ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বিশ্ববাজারে দাপট, তবু কেন দেউলিয়া হচ্ছে চীনের সোলার কোম্পানিগুলো

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্বের জ্বালানি বাজার যখন টালমাটাল, তখন স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছিল চীনের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কোম্পানিগুলো বড় ধরনের মুনাফা লুটে নেবে। কারণ, বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা মোট সোলার প্যানেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি তৈরি হয় চীনে। তাদের এই বিপুল উৎপাদনের ওপর ভর করেই গত বছর বিশ্বজুড়ে কয়লার চেয়ে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু বিশ্বসেরা হওয়া সত্ত্বেও চীনের সৌরবিদ্যুৎ শিল্প এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত। যুদ্ধের কারণে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও তা এই খাতের ধস ঠেকাতে পারছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সোলার কোম্পানি তিনটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কম, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং পশ্চিমা বাজারে ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদিতা। ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া তীব্র দামের লড়াইয়ের কারণে সিংহভাগ কোম্পানিই এখন লোকসানে চলছে। বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির পর চীনের এই ‘বিশ্বের সোলার ফ্যাক্টরি’ এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

দেশের বাজারে চাহিদা কম ও বিদ্যুতের অপচয়

চীনের সোলার প্যানেলের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল তাদের নিজেদের দেশই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত দ্রুত সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে যে, দেশের মূল বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো এখন সেই চাপ সামলাতে পারছে না। চীনের ছাদ, পাহাড় আর মরুভূমি এখন ধূসর সিলিকনের চাদরে ঢাকা।

গ্রিডের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ শুধু দিনের বেলায় পাওয়া যায়, যার ফলে রাতে বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দিনে অতিরিক্ত উৎপাদন দেখা দিচ্ছে। ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের প্রায় নয় শতাংশই অপচয় হয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ছয় শতাংশ।

এই অপচয়ের কারণে নতুন করে সোলার প্যানেল স্থাপনের যৌক্তিকতা কমছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে চীনে সোলার প্যানেল স্থাপন ২৪ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গএনইএফের মতে, এর ফলে গত দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম বিশ্বব্যাপী সোলার প্যানেলের সামগ্রিক চাহিদা কমতে যাচ্ছে।

চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি

বিগত বছরগুলোতে দেদারসে বিনিয়োগের ফলে চীনের কোম্পানিগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা এখন এক হাজার গিগাবাইট ছাড়িয়ে গেছে। অথচ ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬০০ গিগাবাইট।

ব্লুমবার্গএনইএফের বিশ্লেষক জেনি চেজ বলেন, বিশ্বের এমন কোনো বড় দেশ আর বাকি নেই, যেখানে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল বসানো হয়নি। ফলে এই অতিরিক্ত উৎপাদন গিলে ফেলার মতো বাজার এখন আর নেই।

অতিরিক্ত উৎপাদন ঠেকাতে গত বছর কোম্পানিগুলো নিজেরা জোট বেঁধে কোটা নির্ধারণ এবং সর্বনিম্ন দাম (বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সেই চুক্তি টেকেনি। উল্টো সরকারি কর্মকর্তারা একে ‘কার্টেল’ বা সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

হাত গুটিয়ে নিয়েছে সরকার

একসময় চীনের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকার সোলার কোম্পানিগুলোকে সস্তা জমি ও সুদমুক্ত ঋণের বন্যায় ভাসিয়ে দিত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। গত বছরের জুন থেকে নতুন সৌর প্রকল্পগুলোকে আর ভর্তুকি বা নির্ধারিত চড়া মূল্যের গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে না; বরং তাদের বাজারের সাধারণ মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হচ্ছে।

এমনকি গত ১ এপ্রিল থেকে রপ্তানির ওপর ট্যাক্স রিফান্ড সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে বেইজিং। অনেক স্থানীয় সরকার এখন সোলার কোম্পানিগুলোর কাছে অতীতে দেওয়া লাখ লাখ ইউয়ান ভর্তুকি ফেরত চাচ্ছে। ব্যর্থ কোম্পানিগুলোকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে তারা দেউলিয়া হয়ে যেতে দেওয়াই শ্রেয় মনে করছে।

ভূরাজনীতি ও পশ্চিমা বাজারের ‘দেওয়াল’

চীনের সস্তা সোলার প্যানেল এখন নিজের সাফল্যেরই শিকার। পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর বিরুদ্ধে তীব্র ‘সংরক্ষণবাদী’ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ২০২২ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চীনা সোলার আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ ও উচ্চ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে।

পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, চীনের তৈরি যন্ত্রপাতি তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামো হ্যাক বা নজরদারির কাজে ব্যবহার হতে পারে। গত মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ঘোষণা করেছে, ইইউ-এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে তারা চীন থেকে ‘ইনভার্টার’ (সৌরবিদ্যুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ) নেওয়া বন্ধ করে দেবে।

ছাঁটাইয়ের হিড়িক ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ

এই ত্রিমুখী সংকটের ফল হয়েছে ভয়াবহ। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত চীনের ৪০টিরও বেশি সোলার কোম্পানি দেউলিয়া হয়েছে, অন্য কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হয়েছে অথবা শেয়ারবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের শীর্ষ পাঁচটি সোলার কোম্পানির মোট জনবলের এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে।

গবেষণা সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের জেসিকা জিন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ধসের ধাক্কাটা এখনো আসা বাকি। প্যানেলের দাম বাজারে সামান্য বাড়লেও তা উৎপাদন খরচের চেয়ে এখনো অনেক কম।’

লংজি, টংউই, জিংকো সোলার এবং ত্রিনা সোলারের মতো চীনের শীর্ষ জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অন্ধকার কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় হলো পশ্চিমা দেশগুলোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া অথবা ‘পেরোভস্কাইট’-এর মতো নতুন প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ, যা সোলার প্যানেলের কার্যক্ষমতা ৩০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাবে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই সুদিনের সূর্য দেখার জন্য চীনের কয়টি সোলার কোম্পানি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে?

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বিশ্ববাজারে দাপট, তবু কেন দেউলিয়া হচ্ছে চীনের সোলার কোম্পানিগুলো

আপডেট টাইম : ০৩:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্বের জ্বালানি বাজার যখন টালমাটাল, তখন স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছিল চীনের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কোম্পানিগুলো বড় ধরনের মুনাফা লুটে নেবে। কারণ, বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা মোট সোলার প্যানেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি তৈরি হয় চীনে। তাদের এই বিপুল উৎপাদনের ওপর ভর করেই গত বছর বিশ্বজুড়ে কয়লার চেয়ে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু বিশ্বসেরা হওয়া সত্ত্বেও চীনের সৌরবিদ্যুৎ শিল্প এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত। যুদ্ধের কারণে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও তা এই খাতের ধস ঠেকাতে পারছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সোলার কোম্পানি তিনটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কম, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং পশ্চিমা বাজারে ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদিতা। ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া তীব্র দামের লড়াইয়ের কারণে সিংহভাগ কোম্পানিই এখন লোকসানে চলছে। বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির পর চীনের এই ‘বিশ্বের সোলার ফ্যাক্টরি’ এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

দেশের বাজারে চাহিদা কম ও বিদ্যুতের অপচয়

চীনের সোলার প্যানেলের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল তাদের নিজেদের দেশই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত দ্রুত সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে যে, দেশের মূল বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো এখন সেই চাপ সামলাতে পারছে না। চীনের ছাদ, পাহাড় আর মরুভূমি এখন ধূসর সিলিকনের চাদরে ঢাকা।

গ্রিডের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ শুধু দিনের বেলায় পাওয়া যায়, যার ফলে রাতে বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দিনে অতিরিক্ত উৎপাদন দেখা দিচ্ছে। ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের প্রায় নয় শতাংশই অপচয় হয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ছয় শতাংশ।

এই অপচয়ের কারণে নতুন করে সোলার প্যানেল স্থাপনের যৌক্তিকতা কমছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে চীনে সোলার প্যানেল স্থাপন ২৪ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গএনইএফের মতে, এর ফলে গত দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম বিশ্বব্যাপী সোলার প্যানেলের সামগ্রিক চাহিদা কমতে যাচ্ছে।

চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি

বিগত বছরগুলোতে দেদারসে বিনিয়োগের ফলে চীনের কোম্পানিগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা এখন এক হাজার গিগাবাইট ছাড়িয়ে গেছে। অথচ ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬০০ গিগাবাইট।

ব্লুমবার্গএনইএফের বিশ্লেষক জেনি চেজ বলেন, বিশ্বের এমন কোনো বড় দেশ আর বাকি নেই, যেখানে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল বসানো হয়নি। ফলে এই অতিরিক্ত উৎপাদন গিলে ফেলার মতো বাজার এখন আর নেই।

অতিরিক্ত উৎপাদন ঠেকাতে গত বছর কোম্পানিগুলো নিজেরা জোট বেঁধে কোটা নির্ধারণ এবং সর্বনিম্ন দাম (বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সেই চুক্তি টেকেনি। উল্টো সরকারি কর্মকর্তারা একে ‘কার্টেল’ বা সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

হাত গুটিয়ে নিয়েছে সরকার

একসময় চীনের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকার সোলার কোম্পানিগুলোকে সস্তা জমি ও সুদমুক্ত ঋণের বন্যায় ভাসিয়ে দিত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। গত বছরের জুন থেকে নতুন সৌর প্রকল্পগুলোকে আর ভর্তুকি বা নির্ধারিত চড়া মূল্যের গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে না; বরং তাদের বাজারের সাধারণ মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হচ্ছে।

এমনকি গত ১ এপ্রিল থেকে রপ্তানির ওপর ট্যাক্স রিফান্ড সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে বেইজিং। অনেক স্থানীয় সরকার এখন সোলার কোম্পানিগুলোর কাছে অতীতে দেওয়া লাখ লাখ ইউয়ান ভর্তুকি ফেরত চাচ্ছে। ব্যর্থ কোম্পানিগুলোকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে তারা দেউলিয়া হয়ে যেতে দেওয়াই শ্রেয় মনে করছে।

ভূরাজনীতি ও পশ্চিমা বাজারের ‘দেওয়াল’

চীনের সস্তা সোলার প্যানেল এখন নিজের সাফল্যেরই শিকার। পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর বিরুদ্ধে তীব্র ‘সংরক্ষণবাদী’ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ২০২২ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চীনা সোলার আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ ও উচ্চ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে।

পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, চীনের তৈরি যন্ত্রপাতি তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামো হ্যাক বা নজরদারির কাজে ব্যবহার হতে পারে। গত মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ঘোষণা করেছে, ইইউ-এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে তারা চীন থেকে ‘ইনভার্টার’ (সৌরবিদ্যুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ) নেওয়া বন্ধ করে দেবে।

ছাঁটাইয়ের হিড়িক ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ

এই ত্রিমুখী সংকটের ফল হয়েছে ভয়াবহ। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত চীনের ৪০টিরও বেশি সোলার কোম্পানি দেউলিয়া হয়েছে, অন্য কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হয়েছে অথবা শেয়ারবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের শীর্ষ পাঁচটি সোলার কোম্পানির মোট জনবলের এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে।

গবেষণা সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের জেসিকা জিন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ধসের ধাক্কাটা এখনো আসা বাকি। প্যানেলের দাম বাজারে সামান্য বাড়লেও তা উৎপাদন খরচের চেয়ে এখনো অনেক কম।’

লংজি, টংউই, জিংকো সোলার এবং ত্রিনা সোলারের মতো চীনের শীর্ষ জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অন্ধকার কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় হলো পশ্চিমা দেশগুলোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া অথবা ‘পেরোভস্কাইট’-এর মতো নতুন প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ, যা সোলার প্যানেলের কার্যক্ষমতা ৩০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাবে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই সুদিনের সূর্য দেখার জন্য চীনের কয়টি সোলার কোম্পানি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে?

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট