ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

আমাদের ক্ষমতা আমাদের অধিকার

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ কিছুদিন আগে আমার সাথে দুইজন ছাত্রী দেখা করতে এসেছে। রাগে দুঃখে ক্ষোভে তাদের হাউমাউ করে কাঁদার মত অবস্থা, কিন্তু বড় হয়ে গেছে বলে সেটি করতে পারছে না। তারা দুজনেই খুবই ভালো ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র ছাত্রীদের নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার একটা স্বপ্ন থাকে। তবে শিক্ষকতার জন্যে আবেদন করার জন্য একটা নির্দিষ্ট গ্রেড থাকতে হয়। সেই গ্রেড থেকে কম গ্রেড হলে আবেদনই করা যায় না। ছাত্রী দুজন আমাকে জানালো তারা যেন কোনোভাবেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্যে আবেদন করতে না পারে সেই জন্যে তাদের একটি কোর্সে খুব হিসেবে করে মার্কস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোর্সের টার্ম টেস্টে তারা কতো পেয়েছে সেটাও তাদেরকে জানতে দেওয়া হচ্ছে না। তারা তাদের পরীক্ষার খাতাটি নূতন করে দেখানোর জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, কোনো লাভ হয়নি।

আমি তাদেরকে কী বলে শান্তনা দেব বুঝতে পারিনি, তাদের কথা শুনে বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় সিস্টেমে বহুদিন থেকে আছি, এই ব্যাপারগুলো এতোবার দেখেছি, এতোভাবে দেখেছি যে মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের উপরই ঘেন্না ধরে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম কানুনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে একজন বা কয়েকজন শিক্ষক মিলে চাইলেই একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পুরো জীবনটা ধ্বংস করে দিতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জন্যে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে ভয়ংকর বাক্যটি হচ্ছে, তোমাকে আমি দেখে নিব। এবং তারা দেখে নেয়। বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি। একসময় যখন আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি তখন আমি অনেকবার ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে কথা বলেছি, পরীক্ষার খাতা দেখার ব্যাপারে স্বচ্ছতার কথা বলেছি। মনে আছে একেবারে শুরুর দিকে আমি একাডেমিক কাউন্সিলে প্রস্তাব দিয়েছিলাম পরীক্ষার খাতা দেখার পর শিক্ষকেরা যেন খাতাগুলো ছাত্রছাত্রীদের ফেরত দেন তাহলে ছাত্রছাত্রীরা জানতে পারবে তারা কোথায় কী ভুল করেছে। আমার কথা শুনে পুরো একাডেমিক কাউন্সিল এমনভাবে হই হই করে উঠেছিল যেন আমি একটা পাগলা গারদ থেকে ছুটে বের হয়ে এখানে চলে এসেছি। কেউ কি জানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে পরীক্ষার খাতা দেখতে হয় খাতাটিতে কলম স্পর্শ না করে?

যাই হোক আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করার কোনো পথ নেই। কোনো কোনো শিক্ষক তাদের ওপর এই ভয়ংকর অবিচার করেই যাবে তারা বিচারের জন্যে কোথাও যেতে পারবে না। তখন হঠাৎ করে আমার মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের (কিংবা বাংলাদেশের যে কোনো মানুষের) হাতে যে একেবারে কোনো অস্ত্র নেই সেটি সত্যি নয়। এই দেশের বেশীরভাগ মানুষ জানে না যে এই দেশে একটা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রয়োজনীয় আইন আছে যেটা ব্যবহার করে অনেক কিছু করে ফেলা যায়। সেই আইনটি হচ্ছে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯।

খুবই সহজ করে বলা যায় এই আইনটি ব্যবহার করে আমরা সরকারের কাছ থেকে সরকারি কাজ সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য জানতে পারি। তথ্য বলতে বোঝানো হচ্ছে সরকারি অফিস কিংবা বেসরকারী অফিসে রাখা ফাইলে, দলিলে, কম্পিউটারে রাখা যে কোনো তথ্য। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা এই ধরণের কিছু তথ্য জানা যাবে না কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সেগুলো জানার কোনো প্রয়োজনও থাকে না–যে তথ্যগুলো জানতে পারলেই কেউ আমাদের উপর অবিচার করতে পারবে না সেই তথ্যগুলো আমাদের জানার পুরোপুরি অধিকার আছে। কাজেই আমাদের সেই ছাত্রী দুইজন যদি তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তাদের পরীক্ষার নম্বর

বের করে নিয়ে আসতে পারতো তাহলে সত্যিই তাদের উপর অবিচার করা হয়েছে কিনা সেটা দিনের আলোর মত পরিস্কার হয়ে যেতো। শুধু তাই না, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অমানুষ শিক্ষকেরা যদি বুঝতে পারে এতোদিন যে অস্বচ্ছ দেওয়ালের আড়ালে বসে তারা তাদের কাজকর্ম করে এসেছে সেই দেওয়ালটা যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো ছাত্র গুড়িয়ে ফেলতে পারবে তাহলে তারা অপকর্ম করার সাহস পাবে না। একটা দেশকে দূর্নীতিমুক্ত করতে এর চাইতে বেশী শক্তিশালী অস্ত্র দেশের একেবারে সাধারণ মানুষের হাতে কখনো এসেছে বলে আমার জানা নেই।

২-বছরখানেক আগে আমার মনে হলো এই তথ্য অধিকার আইন সত্যিই কাজ করে কিনা সেটা একটু পরীক্ষা করে দেখি। আমার জন্যে পরীক্ষা করার সবচেয়ে সহজ জায়গা হচ্ছে আমার বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এমন একজন ভাইস চ্যান্সেলর রাজত্ব করছেন যিনি ছাত্রলীগের ছাত্রদের ব্যবহার করে শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলিয়েছেন। ছাত্রলীগের ছেলেরা প্রকাশ্যে প্রায় ঘোষণা দিয়েই টেন্ডারবাজী করে, নানারকম বাণিজ্যের কথা শোনা যায়।

তবে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে আমি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অফিসের ফাইলপত্রে রাখা তথ্যটুকু জানতে পারব, সেই তথ্যগুলো কেন এরকম বা তার প্রতিকার চাইতে পারব না। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে, তিনটি ভিন্ন চিঠিতে তিনটি তথ্য জানতে চাইলাম (১) আগের ভাইস চ্যান্সেলররা তাদের নানা মিটিংয়ে কতো টাকা সম্মানী নিয়েছেন এবং বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর কতো নিচ্ছেন। (২) বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ধরনের ছাত্র সংগঠনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে কতো টাকা দেওয়া হয়েছে? (৩) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল করে ধরা পড়ে বহিস্কৃত হওয়া একজন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চিঠি পাঠিয়ে আমি বসে আছি কিন্তু কোনো উত্তর আসে না। অনেকদিন পার হওয়ার পর আমি আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে আমার আবেদনের ফলাফল জানতে চাইলাম। এবারেও কোনো উত্তর নেই। আমি মোটামুটি কাতর গলাতে রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কাছে অনুরোধের পর অনুরোধ করতে থাকি, যে নিদেন পক্ষে আপনি যে চিঠিগুলো পেয়েছেন অন্তত তার প্রাপ্তি স্বীকারটুকু করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দফতর পুরোপুরি নীরব। রেজিস্ট্রার মহোদয় আমার বন্ধুস্থানীয় মানুষ, আমাদের বিল্ডিংয়ের নীচতলায় থাকেন, যেতে আসতে দেখা হয়। আমি অন্য সামাজিক কথাবার্তা বলি, আমার তথ্য সরবরাহ নিয়ে কথা বলি না। কারণ আমি অনুমান করতে পারি ভাইস চ্যান্সেলর অনুমতি না দিলে তিনি নিজে থেকে কিছুই করতে পারবেন না।

অনেক দিন পার হওয়ার পর আমি তথ্য অধিকার কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ করেছি যে আমি কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই তথ্য আমাকে জানাচ্ছে না। আরো কিছুদিন পার হয়ে গেলো, তখন হঠাৎ করে তথ্য অধিকার কমিশন থেকে চিঠি এসেছে যে আমার অভিযোগের কারণে একটা শুনানী হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে ডাকা হয়েছে, আমাকেও ডাকা হয়েছে। রীতিমত হই চই ব্যাপার।

পুরো ব্যাপারটা দেখার জন্যে আমার শুনানীতে যাওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু আমি এতো ব্যস্ত থাকি তার মাঝে সময় বের করা কঠিন। আমি অনুরোধ করলাম আমার অনুপস্থিতেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে। তা ছাড়া রেজিস্ট্রার মহোদয় আমার আপন মানুষ, তাকে কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে জবাবদিহি চাওয়া হচ্ছে সেটা মোটেও ভালো দেখায় না, বিশেষ করে আমি যখন জানি আসলে তাঁর কিছু করার নেই। ভাইস চ্যান্সেলরের অনুমতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক টুকরো কাগজও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায় না।

শেষ পর্যন্ত শুনানী হয়েছিল, সেখানে কী হয়েছে আমি জানি না। ততদিনে আগের ভাইস চ্যান্সেলর বিদায় নিয়েছেন। নূতন ভাইস চ্যান্সেলর এসেছেন। কাজেই হঠাৎ একদিন রেজিস্ট্রার মহোদয় নিজে এসে আমাকে আমার জানতে চাওয়া তথ্যগুলো দিয়ে গেলেন। কয়দিন পরে একটা বিল এলো, কাগজপত্রগুলো ফটোকপি করতে চার টাকা খরচ হয়েছে। তথ্য অধিকার আইনে এই খরচটুকু আমাকে দিতে হবে। আমি খুবই আনন্দের সাথে চার টাকার একটি চেক লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলাম।

এই হচ্ছে তথ্য অধিকার আইন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা। যখন আমি চিঠি চালাচালি করছিলাম তখন আমি অনেক কিছু জানতাম না। তথ্য জানার নিয়ম কানুনগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট। এখন চাইলে আমি আরো গুছিয়ে করতে পারব। আমি যেটুকু জানি সেটি সবাইকে জানাতে চাই। আমার ধারণা শুধুমাত্র তথ্য জেনে কিংবা জানতে চেয়ে দেশকে দূর্নীতিমুক্ত করার একরকম সুযোগটি আমাদের সবার ব্যবহার করা দরকার।

৩-তথ্য জানতে চাওয়ার সুনির্দিষ্ট ফর্ম আছে। ফর্মটি এরকম। কারো কাছে যদি ফর্মটি না থাকে সাদা কাগজেও এই তথ্যগুলো জানিয়ে আবেদন করা যায়।

এই আবেদন করার বিশ থেকে ত্রিশ দিনের ভেতর তথ্য পেয়ে যাওয়ার কথা। যদি পাওয়া না যায় তাহলে পরবর্তী ত্রিশ দিনের ভেতরে নিচের ফর্ম ব্যবহার করে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে আপিল করতে হবে। আবেদন করার পনেরো দিনের ভেতর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য সরবরাহ করার কথা।

যদি আপীল করার পরেও কাজ না হয় তাহলে ত্রিশ দিনের ভেতরে নিচের ফর্ম ব্যবহার করে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে হবে।

তথ্য কমিশন তখন দুই পক্ষকে ডেকে শুনানী করে ৪৫ থেকে ৭৫ দিনের ভেতর অভিযোগ নিস্পত্তি করে দেবে। আমি যতদূর জানি কমিশনের শুনানী পর্যন্ত যেতে হয় না, এর আগেই তথ্য পেয়ে যাওয়া যায়। আবার মনে করিয়ে দিই আমাদের অধিকার শুধু তথ্যটি জানার, কেন তথ্যটি এরকম সেটি কিন্তু আমরা জানতে পারব না।

৪-সামনের বছর তথ্য অধিকার আইনের দশ বছর পূর্ণ হবে। দশ বছরে এটি যেভাবে ব্যবহার করার কথা এখনো সেভাবে ব্যবহার শুরু হয়নি। আগে সরকারের কাছে তথ্য দাবী করতে অনেকেই ভয় পেতেন এখন তারা জানতে শুরু করেছেন এটি তাদের অধিকার, জানতে চাওয়ার মাঝে কোনো ভয় নেই। যারা তথ্য দেবেন তারাও উৎসাহ নিয়ে সাহায্য করতে শুরু করেছেন।

যারা তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করেছেন তাদের কারো কারো সাথে কথা বলে আমি খুব মজা পেয়েছি কারণ আসল তথ্য প্রকাশ পেয়ে যাবার ভয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দ্রুত সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে এরকম উদাহরণও আছে।

তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে কী ধরনের তথ্য জানতে চাওয়া যায় তার কিছু উদাহরণ দিই তাহলেই এই অসাধারণ আইনটির ক্ষমতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

(ক) অমুক শিক্ষক স্কুলে আসেন না, বিগত তিন মাসে এরকম কতজন শিক্ষক বেআইনী ভাবে অনুপস্থিত ছিলেন তার তালিকা এবং তাদের বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে দেখতে চাই।
(খ) অমুক প্রতিষ্ঠানের মহিলা শ্রমিক পুরুষ শ্রমিক থেকে কম মজুরী পান, এ ব্যাপারে সরকারী নীতিমালা দেখতে চাই।
(গ) অমুক এনজিও যারা ঋণের কিস্তি সময়মত শোধ করতে পারিনি তাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাই।
(ঘ) গত অর্থ বছরে কোন কোন সংসদ সদস্য বিদেশ সফরের জন্য সরকারের কোষাগার থেকে কতো টাকা নিয়েছেন জানতে চাই।
(ঙ) অমুক ব্যাংকের গত পাঁচ বছরের ঋণ খেলাপীর তালিকা পেতে চাই।
(চ) অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির জন্য কতোজনকে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করা হয়েছে তার বিবরণ পেতে চাই।
(ছ) ট্রাফিক পুলিশ কোনো কোনো গাড়ীকে নিয়মের বাইরে রাস্তায় মোড় নিতে দেয় এ ব্যাপারে কোনো নিয়ম আছে কী না জানতে চাই।
(জ) প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলাদেশে সরকারী এবং বেসরকারী  কয়টি হোম আছে তার তালিকা জানতে চাই।
(ঝ) মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয় জানতে চাই।
(ঞ) আমাদের অঞ্চলে কৃষকদের যে বীজ দেওয়া হয়েছে সরকারি ল্যাবরেটরিতে তার পরীক্ষার রিপোর্টের কপি পেতে চাই।

এখানে শুধু মাত্র অল্প কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া হলো, এরকম অসংখ্য উদাহরণ থাকা সম্ভব। কেউ যেন মনে না করে এটি সরকারী অফিসগুলোকে হয়রানি করার জন্যে দেয়া হয়েছে। মোটেও তা নয়। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, দেশের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ।

আমরাই যদি ক্ষমতার মালিক হয়ে থাকি তাহলে সরকারী কাজ কীভাবে চলছে সেটা জানার অধিকার আমার আছে। সে জন্যে একটা আইনও আছে। কাজেই আমরা যদি আইনটি ঠিক ভাবে ব্যবহার করি তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরো স্বচ্ছ হবে সবার জন্যে। এর আগে আমরা কী আমাদের হাতে এতো বড় একটা ক্ষমতা কখনো পেয়েছিলাম? যদি পেয়ে না থাকি তাহলে দেশকে ঠিক করে চালানোর জন্যে কেন এটি ব্যবহার করছি না?

(এই লেখাটি লেখার জন্যে আমি রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ এর প্রকাশিত পুস্তিকার সাহায্য নিয়েছি।)

লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

আমাদের ক্ষমতা আমাদের অধিকার

আপডেট টাইম : ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ কিছুদিন আগে আমার সাথে দুইজন ছাত্রী দেখা করতে এসেছে। রাগে দুঃখে ক্ষোভে তাদের হাউমাউ করে কাঁদার মত অবস্থা, কিন্তু বড় হয়ে গেছে বলে সেটি করতে পারছে না। তারা দুজনেই খুবই ভালো ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র ছাত্রীদের নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার একটা স্বপ্ন থাকে। তবে শিক্ষকতার জন্যে আবেদন করার জন্য একটা নির্দিষ্ট গ্রেড থাকতে হয়। সেই গ্রেড থেকে কম গ্রেড হলে আবেদনই করা যায় না। ছাত্রী দুজন আমাকে জানালো তারা যেন কোনোভাবেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্যে আবেদন করতে না পারে সেই জন্যে তাদের একটি কোর্সে খুব হিসেবে করে মার্কস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোর্সের টার্ম টেস্টে তারা কতো পেয়েছে সেটাও তাদেরকে জানতে দেওয়া হচ্ছে না। তারা তাদের পরীক্ষার খাতাটি নূতন করে দেখানোর জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, কোনো লাভ হয়নি।

আমি তাদেরকে কী বলে শান্তনা দেব বুঝতে পারিনি, তাদের কথা শুনে বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় সিস্টেমে বহুদিন থেকে আছি, এই ব্যাপারগুলো এতোবার দেখেছি, এতোভাবে দেখেছি যে মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের উপরই ঘেন্না ধরে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম কানুনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে একজন বা কয়েকজন শিক্ষক মিলে চাইলেই একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পুরো জীবনটা ধ্বংস করে দিতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জন্যে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে ভয়ংকর বাক্যটি হচ্ছে, তোমাকে আমি দেখে নিব। এবং তারা দেখে নেয়। বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি। একসময় যখন আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি তখন আমি অনেকবার ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে কথা বলেছি, পরীক্ষার খাতা দেখার ব্যাপারে স্বচ্ছতার কথা বলেছি। মনে আছে একেবারে শুরুর দিকে আমি একাডেমিক কাউন্সিলে প্রস্তাব দিয়েছিলাম পরীক্ষার খাতা দেখার পর শিক্ষকেরা যেন খাতাগুলো ছাত্রছাত্রীদের ফেরত দেন তাহলে ছাত্রছাত্রীরা জানতে পারবে তারা কোথায় কী ভুল করেছে। আমার কথা শুনে পুরো একাডেমিক কাউন্সিল এমনভাবে হই হই করে উঠেছিল যেন আমি একটা পাগলা গারদ থেকে ছুটে বের হয়ে এখানে চলে এসেছি। কেউ কি জানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে পরীক্ষার খাতা দেখতে হয় খাতাটিতে কলম স্পর্শ না করে?

যাই হোক আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করার কোনো পথ নেই। কোনো কোনো শিক্ষক তাদের ওপর এই ভয়ংকর অবিচার করেই যাবে তারা বিচারের জন্যে কোথাও যেতে পারবে না। তখন হঠাৎ করে আমার মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের (কিংবা বাংলাদেশের যে কোনো মানুষের) হাতে যে একেবারে কোনো অস্ত্র নেই সেটি সত্যি নয়। এই দেশের বেশীরভাগ মানুষ জানে না যে এই দেশে একটা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রয়োজনীয় আইন আছে যেটা ব্যবহার করে অনেক কিছু করে ফেলা যায়। সেই আইনটি হচ্ছে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯।

খুবই সহজ করে বলা যায় এই আইনটি ব্যবহার করে আমরা সরকারের কাছ থেকে সরকারি কাজ সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য জানতে পারি। তথ্য বলতে বোঝানো হচ্ছে সরকারি অফিস কিংবা বেসরকারী অফিসে রাখা ফাইলে, দলিলে, কম্পিউটারে রাখা যে কোনো তথ্য। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা এই ধরণের কিছু তথ্য জানা যাবে না কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সেগুলো জানার কোনো প্রয়োজনও থাকে না–যে তথ্যগুলো জানতে পারলেই কেউ আমাদের উপর অবিচার করতে পারবে না সেই তথ্যগুলো আমাদের জানার পুরোপুরি অধিকার আছে। কাজেই আমাদের সেই ছাত্রী দুইজন যদি তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তাদের পরীক্ষার নম্বর

বের করে নিয়ে আসতে পারতো তাহলে সত্যিই তাদের উপর অবিচার করা হয়েছে কিনা সেটা দিনের আলোর মত পরিস্কার হয়ে যেতো। শুধু তাই না, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অমানুষ শিক্ষকেরা যদি বুঝতে পারে এতোদিন যে অস্বচ্ছ দেওয়ালের আড়ালে বসে তারা তাদের কাজকর্ম করে এসেছে সেই দেওয়ালটা যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো ছাত্র গুড়িয়ে ফেলতে পারবে তাহলে তারা অপকর্ম করার সাহস পাবে না। একটা দেশকে দূর্নীতিমুক্ত করতে এর চাইতে বেশী শক্তিশালী অস্ত্র দেশের একেবারে সাধারণ মানুষের হাতে কখনো এসেছে বলে আমার জানা নেই।

২-বছরখানেক আগে আমার মনে হলো এই তথ্য অধিকার আইন সত্যিই কাজ করে কিনা সেটা একটু পরীক্ষা করে দেখি। আমার জন্যে পরীক্ষা করার সবচেয়ে সহজ জায়গা হচ্ছে আমার বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এমন একজন ভাইস চ্যান্সেলর রাজত্ব করছেন যিনি ছাত্রলীগের ছাত্রদের ব্যবহার করে শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলিয়েছেন। ছাত্রলীগের ছেলেরা প্রকাশ্যে প্রায় ঘোষণা দিয়েই টেন্ডারবাজী করে, নানারকম বাণিজ্যের কথা শোনা যায়।

তবে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে আমি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অফিসের ফাইলপত্রে রাখা তথ্যটুকু জানতে পারব, সেই তথ্যগুলো কেন এরকম বা তার প্রতিকার চাইতে পারব না। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে, তিনটি ভিন্ন চিঠিতে তিনটি তথ্য জানতে চাইলাম (১) আগের ভাইস চ্যান্সেলররা তাদের নানা মিটিংয়ে কতো টাকা সম্মানী নিয়েছেন এবং বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর কতো নিচ্ছেন। (২) বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ধরনের ছাত্র সংগঠনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে কতো টাকা দেওয়া হয়েছে? (৩) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল করে ধরা পড়ে বহিস্কৃত হওয়া একজন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চিঠি পাঠিয়ে আমি বসে আছি কিন্তু কোনো উত্তর আসে না। অনেকদিন পার হওয়ার পর আমি আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে আমার আবেদনের ফলাফল জানতে চাইলাম। এবারেও কোনো উত্তর নেই। আমি মোটামুটি কাতর গলাতে রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কাছে অনুরোধের পর অনুরোধ করতে থাকি, যে নিদেন পক্ষে আপনি যে চিঠিগুলো পেয়েছেন অন্তত তার প্রাপ্তি স্বীকারটুকু করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দফতর পুরোপুরি নীরব। রেজিস্ট্রার মহোদয় আমার বন্ধুস্থানীয় মানুষ, আমাদের বিল্ডিংয়ের নীচতলায় থাকেন, যেতে আসতে দেখা হয়। আমি অন্য সামাজিক কথাবার্তা বলি, আমার তথ্য সরবরাহ নিয়ে কথা বলি না। কারণ আমি অনুমান করতে পারি ভাইস চ্যান্সেলর অনুমতি না দিলে তিনি নিজে থেকে কিছুই করতে পারবেন না।

অনেক দিন পার হওয়ার পর আমি তথ্য অধিকার কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ করেছি যে আমি কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই তথ্য আমাকে জানাচ্ছে না। আরো কিছুদিন পার হয়ে গেলো, তখন হঠাৎ করে তথ্য অধিকার কমিশন থেকে চিঠি এসেছে যে আমার অভিযোগের কারণে একটা শুনানী হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে ডাকা হয়েছে, আমাকেও ডাকা হয়েছে। রীতিমত হই চই ব্যাপার।

পুরো ব্যাপারটা দেখার জন্যে আমার শুনানীতে যাওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু আমি এতো ব্যস্ত থাকি তার মাঝে সময় বের করা কঠিন। আমি অনুরোধ করলাম আমার অনুপস্থিতেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে। তা ছাড়া রেজিস্ট্রার মহোদয় আমার আপন মানুষ, তাকে কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে জবাবদিহি চাওয়া হচ্ছে সেটা মোটেও ভালো দেখায় না, বিশেষ করে আমি যখন জানি আসলে তাঁর কিছু করার নেই। ভাইস চ্যান্সেলরের অনুমতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক টুকরো কাগজও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায় না।

শেষ পর্যন্ত শুনানী হয়েছিল, সেখানে কী হয়েছে আমি জানি না। ততদিনে আগের ভাইস চ্যান্সেলর বিদায় নিয়েছেন। নূতন ভাইস চ্যান্সেলর এসেছেন। কাজেই হঠাৎ একদিন রেজিস্ট্রার মহোদয় নিজে এসে আমাকে আমার জানতে চাওয়া তথ্যগুলো দিয়ে গেলেন। কয়দিন পরে একটা বিল এলো, কাগজপত্রগুলো ফটোকপি করতে চার টাকা খরচ হয়েছে। তথ্য অধিকার আইনে এই খরচটুকু আমাকে দিতে হবে। আমি খুবই আনন্দের সাথে চার টাকার একটি চেক লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলাম।

এই হচ্ছে তথ্য অধিকার আইন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা। যখন আমি চিঠি চালাচালি করছিলাম তখন আমি অনেক কিছু জানতাম না। তথ্য জানার নিয়ম কানুনগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট। এখন চাইলে আমি আরো গুছিয়ে করতে পারব। আমি যেটুকু জানি সেটি সবাইকে জানাতে চাই। আমার ধারণা শুধুমাত্র তথ্য জেনে কিংবা জানতে চেয়ে দেশকে দূর্নীতিমুক্ত করার একরকম সুযোগটি আমাদের সবার ব্যবহার করা দরকার।

৩-তথ্য জানতে চাওয়ার সুনির্দিষ্ট ফর্ম আছে। ফর্মটি এরকম। কারো কাছে যদি ফর্মটি না থাকে সাদা কাগজেও এই তথ্যগুলো জানিয়ে আবেদন করা যায়।

এই আবেদন করার বিশ থেকে ত্রিশ দিনের ভেতর তথ্য পেয়ে যাওয়ার কথা। যদি পাওয়া না যায় তাহলে পরবর্তী ত্রিশ দিনের ভেতরে নিচের ফর্ম ব্যবহার করে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে আপিল করতে হবে। আবেদন করার পনেরো দিনের ভেতর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য সরবরাহ করার কথা।

যদি আপীল করার পরেও কাজ না হয় তাহলে ত্রিশ দিনের ভেতরে নিচের ফর্ম ব্যবহার করে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে হবে।

তথ্য কমিশন তখন দুই পক্ষকে ডেকে শুনানী করে ৪৫ থেকে ৭৫ দিনের ভেতর অভিযোগ নিস্পত্তি করে দেবে। আমি যতদূর জানি কমিশনের শুনানী পর্যন্ত যেতে হয় না, এর আগেই তথ্য পেয়ে যাওয়া যায়। আবার মনে করিয়ে দিই আমাদের অধিকার শুধু তথ্যটি জানার, কেন তথ্যটি এরকম সেটি কিন্তু আমরা জানতে পারব না।

৪-সামনের বছর তথ্য অধিকার আইনের দশ বছর পূর্ণ হবে। দশ বছরে এটি যেভাবে ব্যবহার করার কথা এখনো সেভাবে ব্যবহার শুরু হয়নি। আগে সরকারের কাছে তথ্য দাবী করতে অনেকেই ভয় পেতেন এখন তারা জানতে শুরু করেছেন এটি তাদের অধিকার, জানতে চাওয়ার মাঝে কোনো ভয় নেই। যারা তথ্য দেবেন তারাও উৎসাহ নিয়ে সাহায্য করতে শুরু করেছেন।

যারা তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করেছেন তাদের কারো কারো সাথে কথা বলে আমি খুব মজা পেয়েছি কারণ আসল তথ্য প্রকাশ পেয়ে যাবার ভয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দ্রুত সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে এরকম উদাহরণও আছে।

তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে কী ধরনের তথ্য জানতে চাওয়া যায় তার কিছু উদাহরণ দিই তাহলেই এই অসাধারণ আইনটির ক্ষমতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

(ক) অমুক শিক্ষক স্কুলে আসেন না, বিগত তিন মাসে এরকম কতজন শিক্ষক বেআইনী ভাবে অনুপস্থিত ছিলেন তার তালিকা এবং তাদের বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে দেখতে চাই।
(খ) অমুক প্রতিষ্ঠানের মহিলা শ্রমিক পুরুষ শ্রমিক থেকে কম মজুরী পান, এ ব্যাপারে সরকারী নীতিমালা দেখতে চাই।
(গ) অমুক এনজিও যারা ঋণের কিস্তি সময়মত শোধ করতে পারিনি তাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাই।
(ঘ) গত অর্থ বছরে কোন কোন সংসদ সদস্য বিদেশ সফরের জন্য সরকারের কোষাগার থেকে কতো টাকা নিয়েছেন জানতে চাই।
(ঙ) অমুক ব্যাংকের গত পাঁচ বছরের ঋণ খেলাপীর তালিকা পেতে চাই।
(চ) অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির জন্য কতোজনকে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করা হয়েছে তার বিবরণ পেতে চাই।
(ছ) ট্রাফিক পুলিশ কোনো কোনো গাড়ীকে নিয়মের বাইরে রাস্তায় মোড় নিতে দেয় এ ব্যাপারে কোনো নিয়ম আছে কী না জানতে চাই।
(জ) প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলাদেশে সরকারী এবং বেসরকারী  কয়টি হোম আছে তার তালিকা জানতে চাই।
(ঝ) মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয় জানতে চাই।
(ঞ) আমাদের অঞ্চলে কৃষকদের যে বীজ দেওয়া হয়েছে সরকারি ল্যাবরেটরিতে তার পরীক্ষার রিপোর্টের কপি পেতে চাই।

এখানে শুধু মাত্র অল্প কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া হলো, এরকম অসংখ্য উদাহরণ থাকা সম্ভব। কেউ যেন মনে না করে এটি সরকারী অফিসগুলোকে হয়রানি করার জন্যে দেয়া হয়েছে। মোটেও তা নয়। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, দেশের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ।

আমরাই যদি ক্ষমতার মালিক হয়ে থাকি তাহলে সরকারী কাজ কীভাবে চলছে সেটা জানার অধিকার আমার আছে। সে জন্যে একটা আইনও আছে। কাজেই আমরা যদি আইনটি ঠিক ভাবে ব্যবহার করি তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরো স্বচ্ছ হবে সবার জন্যে। এর আগে আমরা কী আমাদের হাতে এতো বড় একটা ক্ষমতা কখনো পেয়েছিলাম? যদি পেয়ে না থাকি তাহলে দেশকে ঠিক করে চালানোর জন্যে কেন এটি ব্যবহার করছি না?

(এই লেখাটি লেখার জন্যে আমি রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ এর প্রকাশিত পুস্তিকার সাহায্য নিয়েছি।)

লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।