ঢাকা , শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
হজ শেষে ফিরেছেন ৬৬১৭৪ বাংলাদেশি, মারা গেছেন ৫৫ গুমের শিকার পরিবারের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করা হবে: মির্জা ফখরুল বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সেই মিন্নির কারাজীবনের অজানা অধ্যায় সামনে এলো আবাসিক ভবন থেকে নারী চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার শেখ মুজিব ও হাসিনা বন্দনায় সরব ‘ফাটাকেস্ট’ হতে চাওয়া সিলেটের সেই ডিসির অন্দরমহল মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে ঐকমত্য চীন-মালয়েশিয়া একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা হোমনায় পাশাপাশি ৪ কবরে দাফন, বাকরুদ্ধ একমাত্র জীবিত সন্তান সিফাত এনসিপির দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিএনপিতে যোগদান

শেখ মুজিব ও হাসিনা বন্দনায় সরব ‘ফাটাকেস্ট’ হতে চাওয়া সিলেটের সেই ডিসির অন্দরমহল

সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারের ডেক সিলগালা করার ৩ দিনের মাথায় প্রত্যাহার হওয়া ডিসি সারওয়ার আলমের অন্দরমহলের খবর নিয়ে আলোচনায় সরব সোস্যাল মিডিয়া, টকশো অ্যাক্টিভিস্ট, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মহল। ফিল্মের ফাটাকেস্ট চরিত্রের মতো জনপ্রিয় অভিযানের পেছনে তার আসল উদ্দেশ্য নিয়েও কথা উঠছে। স্বচ্ছতার নামে শাহজালালের মাজারের ৭০০ বছরের ঐতিহ্য ও প্রথাকে তাড়াহুড়ো করে ডিসির ক্ষমতাবলে তছনছ করার পেছনে রাজনৈতিক কোন এজেন্ডা আছে কি না এমন জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে।

শাহজালালের মাজারের দানের টাকার হিসাব নিকাশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে মাজারের ৩টি ডেক ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হলেও ডিসি অফিসের এলআর ফান্ড, কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, সারওয়ার আলমের উপর ঋণের শর্তভঙ্গ করার দায়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিপুল জরিমানার বিষয়টি এখন সিলেটে আলোচিত। এছাড়া শাহজালালের মাজারে তাড়াহুড়ো করে নিজে উপস্থিত থেকে দানের টাকা গণনা ও ডিসির পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা মাজারে প্রদানকে ডিসির ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সিলেটের সমন্বয়ক আব্দুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সদ্য বিদায়ী ডিসি মাজার বিরোধী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়ে বদলি হন। যেখানে মাজারের দানের টাকা গুনে গুনে ডিসি দেখালেন প্রচুর টাকা আসে, সেখানে যাওয়ার আগে মাজার তহবিলে ৫ লাখ টাকা দিয়ে রীতিমতো পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজি করলেন।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভেজাল বিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে এই সারওয়ার আলমের জনপ্রিয়তার (!) অভিষেক হয়। সে সময় আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হতে গিয়ে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনাকে বন্দনা করে ফেইসবুকেও নিয়মিত পোস্ট করতেন তিনি। ২০১৮ সালে রাজনৈতিক বিরোধের সূত্রে আওয়ামীলীগ প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ রাখার ভূয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ১৫ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করায়। আর এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্টেট এই সারওয়ার আলম। আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই সারওয়ার আলম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে একরকম তছনছ করে দেন। অবশ্য আওয়ামীলীগের ক্ষমতার শেষের দিকে রহস্যজনক কারণে সারওয়ার আলমের প্রমোশন আটকে দেওয়া হয়।

এদিকে স্বচ্ছতার জন্য বিভিন্ন অভিযান ও মাজারের ডেক সিলগালা করলেও খোদ সারওয়ার আলমের বিরুদ্ধে গাড়ি ক্রয়ে শর্তভঙ্গ করায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে ৬ লক্ষ ২৫ হাজার টাকারও বেশি জরিমানা করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি সেবা শাখা থেকে প্রাধিকারপ্রপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ ও গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা অনুযায়ী এই জরিমানা করা হয়। চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি সেবা শাখার স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সিলেট থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এই জরিমানা আদায় করা হয়েছিল কি না তা জানা যায়নি।

এছাড়া জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে সদ্য বিদায়ী ডিসি ৫ লাখ টাকা দান করার পর ডিসি অফিসের ‘এলআর ফান্ড’ (যা বেসরকারি খাত থেকে আসে) এর টাকার স্বচ্ছতা ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে। ২৪ জুন বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক বলেন, ‘এটা দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিস। এটি আমাদের নজরে আছে। তবে যা করার আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। পরিবর্তন করতে হলে সময় দিতে হবে। হুট করে কিছু করা যাবে না।’

বদলি হওয়া ডিসি সারওয়ার আলমের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের ‘মর্জি’ বুঝে চলা এমন কথা প্রচলিত আছে। এর সত্যতা খোঁজতে ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখে সারওয়ার আলমের ফেইসবুক পোস্টের একটি স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে আসে। যেখানে তিনি শেখ হাসিনার প্রশংসা করে লিখেন ‘আমাদের প্রেরণার বাতিঘর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার দীঘায়ূ ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। ধন্য পিতার ধন্য কন্যা আপনি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকুন হাজার বছর। আপনার নেতৃত্বে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে উন্নত বাংলাদেশ ইনশাআল্লাহ।’ এর আগে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই ‘আমি হতবাক !!!’

শিরোনামে তিনি শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে শিশুদের ছবি আঁকা প্রসঙ্গে ভিন্নধর্মী একটি পোস্টে লিখেন ‘আমরা ভাবি না পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রীর মতো শিশুরা যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বচক্ষে না দেখে মানসপটে ধারণ করে তুলির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সে সেমস্থ শিশুরা আমাদের মতো তথাকথিত সুবিধাবাদীদের চেয়ে কত পবিত্র এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সত্যিকারভাবে অনুপ্রাণিত।’

এদিকে গত ১৭ জুন মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লিখেন ‘পূণ্যভূমি সিলেটে স্বাগতম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। একজন অসাধারণ মানুষের সাধারণ চলাফেরা। আপনার জন্য শুভকামনা। এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।’

৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন সারওয়ার আলম। ইন্টেরিম সরকারের আমলে সিলেটের ভোলাগঞ্জের পাথরকান্ডে গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসাবে নিয়োগ পান তিনি। ছাত্রাবস্থায় একটি ইসলামি সংগঠনের হল সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেলেও এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। কিন্তু হযরত শাহজালালের মাজারে ডিসি সারওয়ারের নাটকীয়তায় তার গোপন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়েছে। এদিকে ডিসিকে প্রত্যাহারের প্রতিবাদে ও তাকে পূণর্বহালের দাবিতে সিলেটে মাজার সংস্কৃতি বিরোধী মতের মানুষ মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। ডিসিকে শ্লোগান দিয়ে তার অফিস পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। ডিসি তাদের সাথে করমর্দন করেছেন ও চক্ষুসজল হয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে তাহলে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডে পেছনে রেখে ডিসি মাজারে ‘প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ’ করতে নেমেছিলেন।

একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রাক্ষালে ডিসি সারওয়ারের এ ধরনের স্পর্শকাতর পদক্ষেপ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। মাজারের ডেগ সিলগালার পরপর তাকে প্রত্যাহার করা না হলে সিলেটের মাজার সংস্কৃতির পক্ষের লোকজনের সাথে ডিসির পক্ষে বিক্ষোভ মিছিলে নামা লোকদের বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটতে পারতো। এ থেকে একপক্ষের রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।

বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে মাজার কর্তৃপক্ষ, ওলি আউলিয়াভক্ত মানুষ ও বিপক্ষের লোকজন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন। মাজারের পক্ষের লোকেরা ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাজারে ডিসির এই প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে সুনির্দিষ্ট একটি দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ মনে করছেন। মাজারপন্থীদের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ উৎপাদনের উপলক্ষ তৈরি করতে পরিকল্পিতভাবে প্রশাসনিক এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

সিলেটের কবি ও সাংবাদিক কবির য়াহমদ তার ফেইসবুক পোস্টের দীর্ঘ লেখার এক জায়গায় লিখেন- ‘মাজারপুজা ও শরীয়ত বিরোধী’ যে চিরাচরিত প্রোপাগান্ডা, তা এখনও সমানভাবে চলমান থাকলেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা। তা হলো- মাজারের সংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে চরম দুর্নীতিগ্রস্থ এবং তারা মানুষের মানত ও দানের টাকার ছয়-নয় করে। এই অর্থ আত্মসাতের ন্যারেটিভটি আগে আড়ালে-আবডালে উচ্চারিত হলেও তা প্রমাণ করতে হলে যে মাজারে গিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেই সুযোগ এতাদিন মাজার বিদ্ধেষীরা করে উঠতে পারেনি’।

উল্লেখ্য, এই মাজারের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের রায় থাকার পরও ডিসি কেন এককভাবে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে গেলেন তা বোধগম্য নয় বলে মাজার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। ডিসির এই দ্রুত পদক্ষেপের ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গত বুধবার (২৪ জুন) সিলেটে সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আর্থিক হিসাব নিকাশে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগে কিছুটা তাড়াহুড়ো হয়েছে। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাই করা হয়নি। এটা ৭০০ বছরের একটি ট্রাডিশন।’ এদিকে ২৬ জুন শুক্রবার শাহজালালের মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করেছেন। মন্ত্রী নিজে এই কমিটির প্রধান হিসাবে দায়িত্বে আছেন। এই কমিটি একমাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি ‘যৌক্তিক পদ্ধতি’ নির্ধারণ করবে।

শাহজালালের মাজারের ডেক সিলগালা ইস্যুতে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবী ব্রাত্য রাইসু লিখেন, ‘সারওয়ার আলম সাহেবকে প্রশংসা করার আগে ১ মিনিট থামতে হবে। ভাবতে হবে. যিনি মাজার ধ্বংস ঠেকানোর ব্যাপারে কী কী কাজ করেছিলেন? যদি কিছু না কইরা থাকেন, তাইলে আরো ১ মিনিট থামতে হবেভ ভাবতে হবে, মাজার ধ্বংস যারা করছেন তাদের অপরাধকে সারোয়ার আলমের কারণে তেমন অপরাধ না বইলা মনে হইতেছে কি না? যদি তেমন মনে হয়, তবে সারোয়ার আলমের সাম্প্রতিক মাজার বিয়য়ক অ্যাকশন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতেছে, তিনি চান বা না চান। এই পর্যায়ে আইসা ১ মিনিট নীরবতা পালন করতে হব। কেন সেইটা বলবো না।’

সাংবাদিক ও কথা সাহিত্যিক মাহবুব মোর্শেদ লিখেন, মাজার ভাঙার সময় বড়কর্তাদের এগিয়ে আসতে দেখা না গেলেও মাজারের দানবাক্সের হিসাব নিতে দেখা যায় তাদের আগ্রহের শেষ নাই।’

এ ব্যাপারে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও টকশো আলোচক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সারওয়ার আলম সাহেব ট্রাংক কিনলেন। সিসি ক্যামেরা ফিট করলেন। টাকা কে দিলো? এই অর্থ কি সরকারি নাকি স্থানীয়ভাবে আহরিত এল আর ফান্ড? এই অর্থের আয় ব্যয় কি অডিট হয়? এই ফান্ডে যারা টাকা দেন তারা কি সবাই সৎ পথে আয় করে?

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

হজ শেষে ফিরেছেন ৬৬১৭৪ বাংলাদেশি, মারা গেছেন ৫৫

শেখ মুজিব ও হাসিনা বন্দনায় সরব ‘ফাটাকেস্ট’ হতে চাওয়া সিলেটের সেই ডিসির অন্দরমহল

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারের ডেক সিলগালা করার ৩ দিনের মাথায় প্রত্যাহার হওয়া ডিসি সারওয়ার আলমের অন্দরমহলের খবর নিয়ে আলোচনায় সরব সোস্যাল মিডিয়া, টকশো অ্যাক্টিভিস্ট, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মহল। ফিল্মের ফাটাকেস্ট চরিত্রের মতো জনপ্রিয় অভিযানের পেছনে তার আসল উদ্দেশ্য নিয়েও কথা উঠছে। স্বচ্ছতার নামে শাহজালালের মাজারের ৭০০ বছরের ঐতিহ্য ও প্রথাকে তাড়াহুড়ো করে ডিসির ক্ষমতাবলে তছনছ করার পেছনে রাজনৈতিক কোন এজেন্ডা আছে কি না এমন জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে।

শাহজালালের মাজারের দানের টাকার হিসাব নিকাশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে মাজারের ৩টি ডেক ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হলেও ডিসি অফিসের এলআর ফান্ড, কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, সারওয়ার আলমের উপর ঋণের শর্তভঙ্গ করার দায়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিপুল জরিমানার বিষয়টি এখন সিলেটে আলোচিত। এছাড়া শাহজালালের মাজারে তাড়াহুড়ো করে নিজে উপস্থিত থেকে দানের টাকা গণনা ও ডিসির পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা মাজারে প্রদানকে ডিসির ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সিলেটের সমন্বয়ক আব্দুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সদ্য বিদায়ী ডিসি মাজার বিরোধী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়ে বদলি হন। যেখানে মাজারের দানের টাকা গুনে গুনে ডিসি দেখালেন প্রচুর টাকা আসে, সেখানে যাওয়ার আগে মাজার তহবিলে ৫ লাখ টাকা দিয়ে রীতিমতো পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজি করলেন।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভেজাল বিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে এই সারওয়ার আলমের জনপ্রিয়তার (!) অভিষেক হয়। সে সময় আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হতে গিয়ে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনাকে বন্দনা করে ফেইসবুকেও নিয়মিত পোস্ট করতেন তিনি। ২০১৮ সালে রাজনৈতিক বিরোধের সূত্রে আওয়ামীলীগ প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ রাখার ভূয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ১৫ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করায়। আর এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্টেট এই সারওয়ার আলম। আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই সারওয়ার আলম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে একরকম তছনছ করে দেন। অবশ্য আওয়ামীলীগের ক্ষমতার শেষের দিকে রহস্যজনক কারণে সারওয়ার আলমের প্রমোশন আটকে দেওয়া হয়।

এদিকে স্বচ্ছতার জন্য বিভিন্ন অভিযান ও মাজারের ডেক সিলগালা করলেও খোদ সারওয়ার আলমের বিরুদ্ধে গাড়ি ক্রয়ে শর্তভঙ্গ করায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে ৬ লক্ষ ২৫ হাজার টাকারও বেশি জরিমানা করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি সেবা শাখা থেকে প্রাধিকারপ্রপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ ও গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা অনুযায়ী এই জরিমানা করা হয়। চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি সেবা শাখার স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সিলেট থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এই জরিমানা আদায় করা হয়েছিল কি না তা জানা যায়নি।

এছাড়া জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে সদ্য বিদায়ী ডিসি ৫ লাখ টাকা দান করার পর ডিসি অফিসের ‘এলআর ফান্ড’ (যা বেসরকারি খাত থেকে আসে) এর টাকার স্বচ্ছতা ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে। ২৪ জুন বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক বলেন, ‘এটা দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিস। এটি আমাদের নজরে আছে। তবে যা করার আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। পরিবর্তন করতে হলে সময় দিতে হবে। হুট করে কিছু করা যাবে না।’

বদলি হওয়া ডিসি সারওয়ার আলমের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের ‘মর্জি’ বুঝে চলা এমন কথা প্রচলিত আছে। এর সত্যতা খোঁজতে ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখে সারওয়ার আলমের ফেইসবুক পোস্টের একটি স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে আসে। যেখানে তিনি শেখ হাসিনার প্রশংসা করে লিখেন ‘আমাদের প্রেরণার বাতিঘর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার দীঘায়ূ ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। ধন্য পিতার ধন্য কন্যা আপনি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকুন হাজার বছর। আপনার নেতৃত্বে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে উন্নত বাংলাদেশ ইনশাআল্লাহ।’ এর আগে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই ‘আমি হতবাক !!!’

শিরোনামে তিনি শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে শিশুদের ছবি আঁকা প্রসঙ্গে ভিন্নধর্মী একটি পোস্টে লিখেন ‘আমরা ভাবি না পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রীর মতো শিশুরা যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বচক্ষে না দেখে মানসপটে ধারণ করে তুলির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সে সেমস্থ শিশুরা আমাদের মতো তথাকথিত সুবিধাবাদীদের চেয়ে কত পবিত্র এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সত্যিকারভাবে অনুপ্রাণিত।’

এদিকে গত ১৭ জুন মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লিখেন ‘পূণ্যভূমি সিলেটে স্বাগতম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। একজন অসাধারণ মানুষের সাধারণ চলাফেরা। আপনার জন্য শুভকামনা। এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।’

৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন সারওয়ার আলম। ইন্টেরিম সরকারের আমলে সিলেটের ভোলাগঞ্জের পাথরকান্ডে গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসাবে নিয়োগ পান তিনি। ছাত্রাবস্থায় একটি ইসলামি সংগঠনের হল সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেলেও এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। কিন্তু হযরত শাহজালালের মাজারে ডিসি সারওয়ারের নাটকীয়তায় তার গোপন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়েছে। এদিকে ডিসিকে প্রত্যাহারের প্রতিবাদে ও তাকে পূণর্বহালের দাবিতে সিলেটে মাজার সংস্কৃতি বিরোধী মতের মানুষ মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। ডিসিকে শ্লোগান দিয়ে তার অফিস পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। ডিসি তাদের সাথে করমর্দন করেছেন ও চক্ষুসজল হয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে তাহলে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডে পেছনে রেখে ডিসি মাজারে ‘প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ’ করতে নেমেছিলেন।

একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রাক্ষালে ডিসি সারওয়ারের এ ধরনের স্পর্শকাতর পদক্ষেপ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। মাজারের ডেগ সিলগালার পরপর তাকে প্রত্যাহার করা না হলে সিলেটের মাজার সংস্কৃতির পক্ষের লোকজনের সাথে ডিসির পক্ষে বিক্ষোভ মিছিলে নামা লোকদের বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটতে পারতো। এ থেকে একপক্ষের রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।

বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে মাজার কর্তৃপক্ষ, ওলি আউলিয়াভক্ত মানুষ ও বিপক্ষের লোকজন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন। মাজারের পক্ষের লোকেরা ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাজারে ডিসির এই প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে সুনির্দিষ্ট একটি দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ মনে করছেন। মাজারপন্থীদের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ উৎপাদনের উপলক্ষ তৈরি করতে পরিকল্পিতভাবে প্রশাসনিক এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

সিলেটের কবি ও সাংবাদিক কবির য়াহমদ তার ফেইসবুক পোস্টের দীর্ঘ লেখার এক জায়গায় লিখেন- ‘মাজারপুজা ও শরীয়ত বিরোধী’ যে চিরাচরিত প্রোপাগান্ডা, তা এখনও সমানভাবে চলমান থাকলেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা। তা হলো- মাজারের সংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে চরম দুর্নীতিগ্রস্থ এবং তারা মানুষের মানত ও দানের টাকার ছয়-নয় করে। এই অর্থ আত্মসাতের ন্যারেটিভটি আগে আড়ালে-আবডালে উচ্চারিত হলেও তা প্রমাণ করতে হলে যে মাজারে গিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেই সুযোগ এতাদিন মাজার বিদ্ধেষীরা করে উঠতে পারেনি’।

উল্লেখ্য, এই মাজারের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের রায় থাকার পরও ডিসি কেন এককভাবে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে গেলেন তা বোধগম্য নয় বলে মাজার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। ডিসির এই দ্রুত পদক্ষেপের ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গত বুধবার (২৪ জুন) সিলেটে সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আর্থিক হিসাব নিকাশে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগে কিছুটা তাড়াহুড়ো হয়েছে। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাই করা হয়নি। এটা ৭০০ বছরের একটি ট্রাডিশন।’ এদিকে ২৬ জুন শুক্রবার শাহজালালের মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করেছেন। মন্ত্রী নিজে এই কমিটির প্রধান হিসাবে দায়িত্বে আছেন। এই কমিটি একমাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি ‘যৌক্তিক পদ্ধতি’ নির্ধারণ করবে।

শাহজালালের মাজারের ডেক সিলগালা ইস্যুতে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবী ব্রাত্য রাইসু লিখেন, ‘সারওয়ার আলম সাহেবকে প্রশংসা করার আগে ১ মিনিট থামতে হবে। ভাবতে হবে. যিনি মাজার ধ্বংস ঠেকানোর ব্যাপারে কী কী কাজ করেছিলেন? যদি কিছু না কইরা থাকেন, তাইলে আরো ১ মিনিট থামতে হবেভ ভাবতে হবে, মাজার ধ্বংস যারা করছেন তাদের অপরাধকে সারোয়ার আলমের কারণে তেমন অপরাধ না বইলা মনে হইতেছে কি না? যদি তেমন মনে হয়, তবে সারোয়ার আলমের সাম্প্রতিক মাজার বিয়য়ক অ্যাকশন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতেছে, তিনি চান বা না চান। এই পর্যায়ে আইসা ১ মিনিট নীরবতা পালন করতে হব। কেন সেইটা বলবো না।’

সাংবাদিক ও কথা সাহিত্যিক মাহবুব মোর্শেদ লিখেন, মাজার ভাঙার সময় বড়কর্তাদের এগিয়ে আসতে দেখা না গেলেও মাজারের দানবাক্সের হিসাব নিতে দেখা যায় তাদের আগ্রহের শেষ নাই।’

এ ব্যাপারে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও টকশো আলোচক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সারওয়ার আলম সাহেব ট্রাংক কিনলেন। সিসি ক্যামেরা ফিট করলেন। টাকা কে দিলো? এই অর্থ কি সরকারি নাকি স্থানীয়ভাবে আহরিত এল আর ফান্ড? এই অর্থের আয় ব্যয় কি অডিট হয়? এই ফান্ডে যারা টাকা দেন তারা কি সবাই সৎ পথে আয় করে?