বর্তমান বিশ্বে শেয়ারবাজার বিনিয়োগের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। অনেক মুসলিমই জানতে চান— শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কি না। এর উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ইসলামে কোনো ব্যবসার বৈধতা নির্ভর করে সেই ব্যবসার প্রকৃতি, লেনদেনের পদ্ধতি এবং শরিয়তের বিধান পালনের ওপর। তাই শেয়ারবাজার সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন না করে শুধু লাভের আশায় বিনিয়োগ করা একজন মুসলিমের জন্য সমীচীন নয়।
আসলে শেয়ার বলতে বোঝায় কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানার একটি অংশ। ইসলামী পরিভাষায় এটি মুশারাকা (অংশীদারিত্ব)-এর আধুনিক রূপ। মুশারাকা অর্থ হলো—দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কোনো বৈধ ব্যবসা বা সম্পদে অংশীদার হওয়া। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এ ধরনের অংশীদারিত্বের প্রচলন ছিল এবং শরিয়ত তা বৈধতা দিয়েছে।
কুরআনের মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা কর; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যে ব্যবসা হালাল ও কল্যাণকর, তাতে অংশীদার হওয়া বৈধ; কিন্তু হারাম বা পাপের কাজে অংশীদার হওয়া বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)
অতএব, ব্যবসা বৈধ হলেও যদি তা সুদের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা আর বৈধ থাকে না।
শেয়ারে বিনিয়োগ কখন জায়েজ?
যদি কোনো কোম্পানির মূল ব্যবসা সম্পূর্ণ হালাল হয়— যেমন ঔষধ, কৃষি, নির্মাণ, প্রযুক্তি বা বৈধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান— এবং তারা হারাম পণ্য উৎপাদন বা বিক্রি না করে, তাহলে নীতিগতভাবে সেই কোম্পানির শেয়ার কেনা জায়েজ হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— কোম্পানিটি সুদি লেনদেনের সঙ্গে জড়িত কি না।
কারণ, শেয়ার কেনার অর্থ হলো আপনি সেই প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসান, সম্পদ এবং কার্যক্রমের অংশীদার হয়ে যাচ্ছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ও অবৈধ উভয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। তাই বিনিয়োগের আগে দুটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি—
- কোম্পানির মূল ব্যবসা হালাল হতে হবে।
- কোম্পানির আর্থিক কার্যক্রম সুদ ও অন্যান্য হারাম লেনদেন থেকে যথাসম্ভব মুক্ত হতে হবে।
হাদিসের নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ عَلَى قَوْمٍ أَكْلَ شَيْءٍ حَرَّمَ عَلَيْهِمْ ثَمَنَهُ
‘আল্লাহ যখন কোনো বস্তুকে হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করে দেন।’ (আবু দাউদ ৩৪৮৮)
অর্থাৎ হারাম পণ্য বা হারাম ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থও বৈধ নয়। তাই হারাম ব্যবসায় পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগও বৈধ হবে না।
এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন—
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়— সবার ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান অপরাধী।’
(মুসলিম ১৫৯৮)
এই হাদিস থেকে সুদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়।
মুফতি তাকী উসমানি-এর বর্ণিত শর্তসমূহ
শাইখুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ তাকী উসমানি (দা.বা.) আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে শেয়ার ব্যবসাকে কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে বৈধ বলেছেন। সেগুলো হলো—
- কোম্পানির মূল ব্যবসা অবশ্যই হালাল হতে হবে।
- কোম্পানির সম্পদ শুধু নগদ অর্থ হবে না; বরং জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি, উৎপাদনসামগ্রী ইত্যাদি বাস্তব সম্পদও থাকতে হবে।
- যদি অল্প পরিমাণ সুদি বা হারাম লেনদেন থেকেও থাকে, তাহলে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে বার্ষিক সাধারণ সভায় (AGM) এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে হবে এবং সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
- সুদ থেকে অর্জিত আয়ের অংশ হিসাব করে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দিতে হবে।
এই শর্তগুলো যথাযথভাবে পালিত হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিনিয়োগের অবকাশ রয়েছে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমান শেয়ারবাজারে অনেক ক্ষেত্রে কারসাজি, প্রতারণা, অস্বচ্ছতা এবং সুদভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম বিদ্যমান। অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে কোনো কোম্পানির আর্থিক বিবরণ গভীরভাবে যাচাই করা সহজ নয়। ফলে শরিয়তের সব শর্ত বাস্তবে পূরণ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়াও কঠিন।
এ কারণে অনেক আলেম সতর্কতার দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, যদি কোনো কোম্পানির শরিয়তসম্মত অবস্থা নিশ্চিতভাবে জানা না যায়, তাহলে এমন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকাই অধিক নিরাপদ।
ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ারবাজারকে এককভাবে হালাল বা হারাম বলা সঠিক নয়। বরং এর বিধান নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্যবসার প্রকৃতি, আর্থিক লেনদেন এবং শরিয়তের নীতিমালা অনুসরণের ওপর। যদি কোম্পানির ব্যবসা হালাল হয়, সুদ ও হারাম লেনদেন থেকে যথাসম্ভব মুক্ত থাকে এবং শরিয়তের শর্তগুলো পূরণ করে, তাহলে সেখানে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এসব শর্ত নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। তাই একজন মুসলিমের উচিত যথাযথ শরিয়াহ যাচাই করে বিনিয়োগ করা এবং সন্দেহযুক্ত লেনদেন থেকে বিরত থাকা। কেননা, হালাল উপার্জন শুধু দুনিয়ার বরকতের নয়, আখিরাতের সফলতারও অন্যতম ভিত্তি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























