টা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগামী ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে এই বিষয়টিই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকায় হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সালসহ তার সহযোগী আলমগীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি বিভাগ ইন্টারপোলের মাধ্যমে আসামিদের প্রত্যাবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই চিঠির কোনো সাড়া বা উত্তর দেয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি দ্রুত সুরাহা না হওয়ায় আসামিদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্তমানে পুরো বিষয়টি এই মন্ত্রণালয় তদারকি করছে এবং ইতোমধ্যে তারা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে গত রোববার (২৯ মার্চ) পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল ও তার সহযোগী পশ্চিমবঙ্গে আটক হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই আমরা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করি। গ্রেপ্তারের কিছুদিন পরেই বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি বিভাগ ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভারতীয় সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আসামিদের হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। তবে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমরা ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাইনি।’

হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল ও আলমগীরকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে, বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত সেই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় বর্তমানে বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে সমাধানের জন্য কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

তিনি জানান, পুলিশের অনুরোধে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় এখন বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সংকেত (গ্রিন সিগন্যাল) পায়, তবে তারা পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আসামিদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা বা গ্রহণ করার জন্য পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে পুলিশ। আপাতত এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও ভারত এখন পর্যন্ত ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ দেয়নি। অবশ্য এ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার আসামিদের নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। আসামিদের কাছ থেকে বিশেষ কিছু তথ্য জানতে চায় ভারত। এই আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণেই বাংলাদেশের প্রাথমিক আবেদনগুলোতে ভারতের পক্ষ থেকে এখনও নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের আগামী ৭ এপ্রিল দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। সফরের প্রথম দিনেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে। এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গেও তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। ওই আলোচনার পরই স্পষ্ট হবে যে, বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে আসামিদের কবে নাগাদ হাতে পাবে বাংলাদেশ।

গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা এখনও ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ পায়নি। তবে, তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এছাড়া শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত অন্যদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দেশটির হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ফয়সাল ও তার সহযোগীকে বর্তমানে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে বিশেষ কিছু তথ্য সংগ্রহ করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এই আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হস্তান্তরের বিষয়ে ভারত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না

এদিকে, গত ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ভারতে গ্রেপ্তার আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী তাদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

ফয়সাল ও তার সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এনআইএ

এদিকে, গত ২৩ মার্চ শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে ভারতীয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)। এদিন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমা বিচার বিভাগীয় আদালতে এনআইএ তাদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এছাড়া হাদি হত্যা মামলার এই দুই আসামিকে সীমান্ত পার হতে সাহায্য করার অপরাধে গ্রেপ্তার ফিলিপ সাংমাকে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে রাখা হয়েছে

এর আগে ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বনগাঁ এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (STF)। অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল। রিমান্ড শেষে গত ২২ মার্চ আদালত তাদের ১২ দিনের জন্য জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ওইদিন আদালতে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল দাবি করেন, ‘আমি এই কাজ করিনি। এসব কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না।’

তবে, ফয়সালের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই ভারতকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের পর থেকে দেশটিতে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় এই সফল অভিযান পরিচালিত হয়।

আগামী ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। এই সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে হাদি হত্যার আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনার মাধ্যমেই বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আসামিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের পথ প্রশস্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে

হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই হত্যাকাণ্ডের মূল শ্যুটার হিসেবে সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদকে অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

গত ৬ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য ছিল। মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় মাসুদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আমরা চার্জশিট জমা দিয়েছি। তাদের মধ্যে ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

অতিরিক্ত কমিশনার আরও জানান, হাদি একটি বিকল্প রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এই রাজনৈতিক কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ ডিএনসিসি ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর সরাসরি নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন।

ডিবি সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে ফয়সালসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে পল্টন মডেল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে হাদির মৃত্যুতে সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয় এবং অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গ্রেপ্তার এড়াতে ফয়সালের ভিডিও বার্তা ও বিভ্রান্তি

হাদি হত্যার পর থেকেই গা-ঢাকা দেন এই মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, ফয়সাল মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন। তবে, পুলিশের এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা প্রচার করেন তিনি।

তদন্ত সংস্থা ডিবির মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য ফয়সালসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে জানা গেছে

গত ৩১ ডিসেম্বর ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে ফয়সাল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িত নই। একটি চক্র ষড়যন্ত্র করে আমাকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছে। তাই আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি এবং বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছি।’

তবে, শুরু থেকেই পুলিশ দাবি করে আসছিল যে, ফয়সালের দুবাইয়ে থাকার দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন। শেষ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পুলিশের সেই দাবিই সত্য প্রমাণিত হলো।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে জুমার নামাজ শেষে গণসংযোগ করার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তির গুলিতে গুরুতর আহত হন ওসমান হাদি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কয়েকজন আসামি ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

বিলের ঘাসে লেখা জীবন

ফয়সাল-আলমগীরকে ফেরাতে ইন্টারপোলের চিঠি, সাড়া দেয়নি ভারত

আপডেট টাইম : ২ ঘন্টা আগে

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের ফিরিয়ে আনা নিয়ে এক ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এমনকি এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা এখনও ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ পায়নি। পুলিশের চিঠিতে কাজ না হওয়ায় বিষয়টি এখন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক চ্যানেলে সুরাহার চেষ্টা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগামী ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে এই বিষয়টিই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকায় হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সালসহ তার সহযোগী আলমগীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি বিভাগ ইন্টারপোলের মাধ্যমে আসামিদের প্রত্যাবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই চিঠির কোনো সাড়া বা উত্তর দেয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি দ্রুত সুরাহা না হওয়ায় আসামিদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্তমানে পুরো বিষয়টি এই মন্ত্রণালয় তদারকি করছে এবং ইতোমধ্যে তারা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে গত রোববার (২৯ মার্চ) পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল ও তার সহযোগী পশ্চিমবঙ্গে আটক হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই আমরা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করি। গ্রেপ্তারের কিছুদিন পরেই বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি বিভাগ ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভারতীয় সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আসামিদের হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। তবে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমরা ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাইনি।’

হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল ও আলমগীরকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে, বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত সেই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় বর্তমানে বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে সমাধানের জন্য কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

তিনি জানান, পুলিশের অনুরোধে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় এখন বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সংকেত (গ্রিন সিগন্যাল) পায়, তবে তারা পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আসামিদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা বা গ্রহণ করার জন্য পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে পুলিশ। আপাতত এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও ভারত এখন পর্যন্ত ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ দেয়নি। অবশ্য এ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার আসামিদের নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। আসামিদের কাছ থেকে বিশেষ কিছু তথ্য জানতে চায় ভারত। এই আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণেই বাংলাদেশের প্রাথমিক আবেদনগুলোতে ভারতের পক্ষ থেকে এখনও নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের আগামী ৭ এপ্রিল দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। সফরের প্রথম দিনেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে। এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গেও তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। ওই আলোচনার পরই স্পষ্ট হবে যে, বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে আসামিদের কবে নাগাদ হাতে পাবে বাংলাদেশ।

গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা এখনও ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ পায়নি। তবে, তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এছাড়া শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত অন্যদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দেশটির হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ফয়সাল ও তার সহযোগীকে বর্তমানে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে বিশেষ কিছু তথ্য সংগ্রহ করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এই আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হস্তান্তরের বিষয়ে ভারত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না

এদিকে, গত ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ভারতে গ্রেপ্তার আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী তাদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

ফয়সাল ও তার সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এনআইএ

এদিকে, গত ২৩ মার্চ শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে ভারতীয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)। এদিন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমা বিচার বিভাগীয় আদালতে এনআইএ তাদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এছাড়া হাদি হত্যা মামলার এই দুই আসামিকে সীমান্ত পার হতে সাহায্য করার অপরাধে গ্রেপ্তার ফিলিপ সাংমাকে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে রাখা হয়েছে

এর আগে ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বনগাঁ এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (STF)। অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল। রিমান্ড শেষে গত ২২ মার্চ আদালত তাদের ১২ দিনের জন্য জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ওইদিন আদালতে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল দাবি করেন, ‘আমি এই কাজ করিনি। এসব কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না।’

তবে, ফয়সালের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই ভারতকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের পর থেকে দেশটিতে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় এই সফল অভিযান পরিচালিত হয়।

আগামী ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। এই সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে হাদি হত্যার আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনার মাধ্যমেই বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আসামিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের পথ প্রশস্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে

হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই হত্যাকাণ্ডের মূল শ্যুটার হিসেবে সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদকে অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

গত ৬ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য ছিল। মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় মাসুদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আমরা চার্জশিট জমা দিয়েছি। তাদের মধ্যে ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

অতিরিক্ত কমিশনার আরও জানান, হাদি একটি বিকল্প রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এই রাজনৈতিক কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ ডিএনসিসি ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর সরাসরি নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন।

ডিবি সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে ফয়সালসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে পল্টন মডেল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে হাদির মৃত্যুতে সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয় এবং অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গ্রেপ্তার এড়াতে ফয়সালের ভিডিও বার্তা ও বিভ্রান্তি

হাদি হত্যার পর থেকেই গা-ঢাকা দেন এই মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, ফয়সাল মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন। তবে, পুলিশের এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা প্রচার করেন তিনি।

তদন্ত সংস্থা ডিবির মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য ফয়সালসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে জানা গেছে

গত ৩১ ডিসেম্বর ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে ফয়সাল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িত নই। একটি চক্র ষড়যন্ত্র করে আমাকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছে। তাই আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি এবং বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছি।’

তবে, শুরু থেকেই পুলিশ দাবি করে আসছিল যে, ফয়সালের দুবাইয়ে থাকার দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন। শেষ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পুলিশের সেই দাবিই সত্য প্রমাণিত হলো।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে জুমার নামাজ শেষে গণসংযোগ করার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তির গুলিতে গুরুতর আহত হন ওসমান হাদি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কয়েকজন আসামি ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন