আগামী নির্বাচনে বিএনপির সামনে তিনটি প্রতিপক্ষ। প্রথমটি দলের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। দ্বিতীয়টি দলের মনোনয়নবঞ্চিত, যাঁরা স্বতন্ত্র বা অন্য দলের টিকিটে বিএনপির প্রতিপক্ষ হয়ে ভোটে লড়তে পারেন এবং তৃতীয়টি হলো সরকারের ভিতরের একটি অংশ, যাঁরা শুরু থেকেই বিএনপি মাইনাসের এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলটি গঠিত হওয়ার পরই জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক তৈরি হয়। কারণ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের কারণে জামায়াত রাজনীতি করার সুযোগ পায়। তবে ৪৭ বছরের দীর্ঘ সময়ে রাজনীতির নানান বাঁকে জামায়াতের সঙ্গে নানান ঘটনাও ঘটেছে। কখনো মান, কখনো অভিমান। এ সময়ের মধ্যে জামায়াত শুধু বিএনপির সঙ্গেই সখ্য গড়ে তুলেছে, এমন নয়। তাদের চরম শত্রু আওয়ামী লীগের সঙ্গেও গড়ে তুলেছিল রাজনীতির ভাগবাঁটোয়ারার সম্পর্ক। এটা ছিল তাদের রাজনৈতিক কৌশল। দলটি অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করেছে। এত দিন বিএনপির একমাত্র প্রতিপক্ষ ছিল আওয়ামী লীগ। জুলাই গণ অভ্যুত্থানে দলটির অপমৃত্যুর কারণে রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। দ্বিতীয় প্রতিপক্ষ বিএনপির ঘর থেকেই সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁদের কাজে লাগানোর কৌশল এঁটেছে। শতাধিক আসনে মনোনয়নবঞ্চিতদের বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারলেই ভাগ হবে ভোট। বিএনপির ভোট ভাগ করতে পারলে লাভবান হবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তৃতীয় প্রতিপক্ষ সরকারের ভিতরের একটি অংশ। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও সরকারের ভিতরের ‘একাধিক পাসপোর্টধারী’ শুরু থেকেই দলটিকে মাইনাসের ফর্মুলা নিয়ে কাজ করছে। গত ১৫ মাস সরকারের একটি অংশ ও বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে সর্বশেষ ঐকমত্য কমিশন যা করেছে, তারপর আর দ্বিধাদ্বন্দ্বের কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং বিষয়গুলো বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী অনুধাবন করতে না পারলে আখেরে পস্তাতে হবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্লোগান ছিল ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। আর তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্লোগান হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। কর্মীদের হঠকারিতা, পারস্পরিক সংঘাত, দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হেরে যাবে বাংলাদেশ। স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিএনপি। আগামী নির্বাচনে দলটির নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের পক্ষে থাকবেন, নাকি বিপক্ষের শক্তিকে ইন্ধন দেবেন, সে সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে।
ভোটের হিসাবনিকাশ মাত্র শুরু হয়েছে। কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে, সে বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট হয়নি। বিশেষ করে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো এখনো ভোট প্রস্তুতির জন্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি। এনসিপি ইতোমধ্যে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রধান এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারাকে সেক্রেটারি করে ১০ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আরিফুল ইসলাম আদীব, মাহবুব আলম মাহির, খালেদ সাইফুল্লাহ, এহতেশাম হক, অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিন, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা, অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর, সাইফুল্লাহ হায়দার ও অ্যাডভোকেট মো. তারিকুল ইসলাম। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অবশ্য বলেছেন, ‘সমঝোতা বা জোট এটা একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক জায়গা থেকে হতে পারে। যেমন জুলাই সনদের বিষয়টি রয়েছে। এ সনদে আমাদের সংস্কারের দাবিগুলোর সঙ্গে যদি কোনো দল সংহতি প্রকাশ করে, সে ক্ষেত্রে হয়তো আমরা জোটের সিদ্ধান্ত নেব। এখন পর্যন্ত আমরা এককভাবেই নির্বাচনের জন্য এগোচ্ছি। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আমাদের প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করব।’ এদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা কোনো জোট করার সিদ্ধান্ত নিইনি, জোট করবও না। আমরা নির্বাচনি সমঝোতা করব। শুধু ইসলামি দল নয়, দেশপ্রেমিক প্রতিশ্রুতিশীল যারা আছেন, তারা সংযুক্ত হচ্ছেন। আগামীতে আরও অনেক দল এ নির্বাচনি সমঝোতায় যুক্ত হবে। আমরা সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চাই।’ এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর দলের কৌশল অনেকটাই পরিষ্কার করেছেন। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ নির্বাচন করবে রিকশা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হাতপাখা প্রতীক নিয়ে। এবার জোটভুক্ত প্রার্থীদের যাঁর যাঁর দলের প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করতে হবে। জানা গেছে, এ দুটি দল জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার নির্বাচন করতে ভরসা পাচ্ছে না। কারণ এ দুই দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা তাঁদের দল ও প্রতীক দাঁড়িপাল্লার প্রতি এতটাই অনুগত যে অন্য প্রতীকে তাঁরা ভোট দেবেন না। সে কারণে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার নির্বাচন করার ব্যাপারে রিকশা ও হাতপাখা ভরসা পাচ্ছে না। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কোন ঘাটের পানি কোন ঘাটে গড়ায়।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু করেছে। সরকারও বলছে, যে কোনো মূল্যে ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। তার পরও রাজনীতির অন্দরমহলের খেলা শেষ হয়েও হইল না শেষ। একদিকে সরকার বলছে নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হবে, অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে সরকার গঠিত ঐকমত্য কমিশন নতুন গিট্টু লাগিয়ে রেখেছে। মুরগি আগে নাকি ডিম আগে। গণভোট আগে নাকি জাতীয় নির্বাচন আগে-এ ইস্যু অমীমাংসিতই রয়ে গেল। সরকার কিছুটা চালাকির আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে বল ঠেলে দিয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা যা আছে তা দলগুলোকেই মীমাংসা করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-শেষ পর্যন্ত যদি দলগুলোকেই সবকিছু মীমাংসা করতে হয়, তাহলে এতগুলো সংস্কার কমিশন গঠন, ঐকমত্য কমিশন গঠন করে ১৫ মাস সময় নষ্ট করা হয়েছে কার স্বার্থে? তবে সরকারকে এও মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের পাগলা ঘোড়া ছুটতে শুরু করেছে। এ ঘোড়ার লাগাম এখন দেশের জনগণের হাতে। নির্বাচন নিয়ে সরকারের ভিতর থেকে নতুন কোনো কূটকৌশল করলে, কোনো বিশেষ মহলকে নির্বাচন বানচালের সুযোগ দেওয়া হলে জনগণ যমুনামুখী হবে। শতচেষ্টা করেও কারও ভাগ্যে সেফ এক্সিট জুটবে না। সুতরাং সবার আগে বাংলাদেশ। সবার আগে নির্বাচন।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























