ঢাকা , বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাইকেলে চড়তেন, ৫ আগস্টের তিন দিন পর প্রাডো গাড়িতে চড়েছেন আওয়ামী আমলের আমলনামা উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ২৯ অক্টোবর মধ্য রাত থেকে উঠে যাচ্ছে ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনকে জুবাইদা রহমানের আহ্বান কৃষিতেও বাড়ছে খেলাপির চাপ ৩১ অক্টোবর লংমার্চ সফল করতে ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছ: হুমায়ূন কবির আইজিপি সহজ-সরল মানুষ, ক্রসফায়ার নিয়ে বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইজিপির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী: তথ্য উপদেষ্টা চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় সামরিক চুক্তিতে বাধ্য করার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত তাদের ঈদের সকাল

বৃহস্পতিবার, সকাল সোয়া ৭টা। রাজধানীর আজিমপুর পুরাতন কবরস্থান। নিত্যদিনের ভোরের এ সময়টাতে সাধারণত কবরস্থানে নীরবতা বিরাজ করে। কিন্তু ঈদুল আজহার দিনে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। আজ ২৮ মে ঈদের দিন ভোর থেকেই বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কবর জিয়ারত করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ছুটে আসেন মানুষ।

কবরস্থানের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই চোখে পড়ে সারি সারি মানুষের ভিড়। কারও হাতে গোলাপের পাপড়ি কারও হাতে আতর। কেউ আবার প্রিয়জনের কবরের ওপর একটু পানি ছিটিয়ে দোয়া করছেন। কবরের পাশে বসা বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে শুরু করে শিশুরাও হাত তুলে মোনাজাত করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন কবরের সামনে স্বজনদের উপস্থিতি। কেউ একা এসেছেন আবার কেউবা এসেছেন স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে প্রিয়জনের কবর জিয়ারত করতে। তাদের কেউ নীরবে চোখ মুছছেন কেউবা বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। ঈদের আনন্দের মধ্যেও কবরস্থানজুড়ে ছিল এক ধরনের চাপা বেদনার আবহ।

jagonews24

তাদেরই একজন মোহাম্মদ রাসেল। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। ভোরে টঙ্গী থেকে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মা রাশিদা বেগমের কবর জিয়ারত করতে। সাত মাস আগে তার মা মারা যান।

আলাপকালে মোহাম্মদ রাসেল বলেন, সকাল থেকেই মায়ের জন্য মনটা ছটফট করছিল। তাই ভোরে উঠেই কবর জিয়ারত করতে সপরিবারে ছুটে এসেছি। ইচ্ছে ছিল কবরস্থান সংলগ্ন হানিফ মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করবো। একটুর জন্য সকাল সাতটার জামাত ধরতে পারিনি। এখন কবর জিয়ারত করে আটটার জামাতে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরবো।

টঙ্গীতে বাসা থাকা সত্ত্বেও কেন আজিমপুরে দাফন করা হয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আজিমপুর কবরস্থানে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষ কবর জিয়ারত করতে আসেন। তারা সব কবরবাসীর জন্য দোয়া করেন। তাছাড়া আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আশপাশের এলাকাতেই থাকেন। সবার পরামর্শেই এখানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

jagonews24

মাসুম বিল্লাহ নামে আরেক ব্যক্তি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে এসেছেন। তিনি জানান, কামরাঙ্গীরচরের একটি মসজিদে সকাল ৬টায় ঈদের নামাজ আদায় করে ছেলেকে নিয়ে আজিমপুরে উদ্দেশ্যে রওনা হন।

তিনি বলেন, আমার বাবা আব্দুল হালিম চলতি বছরের জানুয়ারিতে মারা গেছেন। মা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। সময়-সুযোগ পেলেই আমি কবরস্থানে এসে বাবা-মাসহ অন্যান্য কবরবাসীর জন্য দোয়া করি।

ভোরবেলায় আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদুল আজহার দিনে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস বিতরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই সকালেই কবর জিয়ারত করে বাসায় ফিরে কোরবানি দেবো।

প্রতিবছরই ঈদের দিন রাজধানীর শুধু আজিমপুরের কবরস্থানেই নয়, বনানী ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানসহ বিভিন্ন কবরস্থানে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

নগরজীবনের ব্যস্ততায় সারাবছর অনেকেই কবর জিয়ারত করতে না পারলেও ঈদের দিনে প্রিয়জনদের স্মরণ করতে ছুটে আসেন।

jagonews24

বংশাল থেকে সপরিবারে এসেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমিন মিয়া। মায়ের কবরের পাশে তাকে দীর্ঘ সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

আলাপকালে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমরা বাবা-মা জীবিত থাকতে অনেক সময় তাদের মূল্য বুঝি না। কিন্তু তাদের হারানোর পর মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি, আমরা আসলে কী হারিয়েছি।

ঈদের আনন্দের দিনেও আজিমপুর কবরস্থানে ছিল এক অন্যরকম আবহ। স্বজন হারানোর বেদনা, স্মৃতির ভার আর প্রিয়জনদের জন্য নীরব প্রার্থনায় ভরা এক মানবিক সকাল। দিন শেষে মানুষগুলো আবার পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন, কিন্তু হৃদয়ের এক টুকরো অংশ যেন রয়ে যাবে এই কবরস্থানেই—প্রিয়জনদের স্মৃতি আর অশ্রুসিক্ত দোয়ার সঙ্গে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

সাইকেলে চড়তেন, ৫ আগস্টের তিন দিন পর প্রাডো গাড়িতে চড়েছেন

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত তাদের ঈদের সকাল

আপডেট টাইম : ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

বৃহস্পতিবার, সকাল সোয়া ৭টা। রাজধানীর আজিমপুর পুরাতন কবরস্থান। নিত্যদিনের ভোরের এ সময়টাতে সাধারণত কবরস্থানে নীরবতা বিরাজ করে। কিন্তু ঈদুল আজহার দিনে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। আজ ২৮ মে ঈদের দিন ভোর থেকেই বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কবর জিয়ারত করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ছুটে আসেন মানুষ।

কবরস্থানের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই চোখে পড়ে সারি সারি মানুষের ভিড়। কারও হাতে গোলাপের পাপড়ি কারও হাতে আতর। কেউ আবার প্রিয়জনের কবরের ওপর একটু পানি ছিটিয়ে দোয়া করছেন। কবরের পাশে বসা বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে শুরু করে শিশুরাও হাত তুলে মোনাজাত করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন কবরের সামনে স্বজনদের উপস্থিতি। কেউ একা এসেছেন আবার কেউবা এসেছেন স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে প্রিয়জনের কবর জিয়ারত করতে। তাদের কেউ নীরবে চোখ মুছছেন কেউবা বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। ঈদের আনন্দের মধ্যেও কবরস্থানজুড়ে ছিল এক ধরনের চাপা বেদনার আবহ।

jagonews24

তাদেরই একজন মোহাম্মদ রাসেল। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। ভোরে টঙ্গী থেকে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মা রাশিদা বেগমের কবর জিয়ারত করতে। সাত মাস আগে তার মা মারা যান।

আলাপকালে মোহাম্মদ রাসেল বলেন, সকাল থেকেই মায়ের জন্য মনটা ছটফট করছিল। তাই ভোরে উঠেই কবর জিয়ারত করতে সপরিবারে ছুটে এসেছি। ইচ্ছে ছিল কবরস্থান সংলগ্ন হানিফ মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করবো। একটুর জন্য সকাল সাতটার জামাত ধরতে পারিনি। এখন কবর জিয়ারত করে আটটার জামাতে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরবো।

টঙ্গীতে বাসা থাকা সত্ত্বেও কেন আজিমপুরে দাফন করা হয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আজিমপুর কবরস্থানে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষ কবর জিয়ারত করতে আসেন। তারা সব কবরবাসীর জন্য দোয়া করেন। তাছাড়া আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আশপাশের এলাকাতেই থাকেন। সবার পরামর্শেই এখানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

jagonews24

মাসুম বিল্লাহ নামে আরেক ব্যক্তি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে এসেছেন। তিনি জানান, কামরাঙ্গীরচরের একটি মসজিদে সকাল ৬টায় ঈদের নামাজ আদায় করে ছেলেকে নিয়ে আজিমপুরে উদ্দেশ্যে রওনা হন।

তিনি বলেন, আমার বাবা আব্দুল হালিম চলতি বছরের জানুয়ারিতে মারা গেছেন। মা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। সময়-সুযোগ পেলেই আমি কবরস্থানে এসে বাবা-মাসহ অন্যান্য কবরবাসীর জন্য দোয়া করি।

ভোরবেলায় আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদুল আজহার দিনে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস বিতরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই সকালেই কবর জিয়ারত করে বাসায় ফিরে কোরবানি দেবো।

প্রতিবছরই ঈদের দিন রাজধানীর শুধু আজিমপুরের কবরস্থানেই নয়, বনানী ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানসহ বিভিন্ন কবরস্থানে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

নগরজীবনের ব্যস্ততায় সারাবছর অনেকেই কবর জিয়ারত করতে না পারলেও ঈদের দিনে প্রিয়জনদের স্মরণ করতে ছুটে আসেন।

jagonews24

বংশাল থেকে সপরিবারে এসেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমিন মিয়া। মায়ের কবরের পাশে তাকে দীর্ঘ সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

আলাপকালে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমরা বাবা-মা জীবিত থাকতে অনেক সময় তাদের মূল্য বুঝি না। কিন্তু তাদের হারানোর পর মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি, আমরা আসলে কী হারিয়েছি।

ঈদের আনন্দের দিনেও আজিমপুর কবরস্থানে ছিল এক অন্যরকম আবহ। স্বজন হারানোর বেদনা, স্মৃতির ভার আর প্রিয়জনদের জন্য নীরব প্রার্থনায় ভরা এক মানবিক সকাল। দিন শেষে মানুষগুলো আবার পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন, কিন্তু হৃদয়ের এক টুকরো অংশ যেন রয়ে যাবে এই কবরস্থানেই—প্রিয়জনদের স্মৃতি আর অশ্রুসিক্ত দোয়ার সঙ্গে।