ঢাকা , শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বহুমাত্রিক সম্পর্কের দ্বার উন্মোচন

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যকার বৈঠকের মধ্যদিয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো কৌশলগত ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যে লাল গালিচা অভ্যর্থনা ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেয়া হয়েছে তাও ছিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি চীনের অবিস্মরণীয় ও অভূতপূর্ব সম্মান। আর সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এটি আজ শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে গতকাল বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। গতকাল বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্র-সহকারে প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাকে শুভেচ্ছা জানান।

অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। এ সময় দু’দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্রবাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন। এরপর শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কুয়াং।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন চত্বরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট হল অব দ্য পিপল ভবনসহ তার আশেপাশের বিশাল চত্বর ও সড়কের দুই পাশে বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। এই ভবনে চীনের সর্বোচ্চ আইনসভা ‘ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস’-এর সভা অনুষ্ঠান এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কার্যালয় রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলকে চীনে যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেয়া হয়েছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফরে যে মর্যাদা পাচ্ছেন এবং যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন, তা বিশ্ব দরবারে আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমানের এটি প্রথম চীন সফর। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সফরসঙ্গী হিসেবে তারেক রহমান চীন সফরে গিয়েছিলেন সেই সময়ে এই গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীর লাল গালিচায় সংবর্ধনায়ও উপস্থিত ছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ২০০২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে এসে তিনি এই দেশ থেকে অনেক সমৃদ্ধ স্মৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে তার মা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতটি স্মরণীয় সফরের মাধ্যমে সেই বন্ধুত্বকে আরো সুদৃঢ় করেন। মা-বাবার সেই দলীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর তারেক রহমান। একই সাথে তাকে ও তার প্রতিনিধিদলকে যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেয়া হয়েছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।

প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে বৈঠক : আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। শীর্ষ দুই নেতার বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরো সুসংহত করার লক্ষ্যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবেন, ইনশাআল্লাহ।

১৩টি এমওইউ স্বাক্ষর : চীনের সাথে ১৩ টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বিকালে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছুয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

এসব সমঝোতায় স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখোপাত্র মাহদী আমিন ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই করার কথা জানান।

মাহদী আমিন বলেন, ১৩টি এমওইউর রয়েছেÑ ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কিভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, জয়েন্ট অ্যাকশন প্লানের বিষয়ে কথা হয়েছে। বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রফতানি করতে পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কিভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারি, সেটি নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক এলাইনমেন্ট রিলেটেড ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমইউ হয়েছে। একই সাথে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটি ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্লান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঠালের রফতানি বিষয়ে একটি এমইউ হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, একই সাথে চীনের ভাষা মান্ডারিন বাংলাদেশে আমরা শুরু করতে যাচ্ছিÑ আমাদের স্কুল কারিকুলামের সেটি এবং টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনে কো-আপরেশনে দুটো পৃথক এমইউ হয়েছে। মিডিয়ার ক্ষেত্রে কিভাবে দুই দেশের কোলাবোরেশন বাড়ানো যায়, থিংক ট্যাংক ফোরাম নিয়ে আমরা কিভাবে সামনের দিকে আগাতে পারি এবং রাষ্ট্রয়াত্ত টিভি চ্যানেল এবং নিউজপেপারের ভেতরে চারটি এমইউ হয়েছে।

বিনিয়োগ সংক্রান্ত এমইউর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বোর্ড ভিডার সাথে এর পাশাপাশিভাবে পৃথকভাবে আমাদের চিটাগাংয়ের আনোয়ারাতে এবং মোংলাতে কিভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেখানে ইকোনমিক জোন দিয়ে আমরা কিভাবে বাংলাদেশের নতুন চীনা ফ্যাক্টরি, চীনা প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি এবং তার মাধ্যমে অ্যামপ্লয়মেন্ট জেনারেট করতে পারি সেগুলো নিয়ে পৃথক এমইউ হয়েছে। এর আগে সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লুই হাইজিং এই সমঝোতায় সই করেন। বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এই সমঝোতার আওতায় দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবেÑ বিশেষ করে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতা নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের লিগ্যাসি অব্যাহত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক : মাহদী আমিন বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতাকে ভিত্তি হিসেবে ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরো গভীর করতেই এই সফর। কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

তিনি বলেন, চীনে রাষ্ট্রীয় সফরকালে বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তা ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কীভাবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ শীর্ষক সম্মেলন : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গতকাল সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড-সিসিপিআইটি এবং বিডার যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে চীনের ৮০ জন প্রথম সারির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপÑ এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ব্যবসায়িক নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। একই সাথে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করে।

চীনে বাংলাদেশের অফিস স্থাপন : মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উৎপাদন ও শিল্প খাতের নতুন গন্তব্য হিসেবে একটি প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক অংশীদার হতে পারে। তিনি জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৫ দিনের কম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের নতুন লাইসেন্স দেয়া হবে।

সিপিসির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গতকাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের পার্টি-টু-পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরো ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় চীনা পক্ষ দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততা আরো জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জনগণের সংযোগ ও পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বিএনপির সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।

চীনের পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদল। গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয় বলে জানায় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং।

প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদীখনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করেন। জবাবে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং গত বছর চীনের পানি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে চীন সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। তিনি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ এবং এ খাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানান।

বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ-উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান-বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

আজ দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, চীন সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑ সকালে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সাথে গ্রেট হলে সাক্ষাৎ এবং চীনের জাদুঘর পরিদর্শন। বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রীসহ তার সফরসঙ্গীরা।

মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন। তার এই প্রথম বিদেশ সফর তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে মালয়েশিয়া সফর সম্পন্ন করেছেন। খুব স্বল্প সময়ের এই সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, রাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে চীনের দালিয়ানে যান। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সাতটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। যে সব দেশের প্রধানমন্ত্রী এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন তাদের মধ্যে ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টিনিগ্রো, মঙ্গোলিয়া, গিনি ও কাজাখস্তান। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সেখানে সরকার গঠনের পর গত চার মাসে জলবায়ু খাতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সুধীবৃন্দের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রথম বিদেশ সফরের তৃতীয় পর্বে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি গতকাল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছান। মালয়েশিয়া ও দালিয়ানের ধারাবাহিকতায় বেইজিংয়েও প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, বর্ণাঢ্য লাল গালিচার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে বরণ করা হয়। মোটর শোভাযাত্রা, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও উচ্চপর্যায়ের পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে দাওতি স্টেট গেস্ট হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়, যা সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসন সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মালয়েশিয়া এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতোই এখানেও তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে মাত্র ২৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সফর করেছেন, এর মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১১ জন রয়েছেন।

মাহদী আমিন বলেন, মূলত চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিং এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের উদ্দেশ্য হলোÑ বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরো কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।

গত ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত চার দিনের সরকারি সফরটি বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চলমান সফরে মূলত যে সমস্ত বিষয় এবং অ্যাজেন্ডা গুরুত্ব পাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছেÑ চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ইত্যাদি।

চার দিনের চীন সফরে আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজ শুক্রবার বিকালে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী সাথে এসেছেন ২৪ জনের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এর মধ্যে রয়েছেনÑ পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, তিনজন প্রতিমন্ত্রী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং প্রধানমন্ত্রীর কয়েকজন উপদেষ্টাও রয়েছেন। এরা হলেনÑ হুমায়ুন কবির, এ কে এম শামসুল ইসলাম, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহদী আমিন।

গত ২১ জুন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে যান মালয়েশিয়ায়। এরপর গত সোমবার রাতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে যোগ দিতে চীনের ডালিয়ানে আসেন প্রধানমন্ত্রী। দুদিন সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বুধবার বিকালে বেইজিং পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, গত ২১ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে মালয়েশিয়ায় যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর মালয়েশিয়ায় এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

বহুমাত্রিক সম্পর্কের দ্বার উন্মোচন

আপডেট টাইম : ৯ ঘন্টা আগে

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যকার বৈঠকের মধ্যদিয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো কৌশলগত ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যে লাল গালিচা অভ্যর্থনা ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেয়া হয়েছে তাও ছিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি চীনের অবিস্মরণীয় ও অভূতপূর্ব সম্মান। আর সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এটি আজ শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে গতকাল বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। গতকাল বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্র-সহকারে প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাকে শুভেচ্ছা জানান।

অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। এ সময় দু’দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্রবাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন। এরপর শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কুয়াং।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন চত্বরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট হল অব দ্য পিপল ভবনসহ তার আশেপাশের বিশাল চত্বর ও সড়কের দুই পাশে বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। এই ভবনে চীনের সর্বোচ্চ আইনসভা ‘ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস’-এর সভা অনুষ্ঠান এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কার্যালয় রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলকে চীনে যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেয়া হয়েছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফরে যে মর্যাদা পাচ্ছেন এবং যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন, তা বিশ্ব দরবারে আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমানের এটি প্রথম চীন সফর। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সফরসঙ্গী হিসেবে তারেক রহমান চীন সফরে গিয়েছিলেন সেই সময়ে এই গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীর লাল গালিচায় সংবর্ধনায়ও উপস্থিত ছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ২০০২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে এসে তিনি এই দেশ থেকে অনেক সমৃদ্ধ স্মৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে তার মা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতটি স্মরণীয় সফরের মাধ্যমে সেই বন্ধুত্বকে আরো সুদৃঢ় করেন। মা-বাবার সেই দলীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর তারেক রহমান। একই সাথে তাকে ও তার প্রতিনিধিদলকে যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেয়া হয়েছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।

প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে বৈঠক : আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। শীর্ষ দুই নেতার বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরো সুসংহত করার লক্ষ্যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবেন, ইনশাআল্লাহ।

১৩টি এমওইউ স্বাক্ষর : চীনের সাথে ১৩ টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বিকালে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছুয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

এসব সমঝোতায় স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখোপাত্র মাহদী আমিন ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই করার কথা জানান।

মাহদী আমিন বলেন, ১৩টি এমওইউর রয়েছেÑ ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কিভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, জয়েন্ট অ্যাকশন প্লানের বিষয়ে কথা হয়েছে। বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রফতানি করতে পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কিভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারি, সেটি নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক এলাইনমেন্ট রিলেটেড ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমইউ হয়েছে। একই সাথে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটি ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্লান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঠালের রফতানি বিষয়ে একটি এমইউ হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, একই সাথে চীনের ভাষা মান্ডারিন বাংলাদেশে আমরা শুরু করতে যাচ্ছিÑ আমাদের স্কুল কারিকুলামের সেটি এবং টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনে কো-আপরেশনে দুটো পৃথক এমইউ হয়েছে। মিডিয়ার ক্ষেত্রে কিভাবে দুই দেশের কোলাবোরেশন বাড়ানো যায়, থিংক ট্যাংক ফোরাম নিয়ে আমরা কিভাবে সামনের দিকে আগাতে পারি এবং রাষ্ট্রয়াত্ত টিভি চ্যানেল এবং নিউজপেপারের ভেতরে চারটি এমইউ হয়েছে।

বিনিয়োগ সংক্রান্ত এমইউর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বোর্ড ভিডার সাথে এর পাশাপাশিভাবে পৃথকভাবে আমাদের চিটাগাংয়ের আনোয়ারাতে এবং মোংলাতে কিভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেখানে ইকোনমিক জোন দিয়ে আমরা কিভাবে বাংলাদেশের নতুন চীনা ফ্যাক্টরি, চীনা প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি এবং তার মাধ্যমে অ্যামপ্লয়মেন্ট জেনারেট করতে পারি সেগুলো নিয়ে পৃথক এমইউ হয়েছে। এর আগে সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লুই হাইজিং এই সমঝোতায় সই করেন। বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এই সমঝোতার আওতায় দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবেÑ বিশেষ করে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতা নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের লিগ্যাসি অব্যাহত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক : মাহদী আমিন বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতাকে ভিত্তি হিসেবে ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরো গভীর করতেই এই সফর। কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

তিনি বলেন, চীনে রাষ্ট্রীয় সফরকালে বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তা ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কীভাবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ শীর্ষক সম্মেলন : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গতকাল সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড-সিসিপিআইটি এবং বিডার যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে চীনের ৮০ জন প্রথম সারির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপÑ এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ব্যবসায়িক নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। একই সাথে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করে।

চীনে বাংলাদেশের অফিস স্থাপন : মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উৎপাদন ও শিল্প খাতের নতুন গন্তব্য হিসেবে একটি প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক অংশীদার হতে পারে। তিনি জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৫ দিনের কম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের নতুন লাইসেন্স দেয়া হবে।

সিপিসির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গতকাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের পার্টি-টু-পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরো ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় চীনা পক্ষ দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততা আরো জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জনগণের সংযোগ ও পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বিএনপির সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।

চীনের পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদল। গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয় বলে জানায় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং।

প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদীখনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করেন। জবাবে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং গত বছর চীনের পানি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে চীন সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। তিনি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ এবং এ খাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানান।

বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ-উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান-বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

আজ দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, চীন সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑ সকালে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সাথে গ্রেট হলে সাক্ষাৎ এবং চীনের জাদুঘর পরিদর্শন। বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রীসহ তার সফরসঙ্গীরা।

মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন। তার এই প্রথম বিদেশ সফর তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে মালয়েশিয়া সফর সম্পন্ন করেছেন। খুব স্বল্প সময়ের এই সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, রাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে চীনের দালিয়ানে যান। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সাতটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। যে সব দেশের প্রধানমন্ত্রী এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন তাদের মধ্যে ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টিনিগ্রো, মঙ্গোলিয়া, গিনি ও কাজাখস্তান। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সেখানে সরকার গঠনের পর গত চার মাসে জলবায়ু খাতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সুধীবৃন্দের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রথম বিদেশ সফরের তৃতীয় পর্বে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি গতকাল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছান। মালয়েশিয়া ও দালিয়ানের ধারাবাহিকতায় বেইজিংয়েও প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, বর্ণাঢ্য লাল গালিচার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে বরণ করা হয়। মোটর শোভাযাত্রা, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও উচ্চপর্যায়ের পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে দাওতি স্টেট গেস্ট হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়, যা সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসন সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মালয়েশিয়া এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতোই এখানেও তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে মাত্র ২৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সফর করেছেন, এর মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১১ জন রয়েছেন।

মাহদী আমিন বলেন, মূলত চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিং এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের উদ্দেশ্য হলোÑ বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরো কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।

গত ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত চার দিনের সরকারি সফরটি বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চলমান সফরে মূলত যে সমস্ত বিষয় এবং অ্যাজেন্ডা গুরুত্ব পাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছেÑ চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ইত্যাদি।

চার দিনের চীন সফরে আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজ শুক্রবার বিকালে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী সাথে এসেছেন ২৪ জনের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এর মধ্যে রয়েছেনÑ পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, তিনজন প্রতিমন্ত্রী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং প্রধানমন্ত্রীর কয়েকজন উপদেষ্টাও রয়েছেন। এরা হলেনÑ হুমায়ুন কবির, এ কে এম শামসুল ইসলাম, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহদী আমিন।

গত ২১ জুন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে যান মালয়েশিয়ায়। এরপর গত সোমবার রাতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে যোগ দিতে চীনের ডালিয়ানে আসেন প্রধানমন্ত্রী। দুদিন সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বুধবার বিকালে বেইজিং পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, গত ২১ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে মালয়েশিয়ায় যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর মালয়েশিয়ায় এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর।