ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

শোলাকিয়াতেই কেন সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত

ঈদুল ফিতর ২০২৬-এর ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই কিশোরগঞ্জ শহরের চারপাশের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে শুরু করে। চারপাশের শান্ত মফস্বল শহরটি যেন হঠাৎ করেই এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হতে থাকে। ভোর হতে না হতেই দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে মুসল্লিরা ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের দিকে আসতে শুরু করেন। সকাল ৯টা বাজতে না বাজতেই প্রায় তিন লাখ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বিশাল ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর মানুষের স্রোত ছড়াতে থাকে আশপাশের রাস্তা, নদীর পাড় এবং অলিগলিতে। আজ অনুষ্ঠিত এই ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাতে সব মিলিয়ে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। একটি জেলা শহরের সাধারণ মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে কেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসেন, তা এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

শোলাকিয়ায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই এর প্রায় দ্বিশতবর্ষী ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। লোকশ্রুতি ও ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, এই মাঠের নামকরণের পেছনে দুটি শক্তিশালী মত প্রচলিত আছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এই ময়দান সম্পর্কে এক ধরনের পরাবাস্তব আকর্ষণ তৈরি করেছে। একটি মত বলছে, ১৮২৮ সালে এই মাঠে প্রথম বড় পরিসরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সোয়া লাখ অর্থাৎ এক লাখ পঁচিশ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই ‘সোয়া লাখ’ কথাটি লোকমুখে কালক্রমে উচ্চারণের বিবর্তনে ‘শোলাকিয়া’ আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে, ভিন্ন একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, মুঘল আমলে এখানকার পরগনার বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ‘শ লাখ’ বা এক কোটি টাকা। সেই শ লাখ টাকার পরগনা থেকেই শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি। ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য’ শীর্ষক গ্রন্থেও এই দুটি বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সুদীর্ঘ ইতিহাস ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথাগুলো যুগের পর যুগ ধরে সাধারণ মানুষের মনে শোলাকিয়াকে এক আধ্যাত্মিক মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

তবে কেবল ঐতিহাসিক বয়ান দিয়ে লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কাজ করে মানুষের গভীর ধর্মানুরাগ, বংশপরম্পরায় চলে আসা পারিবারিক প্রথা এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই ময়দানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের কয়েক দশকের স্মৃতি। এমন অনেক বয়োবৃদ্ধ আছেন, যারা পাকিস্তান আমল থেকে একটানা প্রায় ৫৭ বছর ধরে এখানে নামাজ আদায় করে আসছেন। একসময় ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা বা ত্রিশাল উপজেলার মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে মানুষ তাদের পিতা বা চাচার হাত ধরে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এখানে আসতেন। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। ২০ টাকা সম্বল করে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার মধ্যেও তাদের কোনো ক্লান্তি ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের আত্মিক তৃপ্তি। আজ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে তাদের আর হাঁটতে হয় না, তবে শেকড়ের প্রতি সেই টান বিন্দুমাত্র কমেনি।

ঐতিহ্যের এই ধারা কেবল বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রতি বছরই এই বিশাল জামাতে যুক্ত হচ্ছেন নতুন প্রজন্মের বহু মানুষ। দূরদূরান্তের জেলাগুলো থেকে নতুন মুসল্লিরা এই ঐতিহাসিক জামাতে শরিক হওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে ছুটে আসেন। নরসিংদীর পলাশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর কিংবা বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বহু মানুষ ঈদের এক দিন আগেই কিশোরগঞ্জে এসে পৌঁছান। গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজকাঠামোতে একটি বিশ্বাস গভীরভাবে প্রোথিত আছে যে, যত বড় জামাতে বা যত বেশি মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়া যায়, সেই নামাজের পুণ্য তত বেশি। লাখো মানুষের সঙ্গে যখন একই সমলয়ে তাকবির ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তখন তা যে অভূতপূর্ব ধ্বনি-তরঙ্গ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করে, তা সরাসরি মাঠে উপস্থিত না থাকলে উপলব্ধি করা কঠিন। এই সামষ্টিক আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে নিজেদের এলাকার ঈদগাহ ছেড়ে শত শত কিলোমিটার দূর থেকে টেনে আনে।

যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা শোলাকিয়ার এই বিশাল জমায়েতকে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে। দূর-দূরান্তের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঈদের দিন দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়, যা হাজার হাজার মানুষকে নির্বিঘ্নে কিশোরগঞ্জে পৌঁছে দেয়। শোলাকিয়া মাঠের নিজস্ব এক রেওয়াজ রয়েছে, যা এই জামাতকে আরও অনন্য করে তোলে। এই রেওয়াজ অনুযায়ী সকাল ঠিক ১০টায় বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়ার মাধ্যমে ঈদের মূল জামাত শুরু হয়। এবারের ১৯৯তম জামাতে ইমামতি করেন জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনায় যখন লাখো মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।

শোলাকিয়া ঈদগাহের ইতিহাসে ২০১৬ সালের ঈদুল ফিতরের দিনটি একটি গভীর ক্ষত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সেদিন মাঠের অদূরেই একটি তল্লাশিচৌকিতে অপ্রত্যাশিত জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়। এ ধরনের একটি ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা ছিল যে, মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হবে। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোর বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ধর্মানুরাগ যেকোনো চরমপন্থী ভীতির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ওই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর রাষ্ট্র ও প্রশাসন শোলাকিয়ার নিরাপত্তায় যুগান্তকারী ও দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে শোলাকিয়ার ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে যে স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর পাঁচ প্লাটুন সদস্য, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) এবং জেলা পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হিসেবে পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য ভেতর ও বাইরে অর্ধশতাধিক ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা, ছয়টি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের ছাতা বা কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, শুধু একটি পাতলা জায়নামাজ নিয়ে প্রবেশের অনুমতি থাকে। এত কঠোর নিয়মকানুন ও কয়েক স্তরের তল্লাশি পার হয়ে মাঠে প্রবেশ করতে দীর্ঘ সময় লাগলেও মানুষের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়ে না; বরং এই দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা দূর থেকে আসা মানুষদের মনে স্বস্তি ও আস্থার জন্ম দেয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শোলাকিয়ার এই বিশাল জমায়েতের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক রয়েছে। ঈদের আগের দিন থেকে শুরু করে ঈদের দিন পর্যন্ত এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জ শহর এবং এর আশপাশের অর্থনীতিতে এক বিশাল গতিশীলতা তৈরি হয়। দূর থেকে আসা লাখো মানুষের আবাসন ও অন্যান্য লজিস্টিক প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় মসজিদ ও পরিচিতদের বাড়িতে অপরিচিত মুসল্লিদের আশ্রয় দেওয়ার যে রেওয়াজ এখানে গড়ে উঠেছে, তা চিরায়ত সামাজিক সম্প্রীতি ও আতিথেয়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশাল এই ময়দানে ধনী-দরিদ্র বা শ্রেণিগত কোনো বিভেদ থাকে না, সবার পরিচয় হয়ে ওঠে এক কাতারে দাঁড়ানো সমান মানুষ।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এই জনসমুদ্র সৃষ্টির পেছনে তাই কোনো একক কারণ দাঁড় করানো সম্ভব নয়। শতবর্ষের ঐতিহ্য, বংশপরম্পরায় চলে আসা আবেগ, বৃহৎ জামাতে প্রার্থনার গভীর বিশ্বাস, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধা এবং প্রশাসনের নিশ্চিত করা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। এই সব কিছুর সম্মিলিত রূপই হলো আজকের শোলাকিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও, শোলাকিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের এই অকৃত্রিম টান যে ক্রমশ বেড়েই চলেছে, তা প্রতি বছরের এই বিশাল জনস্রোতই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

শোলাকিয়াতেই কেন সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত

আপডেট টাইম : ১২:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬

ঈদুল ফিতর ২০২৬-এর ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই কিশোরগঞ্জ শহরের চারপাশের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে শুরু করে। চারপাশের শান্ত মফস্বল শহরটি যেন হঠাৎ করেই এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হতে থাকে। ভোর হতে না হতেই দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে মুসল্লিরা ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের দিকে আসতে শুরু করেন। সকাল ৯টা বাজতে না বাজতেই প্রায় তিন লাখ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বিশাল ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর মানুষের স্রোত ছড়াতে থাকে আশপাশের রাস্তা, নদীর পাড় এবং অলিগলিতে। আজ অনুষ্ঠিত এই ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাতে সব মিলিয়ে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। একটি জেলা শহরের সাধারণ মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে কেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসেন, তা এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

শোলাকিয়ায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই এর প্রায় দ্বিশতবর্ষী ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। লোকশ্রুতি ও ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, এই মাঠের নামকরণের পেছনে দুটি শক্তিশালী মত প্রচলিত আছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এই ময়দান সম্পর্কে এক ধরনের পরাবাস্তব আকর্ষণ তৈরি করেছে। একটি মত বলছে, ১৮২৮ সালে এই মাঠে প্রথম বড় পরিসরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সোয়া লাখ অর্থাৎ এক লাখ পঁচিশ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই ‘সোয়া লাখ’ কথাটি লোকমুখে কালক্রমে উচ্চারণের বিবর্তনে ‘শোলাকিয়া’ আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে, ভিন্ন একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, মুঘল আমলে এখানকার পরগনার বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ‘শ লাখ’ বা এক কোটি টাকা। সেই শ লাখ টাকার পরগনা থেকেই শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি। ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য’ শীর্ষক গ্রন্থেও এই দুটি বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সুদীর্ঘ ইতিহাস ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথাগুলো যুগের পর যুগ ধরে সাধারণ মানুষের মনে শোলাকিয়াকে এক আধ্যাত্মিক মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

তবে কেবল ঐতিহাসিক বয়ান দিয়ে লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কাজ করে মানুষের গভীর ধর্মানুরাগ, বংশপরম্পরায় চলে আসা পারিবারিক প্রথা এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই ময়দানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের কয়েক দশকের স্মৃতি। এমন অনেক বয়োবৃদ্ধ আছেন, যারা পাকিস্তান আমল থেকে একটানা প্রায় ৫৭ বছর ধরে এখানে নামাজ আদায় করে আসছেন। একসময় ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা বা ত্রিশাল উপজেলার মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে মানুষ তাদের পিতা বা চাচার হাত ধরে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এখানে আসতেন। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। ২০ টাকা সম্বল করে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার মধ্যেও তাদের কোনো ক্লান্তি ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের আত্মিক তৃপ্তি। আজ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে তাদের আর হাঁটতে হয় না, তবে শেকড়ের প্রতি সেই টান বিন্দুমাত্র কমেনি।

ঐতিহ্যের এই ধারা কেবল বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রতি বছরই এই বিশাল জামাতে যুক্ত হচ্ছেন নতুন প্রজন্মের বহু মানুষ। দূরদূরান্তের জেলাগুলো থেকে নতুন মুসল্লিরা এই ঐতিহাসিক জামাতে শরিক হওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে ছুটে আসেন। নরসিংদীর পলাশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর কিংবা বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বহু মানুষ ঈদের এক দিন আগেই কিশোরগঞ্জে এসে পৌঁছান। গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজকাঠামোতে একটি বিশ্বাস গভীরভাবে প্রোথিত আছে যে, যত বড় জামাতে বা যত বেশি মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়া যায়, সেই নামাজের পুণ্য তত বেশি। লাখো মানুষের সঙ্গে যখন একই সমলয়ে তাকবির ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তখন তা যে অভূতপূর্ব ধ্বনি-তরঙ্গ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করে, তা সরাসরি মাঠে উপস্থিত না থাকলে উপলব্ধি করা কঠিন। এই সামষ্টিক আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে নিজেদের এলাকার ঈদগাহ ছেড়ে শত শত কিলোমিটার দূর থেকে টেনে আনে।

যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা শোলাকিয়ার এই বিশাল জমায়েতকে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে। দূর-দূরান্তের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঈদের দিন দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়, যা হাজার হাজার মানুষকে নির্বিঘ্নে কিশোরগঞ্জে পৌঁছে দেয়। শোলাকিয়া মাঠের নিজস্ব এক রেওয়াজ রয়েছে, যা এই জামাতকে আরও অনন্য করে তোলে। এই রেওয়াজ অনুযায়ী সকাল ঠিক ১০টায় বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়ার মাধ্যমে ঈদের মূল জামাত শুরু হয়। এবারের ১৯৯তম জামাতে ইমামতি করেন জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনায় যখন লাখো মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।

শোলাকিয়া ঈদগাহের ইতিহাসে ২০১৬ সালের ঈদুল ফিতরের দিনটি একটি গভীর ক্ষত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সেদিন মাঠের অদূরেই একটি তল্লাশিচৌকিতে অপ্রত্যাশিত জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়। এ ধরনের একটি ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা ছিল যে, মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হবে। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোর বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ধর্মানুরাগ যেকোনো চরমপন্থী ভীতির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ওই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর রাষ্ট্র ও প্রশাসন শোলাকিয়ার নিরাপত্তায় যুগান্তকারী ও দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে শোলাকিয়ার ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে যে স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর পাঁচ প্লাটুন সদস্য, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) এবং জেলা পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হিসেবে পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য ভেতর ও বাইরে অর্ধশতাধিক ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা, ছয়টি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের ছাতা বা কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, শুধু একটি পাতলা জায়নামাজ নিয়ে প্রবেশের অনুমতি থাকে। এত কঠোর নিয়মকানুন ও কয়েক স্তরের তল্লাশি পার হয়ে মাঠে প্রবেশ করতে দীর্ঘ সময় লাগলেও মানুষের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়ে না; বরং এই দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা দূর থেকে আসা মানুষদের মনে স্বস্তি ও আস্থার জন্ম দেয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শোলাকিয়ার এই বিশাল জমায়েতের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক রয়েছে। ঈদের আগের দিন থেকে শুরু করে ঈদের দিন পর্যন্ত এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জ শহর এবং এর আশপাশের অর্থনীতিতে এক বিশাল গতিশীলতা তৈরি হয়। দূর থেকে আসা লাখো মানুষের আবাসন ও অন্যান্য লজিস্টিক প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় মসজিদ ও পরিচিতদের বাড়িতে অপরিচিত মুসল্লিদের আশ্রয় দেওয়ার যে রেওয়াজ এখানে গড়ে উঠেছে, তা চিরায়ত সামাজিক সম্প্রীতি ও আতিথেয়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশাল এই ময়দানে ধনী-দরিদ্র বা শ্রেণিগত কোনো বিভেদ থাকে না, সবার পরিচয় হয়ে ওঠে এক কাতারে দাঁড়ানো সমান মানুষ।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এই জনসমুদ্র সৃষ্টির পেছনে তাই কোনো একক কারণ দাঁড় করানো সম্ভব নয়। শতবর্ষের ঐতিহ্য, বংশপরম্পরায় চলে আসা আবেগ, বৃহৎ জামাতে প্রার্থনার গভীর বিশ্বাস, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধা এবং প্রশাসনের নিশ্চিত করা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। এই সব কিছুর সম্মিলিত রূপই হলো আজকের শোলাকিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও, শোলাকিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের এই অকৃত্রিম টান যে ক্রমশ বেড়েই চলেছে, তা প্রতি বছরের এই বিশাল জনস্রোতই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।