ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
খাবার থেকে শরীরে বাড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত ঢাকা-দিল্লি : পররাষ্ট্রমন্ত্রী হঠাৎ ৬ মুসলিম দেশের যৌথ সামরিক মহড়া, কী বার্তা দিচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সরকার ও বিএনপিতে বড় রদবদলের আভাস ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সেবা দিতে ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করল ভুবন ভোলানো হাসিতে মন জয় করা সেই তাহসিন মোদির আমন্ত্রণ রিভিউ করছে ঢাকা বাংলাদেশের নতুন ওয়ানডে অধিনায়ক লিটন কৃষকের ‘কপাল পুড়িয়ে’ ভেকু দিয়ে খাল খনন খাদ্য নিরাপত্তা-কৃষকের স্বার্থে এগ্রিভোল্টাইক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে হবে

খাবার থেকে শরীরে বাড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান

পানীয় জল, খাবার, পোশাক, এমনকি আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই—সবখানেই এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীর থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফ, পৃথিবীর প্রায় সব পরিবেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

শুধু পরিবেশেই নয়, মানবদেহের মস্তিষ্ক,হৃদযন্ত্র , প্রজনন অঙ্গ, প্লাসেন্টা, রক্ত, প্রস্রাব, বুকের দুধ এমনকি নবজাতকের প্রথম মল পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ থেকে ৪ কোটি টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে। বড় প্লাস্টিকের জিনিস ভেঙে যেমন এসব কণা তৈরি হয়, তেমনি রং, টুথপেস্ট, প্রসাধনী ও পরিষ্কারক পণ্যের মতো বিভিন্ন সামগ্রীতেও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডিজায়ারি লাবিউড বলেন, প্লাস্টিক কখনো সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে আরও ছোট ছোট কণায় বিভক্ত হতে থাকে। ফলে এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।

প্লাস্টিকের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

প্লাস্টিকের যুগ শুরু হয় ১৯০৭ সালে, যখন বেলজীয় রসায়নবিদ লিও বেকেল্যান্ড বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্লাস্টিক আবিষ্কার করেন। টেকসই, হালকা, নমনীয় ও কম খরচে উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় এটি দ্রুত চিকিৎসা, নির্মাণ, পোশাক, খাদ্য মোড়কজাতকরণসহ নানা খাতে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

তবে এর দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যই আজ বড় পরিবেশগত সংকটের কারণ। সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে বাতাস, পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে সমুদ্রের গভীরতা থেকে এভারেস্টের চূড়া পর্যন্ত এবং মানবদেহসহ প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রজাতির প্রাণীর শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর?

মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান হলেও এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মানবদেহের মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, প্লাসেন্টা, অণ্ডকোষ, পাকস্থলী, লিম্ফ নোডসহ বিভিন্ন অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এমনকি প্রস্রাব, মাতৃদুগ্ধ, বীর্য এবং নবজাতকের প্রথম মলেও এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করা, কোষের ক্ষতি এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় এটি প্রজনন, পরিপাক ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি কোলন ও ফুসফুসের ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যাদের ধমনির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল, তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে, কারণ তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তখনও বিকাশমান থাকে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় শিশুদের টনসিলের গভীর অংশেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষকরা এখন এটি শিশুদের থাইরয়েড রোগ বা হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কতদিন থাকে বা দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করে। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো এবং প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার এড়িয়ে চলাই মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কী করা যেতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও এর সংস্পর্শ কমানো যেতে পারে। এজন্য একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার, প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ সময় পানি না রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সূত্র: স্ট্যান্ডফোর্ড মেডিসিন 

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

খাবার থেকে শরীরে বাড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান

খাবার থেকে শরীরে বাড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

পানীয় জল, খাবার, পোশাক, এমনকি আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই—সবখানেই এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীর থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফ, পৃথিবীর প্রায় সব পরিবেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

শুধু পরিবেশেই নয়, মানবদেহের মস্তিষ্ক,হৃদযন্ত্র , প্রজনন অঙ্গ, প্লাসেন্টা, রক্ত, প্রস্রাব, বুকের দুধ এমনকি নবজাতকের প্রথম মল পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ থেকে ৪ কোটি টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে। বড় প্লাস্টিকের জিনিস ভেঙে যেমন এসব কণা তৈরি হয়, তেমনি রং, টুথপেস্ট, প্রসাধনী ও পরিষ্কারক পণ্যের মতো বিভিন্ন সামগ্রীতেও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডিজায়ারি লাবিউড বলেন, প্লাস্টিক কখনো সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে আরও ছোট ছোট কণায় বিভক্ত হতে থাকে। ফলে এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।

প্লাস্টিকের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

প্লাস্টিকের যুগ শুরু হয় ১৯০৭ সালে, যখন বেলজীয় রসায়নবিদ লিও বেকেল্যান্ড বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্লাস্টিক আবিষ্কার করেন। টেকসই, হালকা, নমনীয় ও কম খরচে উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় এটি দ্রুত চিকিৎসা, নির্মাণ, পোশাক, খাদ্য মোড়কজাতকরণসহ নানা খাতে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

তবে এর দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যই আজ বড় পরিবেশগত সংকটের কারণ। সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে বাতাস, পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে সমুদ্রের গভীরতা থেকে এভারেস্টের চূড়া পর্যন্ত এবং মানবদেহসহ প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রজাতির প্রাণীর শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর?

মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান হলেও এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মানবদেহের মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, প্লাসেন্টা, অণ্ডকোষ, পাকস্থলী, লিম্ফ নোডসহ বিভিন্ন অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এমনকি প্রস্রাব, মাতৃদুগ্ধ, বীর্য এবং নবজাতকের প্রথম মলেও এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করা, কোষের ক্ষতি এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় এটি প্রজনন, পরিপাক ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি কোলন ও ফুসফুসের ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যাদের ধমনির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল, তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে, কারণ তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তখনও বিকাশমান থাকে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় শিশুদের টনসিলের গভীর অংশেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষকরা এখন এটি শিশুদের থাইরয়েড রোগ বা হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কতদিন থাকে বা দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করে। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো এবং প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার এড়িয়ে চলাই মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কী করা যেতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও এর সংস্পর্শ কমানো যেতে পারে। এজন্য একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার, প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ সময় পানি না রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সূত্র: স্ট্যান্ডফোর্ড মেডিসিন