আগামী সেপ্টেম্বরে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সরকারে বড় ধরনের রদবদলের আলোচনা জোরালো হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে যিনি নির্বাচিত হবেন, তার বর্তমান দায়িত্বের ওপর নির্ভর করে মন্ত্রিসভা, সংসদ এবং বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় একাধিক পদে পরিবর্তন আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের পুনর্বিন্যাস, দলের শীর্ষ পদে দায়িত্ব বদল এবং শূন্য আসনে উপনির্বাচনের মতো ঘটনাও সামনে আসতে পারে। যদিও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতির নাম কিংবা রদবদল নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট সব সিদ্ধান্ত দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনার পরই চূড়ান্ত হবে। একই সঙ্গে এমন একজনকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, যিনি দলের আস্থাভাজন হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হবেন।
আলোচনা যা-ই হোক দল ও তারেক রহমান সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারেÑ এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবে না বিএনপি। আস্থা বা বিশ্বাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ-এমন একজন রাজনীতিককে রাষ্ট্রের শীর্ষ সাংবিধানিক পদের জন্য চূড়ান্ত করবে দলটি। এই নিয়ে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করতে চান না দলটির নীতিনির্ধারকরা। সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ ও সতর্কতা বিবেচনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক আমাদের সময়কে বলেন, রাষ্ট্রপতি নিয়োগের বিষয়টি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হবে। সেখানে তারা তাদের মতামত দেবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দলীয় প্রধানের হাতে ছেড়ে দেবেন। কারণ রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় যুক্ত থাকে। সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই তিনি একজনকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য চূড়ান্ত করবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের দুজন মন্ত্রী আমাদের সময়কে বলেন, সবকিছুই সরকারের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতে আছে। যাকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিলে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে এবং তারেক রহমান সরকার ঝুঁকিমুক্ত থাকবে দলের এমন একজন রাজনীতিককে বেছে নেওয়া হবে। তাড়াহুড়া করা হচ্ছে না; বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দলে ও দলের বাইরে অনেকের নামই আলোচনায় আছে। তবে ঘুরেফিরে দু’জনের নাম বেশি আলোচনা হচ্ছে। তার মধ্যে একজন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে কেউ কেউ ভারমুক্ত করার পক্ষে। এ সব কিছুই নির্ভর করবে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেন, সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই অনুমাননির্ভর।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, দলের মহাসচিব ও ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হবে। সেক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদে রদবদল হবে। মহাসচিব পদ শূন্য হওয়ায় দলেও পরিবর্তন আসবে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন হবে। আর ড. আবদুল মঈন খান রাষ্ট্রপতি হলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসন শূন্য হবে। হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ভোলা-৩ আসন শূন্য হবে। হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার পদ শূন্য হবে। সেক্ষেত্রে শূন্য স্পিকার পদে নতুন কেউ শপথ নেবেন। দলের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্যে অনেকের ভাগ্য খুলে যেতে পারে। কেউ মন্ত্রিসভায় আবার কেউ দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন। মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, এগুলো নিয়ে কথা বলার একমাত্র এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। তিনি যখন উপযুক্ত বিবেচনা করবেন, তখনই কাউকে নতুন দায়িত্ব দিতে পারেন কিংবা কারও দায়িত্ব পরিবর্তন করতে পারেন।
বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা বলেন, মহাসচিব রাষ্ট্রপতি হলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন। যেভাবে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। আলোচনা এমনও আছে স্থায়ী কমিটি থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদ ও নজরুল ইসলাম খান আলোচনায় আছেন। এর বাইরে চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনের নামও আলোচনায় আছে।
এদিকে সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্যে মন্ত্রিসভায় বড় রদবদল হতে পারে। মন্ত্রিসভায় নতুন ৩ থেকে ৪ জন যুক্ত হতে পারেন। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৪৬ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। পরে ধাপে ধাপে বেড়ে তা ৬০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবারও তেমন হতে পারে। সেই বিবেচনায় মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও তরুণ সংসদ সদস্যসহ দেড় ডজন নেতা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনÑ বিএনপির জাতীয় কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, তরুণদের মধ্যে এবিএম মোশাররফ হোসেন, মিয়া নুরুদ্দিন অপু, রকিবুল ইসলাম বকুল, নজরুল ইসলাম আজাদ, ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন, এরশাদ উল্লাহ। সংক্ষিত নারী আসন থেকে মন্ত্রিসভায় বেগম সেলিমা রহমান, অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, শিরীন সুলতানা, রেহেনা আক্তার রানু, মাহমুদা হাবিবা যুক্ত হতে পারেন।
এ ছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল ও বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেলকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেখা যেতে পারে। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে আন্দালিব রহমান পার্থসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, চলমান বিভিন্ন ইস্যু ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজন মন্ত্রীর দপ্তরে পরিবর্তন আনা হতে পারে। এ ছাড়া কয়েকজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক, টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সরকার গঠনের পর একাধিক উপদেষ্টা ও ৮ জন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ব্যাপক দপ্তর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। এবার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে আরও নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আমাদের সময়কে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যাকে অভিভাবকও বলা যায়। যার কার্যকর নেতৃত্ব ও ভূমিকা বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলা সহজ হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগে সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটি; যার নেতৃত্বে দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে দল থেকে যা সিদ্ধান্ত হবে আমরা তা সমর্থন দেব। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দলীয় ব্যক্তি ও দলের বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে বিএনপির দুই ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। কাজেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত সর্বজনগ্রহণযোগ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। আর বিএনপি থেকেই গ্রহণযোগ্য হবে এমন রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেন, সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই অনুমাননির্ভর। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ নিয়ে নানা মতভেদ থাকতে পারে। তবে যেহেতু এটি রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর বিষয় তাই এই বিষয়ে ভেবেচিন্তে অগ্রসর হতে চায় বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা বিএনপির আছে এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই সেসব অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতির জন্য বেছে নেওয়াটাই হবে শ্রেয়।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 





















