ঢাকা , রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই দেশে বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা রয়েছে, যা বিশ্বের কোথাও নেই : শিক্ষামন্ত্রী সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দর থেকে সরানো হচ্ছে ১৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদ গণভোট বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করব: জামায়াত আমির ঢাকা মেডিকেল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্র হবে : ডা. জুবাইদা রহমান অপতথ্যের বড় লক্ষ্যবস্তু বিএনপি-তারেক রহমান ‘২ লাখ ৪২ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া’— দাবিটি বিভ্রান্তিকর এক ঘণ্টায় হাজারো রুটি, কেরানীগঞ্জ কারাগারে অত্যাধুনিক মেশিনের চমক এআই নিয়ে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে: আইসিটি মন্ত্রী চার বছর পর মুখ খুললেন পরীমণি, জানালেন বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল

সিরাত মহানবী (সা.)-এর বিবাহ ও কাবায় পাথর স্থাপনের বিরোধ মীমাংসা

মানব ইতিহাসে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো কেবল দুই হৃদয়ের মিলন নয়; বরং যুগের পর যুগ মানবতার জন্য দিশারী হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খাদীজা (রা.)-এর বিবাহ সেই মহিমান্বিত সম্পর্কগুলোর সেরা সম্পর্ক। এটি ছিল এক পবিত্র বন্ধন, যেখানে সততা, আস্থা, শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক সুতোয় গাঁথা হয়েছিল। বাণিজ্য সফরে মহানবী  (সা.)-এর চরিত্রের দীপ্তি যেমন উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছিল, তেমনি খাদীজা (রা.)-এর হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিল গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশান্ত ভালোবাসা।

আল্লাহর ইচ্ছায় এই বন্ধনই হয়ে ওঠে নবুওয়াতের দ্বারপ্রান্তে নবী (সা.)-এর জন্য শক্তি ও সান্ত্বনার অনন্য আশ্রয়।খাদীজাহ (রা.) এর সঙ্গে বিবাহ
সিরিয়া থেকে যুবক মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রত্যাবর্তনের পর ব্যবসা বাণিজ্যের হিসাব করা হল। হিসাব নিকাশ করে আমানতসহ এত বেশী পরিমাণ অর্থ তিনি পেলেন খাদীজাহ (রা.)-এর অন্তর তৃপ্তির আমেজে ভরে ওঠে। সেই সাথে দাস মায়সারার বর্ণনায় মুহাম্মাদ (সা.)-এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি বিষয় অবগত হওয়ার পর তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধিহতে থাকে।

তাঁকে  জীবন সাথী হিসেবে পাওয়ার একটা গোপন বাসনা মনে জাগ্রত হয়। যদিও বড় বড় সরদার, নেতা ও প্রধানগণের বিয়ের প্রস্তাব তিনি মঞ্জুর করেননি। খাদিজা (রা.) নিজ অন্তরের গোপন বাসনা তাঁর বান্ধবী নাফীসা বিনতে মুনাবিবহ এর নিকট ব্যক্ত করলেন। নাফিসা বিষয়টি নিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-এর সঙ্গে আলোচনা করলে মুহাম্মাদ (সা.)-ও এ প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
অতপর চাচা আবূ ত্বালিব এ ব্যাপারে খাদীজাহ (রাঃ)-এর পিতৃব্যের সঙ্গে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন এবং এক শুভক্ষণে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত দুইটি প্রাণ বিশ্বমানবের অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান।
বিবাহে নবী (সা.) এবং খাদীজাহ (রা.) কে মোহরানা স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। ঐ সময় খাদীজাহ (রা.)-এর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। বংশ-মর্যাদা, সহায়-সম্পদ, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমাজের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়া। তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের এক অনুপমা মহিলা এবং নবী (সা.)-এর প্রথমা সহধর্মিনী।
তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর অন্য কোনো মহিলাকে বিবাহ করেন নাই।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহীম ব্যতীত সকলেই ছিলেন খাদীজাহ (রা)-এর গর্ভজাত। নবী দম্পতির প্রথম সন্তান ছিলেন কাসেম, তাই উপনাম হয় ‘আবুল কাসেম’। তারপর যথাক্রমে জন্মগ্রহণ করেন যায়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম, ফাত্বিমাহ ও আব্দুল্লাহ।
নবী (সা.)-এর সকল পুত্র সন্তানই বাল্যাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন, মুসলিম হয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাত্বিমাহ (রা.) ব্যতীত কন্যাগণ সকলেই পিতার জীবদ্দশাতেই মৃত্যু বরণ করেন। ফাত্বিমাহ (রা.)-এর মৃত্যু হয়েছিল নবী (সা.)-এর ছয় মাস পর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) পঁয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করলে কুরাইশগণ ক্বাবা’হ গৃহের পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নিলেন। ক্বাবা তখন চতুর্দিকে দেওয়াল দ্বারা বেষ্টিত, কিন্তু ছাদহীন। এই সুযোগে কিছু চোরগোষ্ঠী প্রবেশ করে অমূল্য ধন ও অলঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আ.)-এর আমলে নির্মিত এই ঘরের উচ্চতা ছিল মাত্র নয় হাত। বহু প্রাচীনতার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরে ছিল, যে কোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
সেই বছর মক্কা প্লাবিত হলে ক্বাবামুখী জলধারা তৈরি হয়, যা দেওয়ালকে আরও ক্ষয়প্রাপ্ত করে।
এই নাজুক পরিস্থিতি দেখেও কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ ছিলেন—ক্বাবা’হের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং তা পুনর্নির্মাণের জন্য। সকল গোত্র মিলিত হয়ে নির্মাণের নীতি নির্ধারণ করল: শুধু বৈধ অর্থ ব্যবহার করা হবে, কোনো ধরনের অবৈধ বা হক-নষ্ট অর্থ কাজে লাগানো যাবে না। এই নীতির প্রতি একযোগে সমর্থন জানিয়ে নির্মাণ শুরু হলো।
প্রথমে সমস্যা হলো পুরাতন ইমারত ভাঙা নিয়ে। কেউ সাহস করছিল না আঘাত করতে, শেষমেষ ওয়ালীদ ইবনে মুগীরাহ মাখযুমী ভাঙার কাজের প্রাথমিক উদ্যোগ নিলেন। যখন তিনি কোনো বিপদ ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করলেন, তখন বাকি সবাই ভীত-সম্ভ্রান্ত মনে অংশ নিতে লাগলেন। ইবরাহীম (আ.)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভাঙা হলে নির্মাণ শুরু হলো। প্রতিটি গোত্রের জন্য পূর্বনির্ধারিত অংশ অনুযায়ী কাজ ভাগ করা হয়েছিল। রোমীয় মিস্ত্রি বাকূমের তত্ত্বাবধানে কাজ এগিয়ে চলছিল।
কিন্তু ‘হাজারে আসওয়াদ’, স্থাপন করার বিষয়টি সকলের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করল। চার-পাঁচ দিন বিতর্ক চলল। প্রত্যেকেই দাবি করল, শুধুমাত্র তার গোত্রই এই মহাকাব্যিক কাজটি সম্পন্ন করবে। রেষারেষি তীব্র আকার নিল, যা সহজেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিতে পারতো।
এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে বর্ষীয়ান নেতা আবু উমাইয়া মাখযুমী এক চমৎকার সমাধান বের করলেন—পরের দিন সকালে যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে প্রথম প্রবেশ করবে, তিনি বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। আর আল্লাহর অপার মহিমা! সকল আরবের প্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি, আল-আমিন উপাধী প্রাপ্ত মুহাম্মদ (সা.) প্রথম প্রবেশ করলেন। উপস্থিত সকলেই বলল:
هٰذَا الْأَمِيْنُ، رَضَيْنَاهُ، هٰذَا مُحَمَّدٌ
‘আমাদের বিশ্বাসী, আমরা সন্তুষ্ট, তিনিই মুহাম্মদ (সা.)।”
নবী (সা.) চাদর চেয়ে আনালেন, তা মেঝেতে বিছিয়ে নিজের হাতে তাতে হাজরে আসওয়াদ রাখলেন করলেন। এরপর উপস্থিত সকলকে আহবান জানিয়ে চাদরের চারপাশে ধরতে বললেন। অতপর সকলে মিলে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করলেন। এই সহজ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় সমাধানে সকলের খুশি হলেন।
নির্মাণ চলাকালীন কুরাইশগণের বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল।
এ দিকে কুরাইশগণের নিকট বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল। এ জন্যই উত্তর দিক হতে ক্বাবা’হ গৃহের দৈর্ঘ আনুমানিক ছয় হাত পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হল। এ অংশটুকুই ‘হিজর’ ‘হাতীম’ নামে প্রসিদ্ধ। এবার কুরাইশগণ ক্বাবা’হর দরজা ভূমি হতে বিশেষভাবে উঁচু করে দিলেন যেন এর মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারে যাকে তাঁরা অনুমতি দেবেন। যখন দেয়ালগুলো পনের হাত উঁচু হল তখন গৃহের অভ্যন্তর ভাগে ছয়টি পিলার বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হল এবং তার উপর ছাদ দেয়া হল। ক্বাবা’হ গৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে একটি চতুর্ভূজের রূপ ধারণ করল।
বর্তমানে ক্বাবা’হ গৃহের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর বিশিষ্ট দেয়াল এবং তার সামনের দেয়াল অর্থাৎঃ দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল হচ্ছে দশ দশ মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর মাতাফের জায়গা হতে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দরজা বিশিষ্ট দেয়াল এবং এর সাথে সামনের দেয়াল অর্থাৎ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়াল বার মিটার করে। দরজা রয়েছে মেঝে থেকে দু’মিটার উঁচুতে
। দেয়ালের পাশেই চতুর্দিকে নীচু জায়গা এক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চেয়ার সমতুল্য অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত আছে যার উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং গড় প্রস্থ ত্রিশ সেন্টিমিটার। একে শাজে বওয়া (চলন্ত দুর্লভ) বলা হয়। এটাও হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে বায়তুল্লাহর অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ এটাও ছেড়ে দিয়েছিলেন।
Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই

সিরাত মহানবী (সা.)-এর বিবাহ ও কাবায় পাথর স্থাপনের বিরোধ মীমাংসা

আপডেট টাইম : ১২:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫

মানব ইতিহাসে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো কেবল দুই হৃদয়ের মিলন নয়; বরং যুগের পর যুগ মানবতার জন্য দিশারী হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খাদীজা (রা.)-এর বিবাহ সেই মহিমান্বিত সম্পর্কগুলোর সেরা সম্পর্ক। এটি ছিল এক পবিত্র বন্ধন, যেখানে সততা, আস্থা, শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক সুতোয় গাঁথা হয়েছিল। বাণিজ্য সফরে মহানবী  (সা.)-এর চরিত্রের দীপ্তি যেমন উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছিল, তেমনি খাদীজা (রা.)-এর হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিল গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশান্ত ভালোবাসা।

আল্লাহর ইচ্ছায় এই বন্ধনই হয়ে ওঠে নবুওয়াতের দ্বারপ্রান্তে নবী (সা.)-এর জন্য শক্তি ও সান্ত্বনার অনন্য আশ্রয়।খাদীজাহ (রা.) এর সঙ্গে বিবাহ
সিরিয়া থেকে যুবক মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রত্যাবর্তনের পর ব্যবসা বাণিজ্যের হিসাব করা হল। হিসাব নিকাশ করে আমানতসহ এত বেশী পরিমাণ অর্থ তিনি পেলেন খাদীজাহ (রা.)-এর অন্তর তৃপ্তির আমেজে ভরে ওঠে। সেই সাথে দাস মায়সারার বর্ণনায় মুহাম্মাদ (সা.)-এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি বিষয় অবগত হওয়ার পর তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধিহতে থাকে।

তাঁকে  জীবন সাথী হিসেবে পাওয়ার একটা গোপন বাসনা মনে জাগ্রত হয়। যদিও বড় বড় সরদার, নেতা ও প্রধানগণের বিয়ের প্রস্তাব তিনি মঞ্জুর করেননি। খাদিজা (রা.) নিজ অন্তরের গোপন বাসনা তাঁর বান্ধবী নাফীসা বিনতে মুনাবিবহ এর নিকট ব্যক্ত করলেন। নাফিসা বিষয়টি নিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-এর সঙ্গে আলোচনা করলে মুহাম্মাদ (সা.)-ও এ প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
অতপর চাচা আবূ ত্বালিব এ ব্যাপারে খাদীজাহ (রাঃ)-এর পিতৃব্যের সঙ্গে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন এবং এক শুভক্ষণে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত দুইটি প্রাণ বিশ্বমানবের অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান।
বিবাহে নবী (সা.) এবং খাদীজাহ (রা.) কে মোহরানা স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। ঐ সময় খাদীজাহ (রা.)-এর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। বংশ-মর্যাদা, সহায়-সম্পদ, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমাজের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়া। তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের এক অনুপমা মহিলা এবং নবী (সা.)-এর প্রথমা সহধর্মিনী।
তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর অন্য কোনো মহিলাকে বিবাহ করেন নাই।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহীম ব্যতীত সকলেই ছিলেন খাদীজাহ (রা)-এর গর্ভজাত। নবী দম্পতির প্রথম সন্তান ছিলেন কাসেম, তাই উপনাম হয় ‘আবুল কাসেম’। তারপর যথাক্রমে জন্মগ্রহণ করেন যায়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম, ফাত্বিমাহ ও আব্দুল্লাহ।
নবী (সা.)-এর সকল পুত্র সন্তানই বাল্যাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন, মুসলিম হয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাত্বিমাহ (রা.) ব্যতীত কন্যাগণ সকলেই পিতার জীবদ্দশাতেই মৃত্যু বরণ করেন। ফাত্বিমাহ (রা.)-এর মৃত্যু হয়েছিল নবী (সা.)-এর ছয় মাস পর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) পঁয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করলে কুরাইশগণ ক্বাবা’হ গৃহের পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নিলেন। ক্বাবা তখন চতুর্দিকে দেওয়াল দ্বারা বেষ্টিত, কিন্তু ছাদহীন। এই সুযোগে কিছু চোরগোষ্ঠী প্রবেশ করে অমূল্য ধন ও অলঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আ.)-এর আমলে নির্মিত এই ঘরের উচ্চতা ছিল মাত্র নয় হাত। বহু প্রাচীনতার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরে ছিল, যে কোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
সেই বছর মক্কা প্লাবিত হলে ক্বাবামুখী জলধারা তৈরি হয়, যা দেওয়ালকে আরও ক্ষয়প্রাপ্ত করে।
এই নাজুক পরিস্থিতি দেখেও কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ ছিলেন—ক্বাবা’হের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং তা পুনর্নির্মাণের জন্য। সকল গোত্র মিলিত হয়ে নির্মাণের নীতি নির্ধারণ করল: শুধু বৈধ অর্থ ব্যবহার করা হবে, কোনো ধরনের অবৈধ বা হক-নষ্ট অর্থ কাজে লাগানো যাবে না। এই নীতির প্রতি একযোগে সমর্থন জানিয়ে নির্মাণ শুরু হলো।
প্রথমে সমস্যা হলো পুরাতন ইমারত ভাঙা নিয়ে। কেউ সাহস করছিল না আঘাত করতে, শেষমেষ ওয়ালীদ ইবনে মুগীরাহ মাখযুমী ভাঙার কাজের প্রাথমিক উদ্যোগ নিলেন। যখন তিনি কোনো বিপদ ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করলেন, তখন বাকি সবাই ভীত-সম্ভ্রান্ত মনে অংশ নিতে লাগলেন। ইবরাহীম (আ.)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভাঙা হলে নির্মাণ শুরু হলো। প্রতিটি গোত্রের জন্য পূর্বনির্ধারিত অংশ অনুযায়ী কাজ ভাগ করা হয়েছিল। রোমীয় মিস্ত্রি বাকূমের তত্ত্বাবধানে কাজ এগিয়ে চলছিল।
কিন্তু ‘হাজারে আসওয়াদ’, স্থাপন করার বিষয়টি সকলের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করল। চার-পাঁচ দিন বিতর্ক চলল। প্রত্যেকেই দাবি করল, শুধুমাত্র তার গোত্রই এই মহাকাব্যিক কাজটি সম্পন্ন করবে। রেষারেষি তীব্র আকার নিল, যা সহজেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিতে পারতো।
এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে বর্ষীয়ান নেতা আবু উমাইয়া মাখযুমী এক চমৎকার সমাধান বের করলেন—পরের দিন সকালে যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে প্রথম প্রবেশ করবে, তিনি বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। আর আল্লাহর অপার মহিমা! সকল আরবের প্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি, আল-আমিন উপাধী প্রাপ্ত মুহাম্মদ (সা.) প্রথম প্রবেশ করলেন। উপস্থিত সকলেই বলল:
هٰذَا الْأَمِيْنُ، رَضَيْنَاهُ، هٰذَا مُحَمَّدٌ
‘আমাদের বিশ্বাসী, আমরা সন্তুষ্ট, তিনিই মুহাম্মদ (সা.)।”
নবী (সা.) চাদর চেয়ে আনালেন, তা মেঝেতে বিছিয়ে নিজের হাতে তাতে হাজরে আসওয়াদ রাখলেন করলেন। এরপর উপস্থিত সকলকে আহবান জানিয়ে চাদরের চারপাশে ধরতে বললেন। অতপর সকলে মিলে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করলেন। এই সহজ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় সমাধানে সকলের খুশি হলেন।
নির্মাণ চলাকালীন কুরাইশগণের বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল।
এ দিকে কুরাইশগণের নিকট বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল। এ জন্যই উত্তর দিক হতে ক্বাবা’হ গৃহের দৈর্ঘ আনুমানিক ছয় হাত পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হল। এ অংশটুকুই ‘হিজর’ ‘হাতীম’ নামে প্রসিদ্ধ। এবার কুরাইশগণ ক্বাবা’হর দরজা ভূমি হতে বিশেষভাবে উঁচু করে দিলেন যেন এর মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারে যাকে তাঁরা অনুমতি দেবেন। যখন দেয়ালগুলো পনের হাত উঁচু হল তখন গৃহের অভ্যন্তর ভাগে ছয়টি পিলার বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হল এবং তার উপর ছাদ দেয়া হল। ক্বাবা’হ গৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে একটি চতুর্ভূজের রূপ ধারণ করল।
বর্তমানে ক্বাবা’হ গৃহের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর বিশিষ্ট দেয়াল এবং তার সামনের দেয়াল অর্থাৎঃ দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল হচ্ছে দশ দশ মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর মাতাফের জায়গা হতে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দরজা বিশিষ্ট দেয়াল এবং এর সাথে সামনের দেয়াল অর্থাৎ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়াল বার মিটার করে। দরজা রয়েছে মেঝে থেকে দু’মিটার উঁচুতে
। দেয়ালের পাশেই চতুর্দিকে নীচু জায়গা এক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চেয়ার সমতুল্য অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত আছে যার উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং গড় প্রস্থ ত্রিশ সেন্টিমিটার। একে শাজে বওয়া (চলন্ত দুর্লভ) বলা হয়। এটাও হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে বায়তুল্লাহর অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ এটাও ছেড়ে দিয়েছিলেন।