ঢাকা , বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

ডুবল ঢাকা, ভুগল মানুষ

টানা ভারী বৃষ্টিতে আবার জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর সচিবালয় থেকে শুরু করে মতিঝিল, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, শান্তিনগর, রামপুরা, উত্তরাসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। নগরজুড়েই ছিল জল থইথই পানি। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েও জমে হাঁটু পানি। বহু বাসাবাড়ির নিচতলা ও গ্যারেজে ঢুকে পড়ে নোংরা পানি, বিকল হয়ে যায় পানি তোলার মোটর। পানিতে নষ্ট হয় যানবাহন, কোথাও ভেঙে যায় রাস্তা, আবার উপড়ে পড়া গাছে বন্ধ হয়ে যায় সড়ক যোগাযোগ। জলাবদ্ধতার কারণে বন্ধ রাখতে হয় অনেক স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় স্থগিত করা হয় ক্লাস ও পরীক্ষা।

প্রতিবারের মতো এবারও বৃষ্টির পর মাঠে নামে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটির দাবি, এটি সাময়িক জলজট এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোর থেকেই কর্মীরা কাজ করছেন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে খাল ও পানিপ্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে পড়া এবং জলাধার ভরাটের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দখলদার ও আবাসন কোম্পানির সঙ্গে আপস, খাল-জলাশয় রক্ষা এবং সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে রাজধানীবাসী।

বৃষ্টির পর এমন চিত্র এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালের ২০ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। সেবারও ডুবেছিল ঢাকা। এর পরও ঢাকায় যখনই টানা দুই দিন বা তিন দিন মাঝারি মাত্রার বৃষ্টি হয়েছে, চরম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যখনই জলাবদ্ধতায় হাবুডুবু খায়, দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন। নতুন পরিকল্পনা হয়, নতুন করে বাজেট হয় কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পায় না ঢাকাবাসী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও মাঝারি বৃষ্টিতে ডুবেছিল ঢাকা। জলাবদ্ধতা হলেই নগর কর্তৃপক্ষ দায় খোঁজে নগরবাসীর অসচেতনতাকে। তাদের কমন বার্তাÑ ড্রেনেজের মুখে প্লাস্টিক বর্জ্যসহ নানা কঠিন বর্জ্যরে প্রতিবন্ধকতা। বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। বর্জ্য থাকলেও সেটা পরিষ্কার করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। নগরবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নগর কর্র্তৃপক্ষের আপসনীতি, দখলদারদের শাস্তি না হওয়া, ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ড্রেনে খাল ভরাট করে উন্নয়নকাজ করার খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী। বিদ্যমান খাল দখলমুক্ত এবং ড্রেনেজে নেটওয়ার্ক নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করতে না পারলে এই দুর্ভোগ থেকে কখনই মুক্ত হবে না বলে মনে করেন নগরবিদরা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, শনিবার রাত থেকে রবিবার সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে গতকাল রবিবার সারা দিন বৃষ্টি থেমে চলেছে। আরও তিন দিন অব্যাহত থাকার বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এই বৃষ্টিপাতেই মতিঝিল, শাপলা চত্বর, নিউমার্কেট, শান্তিনগর, ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান, শ্যামলী, আদাবর, শেখেরটেক, পরীবাগ, ঢাকা মেডিক্যাল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা, সেগুনবাগিচা, বনানী, নাখালপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, নাখালপাড়া পিডব্লিউডি স্টাফ কোয়ার্টার, গুলশান, শাহাজাদপুর, উত্তরা, রামপুরা, বনশ্রীসহ সর্বত্র পানির নিচে ছিল। অনেক জায়গায় নৌকা চলাচল করতে দেখা গেছে। এত দুর্ভোগে দুই সিটির বিশেষ টিমের তৎপরতা খুব বেশি ছিল না। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক তাদের দলবল নিয়ে তদারকি করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিয়েছেন প্রশাসকরা।

জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্কুল তাৎক্ষণিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মুহাম্মদ তানবীর রাব্বী আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের অন্য দুই শাখা রামপুরা, বনশ্রীতে রবিবারের ক্লাস বন্ধ করা হয়েছে। মোহাম্মদপুরে ক্লাসও তাৎক্ষণিক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। স্কুলে পানি ওঠেনি। কিন্তু আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যেখান থেকে আসবে তাদের বাসার সামনে অনেক পানি। তাই তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেক স্কুলের পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছে।

দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল রবিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলজট নিরসন এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করে সড়ক সচল রাখতে ভোর থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ার্ডভিত্তিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম।

অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্ট জলজট দ্রুত নিরসনে ডিএসসিসির কমলাপুরের ২টি এবং ধোলাইখালের ১টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে।

জলাবদ্ধতার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুলশান, বনানী, মহাখালী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার রাস্তার দুই পাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ও ড্রেন ব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, দ্রুত পানি অপসারণে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে জানান, ঢাকার দুই সিটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে ২০১৬ সালে একটা মাস্টার প্ল্যান হয়েছিল। সেই মাস্টার প্ল্যানে অনেক সুপারিশ ছিল, সেগুলো বাস্তায়ন হয়নি। উল্টো অনেক জায়গায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে ড্রেন ভরাট করা হয়েছে। অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে এতটাই সরু করা হয়েছে সেখান দিয়ে পানি নেমে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। আবার যেসব জায়গায় আগে পানি জমা হতো, সেগুলো ভরাট হয়েছে। কোথাও ড্রেনের ময়লা জমে ভরাট হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি।

এই কর্মকর্তা আরও জানান, সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিবছর সংস্কারকাজ ও পরিষ্কারের কাজ করা হয় বলেই দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে পানি অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে। এইটুকু না করলে কত ঘণ্টা ডুবে থাকতে হতো তার হিসাব নেই।

প্রতিবছর দুই সিটি করপোরেশনে ড্রেনেজ সংস্কার এবং খাল পরিষ্কারের জন্য শতকোটি টাকার বেশি খরচ করে থাকে। বছরের একটা সময় ড্রেনে পরিষ্কার করে ঠিকই কিন্তু সেটা বাস্তবভিত্তিক নয়। কারণ ড্রেনের ময়লা আবার ড্রেনেই চলে যায়। শুধু সিটি করপোরেশন একা এর জন্য দায়ী, তাও নয়। ঢাকাবাসী, বিশেষ করে খালপাড়ে যাদের বসবাসÑ তাদের মধ্যে ড্রেনকে ডাস্টবিন ি সেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। যে কারণে পরিষ্কার করলেও এক সপ্তাহ পরে আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। এ জন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীর সচেতনতা দরকার বলে মনে করেন পরিকল্পনাবিদরা।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমাদের সময়কে বলেন, বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা নিয়ে আলাপ হয়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয়, এই শহরে এই মুহূর্তে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো মাস্টার প্ল্যান নেই। মাস্টার প্ল্যান ছাড়াই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ড্রেনেজ সংস্কার পরিকল্পনা করছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। তিনি বলেন, যে শহরে সবাই খাল, জলাশয়, ড্রেন ভরাটে আগ্রহী; ওয়াটার রিটেনশন পন্ড বা পানির আধারগুলো বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে ভরাট করে ফেলেÑ সেখানে জলাবদ্ধতা হবেই। জলাবদ্ধতা থেকে বের হতে দ্রুততার সাথে মাস্টার প্ল্যান করতে হবে। মাস্টার প্ল্যান ড্যাপের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে। আর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই দুর্ভোগ থেকেই যাবে। উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকার, রাষ্ট্র যদি ব্যবসায়ী, আবাসন কোম্পানি এবং দখলদারদের সঙ্গে আপস করে, তা হলে কিছু হবে না। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা না নিয়ে ঢাকার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

ডুবল ঢাকা, ভুগল মানুষ

আপডেট টাইম : ০৫:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

টানা ভারী বৃষ্টিতে আবার জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর সচিবালয় থেকে শুরু করে মতিঝিল, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, শান্তিনগর, রামপুরা, উত্তরাসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। নগরজুড়েই ছিল জল থইথই পানি। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েও জমে হাঁটু পানি। বহু বাসাবাড়ির নিচতলা ও গ্যারেজে ঢুকে পড়ে নোংরা পানি, বিকল হয়ে যায় পানি তোলার মোটর। পানিতে নষ্ট হয় যানবাহন, কোথাও ভেঙে যায় রাস্তা, আবার উপড়ে পড়া গাছে বন্ধ হয়ে যায় সড়ক যোগাযোগ। জলাবদ্ধতার কারণে বন্ধ রাখতে হয় অনেক স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় স্থগিত করা হয় ক্লাস ও পরীক্ষা।

প্রতিবারের মতো এবারও বৃষ্টির পর মাঠে নামে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটির দাবি, এটি সাময়িক জলজট এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোর থেকেই কর্মীরা কাজ করছেন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে খাল ও পানিপ্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে পড়া এবং জলাধার ভরাটের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দখলদার ও আবাসন কোম্পানির সঙ্গে আপস, খাল-জলাশয় রক্ষা এবং সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে রাজধানীবাসী।

বৃষ্টির পর এমন চিত্র এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালের ২০ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। সেবারও ডুবেছিল ঢাকা। এর পরও ঢাকায় যখনই টানা দুই দিন বা তিন দিন মাঝারি মাত্রার বৃষ্টি হয়েছে, চরম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যখনই জলাবদ্ধতায় হাবুডুবু খায়, দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন। নতুন পরিকল্পনা হয়, নতুন করে বাজেট হয় কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পায় না ঢাকাবাসী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও মাঝারি বৃষ্টিতে ডুবেছিল ঢাকা। জলাবদ্ধতা হলেই নগর কর্তৃপক্ষ দায় খোঁজে নগরবাসীর অসচেতনতাকে। তাদের কমন বার্তাÑ ড্রেনেজের মুখে প্লাস্টিক বর্জ্যসহ নানা কঠিন বর্জ্যরে প্রতিবন্ধকতা। বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। বর্জ্য থাকলেও সেটা পরিষ্কার করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। নগরবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নগর কর্র্তৃপক্ষের আপসনীতি, দখলদারদের শাস্তি না হওয়া, ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ড্রেনে খাল ভরাট করে উন্নয়নকাজ করার খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী। বিদ্যমান খাল দখলমুক্ত এবং ড্রেনেজে নেটওয়ার্ক নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করতে না পারলে এই দুর্ভোগ থেকে কখনই মুক্ত হবে না বলে মনে করেন নগরবিদরা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, শনিবার রাত থেকে রবিবার সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে গতকাল রবিবার সারা দিন বৃষ্টি থেমে চলেছে। আরও তিন দিন অব্যাহত থাকার বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এই বৃষ্টিপাতেই মতিঝিল, শাপলা চত্বর, নিউমার্কেট, শান্তিনগর, ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান, শ্যামলী, আদাবর, শেখেরটেক, পরীবাগ, ঢাকা মেডিক্যাল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা, সেগুনবাগিচা, বনানী, নাখালপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, নাখালপাড়া পিডব্লিউডি স্টাফ কোয়ার্টার, গুলশান, শাহাজাদপুর, উত্তরা, রামপুরা, বনশ্রীসহ সর্বত্র পানির নিচে ছিল। অনেক জায়গায় নৌকা চলাচল করতে দেখা গেছে। এত দুর্ভোগে দুই সিটির বিশেষ টিমের তৎপরতা খুব বেশি ছিল না। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক তাদের দলবল নিয়ে তদারকি করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিয়েছেন প্রশাসকরা।

জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্কুল তাৎক্ষণিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মুহাম্মদ তানবীর রাব্বী আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের অন্য দুই শাখা রামপুরা, বনশ্রীতে রবিবারের ক্লাস বন্ধ করা হয়েছে। মোহাম্মদপুরে ক্লাসও তাৎক্ষণিক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। স্কুলে পানি ওঠেনি। কিন্তু আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যেখান থেকে আসবে তাদের বাসার সামনে অনেক পানি। তাই তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেক স্কুলের পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছে।

দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল রবিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলজট নিরসন এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করে সড়ক সচল রাখতে ভোর থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ার্ডভিত্তিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম।

অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্ট জলজট দ্রুত নিরসনে ডিএসসিসির কমলাপুরের ২টি এবং ধোলাইখালের ১টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে।

জলাবদ্ধতার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুলশান, বনানী, মহাখালী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার রাস্তার দুই পাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ও ড্রেন ব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, দ্রুত পানি অপসারণে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে জানান, ঢাকার দুই সিটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে ২০১৬ সালে একটা মাস্টার প্ল্যান হয়েছিল। সেই মাস্টার প্ল্যানে অনেক সুপারিশ ছিল, সেগুলো বাস্তায়ন হয়নি। উল্টো অনেক জায়গায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে ড্রেন ভরাট করা হয়েছে। অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে এতটাই সরু করা হয়েছে সেখান দিয়ে পানি নেমে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। আবার যেসব জায়গায় আগে পানি জমা হতো, সেগুলো ভরাট হয়েছে। কোথাও ড্রেনের ময়লা জমে ভরাট হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি।

এই কর্মকর্তা আরও জানান, সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিবছর সংস্কারকাজ ও পরিষ্কারের কাজ করা হয় বলেই দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে পানি অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে। এইটুকু না করলে কত ঘণ্টা ডুবে থাকতে হতো তার হিসাব নেই।

প্রতিবছর দুই সিটি করপোরেশনে ড্রেনেজ সংস্কার এবং খাল পরিষ্কারের জন্য শতকোটি টাকার বেশি খরচ করে থাকে। বছরের একটা সময় ড্রেনে পরিষ্কার করে ঠিকই কিন্তু সেটা বাস্তবভিত্তিক নয়। কারণ ড্রেনের ময়লা আবার ড্রেনেই চলে যায়। শুধু সিটি করপোরেশন একা এর জন্য দায়ী, তাও নয়। ঢাকাবাসী, বিশেষ করে খালপাড়ে যাদের বসবাসÑ তাদের মধ্যে ড্রেনকে ডাস্টবিন ি সেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। যে কারণে পরিষ্কার করলেও এক সপ্তাহ পরে আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। এ জন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীর সচেতনতা দরকার বলে মনে করেন পরিকল্পনাবিদরা।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমাদের সময়কে বলেন, বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা নিয়ে আলাপ হয়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয়, এই শহরে এই মুহূর্তে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো মাস্টার প্ল্যান নেই। মাস্টার প্ল্যান ছাড়াই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ড্রেনেজ সংস্কার পরিকল্পনা করছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। তিনি বলেন, যে শহরে সবাই খাল, জলাশয়, ড্রেন ভরাটে আগ্রহী; ওয়াটার রিটেনশন পন্ড বা পানির আধারগুলো বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে ভরাট করে ফেলেÑ সেখানে জলাবদ্ধতা হবেই। জলাবদ্ধতা থেকে বের হতে দ্রুততার সাথে মাস্টার প্ল্যান করতে হবে। মাস্টার প্ল্যান ড্যাপের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে। আর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই দুর্ভোগ থেকেই যাবে। উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকার, রাষ্ট্র যদি ব্যবসায়ী, আবাসন কোম্পানি এবং দখলদারদের সঙ্গে আপস করে, তা হলে কিছু হবে না। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা না নিয়ে ঢাকার পরিবর্তন সম্ভব নয়।