ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গুইসাপের অভয়ারণ্য তীরচর

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার তীরচর গ্রাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে একটি সড়ক চলে গেছে বাতাঘাসী এলাকায়। সড়কের পাশে একটি খাল শুয়ে আছে। পানির প্রবাহ নেই। অনেকটা ডোবা বলা যেতে পারে। খালের বুকে কচুরিপানার আধিপত্য। এ সড়কে দিয়ে চলাচল করা নতুন পথচারীদের নজর আটকে যায় খালের পাড়ে। কেউ দূর থেকে ছবি তোলার চেষ্টা করেন। কারণ শীতের সময় এখানে রৌদ্রস্নান করে কিছু গুইসাপ। নামে সাপ হলেও এ নিরীহ প্রাণী কারও ক্ষতি করে না। তাই গ্রামবাসীও তাদের বিরক্ত করে না। সাত বছর ধরে এখানে প্রাণী ও মানুষের প্রেম চলছে। গ্রামটি দেড় শতাধিক গুইসাপের নিরাপদ আবাস বলে জানান স্থানীয়রা। সরেজমিন দেখা যায়, তীরচর গ্রামের হাসান সওদাগরের বাড়ি, ওয়ারিশ ব্যাপারীবাড়ির পাশের খালপাড় ও রুহুল আমিনের পুকুরপাড়ে গুইসাপের অভয়ারণ্য। তাদের রোদ পোহাতে দেখা যায়। এমন  আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে আছে যেন কোনো রাজ পরিবারের সদস্য! শব্দ পেলে ধুপধাপ শব্দ তুলে কচুরিপানায় মুখ লুকায়। বড় গুইসাপ দেখতে গাঢ় বাদামি। এদের সারা শরীরে চামড়ার ওপরের ত্বকে হলুদ রঙের রিং। পা ও নখ লম্বা। এরা দ্রুত গাছে উঠতে এবং সাঁতরে খাল পাড়ি দিতে পারে। বন বিভাগ সূত্র জানায়, এ প্রাণী গিরগিটি প্রজাতির। লম্বায় সর্বাধিক ১০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশের আকার ২ থেকে ৪ ফুট এবং প্রস্থে ১১ ইঞ্চি। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির গুইসাপ দেখা যায়। এগুলো হলো সোনা গুই, কালো গুই এবং রামগাদি বা বড় গুই। এরা কাঁকড়া, শামুক, ইঁদুর, হাঁস-মুরগির ডিম, পচাগলা প্রাণীদেহ, সাপ, ব্যাঙ, ছোট কুমির, কুমিরের ডিম ও কচ্ছপসহ নানা পশুপাখি ও উচ্ছিষ্ট খায়।

সামাজিক বন প্রশিক্ষণ ও নার্সারি কেন্দ্র চান্দিনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নগরায়ণ ও শিকারিদের দাপটে এ প্রাণী বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের বিবেচনায় ১৯৯০ সালে সরকার এদের হত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। গ্রামবাসী রুহুল আমিন বলেন, এগুলো কারও কোনো ক্ষতি করে না, আমরাও এগুলোর কোনো ক্ষতি করি না। এখানে দেড় শতাধিক গুইসাপ রয়েছে। অনেকে এগুলো দেখতে আসে, ছবি তোলে। মো. অহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি কয়েক দিন আগে ১৭টি গুইসাপ একসঙ্গে বসে থাকতে দেখেছেন। আজ আটটি দেখেছেন। পথ দিয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীরা গুইসাপগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। গোমতা ইসহাকিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন জানায়, আমরা স্কুলে যাওয়ার পথে গুইসাপগুলোকে খালের পাড়ে বসে থাকতে দেখি। আমরা এগুলোর কোনো ক্ষতি করি না। স্থানীয় পরিবেশ সংগঠক মতিন সৈকত বলেন, এটি নিরীহ উপকারী প্রাণী। নিরাপদ আবাস থাকায় এখানে গুইসাপগুলো বসবাস করছে। এখানে খালের পাড়ে ৮-১০টি পর্যন্ত গুইসাপকে রোদ পোহাতে দেখা যায়। গুইসাপের মতো আমাদের অন্যান্য প্রাণীরও যত্ন নেওয়া উচিত। কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জি এম মোহাম্মদ কবির বলেন, গুইসাপ প্রকৃতি, পরিবেশ ও কৃষকের বন্ধু। এরা ফসলি জমির পোকা ও ইঁদুর খেয়ে ফেলে। এগুলোর নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে আমরা কাজ করব।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

গুইসাপের অভয়ারণ্য তীরচর

আপডেট টাইম : ০৬:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার তীরচর গ্রাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে একটি সড়ক চলে গেছে বাতাঘাসী এলাকায়। সড়কের পাশে একটি খাল শুয়ে আছে। পানির প্রবাহ নেই। অনেকটা ডোবা বলা যেতে পারে। খালের বুকে কচুরিপানার আধিপত্য। এ সড়কে দিয়ে চলাচল করা নতুন পথচারীদের নজর আটকে যায় খালের পাড়ে। কেউ দূর থেকে ছবি তোলার চেষ্টা করেন। কারণ শীতের সময় এখানে রৌদ্রস্নান করে কিছু গুইসাপ। নামে সাপ হলেও এ নিরীহ প্রাণী কারও ক্ষতি করে না। তাই গ্রামবাসীও তাদের বিরক্ত করে না। সাত বছর ধরে এখানে প্রাণী ও মানুষের প্রেম চলছে। গ্রামটি দেড় শতাধিক গুইসাপের নিরাপদ আবাস বলে জানান স্থানীয়রা। সরেজমিন দেখা যায়, তীরচর গ্রামের হাসান সওদাগরের বাড়ি, ওয়ারিশ ব্যাপারীবাড়ির পাশের খালপাড় ও রুহুল আমিনের পুকুরপাড়ে গুইসাপের অভয়ারণ্য। তাদের রোদ পোহাতে দেখা যায়। এমন  আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে আছে যেন কোনো রাজ পরিবারের সদস্য! শব্দ পেলে ধুপধাপ শব্দ তুলে কচুরিপানায় মুখ লুকায়। বড় গুইসাপ দেখতে গাঢ় বাদামি। এদের সারা শরীরে চামড়ার ওপরের ত্বকে হলুদ রঙের রিং। পা ও নখ লম্বা। এরা দ্রুত গাছে উঠতে এবং সাঁতরে খাল পাড়ি দিতে পারে। বন বিভাগ সূত্র জানায়, এ প্রাণী গিরগিটি প্রজাতির। লম্বায় সর্বাধিক ১০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশের আকার ২ থেকে ৪ ফুট এবং প্রস্থে ১১ ইঞ্চি। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির গুইসাপ দেখা যায়। এগুলো হলো সোনা গুই, কালো গুই এবং রামগাদি বা বড় গুই। এরা কাঁকড়া, শামুক, ইঁদুর, হাঁস-মুরগির ডিম, পচাগলা প্রাণীদেহ, সাপ, ব্যাঙ, ছোট কুমির, কুমিরের ডিম ও কচ্ছপসহ নানা পশুপাখি ও উচ্ছিষ্ট খায়।

সামাজিক বন প্রশিক্ষণ ও নার্সারি কেন্দ্র চান্দিনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নগরায়ণ ও শিকারিদের দাপটে এ প্রাণী বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের বিবেচনায় ১৯৯০ সালে সরকার এদের হত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। গ্রামবাসী রুহুল আমিন বলেন, এগুলো কারও কোনো ক্ষতি করে না, আমরাও এগুলোর কোনো ক্ষতি করি না। এখানে দেড় শতাধিক গুইসাপ রয়েছে। অনেকে এগুলো দেখতে আসে, ছবি তোলে। মো. অহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি কয়েক দিন আগে ১৭টি গুইসাপ একসঙ্গে বসে থাকতে দেখেছেন। আজ আটটি দেখেছেন। পথ দিয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীরা গুইসাপগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। গোমতা ইসহাকিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন জানায়, আমরা স্কুলে যাওয়ার পথে গুইসাপগুলোকে খালের পাড়ে বসে থাকতে দেখি। আমরা এগুলোর কোনো ক্ষতি করি না। স্থানীয় পরিবেশ সংগঠক মতিন সৈকত বলেন, এটি নিরীহ উপকারী প্রাণী। নিরাপদ আবাস থাকায় এখানে গুইসাপগুলো বসবাস করছে। এখানে খালের পাড়ে ৮-১০টি পর্যন্ত গুইসাপকে রোদ পোহাতে দেখা যায়। গুইসাপের মতো আমাদের অন্যান্য প্রাণীরও যত্ন নেওয়া উচিত। কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জি এম মোহাম্মদ কবির বলেন, গুইসাপ প্রকৃতি, পরিবেশ ও কৃষকের বন্ধু। এরা ফসলি জমির পোকা ও ইঁদুর খেয়ে ফেলে। এগুলোর নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে আমরা কাজ করব।