ঢাকা , শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেজালে সয়লাব দেশ

দেশে খাবার ও নিত্যপণ্য এখন ভেজালে সয়লাব। ভেজালের দাপট একটি মারাত্মক জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযানের স্বল্পতায় অসাধু ব্যবসায়ীরা আগের মতোই তৎপর হয়ে উঠেছে।
এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য ও খাবারেই ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভেজাল উপাদান মেশানো হচ্ছে। এমনকি প্রধান প্রধান খাদ্যে ভেজালের মধ্যে দুধ ও ডেইরি, সয়াবিন তেল, হাইড্রোজেন পারক্সাইড, শ্যাম্পু ও ডিটারজেন্ট দিয়ে কৃত্রিম দুধ তৈরি করার প্রমাণ মিলেছে। মাছ-গোশতের পচন রোধে ক্ষতিকর ফরমালিন এবং চামড়া ট্যানারির বিষাক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য মুরগির খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফলমূল, শাকসবজি, কাঁচা ফল দ্রুত পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথোফেন এবং তাজা দেখাতে বিষাক্ত রং স্প্রে মেশানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখন মসলাপাতি, মরিচ ও হলুদের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া, কাঠের ভুসি এবং কাপড়ের বিষাক্ত টেক্সটাইল রং মিশানো হচ্ছে। বেকারি ও ফাস্টফুড নোংরা পরিবেশে উৎপাদন, নিষিদ্ধ হাইড্রোস ও পোড়া মবিল বা পাম অয়েল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে। ইদানীং এর সাথে যুক্ত হয়েছে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। প্রথম দিকে তা টুথপেস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিশদ গবেষণায় দুধ, চিনি ও সোয়াবিন তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভেজালের প্রধান কারণসমূহ হলো-অতিরিক্ত মুনাফা, কম খরচে বেশি লাভ করার প্রবনতা। আইনের দুর্বল প্রয়োগ, কঠোর শাস্তি ও জরিমানার অভাব, তদারকির ঘাটতি, পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক পরীক্ষাগারের অভাব, সচেতনতার অভাব, সাধারণ মানুষের ভেজাল চেনার উপায়ের ঘাটতিতে ভেজাল প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ভেজাল প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই-এর নিয়মিত ঝটিকা অভিযান চালানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আইন প্রনয়ণও জরুরী হয়ে পড়েছে, যাতে করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- বা আমৃত্যু কারাদ-ের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তা না হলে কোনোভাবেই ভেজাল প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

সম্প্রতি দেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর থেকেই বাংলাদেশে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এবার নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও অধিক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পেয়েছেন গবেষকরা। পৃথক তিনটি গবেষণায় উঠে আসা এসব তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে গেলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, একজন মানুষ প্রতিদিন কতটুকু প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন এবং এর প্রতিকার কী-এমন নানা প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন সাধারণ ভোক্তারা।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, কেবলমাত্র সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে।
খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশার তিনটি প্রধান পথ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। প্রথমত, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা থেকে সরাসরি কণা খাবারে মিশছে। দ্বিতীয়ত, প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কারখানার মেশিন, পাইপ ও কনভেয়ার বেল্ট ক্ষয়ে গিয়ে কণা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, পরিবেশ দূষণের কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার অর্ধেকের বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সেই অব্যবস্থাপিত বর্জ্যই ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে খাদ্যচক্রে ঢুকছে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি দেশি-বিদেশি নানা গবেষণায় উঠে এলেও কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ফলে শরীরের কোন অঙ্গে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তার বিস্তারিত গবেষণা এখনো হয়নি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে সরাসরি রক্তে মিশে যেতে পারে। এর ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার বলেছেন, পণ্যগুলোকে এমনভাবে নতুন করে ডিজাইন করা দরকার, যাতে সেগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ ও প্লাস্টিক ফাইবার কম থাকে এবং ব্যবহারের পর তা পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে। পরিবহন ও সংরক্ষণে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, খাবার, মাছ- গোশতে রাসায়নিক মেশানোসহ বিভিন্ন বেকারী আইটেম ও ফলে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর প্রমান মেলে। তখন বিএসটিআই, র‌্যাব ও জেলা প্রসাশনের মোবাইল কোর্ট ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ভেজালযুক্ত খাবার ও পণ্যসামগ্রী ধ্বংস করে। এক পর্যায়ে ভেজালকারবারিরা ব্যসা গুটিয়ে ফেলে ঢাকার বাইরে ভেজাল কারখানা সরিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন দোকান বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তখনও তাদের ভেজাল মেশানোর কর্মকান্ড অব্যাহত থাকে। একজন ভেজাল কারবারি নাম গোপন রাখার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, আমি নিজেও এক সময় ভেজাল মেশানোর কাজ করতাম। ধরা খেয়ে তিন মাসের জেল খেটে বের হওয়ার পর আমি আর এইজঘন্য কাজে যাইনি। এখন হালাল ব্যবসা করে যা ইনকাম করি তা দিয়েই সংসার চালাই। তিনি জানান, এখনও কেউ কেউ ভেজাল কারবারী করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স আইটেম, ফল ও খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করলেও এখন আর আগের মতো অভিযান নেই। তিনি জানান, ইতোমধ্যে অনেক ব্যবসায়ি পুরান ঢাকা থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে নিয়ে গেছে। এবারের মৌসুমে আমে কার্বাইড মেশানো হয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ভেজালকারবারি বলেন, এখন ইচ্ছা করলেই আম ব্যবসায়িরা নির্ধারিত তারিখের আগে পাইকারী আম বাজারে ছাড়তে পারে না। এ কারণে ভরা মৌসুমেই আম বাজারে আসে সেগুলোকে পাকাতে আর ফরমালিন ব্যবহার করা লাগে না। তবে কলা পাকাতে এবং মাছের পতন ঠেকাতে বরাবরের মতো এখনও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের বাজারে প্রচলিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনা পরীক্ষায় ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যেও চারটিতে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়। এই তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও প্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মো. ওমর ফারুকের নেতৃত্বে একদল গবেষক দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচা দুধ এবং সুপারশপে বিক্রি হওয়া প্রক্রিয়াজাত দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রক্রিয়াজাত দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক শূন্য ৬টি এবং কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

প্রফেসর ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, খামার থেকে দুধ সংগ্রহের পর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, কর্মীদের প্লাস্টিক গ্লাভস পরিধান এবং সবশেষে প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেটে সংরক্ষণ-প্রতিটি ধাপেই দুধ প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে। গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর অধিকাংশ ছিল স্বচ্ছ ও আঁশের মতো তন্তু আকৃতির। দুধের নমুনায় পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬, পিভিসহ একাধিক ক্ষতিকর পলিমার শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যে দুধের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় তাদের শরীরে প্লাস্টিক কণা প্রবেশের হারও সবচেয়ে বেশি।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগৃহীত খোলা ও প্যাকেটজাত সাত ধরনের চিনি পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বিদ্যমান। গবেষকরা জানিয়েছেন, পরিসংখ্যানগত দিক থেকে পার্থক্য খুব বেশি না হলেও খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর আকার ছিল ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। প্লাস্টিকের বস্তা, প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও সংরক্ষণকালে পরিবেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকই এর মূল উৎস বলে মনে করেন গবেষকরা।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে সয়াবিন তেল পরীক্ষায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে সংগৃহীত ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনায় দেখা গেছে, খোলা তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

গবেষণা দলের প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. শফি মুহাম্মদ তারেক জানিয়েছেন, শিল্পকারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার সান্নিধ্য এবং খোলা তেল সংরক্ষণে পাত্রের বারবার ব্যবহারের কারণে এই উচ্চমাত্রার দূষণ ঘটছে। তিনি বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকের যে মাত্রা পাওয়া গেছে সেটি ভয়াবহ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং কীভাবে এটি কমানো যায় তাও ভাবা দরকার।
২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ ছয়গুণ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু অংশসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। তবে এই কণাগুলো মানবদেহে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তা চিহ্নিত করা এখনো অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্বেগজনক গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীনের এক গবেষক কনুই, কোমর বা কাঁধের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন সার্জারি করানো রোগীদের হাড় ও কঙ্কাল পেশির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক আবিষ্কার করেন। একই বছরের শুরুতে ইতালির গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ের হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্যারোটিড ধমনীতে (মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী একজোড়া প্রধান নালি) প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেনের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় মানুষের মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। ওই গবেষণায় দেখা যায়, মৃত্যুর আগে যাদের ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে এই রোগে আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তিদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক ছিল।
বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার পর সরকার ও মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে প্রশ্নও উঠেছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জনগণকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত না হতে এবং গুজবে কান না দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনি যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ ঘোষণা করা সঠিক হবে না। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়ে ইতিমধ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরীক্ষাপদ্ধতিসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া হয়েছে। উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল ও পণ্যের উপাদান সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বিষয়টিকে কেবল একটি পণ্যের সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। তিনি বলেন, এটা শুধু টুথপেস্ট না, এটা একটা বিরাট ব্যাধির মতো ছড়িয়েছে। খাবারে, পানিতে ছড়িয়েছে। এজন্য একটা সমন্বিত পদক্ষেপ লাগবে। ভেজাল বিরোধী অভিযান নিয়ে একজন প্রাক্তন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, হাসিনার আমলে ভেজালবিরোধী অভিযানে গিয়ে বেশ কয়েকটি সমস্যায় পড়তে হতো। প্রথমত কোনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ভেজাল করতে গিয়ে ধরা পড়লে রাজনীতিবিদেরা তাদের ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়ত, ঊর্ধ্বতন আমলারা তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের আত্মীয়স্বজনকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তৃতীয়ত, দেশে খ্যাতনামা আইনজীবীরা ভেজালকারবাদিদের পক্ষে দ্রুত আইনি লড়াইয়ে নেমে যান। বর্তমান সরকারের উচিত হবে ভেজালবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করা। কেউ তদবির করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান করাসহ ভেজালবিরোধী আইন সংশোধন করা। যাতে একজন ভেজালকারবারিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া যায়। তা না হলে বিদ্যমান আইনে ভেজালকারবারিদের দমানো সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান প্রচলিত আইনে তিন মাসের জেল খেটে তারা আবার একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ভেজালকারবারীরা কিছুদিন জেল খেটে সহজেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

ভেজালে সয়লাব দেশ

আপডেট টাইম : ১২ মিনিট আগে

দেশে খাবার ও নিত্যপণ্য এখন ভেজালে সয়লাব। ভেজালের দাপট একটি মারাত্মক জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযানের স্বল্পতায় অসাধু ব্যবসায়ীরা আগের মতোই তৎপর হয়ে উঠেছে।
এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য ও খাবারেই ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভেজাল উপাদান মেশানো হচ্ছে। এমনকি প্রধান প্রধান খাদ্যে ভেজালের মধ্যে দুধ ও ডেইরি, সয়াবিন তেল, হাইড্রোজেন পারক্সাইড, শ্যাম্পু ও ডিটারজেন্ট দিয়ে কৃত্রিম দুধ তৈরি করার প্রমাণ মিলেছে। মাছ-গোশতের পচন রোধে ক্ষতিকর ফরমালিন এবং চামড়া ট্যানারির বিষাক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য মুরগির খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফলমূল, শাকসবজি, কাঁচা ফল দ্রুত পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথোফেন এবং তাজা দেখাতে বিষাক্ত রং স্প্রে মেশানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখন মসলাপাতি, মরিচ ও হলুদের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া, কাঠের ভুসি এবং কাপড়ের বিষাক্ত টেক্সটাইল রং মিশানো হচ্ছে। বেকারি ও ফাস্টফুড নোংরা পরিবেশে উৎপাদন, নিষিদ্ধ হাইড্রোস ও পোড়া মবিল বা পাম অয়েল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে। ইদানীং এর সাথে যুক্ত হয়েছে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। প্রথম দিকে তা টুথপেস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিশদ গবেষণায় দুধ, চিনি ও সোয়াবিন তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভেজালের প্রধান কারণসমূহ হলো-অতিরিক্ত মুনাফা, কম খরচে বেশি লাভ করার প্রবনতা। আইনের দুর্বল প্রয়োগ, কঠোর শাস্তি ও জরিমানার অভাব, তদারকির ঘাটতি, পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক পরীক্ষাগারের অভাব, সচেতনতার অভাব, সাধারণ মানুষের ভেজাল চেনার উপায়ের ঘাটতিতে ভেজাল প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ভেজাল প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই-এর নিয়মিত ঝটিকা অভিযান চালানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আইন প্রনয়ণও জরুরী হয়ে পড়েছে, যাতে করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- বা আমৃত্যু কারাদ-ের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তা না হলে কোনোভাবেই ভেজাল প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

সম্প্রতি দেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর থেকেই বাংলাদেশে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এবার নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও অধিক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পেয়েছেন গবেষকরা। পৃথক তিনটি গবেষণায় উঠে আসা এসব তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে গেলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, একজন মানুষ প্রতিদিন কতটুকু প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন এবং এর প্রতিকার কী-এমন নানা প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন সাধারণ ভোক্তারা।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, কেবলমাত্র সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে।
খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশার তিনটি প্রধান পথ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। প্রথমত, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা থেকে সরাসরি কণা খাবারে মিশছে। দ্বিতীয়ত, প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কারখানার মেশিন, পাইপ ও কনভেয়ার বেল্ট ক্ষয়ে গিয়ে কণা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, পরিবেশ দূষণের কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার অর্ধেকের বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সেই অব্যবস্থাপিত বর্জ্যই ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে খাদ্যচক্রে ঢুকছে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি দেশি-বিদেশি নানা গবেষণায় উঠে এলেও কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ফলে শরীরের কোন অঙ্গে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তার বিস্তারিত গবেষণা এখনো হয়নি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে সরাসরি রক্তে মিশে যেতে পারে। এর ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার বলেছেন, পণ্যগুলোকে এমনভাবে নতুন করে ডিজাইন করা দরকার, যাতে সেগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ ও প্লাস্টিক ফাইবার কম থাকে এবং ব্যবহারের পর তা পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে। পরিবহন ও সংরক্ষণে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, খাবার, মাছ- গোশতে রাসায়নিক মেশানোসহ বিভিন্ন বেকারী আইটেম ও ফলে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর প্রমান মেলে। তখন বিএসটিআই, র‌্যাব ও জেলা প্রসাশনের মোবাইল কোর্ট ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ভেজালযুক্ত খাবার ও পণ্যসামগ্রী ধ্বংস করে। এক পর্যায়ে ভেজালকারবারিরা ব্যসা গুটিয়ে ফেলে ঢাকার বাইরে ভেজাল কারখানা সরিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন দোকান বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তখনও তাদের ভেজাল মেশানোর কর্মকান্ড অব্যাহত থাকে। একজন ভেজাল কারবারি নাম গোপন রাখার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, আমি নিজেও এক সময় ভেজাল মেশানোর কাজ করতাম। ধরা খেয়ে তিন মাসের জেল খেটে বের হওয়ার পর আমি আর এইজঘন্য কাজে যাইনি। এখন হালাল ব্যবসা করে যা ইনকাম করি তা দিয়েই সংসার চালাই। তিনি জানান, এখনও কেউ কেউ ভেজাল কারবারী করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স আইটেম, ফল ও খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করলেও এখন আর আগের মতো অভিযান নেই। তিনি জানান, ইতোমধ্যে অনেক ব্যবসায়ি পুরান ঢাকা থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে নিয়ে গেছে। এবারের মৌসুমে আমে কার্বাইড মেশানো হয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ভেজালকারবারি বলেন, এখন ইচ্ছা করলেই আম ব্যবসায়িরা নির্ধারিত তারিখের আগে পাইকারী আম বাজারে ছাড়তে পারে না। এ কারণে ভরা মৌসুমেই আম বাজারে আসে সেগুলোকে পাকাতে আর ফরমালিন ব্যবহার করা লাগে না। তবে কলা পাকাতে এবং মাছের পতন ঠেকাতে বরাবরের মতো এখনও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের বাজারে প্রচলিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনা পরীক্ষায় ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যেও চারটিতে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়। এই তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও প্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মো. ওমর ফারুকের নেতৃত্বে একদল গবেষক দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচা দুধ এবং সুপারশপে বিক্রি হওয়া প্রক্রিয়াজাত দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রক্রিয়াজাত দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক শূন্য ৬টি এবং কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

প্রফেসর ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, খামার থেকে দুধ সংগ্রহের পর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, কর্মীদের প্লাস্টিক গ্লাভস পরিধান এবং সবশেষে প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেটে সংরক্ষণ-প্রতিটি ধাপেই দুধ প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে। গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর অধিকাংশ ছিল স্বচ্ছ ও আঁশের মতো তন্তু আকৃতির। দুধের নমুনায় পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬, পিভিসহ একাধিক ক্ষতিকর পলিমার শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যে দুধের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় তাদের শরীরে প্লাস্টিক কণা প্রবেশের হারও সবচেয়ে বেশি।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগৃহীত খোলা ও প্যাকেটজাত সাত ধরনের চিনি পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বিদ্যমান। গবেষকরা জানিয়েছেন, পরিসংখ্যানগত দিক থেকে পার্থক্য খুব বেশি না হলেও খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর আকার ছিল ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। প্লাস্টিকের বস্তা, প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও সংরক্ষণকালে পরিবেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকই এর মূল উৎস বলে মনে করেন গবেষকরা।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে সয়াবিন তেল পরীক্ষায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে সংগৃহীত ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনায় দেখা গেছে, খোলা তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

গবেষণা দলের প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. শফি মুহাম্মদ তারেক জানিয়েছেন, শিল্পকারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার সান্নিধ্য এবং খোলা তেল সংরক্ষণে পাত্রের বারবার ব্যবহারের কারণে এই উচ্চমাত্রার দূষণ ঘটছে। তিনি বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকের যে মাত্রা পাওয়া গেছে সেটি ভয়াবহ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং কীভাবে এটি কমানো যায় তাও ভাবা দরকার।
২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ ছয়গুণ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু অংশসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। তবে এই কণাগুলো মানবদেহে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তা চিহ্নিত করা এখনো অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্বেগজনক গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীনের এক গবেষক কনুই, কোমর বা কাঁধের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন সার্জারি করানো রোগীদের হাড় ও কঙ্কাল পেশির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক আবিষ্কার করেন। একই বছরের শুরুতে ইতালির গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ের হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্যারোটিড ধমনীতে (মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী একজোড়া প্রধান নালি) প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেনের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় মানুষের মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। ওই গবেষণায় দেখা যায়, মৃত্যুর আগে যাদের ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে এই রোগে আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তিদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক ছিল।
বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার পর সরকার ও মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে প্রশ্নও উঠেছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জনগণকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত না হতে এবং গুজবে কান না দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনি যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ ঘোষণা করা সঠিক হবে না। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়ে ইতিমধ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরীক্ষাপদ্ধতিসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া হয়েছে। উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল ও পণ্যের উপাদান সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বিষয়টিকে কেবল একটি পণ্যের সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। তিনি বলেন, এটা শুধু টুথপেস্ট না, এটা একটা বিরাট ব্যাধির মতো ছড়িয়েছে। খাবারে, পানিতে ছড়িয়েছে। এজন্য একটা সমন্বিত পদক্ষেপ লাগবে। ভেজাল বিরোধী অভিযান নিয়ে একজন প্রাক্তন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, হাসিনার আমলে ভেজালবিরোধী অভিযানে গিয়ে বেশ কয়েকটি সমস্যায় পড়তে হতো। প্রথমত কোনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ভেজাল করতে গিয়ে ধরা পড়লে রাজনীতিবিদেরা তাদের ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়ত, ঊর্ধ্বতন আমলারা তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের আত্মীয়স্বজনকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তৃতীয়ত, দেশে খ্যাতনামা আইনজীবীরা ভেজালকারবাদিদের পক্ষে দ্রুত আইনি লড়াইয়ে নেমে যান। বর্তমান সরকারের উচিত হবে ভেজালবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করা। কেউ তদবির করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান করাসহ ভেজালবিরোধী আইন সংশোধন করা। যাতে একজন ভেজালকারবারিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া যায়। তা না হলে বিদ্যমান আইনে ভেজালকারবারিদের দমানো সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান প্রচলিত আইনে তিন মাসের জেল খেটে তারা আবার একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ভেজালকারবারীরা কিছুদিন জেল খেটে সহজেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে।