ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিক মেসির রঙিন দিন

২০০৬ সালের ১৬ জুন। ঠিক ২০ বছর আগে এই তারিখেই ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেছিলেন এক তরুণ লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিতিনি। সময়ের চাকা ঘুরে ২০ বছর পর, ২০২৬-এর ১৬ জুনেই আরেকটি বিশ্বকাপ ম্যাচে ইতিহাস গড়লেন তিনি। মাঝের এই ৭ হাজার ৩০৫ দিন যেন মেসির জাদুতে কোনো ছাপই ফেলতে পারেনি। ৩৯ বছর ছুঁইছুঁই এই কিংবদন্তি আলজেরিয়ার বিপক্ষে জাদুকরী এক হ্যাটট্রিক করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিলেন আরও একবার।

এই হ্যাটট্রিকের মহাশেষ লক্ষ্য ছিল একটি অনন্য রেকর্ড। বিশ্বকাপে এখন মেসির মোট গোল সংখ্যা ১৬। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোসøাভ ক্লোসার ঐতিহাসিক রেকর্ড স্পর্শ করলেন।

কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ম্যাচের আগে বাতাসে গুঞ্জন ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ১৪ গোল নিয়ে বিশ্বকাপে মেসিকে ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু কিংবদন্তিরা যে মাঠেই জবাব দিতে ভালোবাসেন! মেসি যেন অলিখিতভাবে জানিয়ে দিলেন ‘তুমি দুটি করেছ, তো আমি তিনটি করব’। ৩-০ ব্যবধানের এই জয়ে আলজেরিয়াকে যেমন উড়িয়ে দিল আর্জেন্টিনা, তেমনি মেসি নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়।

শুধু তা-ই নয়, ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে মাঠে নামার অবিস্মরণীয় রেকর্ডও এখন শুধুই মেসির।

স্কালোনির ‘স্কালোনেতা’ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দ্বিতীয় শিরোপার মাঠে নামলেও আলজেরিয়ার বিপক্ষে শুরুটা অতটা সহজ ছিল না। প্রথমার্ধে আলজেরিয়া যখন বেশ চেপে ধরেছিল, তখনই দৃশ্যপটে হাজির আর্জেন্টিনার ত্রাতা মেসি। ম্যাচের শুরুর দিকে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছ থেকে চার ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে মনতিয়েলকে বল বাড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল মেসি আজ ক্ষুধার্ত।

এরপর মাঝমাঠের চালিকাশক্তি রদ্রিগো ডি পলের দুর্দান্ত এক পাস থেকে বল পেয়ে যেন প্লে-স্টেশনের মতো ক্ষিপ্রতায় ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জোরালো শটে আলজেরিয়ার জাল কাঁপান মেসি। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক, ফ্রান্সের কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানপুত্র লুকার কিছুই করার ছিল না। গ্যালারিতে থাকা ৫০ হাজারেরও বেশি আকাশি-সাদা সমর্থক তখন ‘মেসি… মেসি…’ চিৎকারে প্রকম্পিত করে তোলেন স্টেডিয়াম।

ম্যাচের ১৭ মিনিটে মেসির সেই প্রথম গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় আর্জেন্টিনা। স্কালোনি একের পর এক পরিবর্তন এনে উইংয়ে নিকোলাস গঞ্জালেস এবং স্ট্রাইকার পজিশনে হুলিয়ান আলভারেজকে মাঠে নামান। গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলজেরিয়ার ডিফেন্স ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি যে এখনো কতটা চটপটে, তা প্রমাণ হলো ৬০ মিনিটে। ম্যাক অ্যালিস্টারের এক জোরালো শট লুকা জিদান পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে না পারলে বাজপাখির মতো ছুটে গিয়ে নিখুঁত ট্যাপ-ইনে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন মেসি।

৭৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় নিকোলাস গঞ্জালেজের সঙ্গে ওয়ান-টু পাসের দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে বক্সের কোণ ঘেঁষে বাঁ পায়ের ট্রেডমার্ক সাইডফুট শটে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। দুই হাত উঁচিয়ে, চোখ দুটো আকাশের দিকে তুলে এবং হাজার হাজার আর্জেন্টাইন ভক্তের মুখে নিজের নাম শুনে মেসি সেই মুহূর্তটি উপভোগ করলেন। মেসির মতো কিংবদন্তির জন্যও এটি বিশেষ কিছু মনে হচ্ছিল।

২০ বছর আগে যখন মেসি প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছিলেন, তখন গ্যালারিতে তার সন্তানরা ছিল না। মঙ্গলবার ভিআইপি বক্সে বসে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোসহ তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও চিরো বাবার এই কীর্তি সরাসরি উদযাপন করেছে। মেসিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি; প্রথম গোলের পর তার চোখ কিছুটা অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল, আর তৃতীয় গোলের পর মেতে ওঠেন চিরচেনা সেই ব্যাকওয়ার্ড নাচে। বরাবরের মতো গোলগুলো তিনি উৎসর্গ করেছেন তার প্রয়াত নানি সেলিয়াকে।

৮০ মিনিট পর্যন্ত মাঠে থেকে দলের জয় নিশ্চিত করার পর অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড নিকোলাস ওটামেন্দির হাতে তুলে দিয়ে মাঠ ছাড়েন এই জাদুকর।

টেনিস কিংবদন্তি রাফা নাদালের একটি তথ্যচিত্রের কথা উল্লেখ করে মেসি পরে জানিয়েছেন, নাদালের মতোই মাঠে নামলে নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেওয়ার তাড়না অনুভব করেন তিনি। যতদিন শরীর সায় দেবে, এই ‘শেষ নাচটা’ এভাবেই নেচে যেতে চান ফুটবল ঈশ্বর।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিক মেসির রঙিন দিন

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

২০০৬ সালের ১৬ জুন। ঠিক ২০ বছর আগে এই তারিখেই ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেছিলেন এক তরুণ লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিতিনি। সময়ের চাকা ঘুরে ২০ বছর পর, ২০২৬-এর ১৬ জুনেই আরেকটি বিশ্বকাপ ম্যাচে ইতিহাস গড়লেন তিনি। মাঝের এই ৭ হাজার ৩০৫ দিন যেন মেসির জাদুতে কোনো ছাপই ফেলতে পারেনি। ৩৯ বছর ছুঁইছুঁই এই কিংবদন্তি আলজেরিয়ার বিপক্ষে জাদুকরী এক হ্যাটট্রিক করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিলেন আরও একবার।

এই হ্যাটট্রিকের মহাশেষ লক্ষ্য ছিল একটি অনন্য রেকর্ড। বিশ্বকাপে এখন মেসির মোট গোল সংখ্যা ১৬। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোসøাভ ক্লোসার ঐতিহাসিক রেকর্ড স্পর্শ করলেন।

কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ম্যাচের আগে বাতাসে গুঞ্জন ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ১৪ গোল নিয়ে বিশ্বকাপে মেসিকে ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু কিংবদন্তিরা যে মাঠেই জবাব দিতে ভালোবাসেন! মেসি যেন অলিখিতভাবে জানিয়ে দিলেন ‘তুমি দুটি করেছ, তো আমি তিনটি করব’। ৩-০ ব্যবধানের এই জয়ে আলজেরিয়াকে যেমন উড়িয়ে দিল আর্জেন্টিনা, তেমনি মেসি নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়।

শুধু তা-ই নয়, ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে মাঠে নামার অবিস্মরণীয় রেকর্ডও এখন শুধুই মেসির।

স্কালোনির ‘স্কালোনেতা’ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দ্বিতীয় শিরোপার মাঠে নামলেও আলজেরিয়ার বিপক্ষে শুরুটা অতটা সহজ ছিল না। প্রথমার্ধে আলজেরিয়া যখন বেশ চেপে ধরেছিল, তখনই দৃশ্যপটে হাজির আর্জেন্টিনার ত্রাতা মেসি। ম্যাচের শুরুর দিকে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছ থেকে চার ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে মনতিয়েলকে বল বাড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল মেসি আজ ক্ষুধার্ত।

এরপর মাঝমাঠের চালিকাশক্তি রদ্রিগো ডি পলের দুর্দান্ত এক পাস থেকে বল পেয়ে যেন প্লে-স্টেশনের মতো ক্ষিপ্রতায় ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জোরালো শটে আলজেরিয়ার জাল কাঁপান মেসি। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক, ফ্রান্সের কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানপুত্র লুকার কিছুই করার ছিল না। গ্যালারিতে থাকা ৫০ হাজারেরও বেশি আকাশি-সাদা সমর্থক তখন ‘মেসি… মেসি…’ চিৎকারে প্রকম্পিত করে তোলেন স্টেডিয়াম।

ম্যাচের ১৭ মিনিটে মেসির সেই প্রথম গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় আর্জেন্টিনা। স্কালোনি একের পর এক পরিবর্তন এনে উইংয়ে নিকোলাস গঞ্জালেস এবং স্ট্রাইকার পজিশনে হুলিয়ান আলভারেজকে মাঠে নামান। গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলজেরিয়ার ডিফেন্স ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি যে এখনো কতটা চটপটে, তা প্রমাণ হলো ৬০ মিনিটে। ম্যাক অ্যালিস্টারের এক জোরালো শট লুকা জিদান পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে না পারলে বাজপাখির মতো ছুটে গিয়ে নিখুঁত ট্যাপ-ইনে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন মেসি।

৭৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় নিকোলাস গঞ্জালেজের সঙ্গে ওয়ান-টু পাসের দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে বক্সের কোণ ঘেঁষে বাঁ পায়ের ট্রেডমার্ক সাইডফুট শটে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। দুই হাত উঁচিয়ে, চোখ দুটো আকাশের দিকে তুলে এবং হাজার হাজার আর্জেন্টাইন ভক্তের মুখে নিজের নাম শুনে মেসি সেই মুহূর্তটি উপভোগ করলেন। মেসির মতো কিংবদন্তির জন্যও এটি বিশেষ কিছু মনে হচ্ছিল।

২০ বছর আগে যখন মেসি প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছিলেন, তখন গ্যালারিতে তার সন্তানরা ছিল না। মঙ্গলবার ভিআইপি বক্সে বসে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোসহ তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও চিরো বাবার এই কীর্তি সরাসরি উদযাপন করেছে। মেসিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি; প্রথম গোলের পর তার চোখ কিছুটা অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল, আর তৃতীয় গোলের পর মেতে ওঠেন চিরচেনা সেই ব্যাকওয়ার্ড নাচে। বরাবরের মতো গোলগুলো তিনি উৎসর্গ করেছেন তার প্রয়াত নানি সেলিয়াকে।

৮০ মিনিট পর্যন্ত মাঠে থেকে দলের জয় নিশ্চিত করার পর অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড নিকোলাস ওটামেন্দির হাতে তুলে দিয়ে মাঠ ছাড়েন এই জাদুকর।

টেনিস কিংবদন্তি রাফা নাদালের একটি তথ্যচিত্রের কথা উল্লেখ করে মেসি পরে জানিয়েছেন, নাদালের মতোই মাঠে নামলে নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেওয়ার তাড়না অনুভব করেন তিনি। যতদিন শরীর সায় দেবে, এই ‘শেষ নাচটা’ এভাবেই নেচে যেতে চান ফুটবল ঈশ্বর।