ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

কৃষক আব্দুল হাই (৫৯)। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচই আসে ধান থেকে। শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার পাকার দুই সপ্তাহ আগেই তলিয়ে গেছে পানিতে। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় দিশাহারা তিনি।

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রানাগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল হাইয়ের পরিবারের সদস্য ৭ জন। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তার মতো ফসলের ক্ষতিতে জেলার হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা। ফসল হারিয়ে অসহায় তারা। একদিকে ফসল ডুবছে, অন্যদিকে কোনো কোনো হাওরে ফসল রক্ষায় বাঁধ তৈরি করে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা।

পানি নিষ্কাশনের জন্য অনেক হাওরে বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও পাম্প বসিয়ে ব্যবস্থা করা হচ্ছে পানি সরানোর। আবার কোনো কোনো হাওরে জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে নিচু অঞ্চলের ফসল।

একই এলাকার বড়কাপন গ্রামের কৃষক শাহেদ মিয়ার আড়াই একর জমি তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টিতে। ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনিও। সব জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় পাগলপ্রায় তিনি।

শনিবার সকালে তলিয়ে যাওয়া জমিতে নেমে দেখেন খেতে অন্তত সাত ফুট পানি। পানির নিচে ডুবে ডুবে ধান তুলছিলেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ধানটা পাকলে কাটার চেষ্টা করতাম। মনরে বোঝ দিতাম। কাঁচা ধান ডুবরায় (জলাবদ্ধতা) চোখের সামনে পচে যাচ্ছে। এই চিন্তায় রাইতে ঘুম অয় না। জমির ফসল দুই সপ্তাহ পরেই কাটা যেত। এমন সময় সব তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে, পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাবে। এখন এসব জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।’

‘পানিতে ডুবে কাঁচা ধান চোখের সামনে পঁচে যাচ্ছে, চিন্তায় ঘুম অয় না’

একই এলাকার বড়কাপন সুনীল সরকার (৬০) বলেন, ‘জমি আবাদ করতে গিয়ে ধার-দেনা করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ কীভাবে দেবো? আর বাকি বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় আছি।’

তিনি বলেন, ‘কিবায় কিতা করমু। বুকটা ভাঙি যায়। কিবায় চলমু। সরকারে ত কুনতা করলো না, সব ধান গেলগা।’

হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা মো. নুরুল আমিন জানান, তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলাবদ্ধতায় অন্তত ১৫-২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের কারণেই অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নদী, খাল-বিল খনন হয় না। এসব ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য কৃষকেরা আহাজারি করছেন। এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো উদ্যোগ নেই। কৃষকরা কাঁদছেন আর তারা শুধু পরিদর্শন করেই দায় সারছেন।’

কলমাকান্দার বড়কাপন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জলাবদ্ধতার খবর পেয়ে কয়েকটি গ্রামের দুই শতাধিক কৃষককে নিয়ে অন্তত তিনটি স্থানে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ দিয়েছি। যাতে নতুন করে আর কোনো হাওর ডুবে না যায়। গত চারদিন ধরে আমরা রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছি, যেন কেউ বাঁধ কেটে না দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের আরও সোচ্চার হওয়া দরকার। না হলে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিবৃষ্টিতে জেলার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা, চরহাইজদা, চন্দ্রাসোনারতাল,শয়তানখালী, খালিয়াজুরী উপজেলার কীর্তনখলা, পাঙ্গাসিয়া, কটিচাপড়া, লক্ষীপাশা, বোয়ালী, জগন্নাথপুর, বিলবিল্লিয়াসহ মদন ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কয়েকটি হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তবে জেলা কৃষি বিভাগের কাছে সেই ক্ষতির কোনো সঠিক হিসাব নেই। তারা জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি হিসেব করে জানানো হবে।

জেলায় এ বছর ১ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে হাওরে হয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর। দেরিতে বাঁধে মাটি কাটায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে হাওড়ের ফসলে। মধ্য এপ্রিল থেকে পুরোদমে হাওরে ধান কাটা শুরু হয়।

জানতে চাইলে কৃষিবিদ দিলীপ সেন বলেন, ‘জলাবদ্ধতায় ধানগাছ যদি ৫ থেকে ৬ দিন নিমজ্জিত থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে। এর আগে যদি পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। তবে থোড়ে পানি লাগলে ধানে চিটা হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।’

‘পানিতে ডুবে কাঁচা ধান চোখের সামনে পঁচে যাচ্ছে, চিন্তায় ঘুম অয় না’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, জেলায় পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ আছে। এ বছর ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে ২০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কিমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে। এর বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গঠিত ২০২টি পিআইসির মধ্যে খালিয়াজুরিতে ১৪৩টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি ও কলমাকান্দায় ১০টি রয়েছে।

জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাওড়ের সবগুলো বাঁধেই মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধে ঘাসও লাগানো হয়েছে। নিন্মাঞ্চলের কিছুটা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আর বৃষ্টিপাত না হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না।’

জেলা প্রশাসক ও হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি খন্দাকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘হাওড়ে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে সর্বোচ্চ তদারকি করা হচ্ছে। প্রতিটি বাঁধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে কিছু কিছু নিচু এলাকায় কৃষকের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়া খবর পেয়েছি। হাওরে ফসল রক্ষায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

এদিকে জেলার কলমাকান্দাসহ বেশ কিছু হাওরে বছরের একমাত্র ফসল টেকাতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করছে এলাকাবাসী। কৃষকের বাঁধ নির্মাণের খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পরিকল্পিত বাঁধসহ নদী খাল খনন পরিদর্শন করে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি।

তিনি বলেন, আমিও কৃষকের সন্তান। শৈশবে বাবার সঙ্গে আমিও ফসল রক্ষা করতে বাঁধে মাটি কেটেছি। এখন এই দুর্ভোগের জন্য অবশ্যই রাষ্ট্র দায়ী। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কৃষকের এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন,নদী-খাল খনন করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে আশা করছি কৃষকদের এই সংকট কমবে।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

আপডেট টাইম : ০৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

কৃষক আব্দুল হাই (৫৯)। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচই আসে ধান থেকে। শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার পাকার দুই সপ্তাহ আগেই তলিয়ে গেছে পানিতে। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় দিশাহারা তিনি।

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রানাগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল হাইয়ের পরিবারের সদস্য ৭ জন। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তার মতো ফসলের ক্ষতিতে জেলার হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা। ফসল হারিয়ে অসহায় তারা। একদিকে ফসল ডুবছে, অন্যদিকে কোনো কোনো হাওরে ফসল রক্ষায় বাঁধ তৈরি করে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা।

পানি নিষ্কাশনের জন্য অনেক হাওরে বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও পাম্প বসিয়ে ব্যবস্থা করা হচ্ছে পানি সরানোর। আবার কোনো কোনো হাওরে জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে নিচু অঞ্চলের ফসল।

একই এলাকার বড়কাপন গ্রামের কৃষক শাহেদ মিয়ার আড়াই একর জমি তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টিতে। ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনিও। সব জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় পাগলপ্রায় তিনি।

শনিবার সকালে তলিয়ে যাওয়া জমিতে নেমে দেখেন খেতে অন্তত সাত ফুট পানি। পানির নিচে ডুবে ডুবে ধান তুলছিলেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ধানটা পাকলে কাটার চেষ্টা করতাম। মনরে বোঝ দিতাম। কাঁচা ধান ডুবরায় (জলাবদ্ধতা) চোখের সামনে পচে যাচ্ছে। এই চিন্তায় রাইতে ঘুম অয় না। জমির ফসল দুই সপ্তাহ পরেই কাটা যেত। এমন সময় সব তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে, পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাবে। এখন এসব জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।’

‘পানিতে ডুবে কাঁচা ধান চোখের সামনে পঁচে যাচ্ছে, চিন্তায় ঘুম অয় না’

একই এলাকার বড়কাপন সুনীল সরকার (৬০) বলেন, ‘জমি আবাদ করতে গিয়ে ধার-দেনা করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ কীভাবে দেবো? আর বাকি বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় আছি।’

তিনি বলেন, ‘কিবায় কিতা করমু। বুকটা ভাঙি যায়। কিবায় চলমু। সরকারে ত কুনতা করলো না, সব ধান গেলগা।’

হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা মো. নুরুল আমিন জানান, তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলাবদ্ধতায় অন্তত ১৫-২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের কারণেই অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নদী, খাল-বিল খনন হয় না। এসব ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য কৃষকেরা আহাজারি করছেন। এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো উদ্যোগ নেই। কৃষকরা কাঁদছেন আর তারা শুধু পরিদর্শন করেই দায় সারছেন।’

কলমাকান্দার বড়কাপন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জলাবদ্ধতার খবর পেয়ে কয়েকটি গ্রামের দুই শতাধিক কৃষককে নিয়ে অন্তত তিনটি স্থানে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ দিয়েছি। যাতে নতুন করে আর কোনো হাওর ডুবে না যায়। গত চারদিন ধরে আমরা রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছি, যেন কেউ বাঁধ কেটে না দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের আরও সোচ্চার হওয়া দরকার। না হলে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিবৃষ্টিতে জেলার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা, চরহাইজদা, চন্দ্রাসোনারতাল,শয়তানখালী, খালিয়াজুরী উপজেলার কীর্তনখলা, পাঙ্গাসিয়া, কটিচাপড়া, লক্ষীপাশা, বোয়ালী, জগন্নাথপুর, বিলবিল্লিয়াসহ মদন ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কয়েকটি হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তবে জেলা কৃষি বিভাগের কাছে সেই ক্ষতির কোনো সঠিক হিসাব নেই। তারা জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি হিসেব করে জানানো হবে।

জেলায় এ বছর ১ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে হাওরে হয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর। দেরিতে বাঁধে মাটি কাটায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে হাওড়ের ফসলে। মধ্য এপ্রিল থেকে পুরোদমে হাওরে ধান কাটা শুরু হয়।

জানতে চাইলে কৃষিবিদ দিলীপ সেন বলেন, ‘জলাবদ্ধতায় ধানগাছ যদি ৫ থেকে ৬ দিন নিমজ্জিত থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে। এর আগে যদি পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। তবে থোড়ে পানি লাগলে ধানে চিটা হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।’

‘পানিতে ডুবে কাঁচা ধান চোখের সামনে পঁচে যাচ্ছে, চিন্তায় ঘুম অয় না’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, জেলায় পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ আছে। এ বছর ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে ২০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কিমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে। এর বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গঠিত ২০২টি পিআইসির মধ্যে খালিয়াজুরিতে ১৪৩টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি ও কলমাকান্দায় ১০টি রয়েছে।

জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাওড়ের সবগুলো বাঁধেই মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধে ঘাসও লাগানো হয়েছে। নিন্মাঞ্চলের কিছুটা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আর বৃষ্টিপাত না হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না।’

জেলা প্রশাসক ও হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি খন্দাকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘হাওড়ে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে সর্বোচ্চ তদারকি করা হচ্ছে। প্রতিটি বাঁধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে কিছু কিছু নিচু এলাকায় কৃষকের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়া খবর পেয়েছি। হাওরে ফসল রক্ষায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

এদিকে জেলার কলমাকান্দাসহ বেশ কিছু হাওরে বছরের একমাত্র ফসল টেকাতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করছে এলাকাবাসী। কৃষকের বাঁধ নির্মাণের খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পরিকল্পিত বাঁধসহ নদী খাল খনন পরিদর্শন করে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি।

তিনি বলেন, আমিও কৃষকের সন্তান। শৈশবে বাবার সঙ্গে আমিও ফসল রক্ষা করতে বাঁধে মাটি কেটেছি। এখন এই দুর্ভোগের জন্য অবশ্যই রাষ্ট্র দায়ী। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কৃষকের এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন,নদী-খাল খনন করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে আশা করছি কৃষকদের এই সংকট কমবে।’