ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়েই ইউরোপের কোনো কোনো দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক মত প্রকাশ করতে থাকেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতা গভীর সংকটে নিমজ্জিত। স্পেংলারের Decline of the West, সুইটজারের The Decay and the Restoration of Civilization,  ক্লাইভ বেলের Civilization  প্রভৃতি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই-তিন বছরের মধ্যেই প্রকাশিত হয়। ক্লাইভ বেলের বইটি মোতাহের হোসেন চৌধুরী ‘সভ্যতা’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন, যেটি বাজারে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ২০ বছর পার হতে না হতেই সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হয় যে পাশ্চাত্য সভ্যতা অপশক্তির দখলে চলে গেছে এবং তার দিন শেষ। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর ঠিক আগে ১৯৪১ সালে রচনা করেছিলেন ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধটি। তাঁরা সবাই অনুভব করেছিলেন যে পাঁচ-ছয় শ বছর ধরে রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে বিকশিত ইউরোপের সভ্যতা শেষ হয়ে গেছে এবং উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে অনৈতিক অবস্থার মধ্যে মানুষ বর্বরতায় নিপতিত হয়েছে। ইউরোপের জ্ঞানীদের প্রতি তাঁরা নতুন রেনেসাঁস কিংবা নতুন সভ্যতা সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছিলেন। সবাই জানেন, সভ্যতার সঙ্কট সম্পর্কে চরম কথাটি জীবনানন্দ দাশ উচ্চারণ করেছিলেন একটি ছোট্ট কবিতার মাধ্যমে :

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা,

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই,

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়। ’

রবীন্দ্রনাথ নতুন সভ্যতার উত্থানের সম্ভাবনা দেখেছিলেন পূর্ব থেকে, পশ্চিম থেকে নয়।

এর মধ্যে নতুন সভ্যতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে এসেছিল মার্ক্সবাদ। কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৮ সালে, রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে এবং ১৯৪৯ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির (১৯৯১) সঙ্গে সে সম্ভাবনাও তিরোহিত। এখন সংকট গভীরতর রূপ নিয়ে সামনে এসেছে। এই সংকটকে নানা দিক থেকে বোঝার এবং সংকট অতিক্রম করার উপায় সন্ধান করা দরকার।

পৃথিবীটাকে সবার জন্য অনেক সুন্দর ও সুখময় করে তোলা সম্ভব। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে প্রগতিহীনতা ও সমাচার, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহ, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকদ্রব্যের প্রসার, অসামাজিক কার্যকলাপ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, নৈতিক পতনশীলতা, জুলুম-জবরদস্তি, অপব্যবস্থা ও দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে হবে। এর জন্য লাগবে অবচেতনা ও নতুন প্রেরণা। তাত্ত্বিক  মীমাংসা, সেই সঙ্গে বাস্তবের পরিবর্তন সাধন। প্রত্যেক জাতির বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরই বিবেচনার কেন্দ্রীয় বিষয় আজ হওয়া উচিত এসব সমস্যার সমাধান। মানব স্বভাবের উন্নতি সম্ভব এবং উন্নতি সাধন করতে হবে। এর জন্য যা কিছু করা দরকার হয়, পর্যায়ক্রমে সবই করতে হবে। নৈতিক উন্নতি এবং আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার উন্নতি—দুটিই করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই মনে করেন মানুষের নৈতিক উন্নতি অসম্ভব। এই ধারণা ভুল। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের নৈতিক উন্নতি অবশ্যই সম্ভব। নৈতিক উন্নতির কার্যক্রম বাদ দিয়ে যে উন্নয়নচিন্তা তা অপর্যাপ্ত।

সর্বজনীন গণতন্ত্রের প্রয়োজনে গণতন্ত্রের চলমান ধারণা ও কার্যক্রম পরিহার করতে হবে। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তদের ও ন্যায়কামী সবার কল্যাণে গণতন্ত্রকে নতুন রূপ ও প্রকৃতি দিতে হবে। সমাজতন্ত্রের ধারণাকে সমন্বিত করতে হবে অভীষ্ট সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যে। রাজনৈতিক দলে অবলম্বন করতে হবে নবসৃষ্টির ও নতুন রেনেসাঁসের স্পিরিট।

জাতিরাষ্ট্রে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ গঠন করতে হবে দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দ্বারা। দলকে জনসমর্থন অর্জন করতে হবে জনজীবনের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির কর্মসূচিভিত্তিক অঙ্গীকার ঘোষণা করে। দলের রাজনৈতিক চরিত্র ক্রমাগত উন্নত করতে হবে। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে নৈতিক অনুশীলন ও নৈতিক উন্নতি অপরিহার্য। ব্যক্তিগত অনুশীলনে যা সম্ভব হয় না, দলীয় অনুশীলন দ্বারা তা সম্ভব করতে হবে। রাজনীতি সম্পর্কে আশির দশক থেকে চলে আসা ধারণার আমূল পরিবর্তন করতে হবে।

পশ্চাদ্বর্তী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করে অগ্রবর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রগতিশীল জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তি গ্রহণ করে শক্তিশালী হতে হবে। ঐক্যহীন, নেতৃত্বহীন, দুর্বলরা শক্তিশালী হতে পারে মহান লক্ষ্য নিয়ে, নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের থেকে, নিজেদের জন্য উন্নত নেতৃত্ব সৃষ্টি করে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে। ঐক্যহীন, নেতৃত্বহীন, লক্ষ্যহীন, কর্মসূচিহীন ও কার্যক্রমহীন হয়ে দুর্বল থাকলে শোষণ-বঞ্চনা ভোগ করতেই হয়। দুর্বল থাকা অন্যায়।

জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিশ্বব্যবস্থাকেও পুনর্গঠিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে আন্তরাষ্ট্রিক ফেডারেল বিশ্বসরকার। বিশ্বসরকার হবে জাতীয় সরকারগুলোর ঊর্ধ্বতন এক সরকার। তার কাজ সীমাবদ্ধ থাকবে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আন্তরাষ্ট্রিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে, বিরোধ মীমাংসায়, যুদ্ধ যাতে না লাগে তার জন্য কাজ করায়, যুদ্ধ যদি লেগে যায়, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থামানোতে এবং আন্তরাষ্ট্রিক শক্তি রক্ষায়। রাষ্ট্রের  অভ্যন্তরীণ সব কাজ করবে রাষ্ট্রীয় সরকার। শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে বিশ্বসরকারের কাছে একটি সেনাবাহিনী রেখে সব রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করতে হবে।

জাতিসংঘকে আন্তরাষ্ট্রিক ফেডারেল বিশ্বসরকারে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আন্তরাষ্ট্রিক ফেডারেল বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভিন্ন ধারার কাজ লাগবে।

বিশ্বায়ন ও বিশ্বব্যাংক নির্দেশিত পথ পৃথিবীর ৯৫ শতাংশ মানুষের জন্য বিপথ। বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদরা নিজ নিজ জাতিকে এবং গোটা মানবজাতিকে এই বিপথ অবলম্বন করে চলার দিকনির্দেশই দিয়ে থাকেন। দুর্বল দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোতে অর্থনীতিবিদদের চিন্তা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তাই গুরুত্ব পায় না। এটা শুভকর নয়। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের বেলায় অর্থনীতিবিদদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে হবে।

মানুষ যদি তার চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তিকে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠনে ও উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত করে, তাহলে মাত্র তিন দশক কালের মধ্যে যে সুফল দেখা দেবে, তা কল্পনা করাও এখন দুঃসাধ্য। মানুষ যদি বিবেককে জাগ্রত ও সক্রিয় রেখে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে, বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে জেনারেশনের পর জেনারেশনের চেষ্টায় সব কিছুই পারবে।

প্রকৃতিতে প্রাণিকুলের মধ্যে দেখা যায় খাদ্য-খাদক সম্পর্ক। আর মানুষের সমাজে দেখা যায় শোষক-শোষিত সম্পর্ক। প্রকৃতির ন্যায়—মাৎস্যন্যায়। বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে খায়। বাঘ-সিংহ হরিণকে মেরে খায়। কোনো প্রতিকার নেই। ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন নেই। ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপারে প্রকৃতি উদাসীন, ন্যায়-অন্যায় সম্পূর্ণই মানবীয় ব্যাপার। অবশ্য মানুষ প্রকৃতির অন্তর্গত। মানুষের সমাজ প্রবল দুর্বলের ওপর শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা ও নির্যাতন চালায়। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন আছে, প্রতিকারের উপায় আছে। দুর্বল মানুষেরা ন্যায় প্রতিষ্ঠার ও অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা চালাতে পারে। দৈহিক ও মানসিক শক্তির দিক দিয়ে মানুষ পরস্পর সমান না হওয়ায় সমস্যা জটিল। মানবপ্রকৃতি এমন যে কোনো শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একবার জয়ী হলে তা চিরকালের বিজয় হয় না; মানুষের সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হয়। ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে সাধনা ও সংগ্রাম করে এগিয়ে চলতে হয়। কালের ব্যবধানে ন্যায়, ইনসাফ, জাস্টিস বিষয়ে ধারণা বদলায়। ঘন ঘন বদলায় না, ঐতিহাসিক কালের ব্যবধানে বদলায়। বলা যায়, Eternal vigilence is the price of liberty.

দুর্বল জাতিগুলোকে বুঝতে হবে যে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান চিন্তাধারা ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মধারার সুস্পষ্ট দুটি শাখা আছে। এক শাখায় আছে সর্বজনীন কল্যাণচিন্তা, মহান আবিষ্কারক-উদ্ভাবন, প্রগতিশীল দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য ও আদর্শ। এ শাখা সৃষ্টিশীল, প্রগতিশীল, মানবজাতির জন্য কল্যাণকর, সব জাতির জন্য কোনো না কোনোভাবে গ্রহণীয়। অপর শাখায় আছে কায়েমি স্বার্থবাদ ও প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলতা—উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। এ ধারা মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে থেকে এই দ্বিতীয় ধারার চিন্তক ও কর্মীরা আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ ধরে পর্যায়ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে কর্তৃত্ব দখল করে নিয়েছে। তাতে দেখা দিয়েছে পশ্চিমা সভ্যতার সংকট। পশ্চিমের কর্তৃত্বশীল শক্তিগুলোকে বলা যায় অপশক্তি। আজকের অত্যুন্নত প্রযুক্তির দুনিয়ায় কর্তৃত্বশীল আছে এই অপশক্তি।

পশ্চিমা অপশক্তির কর্তৃত্বে মানবজাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার জনগণের নৈতিক জাগরণ ও ঐক্য দরকার। পশ্চিমা অপশক্তির বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোতেও অবশ্যই প্রতিবাদ ও গণজাগরণ দেখা দেবে।

ভবিষ্যতের উন্নত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা দরকার। রাজনীতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তিন দশক ধরে ব্যস্ত আছে কেবল নির্বাচন নিয়ে চিন্তায়। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন, সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন ইত্যাদি কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। ‘মানুষ নির্বাচনপাগল’, ‘মানুষ ভোটপাগল’। এসব কথা কি ঠিক? দরকার নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা। নতুন কল্পনা। ভবিষ্যতের উন্নত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা দেখা দিলে সৃষ্টি হবে নতুন আশাবাদ—নবযুগ।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ

আপডেট টাইম : ০৫:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ অক্টোবর ২০১৭

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়েই ইউরোপের কোনো কোনো দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক মত প্রকাশ করতে থাকেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতা গভীর সংকটে নিমজ্জিত। স্পেংলারের Decline of the West, সুইটজারের The Decay and the Restoration of Civilization,  ক্লাইভ বেলের Civilization  প্রভৃতি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই-তিন বছরের মধ্যেই প্রকাশিত হয়। ক্লাইভ বেলের বইটি মোতাহের হোসেন চৌধুরী ‘সভ্যতা’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন, যেটি বাজারে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ২০ বছর পার হতে না হতেই সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হয় যে পাশ্চাত্য সভ্যতা অপশক্তির দখলে চলে গেছে এবং তার দিন শেষ। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর ঠিক আগে ১৯৪১ সালে রচনা করেছিলেন ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধটি। তাঁরা সবাই অনুভব করেছিলেন যে পাঁচ-ছয় শ বছর ধরে রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে বিকশিত ইউরোপের সভ্যতা শেষ হয়ে গেছে এবং উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে অনৈতিক অবস্থার মধ্যে মানুষ বর্বরতায় নিপতিত হয়েছে। ইউরোপের জ্ঞানীদের প্রতি তাঁরা নতুন রেনেসাঁস কিংবা নতুন সভ্যতা সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছিলেন। সবাই জানেন, সভ্যতার সঙ্কট সম্পর্কে চরম কথাটি জীবনানন্দ দাশ উচ্চারণ করেছিলেন একটি ছোট্ট কবিতার মাধ্যমে :

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা,

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই,

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়। ’

রবীন্দ্রনাথ নতুন সভ্যতার উত্থানের সম্ভাবনা দেখেছিলেন পূর্ব থেকে, পশ্চিম থেকে নয়।

এর মধ্যে নতুন সভ্যতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে এসেছিল মার্ক্সবাদ। কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৮ সালে, রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে এবং ১৯৪৯ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির (১৯৯১) সঙ্গে সে সম্ভাবনাও তিরোহিত। এখন সংকট গভীরতর রূপ নিয়ে সামনে এসেছে। এই সংকটকে নানা দিক থেকে বোঝার এবং সংকট অতিক্রম করার উপায় সন্ধান করা দরকার।

পৃথিবীটাকে সবার জন্য অনেক সুন্দর ও সুখময় করে তোলা সম্ভব। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে প্রগতিহীনতা ও সমাচার, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহ, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকদ্রব্যের প্রসার, অসামাজিক কার্যকলাপ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, নৈতিক পতনশীলতা, জুলুম-জবরদস্তি, অপব্যবস্থা ও দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে হবে। এর জন্য লাগবে অবচেতনা ও নতুন প্রেরণা। তাত্ত্বিক  মীমাংসা, সেই সঙ্গে বাস্তবের পরিবর্তন সাধন। প্রত্যেক জাতির বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরই বিবেচনার কেন্দ্রীয় বিষয় আজ হওয়া উচিত এসব সমস্যার সমাধান। মানব স্বভাবের উন্নতি সম্ভব এবং উন্নতি সাধন করতে হবে। এর জন্য যা কিছু করা দরকার হয়, পর্যায়ক্রমে সবই করতে হবে। নৈতিক উন্নতি এবং আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার উন্নতি—দুটিই করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই মনে করেন মানুষের নৈতিক উন্নতি অসম্ভব। এই ধারণা ভুল। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের নৈতিক উন্নতি অবশ্যই সম্ভব। নৈতিক উন্নতির কার্যক্রম বাদ দিয়ে যে উন্নয়নচিন্তা তা অপর্যাপ্ত।

সর্বজনীন গণতন্ত্রের প্রয়োজনে গণতন্ত্রের চলমান ধারণা ও কার্যক্রম পরিহার করতে হবে। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তদের ও ন্যায়কামী সবার কল্যাণে গণতন্ত্রকে নতুন রূপ ও প্রকৃতি দিতে হবে। সমাজতন্ত্রের ধারণাকে সমন্বিত করতে হবে অভীষ্ট সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যে। রাজনৈতিক দলে অবলম্বন করতে হবে নবসৃষ্টির ও নতুন রেনেসাঁসের স্পিরিট।

জাতিরাষ্ট্রে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ গঠন করতে হবে দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দ্বারা। দলকে জনসমর্থন অর্জন করতে হবে জনজীবনের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির কর্মসূচিভিত্তিক অঙ্গীকার ঘোষণা করে। দলের রাজনৈতিক চরিত্র ক্রমাগত উন্নত করতে হবে। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে নৈতিক অনুশীলন ও নৈতিক উন্নতি অপরিহার্য। ব্যক্তিগত অনুশীলনে যা সম্ভব হয় না, দলীয় অনুশীলন দ্বারা তা সম্ভব করতে হবে। রাজনীতি সম্পর্কে আশির দশক থেকে চলে আসা ধারণার আমূল পরিবর্তন করতে হবে।

পশ্চাদ্বর্তী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করে অগ্রবর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রগতিশীল জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তি গ্রহণ করে শক্তিশালী হতে হবে। ঐক্যহীন, নেতৃত্বহীন, দুর্বলরা শক্তিশালী হতে পারে মহান লক্ষ্য নিয়ে, নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের থেকে, নিজেদের জন্য উন্নত নেতৃত্ব সৃষ্টি করে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে। ঐক্যহীন, নেতৃত্বহীন, লক্ষ্যহীন, কর্মসূচিহীন ও কার্যক্রমহীন হয়ে দুর্বল থাকলে শোষণ-বঞ্চনা ভোগ করতেই হয়। দুর্বল থাকা অন্যায়।

জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিশ্বব্যবস্থাকেও পুনর্গঠিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে আন্তরাষ্ট্রিক ফেডারেল বিশ্বসরকার। বিশ্বসরকার হবে জাতীয় সরকারগুলোর ঊর্ধ্বতন এক সরকার। তার কাজ সীমাবদ্ধ থাকবে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আন্তরাষ্ট্রিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে, বিরোধ মীমাংসায়, যুদ্ধ যাতে না লাগে তার জন্য কাজ করায়, যুদ্ধ যদি লেগে যায়, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থামানোতে এবং আন্তরাষ্ট্রিক শক্তি রক্ষায়। রাষ্ট্রের  অভ্যন্তরীণ সব কাজ করবে রাষ্ট্রীয় সরকার। শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে বিশ্বসরকারের কাছে একটি সেনাবাহিনী রেখে সব রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করতে হবে।

জাতিসংঘকে আন্তরাষ্ট্রিক ফেডারেল বিশ্বসরকারে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আন্তরাষ্ট্রিক ফেডারেল বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভিন্ন ধারার কাজ লাগবে।

বিশ্বায়ন ও বিশ্বব্যাংক নির্দেশিত পথ পৃথিবীর ৯৫ শতাংশ মানুষের জন্য বিপথ। বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদরা নিজ নিজ জাতিকে এবং গোটা মানবজাতিকে এই বিপথ অবলম্বন করে চলার দিকনির্দেশই দিয়ে থাকেন। দুর্বল দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোতে অর্থনীতিবিদদের চিন্তা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তাই গুরুত্ব পায় না। এটা শুভকর নয়। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের বেলায় অর্থনীতিবিদদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে হবে।

মানুষ যদি তার চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তিকে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠনে ও উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত করে, তাহলে মাত্র তিন দশক কালের মধ্যে যে সুফল দেখা দেবে, তা কল্পনা করাও এখন দুঃসাধ্য। মানুষ যদি বিবেককে জাগ্রত ও সক্রিয় রেখে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে, বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে জেনারেশনের পর জেনারেশনের চেষ্টায় সব কিছুই পারবে।

প্রকৃতিতে প্রাণিকুলের মধ্যে দেখা যায় খাদ্য-খাদক সম্পর্ক। আর মানুষের সমাজে দেখা যায় শোষক-শোষিত সম্পর্ক। প্রকৃতির ন্যায়—মাৎস্যন্যায়। বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে খায়। বাঘ-সিংহ হরিণকে মেরে খায়। কোনো প্রতিকার নেই। ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন নেই। ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপারে প্রকৃতি উদাসীন, ন্যায়-অন্যায় সম্পূর্ণই মানবীয় ব্যাপার। অবশ্য মানুষ প্রকৃতির অন্তর্গত। মানুষের সমাজ প্রবল দুর্বলের ওপর শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা ও নির্যাতন চালায়। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন আছে, প্রতিকারের উপায় আছে। দুর্বল মানুষেরা ন্যায় প্রতিষ্ঠার ও অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা চালাতে পারে। দৈহিক ও মানসিক শক্তির দিক দিয়ে মানুষ পরস্পর সমান না হওয়ায় সমস্যা জটিল। মানবপ্রকৃতি এমন যে কোনো শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একবার জয়ী হলে তা চিরকালের বিজয় হয় না; মানুষের সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হয়। ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে সাধনা ও সংগ্রাম করে এগিয়ে চলতে হয়। কালের ব্যবধানে ন্যায়, ইনসাফ, জাস্টিস বিষয়ে ধারণা বদলায়। ঘন ঘন বদলায় না, ঐতিহাসিক কালের ব্যবধানে বদলায়। বলা যায়, Eternal vigilence is the price of liberty.

দুর্বল জাতিগুলোকে বুঝতে হবে যে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান চিন্তাধারা ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মধারার সুস্পষ্ট দুটি শাখা আছে। এক শাখায় আছে সর্বজনীন কল্যাণচিন্তা, মহান আবিষ্কারক-উদ্ভাবন, প্রগতিশীল দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য ও আদর্শ। এ শাখা সৃষ্টিশীল, প্রগতিশীল, মানবজাতির জন্য কল্যাণকর, সব জাতির জন্য কোনো না কোনোভাবে গ্রহণীয়। অপর শাখায় আছে কায়েমি স্বার্থবাদ ও প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলতা—উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। এ ধারা মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে থেকে এই দ্বিতীয় ধারার চিন্তক ও কর্মীরা আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ ধরে পর্যায়ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে কর্তৃত্ব দখল করে নিয়েছে। তাতে দেখা দিয়েছে পশ্চিমা সভ্যতার সংকট। পশ্চিমের কর্তৃত্বশীল শক্তিগুলোকে বলা যায় অপশক্তি। আজকের অত্যুন্নত প্রযুক্তির দুনিয়ায় কর্তৃত্বশীল আছে এই অপশক্তি।

পশ্চিমা অপশক্তির কর্তৃত্বে মানবজাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার জনগণের নৈতিক জাগরণ ও ঐক্য দরকার। পশ্চিমা অপশক্তির বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোতেও অবশ্যই প্রতিবাদ ও গণজাগরণ দেখা দেবে।

ভবিষ্যতের উন্নত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা দরকার। রাজনীতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তিন দশক ধরে ব্যস্ত আছে কেবল নির্বাচন নিয়ে চিন্তায়। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন, সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন ইত্যাদি কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। ‘মানুষ নির্বাচনপাগল’, ‘মানুষ ভোটপাগল’। এসব কথা কি ঠিক? দরকার নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা। নতুন কল্পনা। ভবিষ্যতের উন্নত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা দেখা দিলে সৃষ্টি হবে নতুন আশাবাদ—নবযুগ।