ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জোরাল হচ্ছে। বাজেটকে ঘিরে যখন রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।

তাদের মতে, এলডিসি উত্তরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বাস্তবতায় শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। শিক্ষা খাতকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার এখনই উপযুক্ত সময়।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, ‘আগামী দিনের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে। ফলে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’

তার মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি ছাড়া বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শুধু সনদ প্রদান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

তার মতে, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পখাত অংশীদারিত্ব জোরদার করা জরুরি।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, ‘শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সেই কারণেই আমি মনে করি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করবে। এ কারণে সিএসইআরের বাজেট প্রস্তাবনায় শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বর্তমান প্রায় ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে এআই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।’

তার মতে, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধিকতর একাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের আওতায় এনে গবেষণাভিত্তিক অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করতে হবে। কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে।

সিএসইআরের প্রস্তাবে সাকিফ শামীম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা সাধারণত কয়েকটি পরিচিত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাজস্ব আয় কত হবে, মূল্যস্ফীতি কতটা কমবে, কোন খাতে কত বরাদ্দ বাড়বে, নতুন কর আরোপ হবে কি না কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কী ধরনের প্রণোদনা আসবে—এসব প্রশ্নই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাজেট নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত অন্য। তা হলো, আমরা কি এমন একটি অর্থনীতি নির্মাণ করছি, যা আগামী বিশ বছর টিকে থাকতে পারবে?’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের সময় অতিক্রম করছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, পরিবর্তিত শ্রমবাজার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা আমাদের সামনে একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। এ বাস্তবতায় উন্নয়নের পুরোনো সূত্রগুলো আর যথেষ্ট নয়। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, কেবল শিল্পায়ন কিংবা কেবল রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী দিনের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’

সাকিফ শামীম বলেন, ‘ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে মূলত জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি-সক্ষম মানব সম্পদকে ঘিরে। সেই কারণেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য। ভাষা শিক্ষাকে তাই কেবলমাত্র একটি একাডেমিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করে একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষা খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বরাদ্দ এবং ফলাফলের মধ্যে সংযোগের ঘাটতি। তাই ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং, ডিজিটাল মনিটরিং, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। শিক্ষা খাতে ব্যয় করা প্রতিটি টাকার বিপরীতে কী ধরনের দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুফল তৈরি হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আগামী দুই দশকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ধারিত হবে আজকের শিক্ষা বিনিয়োগের মাধ্যমে। অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ, যেখানে সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ। তাই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতকে একটি ‘ব্যয় খাত’ হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি, জাতীয় উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ হিসেবে ও বিবেচনা করার সময় এসেছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা

আপডেট টাইম : ০৫:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জোরাল হচ্ছে। বাজেটকে ঘিরে যখন রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।

তাদের মতে, এলডিসি উত্তরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বাস্তবতায় শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। শিক্ষা খাতকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার এখনই উপযুক্ত সময়।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, ‘আগামী দিনের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে। ফলে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’

তার মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি ছাড়া বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শুধু সনদ প্রদান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

তার মতে, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পখাত অংশীদারিত্ব জোরদার করা জরুরি।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, ‘শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সেই কারণেই আমি মনে করি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করবে। এ কারণে সিএসইআরের বাজেট প্রস্তাবনায় শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বর্তমান প্রায় ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে এআই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।’

তার মতে, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধিকতর একাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের আওতায় এনে গবেষণাভিত্তিক অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করতে হবে। কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে।

সিএসইআরের প্রস্তাবে সাকিফ শামীম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা সাধারণত কয়েকটি পরিচিত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাজস্ব আয় কত হবে, মূল্যস্ফীতি কতটা কমবে, কোন খাতে কত বরাদ্দ বাড়বে, নতুন কর আরোপ হবে কি না কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কী ধরনের প্রণোদনা আসবে—এসব প্রশ্নই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাজেট নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত অন্য। তা হলো, আমরা কি এমন একটি অর্থনীতি নির্মাণ করছি, যা আগামী বিশ বছর টিকে থাকতে পারবে?’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের সময় অতিক্রম করছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, পরিবর্তিত শ্রমবাজার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা আমাদের সামনে একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। এ বাস্তবতায় উন্নয়নের পুরোনো সূত্রগুলো আর যথেষ্ট নয়। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, কেবল শিল্পায়ন কিংবা কেবল রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী দিনের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’

সাকিফ শামীম বলেন, ‘ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে মূলত জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি-সক্ষম মানব সম্পদকে ঘিরে। সেই কারণেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য। ভাষা শিক্ষাকে তাই কেবলমাত্র একটি একাডেমিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করে একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষা খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বরাদ্দ এবং ফলাফলের মধ্যে সংযোগের ঘাটতি। তাই ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং, ডিজিটাল মনিটরিং, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। শিক্ষা খাতে ব্যয় করা প্রতিটি টাকার বিপরীতে কী ধরনের দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুফল তৈরি হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আগামী দুই দশকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ধারিত হবে আজকের শিক্ষা বিনিয়োগের মাধ্যমে। অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ, যেখানে সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ। তাই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতকে একটি ‘ব্যয় খাত’ হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি, জাতীয় উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ হিসেবে ও বিবেচনা করার সময় এসেছে।