শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন রাজধানীর মিরপুর-১, শাহআলী মার্কেট, সনি সিনেমা হলের মোড়, মুক্তবাংলা মার্কেট এলাকার ফুটপাতে কোনো হকার নেই, দোকান নেই। এই দৃশ্য যেন স্বপ্নের মতো। বিগত কয়েক দশকেই এমন চিত্র দেখা যায়নি। হকারমুক্ত ফুটপাত উপহার দিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কঠোর অবস্থানের কারণে এটা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক প্রত্যেকের দৃঢ়তা, যে করেই হোক রাজধানীর ফুটপাত হবে হকারমুক্ত। ফুটপাত শুধু পথচারীদের জন্য। সেই ঘোষণার বাস্তব রূপ পেয়েছে মিরপুর এলাকায়।
মিরপুর পাইকপাড়ার বাসিন্দা হারুন-অর-রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার ঘোষণা আগে অনেকবার শুনেছি, দেখেছি। এক দিকে উচ্ছেদ হয়েছে, সপ্তাহ না যেতে আবার দখল হয়েছে। কিন্তু এবার গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দখলমুক্ত রয়েছে। এটা সত্যি স্বপ্নের মতো। ফুটপাতে এত জায়গা আগে কখনো বোঝাই যায়নি। কারণ ফুটপাত পুরোটাই অবৈধ দখলে থাকত। এখন পাশাপাশি তিন-চারজন হাঁটলেও কোনো সমস্যা হয় না। এ রকম ফুটপাত থাকলে সকালে অনেকেই হাঁটার জন্য পথ খুঁজে পাবে।
তবে দখলমুক্ত এই পরিবেশ কত দিন ধরে রাখতে পারে, সেটাই হচ্ছে কথা। পাশাপাশি হারুন-অর-রশিদ দখলমুক্ত ফুটপাতের জন্য পরামর্শও দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাইরের অনেক দেশেই দেখবেন ফুটপাতের ওপর বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মানুষ হাঁটাহাঁটি করার পর কোথাও একটু বসে জিরিয়ে নিতে পারে। সেজন্য গাছ লাগানোর পাশাপাশি নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
নগরবাসী বলছেন, শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই চলবে না। প্রত্যেকটা মার্কেটের দোকান মালিক সমিতিকে জবাবদিহির মধ্যে নিতে হবে যেন কেউ তার দোকানের সামনে ফুটপাতে মালামাল না রাখে আর নোংরা না করে। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে ফুটপাতই হতে পারে হাঁটার মাঠের বিকল্প। যেহেতু সব এলাকায় খোলা মাঠ বা জায়গা নেই। যদি বড় ফুটপাত থাকে তাহলে সকাল-বিকাল অন্তত মানুষ হাঁটতে পারবে। এজন্য ফুটপাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা মনিটরিংয়ের আওতায় রাখাটা জরুরি।
গতকাল শুক্রবার বিকালে মিরপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পড়ন্ত বিকালে নেই কোনো হকারের হাকডাক। নেই কোনো যানজট। পুরো মিরপুর যেন দখলমুক্ত ফুটপাতের মডেলে পরিণত হয়ে উঠেছে। মিরপুর-১, পাইকপাড়া, বাঙলা কলেজ, মুক্তবাংলা মার্কেট, সনি সিনেমা হল এলাকা, মিরপুর-২ শেরেবাংলা
জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম এলাকা হয়ে মিরপুর-১০ গোল চত্বর কোথাও নেই হকার। তবে মিরপুর থানা শিক্ষা অফিসের সামনের ফুটপাতের কিছু অংশ দখল করে গড়ে ওঠা ভাসমান নার্সারি এখনও বহালতবিয়তে। আবার দখলমুক্ত ফুটপাতের কোথাও কোথাও মার্কেটের সামনে অবৈধভাবে মোটরসাইকেল পার্র্কিং করে রাখতে দেখা গেছে।
একই চিত্র মিরপুর-১০ গোল চত্বর ও আশপাশের এলাকা। মিরপুর-১০ ফায়ার সার্ভিসের কার্যালয়ের সামনের ফুটপাত, ফলপট্টি, শাহ আলী প্লাজা, আনোয়ার ম্যানশন (গোল চত্বর), কাজীপাড়া, পর্বতা, শেওড়াপাড়া, হারমান মেইনার স্কুলের সামনের ফুটপাত সব এখন দখলমুক্ত। মানুষ নির্বিগ্নে হেঁটে নিকটতম গন্তব্যে যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় গাছ লাগিয়ে হকারদের বসার পথ বন্ধ করা হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় দোকানের পণ্য ফুটপাতের কিছু অংশজুড়ে রাখা হয়েছে। তবুও দখলমুক্ত এই ফুটপাত যেন পথচারীদের জন্য নতুন ঢাকা।
মিরপুর-১৩ এলাকার বাসিন্দা মুজিবুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, এখন নির্বিগ্নে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারছি। এটা অনেক বড় স্বস্তি। এখন সকাল-বিকাল অন্তত ১ কিলোমিটার পথ হাঁটার ব্যবস্থা হয়েছে। এটা ধরে রাখতে পারলে সত্যি ঢাকা বদলে যাবে। শুধু একটু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারলে ঢাকার ফুটপাত হয়ে উঠবে মানুষের সুস্থ থাকার একটা উপায়। কারণ এই ফুটপাত দিয়ে যদি হাঁটতে পারে অনেকের জন্যই এটা বড় স্বস্তির খবর হবে। মানুষ ৩০ মিনিটের পথ হেঁটেই যেতে পারবে। এর ফলে একদিকে যানজট কমবে, অন্যদিকে ব্যায়াম হবে এবং সাশ্রয় হবে অর্থ।
মুজিবুর রহমান বলেন, আগে ভোটের চিন্তা করে উচ্ছেদ করেও দখলমুক্ত রাখতে পারতেন না মেয়ররা। এবার এখন পর্যন্ত দখলমুক্ত রাখতে পারায় সিটি করপোরেশন ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে হকারদেরও দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা না করলে তাদের ধরে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে। তা ছাড়া হকারদের পেছনে যে সিন্ডিকেট কাজ করে তাদের বিষয়েও কঠোর থাকতে হবে।
রাজধানীর মিরপুরের মতো ঢাকার অন্যান্য এলাকা বিশেষ করে শ্যামলী, রিং রোড, জাপান গার্ডেন সিটির সামনের ফুটপাত, কৃষি মার্কেটের সামনের ফুটপাত, মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়ের ফুটপাত, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতলের সামনের ফুটপাত, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনের ফুটপাত, নিউমার্কেট, মতিঝিল, গুলিস্তান- সব ফুটপাত দখলমুক্ত হলে ঢাকাবাসীর সুস্থতার জন্য বিরাট অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ হাঁটার জন্য ফুটপাত পেলে বেশিরভাগ মানুষ স্বল্প দূরত্বে হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। মিরপুরের মডেল ঢাকার অন্যান্য এলাকাতেও দেখতে চান নগরবাসী।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























