মানুষের ইবাদত ও আমল পরিমাপ করা হয় নিয়তের মাধ্যমে। বান্দা সব ধরনের আমলের প্রতিদান ও পুরস্কার পাবে নিয়ত অনুযায়ী। হাদিসে এসেছে, হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি- ‘প্রত্যেক কাজের ফলাফল নিয়ত অনুসারে হয়। প্রত্যেক মানুষ তার কাজের ফলাফল আল্লাহর কাছে তদ্রƒপ পাবে, যেরূপ সে নিয়ত করেছে’ (বুখারি : ১)। একজন মুসলমান যত আমলই করুন, যদি নিয়ত পরিশুদ্ধ না হয় তা হলে অনেক বড় বড় কাজও নিষ্ফল হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী! আপনি বলুন, আমাকে খাঁটি নিয়তে আল্লাহর ইবাদত করতে আদেশ করা হয়েছে’ (সুরা জুমার : ১১)। রাসুল (সা.)কে যে জিনিসের আদেশ দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয় তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আল্লাহর কাছে বান্দার আমলের কেবল নিয়তটুকুই পৌঁছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘নিয়ত ছাড়া কোনো আমল গ্রহণ করা হয় না।’ (আস-সুনানুল কুবরা : ৬/৪১)
কুরআনে নিয়তের গুরুত্ব
কোনো মুসলমান পার্থিব জগতের নিয়ত নিয়ে কাজ করবে আল্লাহ তাকে দুনিয়ায় বদলা দেবেন। আর যে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাতের উদ্দেশে কোনো আমল করবে সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে প্রতিদানপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিজ আমলের বদলা চাইবে তাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেব (আর আখেরাতে তার জন্য কোনো অংশ থাকবে না)। আর যে ব্যক্তি আখেরাতের বদলা চাইবে তাকে আখেরাতের সওয়াব দান করব (এবং দুনিয়াতেও দেব)। আমি শিগগিরই শোকর গুজারদের বদলা দেব। অর্থাৎ ওই সব লোককে শিগগিরই বদলা দেব যারা আখেরাতের সওয়াবের নিয়তে আমল করে। (সুরা আলে ইমরান : ১৪৫)
হাদিসে নিয়তের ফজিলত
আল্লাহ তায়ালার কাছে বান্দার আমলের ফয়সালা নিয়তের ওপর ভিত্তি করে হয়। বান্দার অন্তরের নিয়ত ও বাহ্যিক অবস্থার মিল থাকতে হবে। কারণ মহান আল্লাহ বান্দার বাহ্যিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আমলের প্রতিদান দেন না। সুতরাং প্রতিটি কাজের শুরুতে নিয়তকে ঠিক করতে হবে। ভালো কাজের নিয়তের জন্য উত্তম বদলা পাবে আর মন্দ কাজের জন্য পরিণাম ভোগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের আকার-আকৃতি এবং তোমাদের ধনসম্পদ দেখেন না, বরং তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমল দেখেন।’ (মুসলিম : ৬৭০৮)। রাসুল আরও বলেন, ‘সব আমলের ভিত্তি নিয়তের ওপরই। আর মানুষ যা নিয়ত করবে তাই পাবে।’ (বোখারি : ৫৪)
উত্তম নিয়তের উত্তম প্রতিদান
কোনো মুমিন কোনো ভালো কাজ সম্পাদনের জন্য নিয়ত করল, অথচ সে কোনো কারণে ওই কাজ সম্পাদন করতে পারেনি, তখনও সে সওয়াবপ্রাপ্ত হবে। উত্তম আমলের নিয়ত কখনো ব্যর্থ যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বান্দার উত্তম নিয়তের প্রতিদান অবশ্যই দেবেন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঘুমানোর জন্য নিজের বিছানায় আসে এবং তার নিয়ত এই হয় যে, রাতে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ পড়ব। কিন্তু ঘুম প্রবল হওয়ার কারণে সকালেই চোখ খোলে। তার জন্য তাহাজ্জুদের সওয়াব লিখে দেওয়া হয় এবং তার ঘুম তার রবের পক্ষ থেকে তার জন্য দানস্বরূপ হয়।’ (নাসাঈ : ১৭৯৮)। রাসুল আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তির নিয়ত আখেরাত হয় আল্লাহ তায়ালা তার সব কাজকে সহজ করে দেন, তার অন্তরকে ধনী করে দেন এবং দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে তার কাছে উপস্থিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ : ৪২৪৪)
মন্দ নিয়তের মন্দ পরিণাম
মানবসমাজে ‘মুখে মধু অন্তরে বিষ’ এমন স্বভাবের কিছু মানুষ রয়েছে। তারা অন্তরে অসভ্যতাকে লালন করে আর মুখে সভ্যতার বুলি ছোটে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা আত্মশুদ্ধির ভাব দেখায়, কিন্তু তাদের অন্তর কপটতায় ভরপুর। অথচ আল্লাহ তায়ালা বান্দার অন্তরের ইচ্ছা বা নিয়তের ওপর ভিত্তি করে কর্মফল দান করেন। সুতরাং মন্দ নিয়তকারী বাহ্যিকভাবে যতই উত্তমরূপ ধারণ করুক না কেন; কিন্তু আল্লাহ তার অন্তরের মন্দ নিয়তের পরিণাম নিশ্চিত ভোগ করাবেন। আল্লাহ তায়ালার কাছে শুধু নিয়তই বিবেচ্য। আল্লাহর কাছে বান্দার দৈহিক গঠন ও রং গ্রহণযোগ্য নয়, বরং আত্মার শুভ্রতাই গ্রহণযোগ্য। যাই হোক কোনো মুমিন ব্যক্তি দুনিয়া অর্জনের নিয়ত করবে সে শুধু দুনিয়াই পাবে, আখেরাতে তার কোনো প্রতিদান নেই। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, দুনিয়া যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য হয়ে যায় আল্লাহ তায়ালা তার সব কাজকে বিক্ষিপ্ত করে দেন (অর্থাৎ প্রত্যেক কাজে তাকে চিন্তিত করে দেন)। অভাবের ভয় তার চোখের সামনে করে দেন এবং দুনিয়া থেকে সে ওইটুকু পায় যেটুকু তার জন্য পূর্ব থেকে নির্ধারিত ছিল। (ইবনে মাজাহ : ৪২৪৪)
নিয়তের বিধান
ইসলামের ইবাদত দুই প্রকারে বিভক্ত- ১. মূলগতভাবে ইবাদত। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। ২. মূল ইবাদতের জন্য সহায়ক ইবাদত। যেমন- ওজু, গোসল, তায়াম্মুম ইত্যাদি। মূলগত ইবাদতগুলো নিয়ত ছাড়া শুদ্ধ হয় না। তাই নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি আদায় করতে নিয়ত করতে হবে। আর মূল ইবাদতের সহায়ক ইবাদতের জন্য নিয়ত জরুরি নয়। তাই ওজু, গোসল ইত্যাদি নিয়ত ছাড়া আদায় করা যাবে। তবে তায়াম্মুম ও মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া মূলগত ইবাদত না হলেও তাতে নিয়ত করা আবশ্যক। (আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ের : ৩০)।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























