ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিতে সাইকেলেই পাড়ি দিয়েছেন ১৭ হাজার কিলোমিটার

পৃথিবীর এক মাথা থেকে আরেক মাথায় সাইকেল চালিয়ে যাওয়া মানুষ আছেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকার বুক চিরে শুধু একটা ফুটবল দলকে সমর্থন জানাতে ছুটে যাওয়া—এ কাহিনি অন্য রকম।

সাড়ে নয় মাসে সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ। পার হয়েছেন ১৭টি দেশের সীমানা। লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে গ্যালারিতে বসে সমর্থন জোগানো।

মিগুয়েল সিলিও (৫৬), ইয়ামান্দু মার্তিনেস (৪৯) এবং ভিসেন্তে কোনকুলিনি (২৯)—আর্জেন্টাইন এই তিন সাইক্লিস্টের গল্পটা যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। আর্জেন্টিনার এন্ত্রে রিওস প্রদেশের গুয়ালেগুয়া শহর থেকে শুরু হয়েছিল তাঁদের এই স্বপ্নযাত্রা। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে আলবিসেলেস্তেদের ক্যাম্পের সামনে যখন তাঁরা এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবাই তাঁদের এমনভাবে বরণ করে নেন, যেন তাঁরা কোনো রকস্টার! বিশ্বখ্যাত ‘ট্যুর ডি ফ্রান্স’ জয়ের মতো করেই একে অপরের গায়ে শ্যাম্পেন ঢেলে মেতে ওঠেন উদযাপনে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাঁরা পুরো যাত্রার খুঁটিনাটি নিয়মিত তুলে ধরেছেন। তবে এই অবিশ্বাস্য যাত্রা তাঁদের জন্য মোটেও প্রথম নয়। দলনেতা মিগুয়েলের জন্য এটি হ্যাটট্রিক। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও তিনি দুই চাকার ওপর ভর করেই পৌঁছেছিলেন। মূলত কাতার বিশ্বকাপের পরই, অর্থাৎ সাড়ে তিন বছর আগে থেকেই শুরু হয় ২০২৬ সালের এই মিশন। লিওনেল স্কালোনির দল কোথায় খেলবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই গত বছরের ১৬ আগস্ট সাইকেল নিয়ে ঘর ছাড়েন তাঁরা।

পাগলাটে ও রোমাঞ্চকর ধারণার মূল হোতা মিগুয়েল সিলিও আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ক্লারিনকে তাঁদের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৬ আগস্ট রওনা হয়েছিলাম এবং আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল, যাতে প্রয়োজন হলে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও পৌঁছাতে পারি। যখন জানা গেল যে কানসাস আর্জেন্টিনার ভেন্যু হতে যাচ্ছে, তখন অতিরিক্ত সময়টুকু আমরা যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের শেষ মাসটি বেশ নিশ্চিন্তে এবং কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই উপভোগ করার জন্য ব্যবহার করেছি। অবশেষে আমরা পৌঁছে গেছি এবং আমরা অত্যন্ত খুশি।’

যাত্রাপথে দুবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েও দমে যাননি ৪৯ বছর বয়সী ইয়ামান্দু মার্টিনেজ। নিজের সাইকেলটি শক্ত করে ধরে রেখে তিনি বলেন, ‘২০২২ সাল থেকেই আমরা এই ভ্রমণটার পরিকল্পনা করছিলাম, যাতে আজকের এই দিনটিতে এখানে এসে পৌঁছাতে পারি।’

আর্জেন্টাইন কোচ স্কালোনির মতোই সাইকেল চালানোর প্রতি এক অদ্ভুত টান রয়েছে এই তিনজনের। তবে এই দীর্ঘ পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল জীবনহানির ঝুঁকি। ইকুয়েডরে পৌঁছানোর পর সেখানে একটি কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গা বেঁধে যায়, যার ফলে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে যাত্রা থামিয়ে বাধ্য হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। আবার কলম্বিয়ায় ভ্রমণের সময় ঠিক তাঁদের রুটেই একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরিত হয়। স্থানীয় প্রশাসনের কড়া নির্দেশে সে সময় একটি হোটেলে অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছিল এই তিন সাইক্লিস্টকে। তবে সব বাধা পেরিয়ে তাঁরা এগিয়ে গেছেন লক্ষ্যের দিকে।

ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় যেমন ছিল আতঙ্ক, তেমনি জমা হয়েছে দারুণ সব স্মৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে পৌঁছানোর পর বাস্কেটবল দুনিয়ার আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি মানু জিনোবিলির সঙ্গে দেখা হওয়াটা তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। তরুণ ভিসেন্তে কোনকুলিনি সেই মুহূর্তটি হাতড়ে বলছিলেন, ‘দুই বা তিন সপ্তাহ আগে আমরা মানু জিনোবিলির দেখা পাই, একটা বাস্কেটবল কোর্টে ওঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। আমরা এর আগে ওনাকে টেক্সট পাঠিয়েছিলাম এবং উনি সাড়াও দিয়েছিলেন। আমরা তাঁর এবং তাঁর মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা বসে কফি খেয়েছি। আমাদের এই সাইকেল যাত্রা এবং বাস্কেটবল থেকে অবসরের পর ওঁর জীবন কেমন কাটছে—এসব নিয়ে খুব সুন্দর একটা আড্ডা হয়েছিল।’

কানসাসে আর্জেন্টিনা দলের হোটেলের সামনে এখন এই তিন বীর। ইয়ামান্দু জানালেন, দলের অন্তত ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে অফিশিয়ালদের কেউ একজন এসে তাঁদের ক্যাম্পের ভেতরে স্বাগত জানাবেন। অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড়লেন না তিনি,‘আমরা জানি যে মেসি ইতিমধ্যেই (আর্জেন্টাইন ঐতিহ্যবাহী চা) “মাতে” খাওয়ার জন্য জল গরম করছেন।’

পাশে থাকা মিগুয়েল তখন হেসে ইয়ামান্দুর কথার রেশ ধরে মেসিকে এক মৃদু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমা করবেন, তবে আমরা ওনাকে মাতে তৈরি করা শেখাব। কারণ উনি মাঠের সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন, কিন্তু মাতে বানানোর ক্ষেত্রে আমাদের এন্ত্রে রিওসের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাঁর একটা ক্লাস নেওয়া উচিত।’

৫৬ বছর বয়সী মিগুয়েল শোনালেন তাঁর গত ২৫ বছরের সাইকেল ভ্রমণের মূল দর্শন। কেন এই বয়সেও এমন কঠিন চ্যালেঞ্জ নেন? মিগুয়েলের উত্তর ‘আমি এটা নিয়মিতই ভাবি, কারণ গত ২৫ বছর ধরে আমি সাইকেলে ভ্রমণ করছি। আমি এটা করি জীবনের নশ্বরতা বা শেষ হয়ে যাওয়ার চেতনা থেকে। আমি জানি যে আমাদের সময় খুব সীমিত, বয়সের সাথে সাথে স্বাস্থ্যও একসময় চলে যাবে। তাই যতক্ষণ পারছি, জীবনটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি। ৫৬ বছর বয়সে এসেও আমি যে আমার ভালোবাসার কাজটি এভাবে করে যেতে পারছি, তা আমাকে পরম আনন্দ দেয়।’

বিশ্বকাপের মাঠে আর্জেন্টিনা ট্রফি জিতবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মেসির দলকে ভালোবেসে সাড়ে ৯ মাসে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই তিন আর্জেন্টাইন যে ইতিমধ্যেই জীবনের এক পরম ট্রফি জিতে নিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিতে সাইকেলেই পাড়ি দিয়েছেন ১৭ হাজার কিলোমিটার

আপডেট টাইম : ০৪:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

পৃথিবীর এক মাথা থেকে আরেক মাথায় সাইকেল চালিয়ে যাওয়া মানুষ আছেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকার বুক চিরে শুধু একটা ফুটবল দলকে সমর্থন জানাতে ছুটে যাওয়া—এ কাহিনি অন্য রকম।

সাড়ে নয় মাসে সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ। পার হয়েছেন ১৭টি দেশের সীমানা। লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে গ্যালারিতে বসে সমর্থন জোগানো।

মিগুয়েল সিলিও (৫৬), ইয়ামান্দু মার্তিনেস (৪৯) এবং ভিসেন্তে কোনকুলিনি (২৯)—আর্জেন্টাইন এই তিন সাইক্লিস্টের গল্পটা যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। আর্জেন্টিনার এন্ত্রে রিওস প্রদেশের গুয়ালেগুয়া শহর থেকে শুরু হয়েছিল তাঁদের এই স্বপ্নযাত্রা। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে আলবিসেলেস্তেদের ক্যাম্পের সামনে যখন তাঁরা এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবাই তাঁদের এমনভাবে বরণ করে নেন, যেন তাঁরা কোনো রকস্টার! বিশ্বখ্যাত ‘ট্যুর ডি ফ্রান্স’ জয়ের মতো করেই একে অপরের গায়ে শ্যাম্পেন ঢেলে মেতে ওঠেন উদযাপনে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাঁরা পুরো যাত্রার খুঁটিনাটি নিয়মিত তুলে ধরেছেন। তবে এই অবিশ্বাস্য যাত্রা তাঁদের জন্য মোটেও প্রথম নয়। দলনেতা মিগুয়েলের জন্য এটি হ্যাটট্রিক। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও তিনি দুই চাকার ওপর ভর করেই পৌঁছেছিলেন। মূলত কাতার বিশ্বকাপের পরই, অর্থাৎ সাড়ে তিন বছর আগে থেকেই শুরু হয় ২০২৬ সালের এই মিশন। লিওনেল স্কালোনির দল কোথায় খেলবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই গত বছরের ১৬ আগস্ট সাইকেল নিয়ে ঘর ছাড়েন তাঁরা।

পাগলাটে ও রোমাঞ্চকর ধারণার মূল হোতা মিগুয়েল সিলিও আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ক্লারিনকে তাঁদের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৬ আগস্ট রওনা হয়েছিলাম এবং আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল, যাতে প্রয়োজন হলে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও পৌঁছাতে পারি। যখন জানা গেল যে কানসাস আর্জেন্টিনার ভেন্যু হতে যাচ্ছে, তখন অতিরিক্ত সময়টুকু আমরা যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের শেষ মাসটি বেশ নিশ্চিন্তে এবং কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই উপভোগ করার জন্য ব্যবহার করেছি। অবশেষে আমরা পৌঁছে গেছি এবং আমরা অত্যন্ত খুশি।’

যাত্রাপথে দুবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েও দমে যাননি ৪৯ বছর বয়সী ইয়ামান্দু মার্টিনেজ। নিজের সাইকেলটি শক্ত করে ধরে রেখে তিনি বলেন, ‘২০২২ সাল থেকেই আমরা এই ভ্রমণটার পরিকল্পনা করছিলাম, যাতে আজকের এই দিনটিতে এখানে এসে পৌঁছাতে পারি।’

আর্জেন্টাইন কোচ স্কালোনির মতোই সাইকেল চালানোর প্রতি এক অদ্ভুত টান রয়েছে এই তিনজনের। তবে এই দীর্ঘ পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল জীবনহানির ঝুঁকি। ইকুয়েডরে পৌঁছানোর পর সেখানে একটি কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গা বেঁধে যায়, যার ফলে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে যাত্রা থামিয়ে বাধ্য হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। আবার কলম্বিয়ায় ভ্রমণের সময় ঠিক তাঁদের রুটেই একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরিত হয়। স্থানীয় প্রশাসনের কড়া নির্দেশে সে সময় একটি হোটেলে অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছিল এই তিন সাইক্লিস্টকে। তবে সব বাধা পেরিয়ে তাঁরা এগিয়ে গেছেন লক্ষ্যের দিকে।

ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় যেমন ছিল আতঙ্ক, তেমনি জমা হয়েছে দারুণ সব স্মৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে পৌঁছানোর পর বাস্কেটবল দুনিয়ার আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি মানু জিনোবিলির সঙ্গে দেখা হওয়াটা তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। তরুণ ভিসেন্তে কোনকুলিনি সেই মুহূর্তটি হাতড়ে বলছিলেন, ‘দুই বা তিন সপ্তাহ আগে আমরা মানু জিনোবিলির দেখা পাই, একটা বাস্কেটবল কোর্টে ওঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। আমরা এর আগে ওনাকে টেক্সট পাঠিয়েছিলাম এবং উনি সাড়াও দিয়েছিলেন। আমরা তাঁর এবং তাঁর মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা বসে কফি খেয়েছি। আমাদের এই সাইকেল যাত্রা এবং বাস্কেটবল থেকে অবসরের পর ওঁর জীবন কেমন কাটছে—এসব নিয়ে খুব সুন্দর একটা আড্ডা হয়েছিল।’

কানসাসে আর্জেন্টিনা দলের হোটেলের সামনে এখন এই তিন বীর। ইয়ামান্দু জানালেন, দলের অন্তত ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে অফিশিয়ালদের কেউ একজন এসে তাঁদের ক্যাম্পের ভেতরে স্বাগত জানাবেন। অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড়লেন না তিনি,‘আমরা জানি যে মেসি ইতিমধ্যেই (আর্জেন্টাইন ঐতিহ্যবাহী চা) “মাতে” খাওয়ার জন্য জল গরম করছেন।’

পাশে থাকা মিগুয়েল তখন হেসে ইয়ামান্দুর কথার রেশ ধরে মেসিকে এক মৃদু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমা করবেন, তবে আমরা ওনাকে মাতে তৈরি করা শেখাব। কারণ উনি মাঠের সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন, কিন্তু মাতে বানানোর ক্ষেত্রে আমাদের এন্ত্রে রিওসের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাঁর একটা ক্লাস নেওয়া উচিত।’

৫৬ বছর বয়সী মিগুয়েল শোনালেন তাঁর গত ২৫ বছরের সাইকেল ভ্রমণের মূল দর্শন। কেন এই বয়সেও এমন কঠিন চ্যালেঞ্জ নেন? মিগুয়েলের উত্তর ‘আমি এটা নিয়মিতই ভাবি, কারণ গত ২৫ বছর ধরে আমি সাইকেলে ভ্রমণ করছি। আমি এটা করি জীবনের নশ্বরতা বা শেষ হয়ে যাওয়ার চেতনা থেকে। আমি জানি যে আমাদের সময় খুব সীমিত, বয়সের সাথে সাথে স্বাস্থ্যও একসময় চলে যাবে। তাই যতক্ষণ পারছি, জীবনটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি। ৫৬ বছর বয়সে এসেও আমি যে আমার ভালোবাসার কাজটি এভাবে করে যেতে পারছি, তা আমাকে পরম আনন্দ দেয়।’

বিশ্বকাপের মাঠে আর্জেন্টিনা ট্রফি জিতবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মেসির দলকে ভালোবেসে সাড়ে ৯ মাসে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই তিন আর্জেন্টাইন যে ইতিমধ্যেই জীবনের এক পরম ট্রফি জিতে নিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।