দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যখন ঢাকায় আসেন তখন দেশের মানুষ, বিশেষ করে ১৭ বছরে বুঝমান হওয়া নতুন প্রজন্ম প্রথম তারেক সাহেবকে মন দিয়ে শুনেছে। সেদিন ৩০০ ফুট ৩৬ জুলাই অ্যাভিনিউয়ে দেশবাসী তাঁর মুখে বিসমিল্লাহ, ইন শা-আল্লাহ, বারবার আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহর রহমত, দোয়া ইত্যাদি বাংলাদেশি মুসলমানের ব্যবহৃত শব্দ ও পরিভাষা শুনে তাঁকে জানা বোঝার সুযোগ পেয়েছিল। আর যারা বয়সে প্রবীণ, যারা প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াকে দেখেছেন, শুনেছেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তাঁর শহীদ পিতার আলোক-আভা দেখতে পেয়েছেন। এরপর যারা অপেক্ষাকৃত মধ্যবয়সী তারা খুঁজে পেয়েছেন তাঁর মাতা দেশপ্রেমের প্রতীক, আপসহীন নেত্রী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছায়া।
এরপর নির্বাচনী প্রচারাভিযান, বিজয়, সরকার গঠন এবং পরবর্তী কয়েকমাসে নিজ কথা, কাজ ও আচরণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিত্ব মানুষের সামনে অনেকটাই ফুটে উঠেছে। তিনি মরহুমা মায়ের কাছে বসে কোরআনের সুরা পাঠ করছেন। তার নামাজ, জনসভার মধ্যে নামাজের তাড়া। সংসদের মধ্যে সময়মতো জামাতে নামাজ আদায়। সংসদ লবিতে “আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” ফলক লাগানো, এসব দেখে জনগণ তাঁর চিন্তা চেতনা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশি দেশপ্রেমিক চেতনার স্পষ্ট বার্তা পেয়েছেন।
বিশেষ করে সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রতিশোধহীন উদার মহৎ ক্ষমাশীলতা সম্পর্কে জানতে-বুঝতে পারছেন।
তাঁর ভদ্রতা, আদবকেতা, সংযম, পরিমিতিবোধ ও সুসভ্য আচরণ মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে শুরু করেছে। তাছাড়া শত্রু মিত্র, পক্ষ বিপক্ষ, কাছে ও দূরের মানুষের প্রতি তাঁর মহৎ ও মানবিক মনোভাব এবং নানা ঘটনায় প্রকাশিত মানুষের প্রতি তাঁর মমতা, দায়িত্বশীলতা, উত্তম আচরণ সাধারণ মানুষকে মুগ্ধও করছে। বিশেষ করে তাঁর মিতব্যয়িতা, শাসন-শৃঙ্খলা, বাকসংযম ও সতর্ক শব্দপ্রয়োগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারায় নতুন আবহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এসব থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভেতরগত প্রায় ৯২ ভাগ মুসলমানের স্বাধীন রাষ্ট্র ও ইসলামী মূল্যবোধে লালিত, শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার উদারনৈতিক রাজনীতির সুরভী পুনরায় দেশের মানুষ উপলব্ধি করছে। এসবই একটি নির্মোহ নাগরিক অধ্যয়ন।
সব মানুষ সাদা চোখে এসব বিষয় দেখছে, বুঝছে এবং এর সুপ্রভাব সম্পর্কে ভাবতেও শুরু করেছে। সরকার পরিচালনার ভেতর সংস্কার ও নতুনত্বের আভাস পেয়ে মানুষের মনে ভালো কিছুর আশাবাদ দৃঢ় হচ্ছে। এমন মুহূর্তে বিএনপির কিছু নেতা, এমপি, মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহ্যগত ইমেজ ও নিজের অর্জিত ভাবমর্যাদাকে প্রায় প্রতিদিন নিজেদের চিন্তা, কথা ও শব্দচয়নের মাধ্যমে আঘাত করে চলেছেন।
১৯০ বছর স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ভারতবর্ষ যখন স্বাধীন হয়, তখন সেখানকার বাসিন্দারা বড় দাগে দুইভাগে বিভক্ত ছিল। এক ভাগ অখ- ভারতের পক্ষে। আরেক ভাগ নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষা করে মুসলমানের তাহযীব তামাদ্দুন চর্চার জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে। এ কথার ওপর ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারতের জন্ম হয়। কিন্তু এর পরদিন থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ বলতে কোনো বিভক্তি নেই।
ভারতেও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে কোনো দলাদলি নেই। অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্র রক্ষায় পাকিস্তান ও ভারতের নাগরিকরা মোটাদাগে ঐক্যবদ্ধ। বিভক্তি কেবল ১৯৪৭ সালে স্বাধীন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মুক্ত রাষ্ট্র বাংলাদেশেই। জাতির মধ্যে এ বিভক্তি ৫৫ বছর ধরে সযত্নে লালন করা হয়েছে। দুনিয়ার সবদেশে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সময় দুইভাগ হয়ে যাওয়া জাতি খুব দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যেন স্বাধীন দেশ হয়েও ঐক্যবদ্ধ না হয় এ নিয়ে রীতিমতো মিশন চালানো হয়েছে। এ বিভেদ কারা সৃষ্টি করেছে ও জিইয়ে পরবর্তীতে সুযোগ পেলেই পুনরুজ্জীবিত করেছে জাতি তাদের চেনে। কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ বিভেদকে মুছে দিয়ে জাতিকে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সুদৃঢ় ও চির স্বাধীন রাখার জন্য তাঁর আদর্শ ও দর্শনকে সাজিয়েছিলেন। তিনি বাঙালী পাহাড়ি ও বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর জাতীয়তা সংকট দূর করে ছিলেন ইনক্লুসিভ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করে।
তিনি দেশের সেরা মুক্তিযোদ্ধা, প্রথম বিদ্রোহকারী, অজ্ঞাতবাসে থাকা বড় রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশ ভূখ-ের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম ছিলেন। রাজনীতিতে এসে জাতীয় ঐক্য বিনির্মাণের জন্য ৭১-এ বিচিত্র চিন্তার যোগ্য লোকদের এক করে নিজে দল গঠন করেন। এর মাধ্যমে দেশপ্রেমিক জনগণকে নতুন রাষ্ট্রের সমন্বিত আদর্শে ঐক্যবদ্ধ করেন।
৯২ ভাগের বেশি মুসলমানের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উচ্চকিত করে জাতীয় দর্শনের শক্ত পাটাতন নির্মাণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নায়কদের সাথে বাম ঘরানার, রুশপন্থি নেতাদের সাথে চীনা ঘরানার, পাকিস্তানের সমর্থক নেতৃবৃন্দের সাথে আজন্ম স্বাধীনতার পতাকাবাহী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এক অনবদ্য মেলবন্ধন প্রতিষ্ঠা করেন।
মওলানা ভাসানী, এম এ জি ওসমানী, শাহ আজিজুর রহমান, মাওলানা এম এ মান্নান, মশিউর রহমান যাদু মিয়া ও কর্নেল অলি আহমেদ-এর মতো কঠিন বিপরীত মেরুর প্রভাবশালী এবং স্বাধীন ভূখ-প্রেমী প্রতিভাসমূহের সমন্বয় করেছিলেন। যার নির্গলিত রূপ আজকের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
এ ঐতিহাসিক সফল ও অমর রাজনৈতিক দর্শনের বিপক্ষে যখন কিছু বিএনপি নেতা, এমপি, মন্ত্রীর কথা, উক্তি, মন্তব্য চলে যায় তখন আমরা খুবই বিব্রত হই। তাদের অনেকের কথা আধিপত্যবাদের পক্ষে চলে যায়। অনেকের কণ্ঠে বেজে ওঠে ফ্যাসিবাদের ধ্বনি। কারো মন্তব্য বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে আঘাত করে। কেউ আবার ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। জাতীয় ঐক্য সংহতির বিরুদ্ধেও অনেককে কথা বলতে শোনা যায়। কোনো কোনো নেতা, মন্ত্রী, এমপি ও কর্মীর চালচলন কথাবার্তা যেন বিএনপির সাথে যায় না। তারা যেন হাতে আসমান ছুঁয়ে ফেলেছেন। বাঘের পাঁচ-পা দেখছেন। প্রধানমন্ত্রীকে নিজের ঐতিহাসিক অর্জন ও রাজনীতি রক্ষার জন্যই এদের বাড়বাড়ন্ত খর্ব করতে হবে।
এসব উক্তি ও আচরণ দেশের মানুষের মানসিক অশান্তির কারণ হয়। শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে আধা শতাব্দীকালব্যাপী জনমনে অনুভূত শান্তি ও স্বস্তি বিনাশ করে। তাদের সন্তান আজকের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ভাষা, বক্তব্য, অভিব্যক্তি ও মার্জিত আচরণের মাধ্যমে নাগরিকদের অন্তরে জেগে ওঠা আশাবাদকে প্রবল ঝাঁকুনি দেয়।
তাঁর মন্ত্রীরা শরীয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেন। অথচ জাতীয়তাবাদী শাসনের ছায়াতলে থাকা ৯২ ভাগ মানুষ ঈমানের দাবিতেই শরীয়তে বিশ্বাসী ও দৈনন্দিন জীবনে শরীয়াহ পালনে সচেষ্ট এবং আগ্রহী। এরা বিদ্বেষ কিংবা অজ্ঞতাহেতু ৯২ ভাগ মানুষকে আঘাত করেন। কোনো মন্ত্রী ১৯০ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ফসল ১৯৪৭-এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। কথা বলার সময় তার মনে থাকে না যে, তিনি ৪৭-এর প্রভাবেই তার বর্তমান ধর্মীয় রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক অবস্থানে উপনীত হয়েছেন। তিনি তার পিতৃপুরুষের কথা ভুলে যান। কেউ আবার মাদরাসা মসজিদের বিরুদ্ধে যা মুখে আসে তাই বলে ফেলেন। তিনি আন্দাজ করতে পারেন না যে, তার দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়া, পরে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ম্যাডাম জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তারা প্রত্যেকেই মাদরাসা ও মসজিদের কত বড় ভক্ত।
এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ হাজার বছর ধরে যেসব পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামার নিবিড় পরিচর্যায় আজকের এ জাতিতে পরিণতি হয়েছে তারা মসজিদ মাদরাসা ও খানকাহ দিয়েই এদেশকে সভ্য, ভাবসম্পদে পূর্ণ ও স্বাধীন অস্তিত্বে এনেছেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এবং এর মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংস্থাপন করে এদেশের দেশপ্রেমিক নাগরিকদের অন্তর চিরদিনের জন্য যেভাবে জয় করেছেন, এসব আনাড়ি, অকালপক্ক ও অদূরদর্শী লোকেদের তা ধারণা করারও সামর্থ্য নেই।
এদের কথা ও আচরণে তা যেন কলুষিত না হতে পারে সেদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তীক্ষ¥ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাঁর সংযত আচরণ, কথা ও সংস্কৃতি থেকে ছোট বড় নেতা-মন্ত্রী ও এমপিরাও যেন আলোক লাভ করেন সেদিকে যতœবান হতে হবে। নেতা মন্ত্রী এমপি ও সাধারণ কর্মীদেরও উচিত তাদের দুই মরহুম নেতা-নেত্রী এবং বর্তমান দিক-দিশারী দলীয় প্রধানের সামগ্রিক ঐতিহ্য, অভ্যাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে অনুসরণ করে চলা।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























