ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

সেফ এক্সিট’, যা বলছেন উপদেষ্টারা

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক ‘সেফ এক্সিট’ (নিরাপদ প্রস্থান) বিষয়ক মন্তব্য ঘিরে দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন– ‘সেফ এক্সিট নয়, বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটাবেন’।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা হয়েছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি সরকার থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। এর কয়েক মাস যেতেই উপদেষ্টাদের নিরাপদ প্রস্থানের অভিযোগ তোলেন তিনি।

অবশ্য, ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে নাহিদের সঙ্গে সরকারে যোগ দেওয়া মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এখনও উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন।

যেভাবে আলোচনায় এলো ‘সেফ এক্সিট’

সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতাদের এবং যারা উপদেষ্টা হয়েছেন, তাদের অনেককে বিশ্বাস করাটা আমাদের অবশ্যই ভুল হয়েছিল। আমাদের উচিত ছিল ছাত্র-নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করা, সরকারে গেলে সম্মিলিতভাবে যাওয়া। নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক দলকে আমরা যে বিশ্বাসটা করেছিলাম, যে আস্থা রেখেছিলাম, সেই জায়গায় আসলে আমরা প্রতারিত হয়েছি। অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছে অথবা গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে (প্রতারণা) করেছে। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করব।’

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে লিয়াজোঁ করে ফেলেছে। তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথা ভাবতেছে। এটা আমাদের অনেক পোহাতে হচ্ছে এবং পোহাতে হবে। কিন্তু তারা যদি এটা বিশ্বাস করত যে তাদের নিয়োগকর্তা ছিল গণঅভ্যুত্থানের শক্তি, রাজপথে নেমে জীবন দেওয়া ও আহত সাধারণ মানুষজন এবং তারা যদি তাদের ওপর ভরসা করত, তাহলে উপদেষ্টাদের এই বিচ্যুতি হতো না।’

নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের পর প্রায় একই রকম বক্তব্য দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সম্প্রতি নওগাঁয় এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘কিছু উপদেষ্টার মাঝে আমরা এই আচরণ দেখতে পাচ্ছি যে, তারা এখন কোনোভাবে দায়সারা দায়িত্বটা পালন করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক্সিট নিতে পারলেই হলো। দেশে থাকুন আর দেশের বাইরে থাকুন। এই দায়সারা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটা সরকার কাজ করতে পারে না।’

সারজিস আরও বলেন, ‘কোথায় সেফ এক্সিট নেবে? পৃথিবীতে সেফ এক্সিট নেওয়ার একটাই জায়গা, সেটা হচ্ছে মৃত্যু। এ ছাড়া কোনো সেফ এক্সিট নাই। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান, সেখানে বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ধরবে।’

তবে, কোন কোন উপদেষ্টা ‘সেফ এক্সিট’ খুঁজছেন তা নাহিদ বা সারজিস কেউই স্পষ্ট করেননি।

যা বলছেন উপদেষ্টারা

নাহিদের বক্তব্যের পর নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা। তারা বলছেন, এক্সিট খুঁজছেন না। বাকি জীবন দেশেই থাকবেন।

এ ইস্যুতে সম্প্রতি ঢাকার একটি হোটেলে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘এখন সেফ এক্সিট নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা উপদেষ্টারা খুব নিশ্চিতভাবে জানি যে, আমাদের কারও কোনো সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নাই।’

‘তবে, বাংলাদেশের জাতি হিসেবে আমাদের সেফ এক্সিটের প্রয়োজন আছে। কারণ একটা ভয়াবহ, অসুস্থ, আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আমাদের সেফ এক্সিট প্রয়োজন, এই জাতির।’

গত বুধবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমি একদম কোনো এক্সিট খুঁজছি না। দেশেই ছিলাম, এর আগেও বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা এসেছে, ওই সব ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিহত করে দেশে থেকেছি। বাকি জীবনও বাংলাদেশেই কাটিয়ে যাব আপনাদের সাথে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে তাকে (নাহিদ ইসলাম) তার বক্তব্যকে সাবস্টেন্সিয়েট (অভিযোগের সপক্ষে তথ্য উপস্থাপন) করতে হবে, তার বক্তব্য আমার সাবস্টেন্সিয়েট করার বিষয় নয়, আমার খণ্ডানোরও বিষয় নয়। তথ্য-প্রমাণ, উপাত্ত… মানে বক্তব্যটা স্পেসিফিক হলে হয়তো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলা হতো। এটা হয়তো তাদের ধারণা, তারা মনে করে তাদের বক্তব্য হিসেবে বলেছে। এখানে সরকারের অবস্থান নেওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। সরকারের বক্তব্য দেওয়ার কোনো কিছু নেই।’

গত বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) এক ফেসবুক পোস্টে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বিষয়টি উত্থাপনকারী, প্রাক্তন উপদেষ্টা ও বর্তমান এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ও জুলাই আন্দোলনের অগ্র-সেনা হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। তাই তার বক্তব্যের ওপর আমার মন্তব্য করা শোভন নয়। তাছাড়া আমি রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো মন্তব্য করি না। নিজের সীমিত সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষকতার সূত্রে, ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ গ্রহণ করিনি। আজ ৭২+ বছর বয়সে আমাকে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয় তা হবে গভীর দুঃখের বিষয়।’

গতকাল শনিবার দুপুরে রাঙ্গামাটিতে এক ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’ শেষে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে আমরা চলে যাব। সেফ এক্সিট বলতে আমি কিছু বুঝি না। আমার কোনো সেকেন্ড হোম নেই, এমনকি ঢাকাতেও নিজের বাড়ি নেই। বর্তমানে আমি সরকারি বাড়িতে এবং চট্টগ্রামে ভাড়া বাসায় থাকি। আমি এই দেশের মানুষ। এই দেশ আমার, এখানেই আমি থাকব।’

সর্বশেষ রোববার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে সবাই দেশে, আমি একা বিদেশে গিয়ে কী করব?’

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে ঝুঁকি তৈরি হবে

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনেক সময় অনেক কথাই বলেন। কিন্তু দেখা গেল বাস্তবে এর সঙ্গে কোনো কানেকশন (যোগসূত্র) থাকে না। আবার অনেক সময় কানেকশন থাকেও। সুতরাং এ বিষয়ে মন্তব্য করা একটু কঠিন।’

‘এনসিপি ও অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দল চাইছে সরকার যেন নির্বাচনের আগে একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান নিয়ে এনসিপি সন্দেহ প্রকাশ করছে।’

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যদি একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সমস্যা হবে না। তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের পারফরম্যান্সে ঘাটতি দেখা দিলে কিংবা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

সেফ এক্সিট’, যা বলছেন উপদেষ্টারা

আপডেট টাইম : ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক ‘সেফ এক্সিট’ (নিরাপদ প্রস্থান) বিষয়ক মন্তব্য ঘিরে দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন– ‘সেফ এক্সিট নয়, বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটাবেন’।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা হয়েছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি সরকার থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। এর কয়েক মাস যেতেই উপদেষ্টাদের নিরাপদ প্রস্থানের অভিযোগ তোলেন তিনি।

অবশ্য, ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে নাহিদের সঙ্গে সরকারে যোগ দেওয়া মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এখনও উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন।

যেভাবে আলোচনায় এলো ‘সেফ এক্সিট’

সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতাদের এবং যারা উপদেষ্টা হয়েছেন, তাদের অনেককে বিশ্বাস করাটা আমাদের অবশ্যই ভুল হয়েছিল। আমাদের উচিত ছিল ছাত্র-নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করা, সরকারে গেলে সম্মিলিতভাবে যাওয়া। নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক দলকে আমরা যে বিশ্বাসটা করেছিলাম, যে আস্থা রেখেছিলাম, সেই জায়গায় আসলে আমরা প্রতারিত হয়েছি। অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছে অথবা গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে (প্রতারণা) করেছে। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করব।’

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে লিয়াজোঁ করে ফেলেছে। তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথা ভাবতেছে। এটা আমাদের অনেক পোহাতে হচ্ছে এবং পোহাতে হবে। কিন্তু তারা যদি এটা বিশ্বাস করত যে তাদের নিয়োগকর্তা ছিল গণঅভ্যুত্থানের শক্তি, রাজপথে নেমে জীবন দেওয়া ও আহত সাধারণ মানুষজন এবং তারা যদি তাদের ওপর ভরসা করত, তাহলে উপদেষ্টাদের এই বিচ্যুতি হতো না।’

নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের পর প্রায় একই রকম বক্তব্য দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সম্প্রতি নওগাঁয় এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘কিছু উপদেষ্টার মাঝে আমরা এই আচরণ দেখতে পাচ্ছি যে, তারা এখন কোনোভাবে দায়সারা দায়িত্বটা পালন করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক্সিট নিতে পারলেই হলো। দেশে থাকুন আর দেশের বাইরে থাকুন। এই দায়সারা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটা সরকার কাজ করতে পারে না।’

সারজিস আরও বলেন, ‘কোথায় সেফ এক্সিট নেবে? পৃথিবীতে সেফ এক্সিট নেওয়ার একটাই জায়গা, সেটা হচ্ছে মৃত্যু। এ ছাড়া কোনো সেফ এক্সিট নাই। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান, সেখানে বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ধরবে।’

তবে, কোন কোন উপদেষ্টা ‘সেফ এক্সিট’ খুঁজছেন তা নাহিদ বা সারজিস কেউই স্পষ্ট করেননি।

যা বলছেন উপদেষ্টারা

নাহিদের বক্তব্যের পর নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা। তারা বলছেন, এক্সিট খুঁজছেন না। বাকি জীবন দেশেই থাকবেন।

এ ইস্যুতে সম্প্রতি ঢাকার একটি হোটেলে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘এখন সেফ এক্সিট নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা উপদেষ্টারা খুব নিশ্চিতভাবে জানি যে, আমাদের কারও কোনো সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নাই।’

‘তবে, বাংলাদেশের জাতি হিসেবে আমাদের সেফ এক্সিটের প্রয়োজন আছে। কারণ একটা ভয়াবহ, অসুস্থ, আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আমাদের সেফ এক্সিট প্রয়োজন, এই জাতির।’

গত বুধবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমি একদম কোনো এক্সিট খুঁজছি না। দেশেই ছিলাম, এর আগেও বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা এসেছে, ওই সব ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিহত করে দেশে থেকেছি। বাকি জীবনও বাংলাদেশেই কাটিয়ে যাব আপনাদের সাথে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে তাকে (নাহিদ ইসলাম) তার বক্তব্যকে সাবস্টেন্সিয়েট (অভিযোগের সপক্ষে তথ্য উপস্থাপন) করতে হবে, তার বক্তব্য আমার সাবস্টেন্সিয়েট করার বিষয় নয়, আমার খণ্ডানোরও বিষয় নয়। তথ্য-প্রমাণ, উপাত্ত… মানে বক্তব্যটা স্পেসিফিক হলে হয়তো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলা হতো। এটা হয়তো তাদের ধারণা, তারা মনে করে তাদের বক্তব্য হিসেবে বলেছে। এখানে সরকারের অবস্থান নেওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। সরকারের বক্তব্য দেওয়ার কোনো কিছু নেই।’

গত বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) এক ফেসবুক পোস্টে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বিষয়টি উত্থাপনকারী, প্রাক্তন উপদেষ্টা ও বর্তমান এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ও জুলাই আন্দোলনের অগ্র-সেনা হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। তাই তার বক্তব্যের ওপর আমার মন্তব্য করা শোভন নয়। তাছাড়া আমি রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো মন্তব্য করি না। নিজের সীমিত সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষকতার সূত্রে, ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ গ্রহণ করিনি। আজ ৭২+ বছর বয়সে আমাকে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয় তা হবে গভীর দুঃখের বিষয়।’

গতকাল শনিবার দুপুরে রাঙ্গামাটিতে এক ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’ শেষে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে আমরা চলে যাব। সেফ এক্সিট বলতে আমি কিছু বুঝি না। আমার কোনো সেকেন্ড হোম নেই, এমনকি ঢাকাতেও নিজের বাড়ি নেই। বর্তমানে আমি সরকারি বাড়িতে এবং চট্টগ্রামে ভাড়া বাসায় থাকি। আমি এই দেশের মানুষ। এই দেশ আমার, এখানেই আমি থাকব।’

সর্বশেষ রোববার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে সবাই দেশে, আমি একা বিদেশে গিয়ে কী করব?’

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে ঝুঁকি তৈরি হবে

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনেক সময় অনেক কথাই বলেন। কিন্তু দেখা গেল বাস্তবে এর সঙ্গে কোনো কানেকশন (যোগসূত্র) থাকে না। আবার অনেক সময় কানেকশন থাকেও। সুতরাং এ বিষয়ে মন্তব্য করা একটু কঠিন।’

‘এনসিপি ও অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দল চাইছে সরকার যেন নির্বাচনের আগে একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান নিয়ে এনসিপি সন্দেহ প্রকাশ করছে।’

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যদি একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সমস্যা হবে না। তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের পারফরম্যান্সে ঘাটতি দেখা দিলে কিংবা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।’