ঢাকা , রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই দেশে বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা রয়েছে, যা বিশ্বের কোথাও নেই : শিক্ষামন্ত্রী সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দর থেকে সরানো হচ্ছে ১৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদ গণভোট বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করব: জামায়াত আমির ঢাকা মেডিকেল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্র হবে : ডা. জুবাইদা রহমান অপতথ্যের বড় লক্ষ্যবস্তু বিএনপি-তারেক রহমান ‘২ লাখ ৪২ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া’— দাবিটি বিভ্রান্তিকর এক ঘণ্টায় হাজারো রুটি, কেরানীগঞ্জ কারাগারে অত্যাধুনিক মেশিনের চমক এআই নিয়ে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে: আইসিটি মন্ত্রী চার বছর পর মুখ খুললেন পরীমণি, জানালেন বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল

রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি আসলে কতটা

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তির সময়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টিআইবি৷ রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে সেখানে৷ রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে সংস্কারের প্রত্যাশা পদদলিত হতে পারে- এমন আশঙ্কাও করছে জার্মানিভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)৷

সংস্থাটি বলছে, দেশে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার জন্য যা করা দরকার, তা করা হচ্ছে না৷ অন্তর্বর্তী সরকার অ্যাডহক ভিত্তিতে কাজ করছে৷ মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি৷

সেইসাথে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্স এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে টিআইবির এ প্রতিবেদনে৷

সোমবার প্রকাশিত ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবি বলেছে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব গত এক বছরে অনেক বেশি বেড়েছে৷ তথ্য প্রকাশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনো বাধার মুখে রয়েছে৷ অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের কারণে নারীর অধিকার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, যা বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক৷

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল সোমবার (৪ আগস্ট) প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়৷ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম ও মো. জুলকারনাইন৷

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘সরকারে তথ্য প্রকাশে সমন্বয়হীনতা ও গোপনীয়তার প্রবণতা রয়েছে৷ ভারতের অবন্ধুসুলভ আচরণের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সংকট ও তার ফলে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত৷”

টিআইবি বলছে, রাখাইনে ‘মানবিক করিডোর’দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান ও তথ্য প্রকাশে ঘাটতি রয়েছে৷ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অবন্ধুসুলভ আচরণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ; সীমান্তে হত্যা ও ‘পুশইন’অব্যাহত; বাণিজ্যে বাধা আরোপ; কূটনৈতিক টানাপোড়েন; শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া না জানানোও সরকারের ঘাটতি বলে মনে করে টিআইবি৷

আইনশৃঙ্খলার অবনতি

এক বছরের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে৷ অব্যাহত রয়েছে খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, লুটপাট, অরাজকতা৷ আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা (মব জাস্টিস), গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও মনে করে টিআইবি৷

ঢালাওভাবে মামলায় আসামি হিসেবে নাম দেওয়া, গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ বাড়লে গ্রেপ্তার বৃদ্ধির অভিযোগ বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যুও অব্যাহত রয়েছে৷

আন্দোলন দমন করতে পুলিশের কার্যক্রমে বৈষম্য, কোনো পক্ষের প্রতি নমনীয় মনোভাব, কোনো পক্ষের ওপর নির্যাতন হয়েছে৷

চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিচার, নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কারসহ নানা ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হলেও অন্তর্বর্তী সরকার বিগত এক বছরে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে৷

সুশাসনের আলোকে বিচার ও প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বেশ কিছু ঘাটতি দেখছে টিআইবি৷ এ কারণে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি৷

সংস্কার কমিশনগুলো যেসব সুপারিশ দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই৷ কোথাও কোথাও কিছু সুপারিশ বেছে নেওয়া হয়েছে৷ আবার অনেক জায়গায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ সরকার কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা প্রকাশ না করায় বিভিন্ন সময় জনগণ ও অংশীজনদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে৷

৭০ শতাংশ মামলায় ‘সন্তোষজনক অগ্রগতি’

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানে হত্যায় জড়িত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে৷

সরকার পতন-পরবর্তী ১১ মাসে সারাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলায় আসামি এক হাজার ১৬৮ পুলিশ৷ এর মধ্যে ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারী, হত্যার ইন্ধনদাতা ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে মামলা হয়েছে৷ দায়ের হওয়া মামলা এক হাজার ৬০২টি৷এর মধ্যে হত্যা মামলা ৬৩৮টি৷ এসব মামলায় পতিত সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আনুমানিক ৮৭ জন গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ৭০ শতাংশ মামলার তদন্তে ‘সন্তোষজনক অগ্রগতি’রয়েছে৷ ৬০-৭০টি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে৷

এক বছর হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে৷ এর মধ্যে অভিযোগ এসেছে ৪২৯টি ও মামলা ২৭টি৷ শেখ হাসিনাসহ ২০৬ জন আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭৩ জনকে৷ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনের আগেই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ তবে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে ধীরগতি আছে৷ জুলাই-আগস্টে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান৷

টিআইবি বলছে, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একধরনের তড়িঘড়ি বা ‘অ্যাডহক’মনোভাব দেখা গেছে৷ প্রশাসন চালাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট হয়েছে৷ প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে একদলীয়করণ থেকে সরে এসে আরেক দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা গেছে৷ এতে প্রশাসনে অস্থিরতা ও কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে৷

গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের নিজস্ব এজেন্ডা সামনে আসায় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে৷ ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের পথ আরো জটিল হয়ে পড়েছে৷ মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদও স্পষ্ট৷

গবেষণা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা চাঁদাবাজি, পরিবহণ টার্মিনাল দখল এবং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়েছে৷

সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘‘সংস্কারের বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোনো রূপরেখা নিশ্চিত নয়৷ ফলে সংস্কারের প্রত্যাশা পদদদিলত হওয়া ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে৷”

রাজনৈতিক দলের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব

টিআইবির গবেষক মো. জুলকারনাইন প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘আমরা অনেক রাজনৈতিক দলের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব দেখতে পেয়েছি৷ রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে৷ এ কারণে তারা অপকর্মে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না৷ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার প্রবণতা রয়েছে৷ আমরা দলীয় লোকদের মধ্যে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রবণতাও দেখেছি৷”

একই অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের জন্য বহু উদ্যোগ নিলেও তার অনেকগুলোই অ্যাডহক বা সাময়িক প্রকৃতির এবং বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই৷ অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চাপের কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে৷”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি যে, একেবারে নতুন গঠিত একটি রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু সদস্য দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতে জড়িত৷ সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি, কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা যথেষ্ট করছি না৷”

টিআইবির প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতার কথা, রাজনৈতিক দলগুলোর বেপরোয়া কর্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা বলছেন৷ টিআইবির করা গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলকে চলমান অবস্থার বাস্তব প্রতিফল বলে মনে করছেন কেউ কেউ৷

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘‘দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচন নিয়ে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে৷ এক গ্রুপ দ্রুত নির্বাচন চায়, আরেক গ্রুপ চায় নির্বাচন পেছাতে৷ আর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বচ্ছতা এবং বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতের কারণে৷ সরকারের মধ্যেও একটি গ্র্রুপ নির্বাচন পিছিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়৷ সংস্কার বা প্রয়োজনীয় কাজে সরকার যথাসময়ে মনোযোগী হয়নি৷ ফলে, এক বছরে মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছে৷ মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে৷ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্স সব মিলিয়ে টিআইবি যা বলছে, তা বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন৷”

ড. জাহেদ উর রহমান কথা, ‘‘এই সরকারের ওপর জামায়াতের প্রচণ্ড প্রভাব আছে৷ দুই তরুণ উপদেষ্টা তো নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির জন্য কাজ করছে৷ বিএনপিরও প্রভাব আছে৷ ফলে, সরকারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ সরকার যে সংস্কারগুলো দ্রুত করতে পারতো, তা করেনি৷ আর এক বছরেও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি৷ সব মিলিয়ে পুরো দেশই একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে৷”

টিআইবির গবেষণার তথ্য ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে মানবাধিকার কর্মী এবং গুম কমিশনের সদস্য নূর খান বলেন, ‘‘টিআইবি যা বলেছে, তা উপেক্ষা বা অস্বীকার করার সুযোগ নাই৷ মানুষ যে আশা করেছিল, যে আস্থা রেখেছিল, সেই জায়গায় যাওয়া যায়নি, থাকাও যায়নি৷ মানুষের চোখে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা৷ এক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও দেশ পরিচালনায় মানুষ যে সফলতার আশা করেছিল, তা সুদূর পরাহত হয়েছে৷ মানবাধিকার, গণতন্ত্র কোনো দিকেই আশা দেখছি না৷ গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ হলো, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে৷ মব ভায়োলেন্স আছে, বাকস্বাধীনতা,সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে৷ উগ্রবাদের আস্ফালন বেড়েছে৷ আর রাজনৈতিক সংকটের তো আশঙ্কা আছেই৷ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে৷ নির্বাচন নিয়ে ধূসরতার কারণে এটা হচ্ছে।’’

জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘কর্তৃত্ববাদের পুনর্বিকাশ দেশবাসী চায় না৷ আমরা যদি কর্তৃত্ববাদ বিদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সবাই একতাবদ্ধ হতে পারি এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারি, তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি৷ আমাদের সামনে বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের জঞ্জাল আছে৷ সেটা সরানো সহজ নয়৷ কিন্তু আমরা সবাই- রাজনৈতিক দল, যারা এখন সরকারে আছেন, দেশের মানুষ, নাগরিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে কর্তৃত্ববাদের অবসানে কাজ করি, তাহলে আমাদের পক্ষে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব৷”

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘‘জাতীয় ঐকমত্যের যে দলিল প্রকাশ করা হবে, সেটার একটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে৷ পুরো জাতির কাছে এটা থাকবে৷ এটা পুরো জাতির দলিল৷ এখন যারা ক্ষমতায় যাবে, যারা ক্ষমতার বাইরে থাকবে – সবার দায়িত্ব হবে এই দলিল বাস্তবায়ন করা৷ তারা এটা না করলে দেশের মানুষ চাপ সৃষ্টি করতে পারবে৷ আসলে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই৷

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই

রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি আসলে কতটা

আপডেট টাইম : ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তির সময়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টিআইবি৷ রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে সেখানে৷ রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে সংস্কারের প্রত্যাশা পদদলিত হতে পারে- এমন আশঙ্কাও করছে জার্মানিভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)৷

সংস্থাটি বলছে, দেশে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার জন্য যা করা দরকার, তা করা হচ্ছে না৷ অন্তর্বর্তী সরকার অ্যাডহক ভিত্তিতে কাজ করছে৷ মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি৷

সেইসাথে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্স এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে টিআইবির এ প্রতিবেদনে৷

সোমবার প্রকাশিত ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবি বলেছে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব গত এক বছরে অনেক বেশি বেড়েছে৷ তথ্য প্রকাশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনো বাধার মুখে রয়েছে৷ অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের কারণে নারীর অধিকার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, যা বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক৷

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল সোমবার (৪ আগস্ট) প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়৷ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম ও মো. জুলকারনাইন৷

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘সরকারে তথ্য প্রকাশে সমন্বয়হীনতা ও গোপনীয়তার প্রবণতা রয়েছে৷ ভারতের অবন্ধুসুলভ আচরণের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সংকট ও তার ফলে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত৷”

টিআইবি বলছে, রাখাইনে ‘মানবিক করিডোর’দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান ও তথ্য প্রকাশে ঘাটতি রয়েছে৷ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অবন্ধুসুলভ আচরণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ; সীমান্তে হত্যা ও ‘পুশইন’অব্যাহত; বাণিজ্যে বাধা আরোপ; কূটনৈতিক টানাপোড়েন; শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া না জানানোও সরকারের ঘাটতি বলে মনে করে টিআইবি৷

আইনশৃঙ্খলার অবনতি

এক বছরের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে৷ অব্যাহত রয়েছে খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, লুটপাট, অরাজকতা৷ আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা (মব জাস্টিস), গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও মনে করে টিআইবি৷

ঢালাওভাবে মামলায় আসামি হিসেবে নাম দেওয়া, গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ বাড়লে গ্রেপ্তার বৃদ্ধির অভিযোগ বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যুও অব্যাহত রয়েছে৷

আন্দোলন দমন করতে পুলিশের কার্যক্রমে বৈষম্য, কোনো পক্ষের প্রতি নমনীয় মনোভাব, কোনো পক্ষের ওপর নির্যাতন হয়েছে৷

চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিচার, নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কারসহ নানা ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হলেও অন্তর্বর্তী সরকার বিগত এক বছরে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে৷

সুশাসনের আলোকে বিচার ও প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বেশ কিছু ঘাটতি দেখছে টিআইবি৷ এ কারণে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি৷

সংস্কার কমিশনগুলো যেসব সুপারিশ দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই৷ কোথাও কোথাও কিছু সুপারিশ বেছে নেওয়া হয়েছে৷ আবার অনেক জায়গায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ সরকার কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা প্রকাশ না করায় বিভিন্ন সময় জনগণ ও অংশীজনদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে৷

৭০ শতাংশ মামলায় ‘সন্তোষজনক অগ্রগতি’

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানে হত্যায় জড়িত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে৷

সরকার পতন-পরবর্তী ১১ মাসে সারাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলায় আসামি এক হাজার ১৬৮ পুলিশ৷ এর মধ্যে ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারী, হত্যার ইন্ধনদাতা ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে মামলা হয়েছে৷ দায়ের হওয়া মামলা এক হাজার ৬০২টি৷এর মধ্যে হত্যা মামলা ৬৩৮টি৷ এসব মামলায় পতিত সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আনুমানিক ৮৭ জন গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ৭০ শতাংশ মামলার তদন্তে ‘সন্তোষজনক অগ্রগতি’রয়েছে৷ ৬০-৭০টি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে৷

এক বছর হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে৷ এর মধ্যে অভিযোগ এসেছে ৪২৯টি ও মামলা ২৭টি৷ শেখ হাসিনাসহ ২০৬ জন আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭৩ জনকে৷ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনের আগেই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ তবে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে ধীরগতি আছে৷ জুলাই-আগস্টে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান৷

টিআইবি বলছে, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একধরনের তড়িঘড়ি বা ‘অ্যাডহক’মনোভাব দেখা গেছে৷ প্রশাসন চালাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট হয়েছে৷ প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে একদলীয়করণ থেকে সরে এসে আরেক দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা গেছে৷ এতে প্রশাসনে অস্থিরতা ও কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে৷

গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের নিজস্ব এজেন্ডা সামনে আসায় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে৷ ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের পথ আরো জটিল হয়ে পড়েছে৷ মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদও স্পষ্ট৷

গবেষণা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা চাঁদাবাজি, পরিবহণ টার্মিনাল দখল এবং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়েছে৷

সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘‘সংস্কারের বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোনো রূপরেখা নিশ্চিত নয়৷ ফলে সংস্কারের প্রত্যাশা পদদদিলত হওয়া ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে৷”

রাজনৈতিক দলের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব

টিআইবির গবেষক মো. জুলকারনাইন প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘আমরা অনেক রাজনৈতিক দলের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব দেখতে পেয়েছি৷ রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে৷ এ কারণে তারা অপকর্মে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না৷ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার প্রবণতা রয়েছে৷ আমরা দলীয় লোকদের মধ্যে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রবণতাও দেখেছি৷”

একই অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের জন্য বহু উদ্যোগ নিলেও তার অনেকগুলোই অ্যাডহক বা সাময়িক প্রকৃতির এবং বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই৷ অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চাপের কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে৷”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি যে, একেবারে নতুন গঠিত একটি রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু সদস্য দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতে জড়িত৷ সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি, কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা যথেষ্ট করছি না৷”

টিআইবির প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতার কথা, রাজনৈতিক দলগুলোর বেপরোয়া কর্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা বলছেন৷ টিআইবির করা গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলকে চলমান অবস্থার বাস্তব প্রতিফল বলে মনে করছেন কেউ কেউ৷

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘‘দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচন নিয়ে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে৷ এক গ্রুপ দ্রুত নির্বাচন চায়, আরেক গ্রুপ চায় নির্বাচন পেছাতে৷ আর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বচ্ছতা এবং বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতের কারণে৷ সরকারের মধ্যেও একটি গ্র্রুপ নির্বাচন পিছিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়৷ সংস্কার বা প্রয়োজনীয় কাজে সরকার যথাসময়ে মনোযোগী হয়নি৷ ফলে, এক বছরে মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছে৷ মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে৷ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্স সব মিলিয়ে টিআইবি যা বলছে, তা বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন৷”

ড. জাহেদ উর রহমান কথা, ‘‘এই সরকারের ওপর জামায়াতের প্রচণ্ড প্রভাব আছে৷ দুই তরুণ উপদেষ্টা তো নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির জন্য কাজ করছে৷ বিএনপিরও প্রভাব আছে৷ ফলে, সরকারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ সরকার যে সংস্কারগুলো দ্রুত করতে পারতো, তা করেনি৷ আর এক বছরেও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি৷ সব মিলিয়ে পুরো দেশই একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে৷”

টিআইবির গবেষণার তথ্য ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে মানবাধিকার কর্মী এবং গুম কমিশনের সদস্য নূর খান বলেন, ‘‘টিআইবি যা বলেছে, তা উপেক্ষা বা অস্বীকার করার সুযোগ নাই৷ মানুষ যে আশা করেছিল, যে আস্থা রেখেছিল, সেই জায়গায় যাওয়া যায়নি, থাকাও যায়নি৷ মানুষের চোখে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা৷ এক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও দেশ পরিচালনায় মানুষ যে সফলতার আশা করেছিল, তা সুদূর পরাহত হয়েছে৷ মানবাধিকার, গণতন্ত্র কোনো দিকেই আশা দেখছি না৷ গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ হলো, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে৷ মব ভায়োলেন্স আছে, বাকস্বাধীনতা,সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে৷ উগ্রবাদের আস্ফালন বেড়েছে৷ আর রাজনৈতিক সংকটের তো আশঙ্কা আছেই৷ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে৷ নির্বাচন নিয়ে ধূসরতার কারণে এটা হচ্ছে।’’

জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘কর্তৃত্ববাদের পুনর্বিকাশ দেশবাসী চায় না৷ আমরা যদি কর্তৃত্ববাদ বিদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সবাই একতাবদ্ধ হতে পারি এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারি, তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি৷ আমাদের সামনে বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের জঞ্জাল আছে৷ সেটা সরানো সহজ নয়৷ কিন্তু আমরা সবাই- রাজনৈতিক দল, যারা এখন সরকারে আছেন, দেশের মানুষ, নাগরিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে কর্তৃত্ববাদের অবসানে কাজ করি, তাহলে আমাদের পক্ষে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব৷”

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘‘জাতীয় ঐকমত্যের যে দলিল প্রকাশ করা হবে, সেটার একটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে৷ পুরো জাতির কাছে এটা থাকবে৷ এটা পুরো জাতির দলিল৷ এখন যারা ক্ষমতায় যাবে, যারা ক্ষমতার বাইরে থাকবে – সবার দায়িত্ব হবে এই দলিল বাস্তবায়ন করা৷ তারা এটা না করলে দেশের মানুষ চাপ সৃষ্টি করতে পারবে৷ আসলে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই৷