ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

দেশ বাঁচাতে এগিয়ে আসুন সবাই

দেশ আজ মহাসংকটে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের দুঃশাসনের কারণে দেশ যখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শুরু হয়েছে ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধে টালমাটাল গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে যুদ্ধের ঢেউ। তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংকট। ফলে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি এখন দুর্যোগের মুখে পড়েছে। এই সময়টা আমাদের জন্য ধৈর্যের, পরীক্ষার, সহনশীলতার, সংযমের এবং ঐক্যবদ্ধ থেকে সংকট মোকাবিলা করার। এখন বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হবে। আমরা যদি বিভক্তির চোরাগলিতে আটকে যাই, তাহলে সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এমন এক কঠিন সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যখন আমাদের অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা, রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা, স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংকটের মুখোমুখি দেশ, শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের সামনে এক কঠিন সময়।

ইতোমধ্যে সংকট মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যয় সংকোচনমূলক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমরা যদি সবাই সচেতন না হই, দায়িত্বশীল আচরণ না করি তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম মূল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে গ্রীষ্মের আগেই শুরু হয়েছে লোডশেডিং। এটি সহনীয় রাখতে জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট। ঢাকা শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিং বেশি। সামনে এই লোডশেডিং আরও বাড়বে। এ কারণেই আমাদের ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সচেতন এবং দায়িত্বশীল হলেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। অযথা বিদ‍্যুতের অপচয় আমরাই কমাতে পারি। অপ্রয়োজনে লাইট, ফ্যান, এসি না চালিয়ে আমরাই সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারি। আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগ একত্রিত করলে বড় ধরনের জ্বালানি সাশ্রয় হবে।

জ্বালানি তেলের সংকট চলছে বেশকিছু দিন ধরে। এই সময়ে  আমরা অনেকেই দায়িত্বহীন আচরণ করছি। নিজেদের স্বার্থের জন্য অবৈধভাবে তেল মজুত করছি। এর ফলে জ্বালানি তেলের সংকট যেমন আরও বাড়ছে তেমনি আমরাও নিজেদের ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছি। বাসাবাড়িতে এসব জ্বালানি তেলের মজুত যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অনেকেই সামান্য টাকার লোভে জ্বালানি তেল বিদেশে পাচার করার চেষ্টা করছে। এটা কেবল আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়, এটা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিক এটা করতে পারে না। যারা কিছু মুনাফার লোভে দেশের ক্ষতি করছেন তারা এখনই এসব বন্ধ করুন। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো এসব অবৈধ পাচারকারী ও মজুতদারদের খুঁজে বের করা। তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করা। কারণ, দেশটা আমাদের সবার। এখন আমরা নিজেরাই জ্বালানি তেলের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে পারি।

রাষ্ট্র একটা পরিবারের মতো। পরিবারে সংকট হলে সবাই যেমন একসাথে সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করি, সবাই একটু করে কষ্ট স্বীকার করি, খানিকটা ত‍্যাগ স্বীকার করি, তেমনি এই পরিস্থিতিতে সব ভেদাভেদ ভুলে আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, কৃচ্ছ্রতার মানসিকতা নিয়ে চলতে হবে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে।

এ কথা ঠিক গত দেড় বছর যদি দেশ ঠিকমতো পরিচালিত হতো তাহলে আজকের এই সংকট এতো গভীর হতো না। ইউনূস সরকার দেশকে রীতিমতো দেউলিয়া করে বিদায় নিয়েছে। বেসরকারি খাতকে বিপর্যস্ত করে ঋণের পর ঋণ করে দেশ চালিয়েছে ইউনূস সরকার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।

এর তিন মাস আগে সেপ্টেম্বরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ২২১ কোটি ডলার। আর জুনের শেষে বিদেশি ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদেশি ঋণ গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই বিদেশি ঋণ বেড়েছে। এসব ঋণের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি।

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। অথচ ইউনূস সরকারের শাসনামলে হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখো শ্রমিক বেকার হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তাদের। দেশের অর্থনীতি আজ কংকালসার। বিদেশি ঋণ আর প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশ চলেছে। এখন ইরান যুদ্ধ রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। নতুন করে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বর্তমান সরকারের জন্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বিদ‍্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নেয়নি। দেশের স্বার্থবিরোধী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা না নিয়ে নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বোঝা।

হামের টিকা না দিয়ে দেশের শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। যে সংকট মোকাবিলায় এখন নির্বাচিত সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিভিন্ন অযৌক্তিক চুক্তি করে নতুন সরকারের হাত পা বেঁধে দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ফলে সরকার দেশের স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতেও পারছে না।

এভাবে সবক্ষেত্রে দেশকে খাদের কিনারায় নিয়ে চলে গেছেন ড. ইউনূস। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন এদেশের ছাত্র-জনতা। কিন্তু দেড় বছরে ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টারা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিলেন।

এই সরকারকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই পাহাড়সম সংকট মোকাবিলায় সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশটা আমাদের সবার। এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই, এখন আমাদের সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কারণ সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, সাধারণ মানুষের সমস্যাই হবে সবচেয়ে বেশি। বিপন্ন হবে গণতন্ত্র।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

দেশ বাঁচাতে এগিয়ে আসুন সবাই

আপডেট টাইম : ০৫:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

দেশ আজ মহাসংকটে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের দুঃশাসনের কারণে দেশ যখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শুরু হয়েছে ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধে টালমাটাল গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে যুদ্ধের ঢেউ। তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংকট। ফলে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি এখন দুর্যোগের মুখে পড়েছে। এই সময়টা আমাদের জন্য ধৈর্যের, পরীক্ষার, সহনশীলতার, সংযমের এবং ঐক্যবদ্ধ থেকে সংকট মোকাবিলা করার। এখন বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হবে। আমরা যদি বিভক্তির চোরাগলিতে আটকে যাই, তাহলে সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এমন এক কঠিন সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যখন আমাদের অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা, রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা, স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংকটের মুখোমুখি দেশ, শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের সামনে এক কঠিন সময়।

ইতোমধ্যে সংকট মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যয় সংকোচনমূলক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমরা যদি সবাই সচেতন না হই, দায়িত্বশীল আচরণ না করি তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম মূল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে গ্রীষ্মের আগেই শুরু হয়েছে লোডশেডিং। এটি সহনীয় রাখতে জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট। ঢাকা শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিং বেশি। সামনে এই লোডশেডিং আরও বাড়বে। এ কারণেই আমাদের ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সচেতন এবং দায়িত্বশীল হলেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। অযথা বিদ‍্যুতের অপচয় আমরাই কমাতে পারি। অপ্রয়োজনে লাইট, ফ্যান, এসি না চালিয়ে আমরাই সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারি। আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগ একত্রিত করলে বড় ধরনের জ্বালানি সাশ্রয় হবে।

জ্বালানি তেলের সংকট চলছে বেশকিছু দিন ধরে। এই সময়ে  আমরা অনেকেই দায়িত্বহীন আচরণ করছি। নিজেদের স্বার্থের জন্য অবৈধভাবে তেল মজুত করছি। এর ফলে জ্বালানি তেলের সংকট যেমন আরও বাড়ছে তেমনি আমরাও নিজেদের ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছি। বাসাবাড়িতে এসব জ্বালানি তেলের মজুত যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অনেকেই সামান্য টাকার লোভে জ্বালানি তেল বিদেশে পাচার করার চেষ্টা করছে। এটা কেবল আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়, এটা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিক এটা করতে পারে না। যারা কিছু মুনাফার লোভে দেশের ক্ষতি করছেন তারা এখনই এসব বন্ধ করুন। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো এসব অবৈধ পাচারকারী ও মজুতদারদের খুঁজে বের করা। তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করা। কারণ, দেশটা আমাদের সবার। এখন আমরা নিজেরাই জ্বালানি তেলের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে পারি।

রাষ্ট্র একটা পরিবারের মতো। পরিবারে সংকট হলে সবাই যেমন একসাথে সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করি, সবাই একটু করে কষ্ট স্বীকার করি, খানিকটা ত‍্যাগ স্বীকার করি, তেমনি এই পরিস্থিতিতে সব ভেদাভেদ ভুলে আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, কৃচ্ছ্রতার মানসিকতা নিয়ে চলতে হবে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে।

এ কথা ঠিক গত দেড় বছর যদি দেশ ঠিকমতো পরিচালিত হতো তাহলে আজকের এই সংকট এতো গভীর হতো না। ইউনূস সরকার দেশকে রীতিমতো দেউলিয়া করে বিদায় নিয়েছে। বেসরকারি খাতকে বিপর্যস্ত করে ঋণের পর ঋণ করে দেশ চালিয়েছে ইউনূস সরকার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।

এর তিন মাস আগে সেপ্টেম্বরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ২২১ কোটি ডলার। আর জুনের শেষে বিদেশি ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদেশি ঋণ গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই বিদেশি ঋণ বেড়েছে। এসব ঋণের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি।

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। অথচ ইউনূস সরকারের শাসনামলে হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখো শ্রমিক বেকার হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তাদের। দেশের অর্থনীতি আজ কংকালসার। বিদেশি ঋণ আর প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশ চলেছে। এখন ইরান যুদ্ধ রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। নতুন করে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বর্তমান সরকারের জন্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বিদ‍্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নেয়নি। দেশের স্বার্থবিরোধী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা না নিয়ে নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বোঝা।

হামের টিকা না দিয়ে দেশের শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। যে সংকট মোকাবিলায় এখন নির্বাচিত সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিভিন্ন অযৌক্তিক চুক্তি করে নতুন সরকারের হাত পা বেঁধে দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ফলে সরকার দেশের স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতেও পারছে না।

এভাবে সবক্ষেত্রে দেশকে খাদের কিনারায় নিয়ে চলে গেছেন ড. ইউনূস। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন এদেশের ছাত্র-জনতা। কিন্তু দেড় বছরে ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টারা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিলেন।

এই সরকারকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই পাহাড়সম সংকট মোকাবিলায় সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশটা আমাদের সবার। এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই, এখন আমাদের সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কারণ সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, সাধারণ মানুষের সমস্যাই হবে সবচেয়ে বেশি। বিপন্ন হবে গণতন্ত্র।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com