ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

আওয়ামী লীগ-বিএনপি গণতন্ত্রের শত্রু না বন্ধু : চিররঞ্জন সরকার

আগামী জাতীয় নির্বাচন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে হবে, না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে, সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে, নাকি বর্জনের পথে এগোবে আপাতত রাজনীতিতে এই প্রশ্নগুলো উচ্চারিত হচ্ছে। মোট কথা নির্বাচনকালীন শাসন প্রক্রিয়া এবং সেই নির্বাচনে বিএনপির অংশ্রগহণ করা না-করাই আমাদের আগামী দিনের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যতের নিয়ামক হয়ে উঠেছে।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচন যার অধীনেই হোক, বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক আর না করুক, দেশের মানুষ কিন্তু ঠিকই বিপুল সংখ্যায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন! ভোট প্রদানে আমাদের দেশের মানুষের সীমাহীন উৎসাহ। হতে পারে এক দিনের জন্য হলেও হয়তো তাদের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম নেয় যে, তাঁদের হাতেই রয়েছে ক্ষমতার চাবিকাঠি!

ভোটাধিকার প্রয়োগে আমাদের দেশের মানুষ বরাবরই উৎসাহী। বাঙালির কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন ছিল স্বাধীনতার আগে সত্তরের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র-ভয়-কৌশল সব কিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দেশের মানুষ বিপুল ভোটে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে বিজয়ী করে। ১৯৭০ এর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে। ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনেই জয় পায় আওয়ামী লীগ। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। এই নির্বাচনের ফলাফলই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশকে ত্বরান্বিত করে।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে মানুষ প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ১৯৭৩ সালে। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি  আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে।

সেই সময় নির্বাচন পরিচালনার কাজটি কিন্তু সহজ ছিল না। ভোটারদের প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিলেন নিরক্ষর, যাদের কথা ভেবে প্রার্থীর নামের সঙ্গে প্রতীকের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। নারীদের নাম তালিকাভুক্ত করাও ছিল একটি বড় সমস্যা। গ্রাম-বাংলায় তখন অনেক নারীরই পরিচিতি ছিল কেবল অমুকের মা বা তমুকের বউ হিসেবে। তাদের নাম খুঁজে তালিকাভুক্ত করাটা ছিল খুবই দূরূহ কাজ। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচনের উপকরণ পাঠানো, নির্বাচন কেন্দ্র স্থাপন, ভোটগণনা, ফলপ্রকাশ ইত্যাদি ছিল আরও কঠিন। তারপরও সেই সময় নির্বাচন হয়েছে বড় কোনো ধরনের প্রশ্ন বা অভিযোগ ছাড়াই।

এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার মান বেড়েছে। প্রশাসনিক স্তরও বিন্যস্ত হয়েছে। তাপরও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ও অভিযোগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এখন প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল উভয়ের বিরুদ্ধেই অভিযোগ শোনা যায়। প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পক্ষপাতিত্বের। আর রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগের তো কোনো শেষ নেই।

নির্বাচন নামক গণতন্ত্রের উৎসবকে নিয়ে এখন তৈরি হয় বেশ কিছু প্রশ্নও। প্রার্থীদের দুর্নীতি এবং নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে থাকার অভিযোগ, নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির পেশিশক্তির ব্যবহার, এই সব বিষয় বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর সচেতন মহলের আস্থা নিশ্চয় কিছুটা কমিয়েছে। তবে লক্ষণীয়, এই সব প্রশ্ন এবং সংশয় মূলত নির্বাচনব্যবস্থার বাস্তব রূপায়ণকে ঘিরে। নির্বাচন আরও ঠিক ভাবে পরিচালিত হলে হয়তো এই সব সংশয়ের নিরাময় হবে। কিন্তু এর বাইরেও একটি বিষয় রয়েছে, যেটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নির্বাচনের অবিংসবাদী গুরুত্বকেই প্রশ্ন করে।

আমাদের রাজনীতির কয়েক দশকের গতিবিধি খেয়াল করলে মনে হতে পারে যে, গণতন্ত্রের অর্থ হল নির্বাচন এবং কেবলমাত্রই নির্বাচন। নির্বাচন যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশমাত্র (হোক না সে অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ), আরও অনেকগুলি প্রক্রিয়া যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আমাদের দেশের গণতন্ত্র সে কথাটা যেন সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে। এই বিস্মৃতি গণতন্ত্রকেই নানা ভাবে দুর্বল করে চলেছে। প্রশ্নটা নিয়ে আরও অনেক বিস্তৃত আলাপ-আলোচনা দরকার।

ভোটদানের অধিকার আসলে মানুষের জীবন এবং জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও কয়েকটি অধিকার (যেমন খাদ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা) সুনিশ্চিত করার প্রথম ধাপ মাত্র। প্রথম ধাপটি সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করা আমাদের গণতন্ত্রের পক্ষে অবশ্যই জরুরি, কিন্তু পরের লক্ষ্যগুলি অর্জিত না হলে প্রথম ধাপের সাফল্য অনেকটাই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিপুল বিস্তার, বৈচিত্র্য এবং সাফল্য কি রাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যর্থতাকে কিছুটা হলেও আড়াল করে না?

নির্বাচনী পরিসরের বাইরে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলি রয়েছে, সেগুলির গুরুত্ব হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়, যখন নির্বাচন এবং গণতন্ত্র সমার্থক বলে বিবেচিত হয়। স্বাধীন মতপ্রকাশ, মতবিনিময় এবং বিরুদ্ধমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, এই সবের মধ্যে দিয়ে একটি নির্বাচন-বহির্ভূত পরিসর আছে, গণতন্ত্রের সাফল্যে যার ভূমিকা অসীম। এই পরিসরে যে স্বর উঠে আসে তা অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের প্রতিস্পর্ধী হয়। নির্বাচনের বলে বলীয়ান হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত চাপিয়ে দিয়ে এই বৃহত্তর পরিসরটাকে সংকুচিত করার চেষ্টা চলে। সম্প্রতি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতি’র দোহাই দিয়ে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করাটা এরই উদাহরণ।

বর্তমানে আমাদের দেশে সমস্ত রাজনৈতিক দলেরই এক এবং অদ্বিতীয় লক্ষ্য হল নির্বাচনে জয়লাভ করা, সেটা যেভাবে হোক, যে কোনো মূল্যে হোক। রাষ্ট্রের সব নীতিই রচিত হচ্ছে নির্বাচনকে পাখির চোখ করে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির আমদানি ঘটে, তাদের হাত দিয়েই আমাদের দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির কবর রচিত হয়। সামরিক শাসকরা নির্বাচনকে পরিণত করে ক্ষমতায় থাকার জন্য যে কোনো মূল্যে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের হাতিয়ারে।

নব্বইয়ের পরে সামরিক শাসনের আপাত অবসান হলেও দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ‘নির্বাচনযন্ত্রকে কুক্ষিগত’ করে ‘বিজয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা’ আরও তীব্র হয়েছে। এখন ক্ষমতাসীন দলগুলোর প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে কীভাবে নির্বাচনযন্ত্রকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করা যাবে-সেই চিন্তায় এবং তা বাস্তবায়নের পথ-পদ্ধতি অুনসন্ধানে। এই ধারার সূচনা ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে, যিনি নির্বাচনকে বসান তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।

পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে বিচারপতির অবসর গ্রহণের বয়স বাড়িয়ে, নানা কৌশলের প্রয়োগ ঘটান তিনি। সংকটের শুরুটা সেখান থেকেই। এর পর যে কোনো মূল্যে নিজের লোককে নির্বাচনের দায়িত্বে বা নির্বাচনকালীন প্রশাসনে নিয়োগ দিতে কৌশলের খেলা চলছেই। এতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলেও কারও ভ্রূক্ষেপ নেই।

মনে রাখা দরকার যে, নির্বাচন এবং গণতন্ত্র যখন ‘মেটোনিমিক’ সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে ওঠে (অর্থাৎ অংশ যখন সম্পূর্ণের স্থান দখল করে), তখন তা হয়ে ওঠে অতীব বিপজ্জনক।

আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের দ্বারা প্রবর্তিত বিধি-ব্যবস্থায় আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে কি বিএনপির লাভ হবে? আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে? দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বড় বেশি ক্ষতি হবে? এই ক্ষতির কথা কি আওয়ামী লীগ স্বীকার করবে? আর কোনো রকম ছাড় না দিয়ে আওয়ামী লীগ যদি বিএনপিকে বাদ দিয়ে আবারও একটি নির্বাচন করে ফেলে তাহলে কি আওয়ামী লীগের খুব লাভ হবে? তাতে গণতন্ত্র বাঁচবে?

বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ‘নির্বাচনযন্ত্র দখলের মাধ্যমে’ ‘যে কোনো মূল্যে জয়ী হওয়ার মানসিকতা’র মধ্যেই নিহিত রয়েছে গণতন্ত্রের বিপদ! প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির এই ‘মানসিকতা’র পরিবর্তন কে করবে?

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

আওয়ামী লীগ-বিএনপি গণতন্ত্রের শত্রু না বন্ধু : চিররঞ্জন সরকার

আপডেট টাইম : ০৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ মার্চ ২০১৭

আগামী জাতীয় নির্বাচন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে হবে, না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে, সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে, নাকি বর্জনের পথে এগোবে আপাতত রাজনীতিতে এই প্রশ্নগুলো উচ্চারিত হচ্ছে। মোট কথা নির্বাচনকালীন শাসন প্রক্রিয়া এবং সেই নির্বাচনে বিএনপির অংশ্রগহণ করা না-করাই আমাদের আগামী দিনের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যতের নিয়ামক হয়ে উঠেছে।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচন যার অধীনেই হোক, বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক আর না করুক, দেশের মানুষ কিন্তু ঠিকই বিপুল সংখ্যায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন! ভোট প্রদানে আমাদের দেশের মানুষের সীমাহীন উৎসাহ। হতে পারে এক দিনের জন্য হলেও হয়তো তাদের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম নেয় যে, তাঁদের হাতেই রয়েছে ক্ষমতার চাবিকাঠি!

ভোটাধিকার প্রয়োগে আমাদের দেশের মানুষ বরাবরই উৎসাহী। বাঙালির কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন ছিল স্বাধীনতার আগে সত্তরের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র-ভয়-কৌশল সব কিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দেশের মানুষ বিপুল ভোটে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে বিজয়ী করে। ১৯৭০ এর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে। ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনেই জয় পায় আওয়ামী লীগ। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। এই নির্বাচনের ফলাফলই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশকে ত্বরান্বিত করে।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে মানুষ প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ১৯৭৩ সালে। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি  আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে।

সেই সময় নির্বাচন পরিচালনার কাজটি কিন্তু সহজ ছিল না। ভোটারদের প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিলেন নিরক্ষর, যাদের কথা ভেবে প্রার্থীর নামের সঙ্গে প্রতীকের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। নারীদের নাম তালিকাভুক্ত করাও ছিল একটি বড় সমস্যা। গ্রাম-বাংলায় তখন অনেক নারীরই পরিচিতি ছিল কেবল অমুকের মা বা তমুকের বউ হিসেবে। তাদের নাম খুঁজে তালিকাভুক্ত করাটা ছিল খুবই দূরূহ কাজ। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচনের উপকরণ পাঠানো, নির্বাচন কেন্দ্র স্থাপন, ভোটগণনা, ফলপ্রকাশ ইত্যাদি ছিল আরও কঠিন। তারপরও সেই সময় নির্বাচন হয়েছে বড় কোনো ধরনের প্রশ্ন বা অভিযোগ ছাড়াই।

এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার মান বেড়েছে। প্রশাসনিক স্তরও বিন্যস্ত হয়েছে। তাপরও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ও অভিযোগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এখন প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল উভয়ের বিরুদ্ধেই অভিযোগ শোনা যায়। প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পক্ষপাতিত্বের। আর রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগের তো কোনো শেষ নেই।

নির্বাচন নামক গণতন্ত্রের উৎসবকে নিয়ে এখন তৈরি হয় বেশ কিছু প্রশ্নও। প্রার্থীদের দুর্নীতি এবং নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে থাকার অভিযোগ, নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির পেশিশক্তির ব্যবহার, এই সব বিষয় বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর সচেতন মহলের আস্থা নিশ্চয় কিছুটা কমিয়েছে। তবে লক্ষণীয়, এই সব প্রশ্ন এবং সংশয় মূলত নির্বাচনব্যবস্থার বাস্তব রূপায়ণকে ঘিরে। নির্বাচন আরও ঠিক ভাবে পরিচালিত হলে হয়তো এই সব সংশয়ের নিরাময় হবে। কিন্তু এর বাইরেও একটি বিষয় রয়েছে, যেটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নির্বাচনের অবিংসবাদী গুরুত্বকেই প্রশ্ন করে।

আমাদের রাজনীতির কয়েক দশকের গতিবিধি খেয়াল করলে মনে হতে পারে যে, গণতন্ত্রের অর্থ হল নির্বাচন এবং কেবলমাত্রই নির্বাচন। নির্বাচন যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশমাত্র (হোক না সে অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ), আরও অনেকগুলি প্রক্রিয়া যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আমাদের দেশের গণতন্ত্র সে কথাটা যেন সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে। এই বিস্মৃতি গণতন্ত্রকেই নানা ভাবে দুর্বল করে চলেছে। প্রশ্নটা নিয়ে আরও অনেক বিস্তৃত আলাপ-আলোচনা দরকার।

ভোটদানের অধিকার আসলে মানুষের জীবন এবং জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও কয়েকটি অধিকার (যেমন খাদ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা) সুনিশ্চিত করার প্রথম ধাপ মাত্র। প্রথম ধাপটি সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করা আমাদের গণতন্ত্রের পক্ষে অবশ্যই জরুরি, কিন্তু পরের লক্ষ্যগুলি অর্জিত না হলে প্রথম ধাপের সাফল্য অনেকটাই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিপুল বিস্তার, বৈচিত্র্য এবং সাফল্য কি রাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যর্থতাকে কিছুটা হলেও আড়াল করে না?

নির্বাচনী পরিসরের বাইরে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলি রয়েছে, সেগুলির গুরুত্ব হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়, যখন নির্বাচন এবং গণতন্ত্র সমার্থক বলে বিবেচিত হয়। স্বাধীন মতপ্রকাশ, মতবিনিময় এবং বিরুদ্ধমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, এই সবের মধ্যে দিয়ে একটি নির্বাচন-বহির্ভূত পরিসর আছে, গণতন্ত্রের সাফল্যে যার ভূমিকা অসীম। এই পরিসরে যে স্বর উঠে আসে তা অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের প্রতিস্পর্ধী হয়। নির্বাচনের বলে বলীয়ান হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত চাপিয়ে দিয়ে এই বৃহত্তর পরিসরটাকে সংকুচিত করার চেষ্টা চলে। সম্প্রতি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতি’র দোহাই দিয়ে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করাটা এরই উদাহরণ।

বর্তমানে আমাদের দেশে সমস্ত রাজনৈতিক দলেরই এক এবং অদ্বিতীয় লক্ষ্য হল নির্বাচনে জয়লাভ করা, সেটা যেভাবে হোক, যে কোনো মূল্যে হোক। রাষ্ট্রের সব নীতিই রচিত হচ্ছে নির্বাচনকে পাখির চোখ করে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির আমদানি ঘটে, তাদের হাত দিয়েই আমাদের দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির কবর রচিত হয়। সামরিক শাসকরা নির্বাচনকে পরিণত করে ক্ষমতায় থাকার জন্য যে কোনো মূল্যে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের হাতিয়ারে।

নব্বইয়ের পরে সামরিক শাসনের আপাত অবসান হলেও দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ‘নির্বাচনযন্ত্রকে কুক্ষিগত’ করে ‘বিজয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা’ আরও তীব্র হয়েছে। এখন ক্ষমতাসীন দলগুলোর প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে কীভাবে নির্বাচনযন্ত্রকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করা যাবে-সেই চিন্তায় এবং তা বাস্তবায়নের পথ-পদ্ধতি অুনসন্ধানে। এই ধারার সূচনা ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে, যিনি নির্বাচনকে বসান তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।

পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে বিচারপতির অবসর গ্রহণের বয়স বাড়িয়ে, নানা কৌশলের প্রয়োগ ঘটান তিনি। সংকটের শুরুটা সেখান থেকেই। এর পর যে কোনো মূল্যে নিজের লোককে নির্বাচনের দায়িত্বে বা নির্বাচনকালীন প্রশাসনে নিয়োগ দিতে কৌশলের খেলা চলছেই। এতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলেও কারও ভ্রূক্ষেপ নেই।

মনে রাখা দরকার যে, নির্বাচন এবং গণতন্ত্র যখন ‘মেটোনিমিক’ সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে ওঠে (অর্থাৎ অংশ যখন সম্পূর্ণের স্থান দখল করে), তখন তা হয়ে ওঠে অতীব বিপজ্জনক।

আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের দ্বারা প্রবর্তিত বিধি-ব্যবস্থায় আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে কি বিএনপির লাভ হবে? আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে? দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বড় বেশি ক্ষতি হবে? এই ক্ষতির কথা কি আওয়ামী লীগ স্বীকার করবে? আর কোনো রকম ছাড় না দিয়ে আওয়ামী লীগ যদি বিএনপিকে বাদ দিয়ে আবারও একটি নির্বাচন করে ফেলে তাহলে কি আওয়ামী লীগের খুব লাভ হবে? তাতে গণতন্ত্র বাঁচবে?

বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ‘নির্বাচনযন্ত্র দখলের মাধ্যমে’ ‘যে কোনো মূল্যে জয়ী হওয়ার মানসিকতা’র মধ্যেই নিহিত রয়েছে গণতন্ত্রের বিপদ! প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির এই ‘মানসিকতা’র পরিবর্তন কে করবে?

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।