ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

শাপলা গণহত্যা : আওয়ামী লীগের খুনের রাজনীতি

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান ‘শাপলা গণহত্যা’ নামে পরিচিত। নাস্তিক ব্লগাররা যখন মহান আল্লাহ, মহানবী সা., পবিত্র কুরআন অবমাননা ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কটূক্তি করে এবং ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতি ও কুরআন সুন্নাহবিরোধী নারী-নীতিসহ ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির জেরে ওই গণহত্যা চালানো হয়, যাতে বহু মানুষ শহীদ হন, আহত হন হাজারো আলেম-ওলামা, হাফেজ, মুফতি, মুহাদ্দিস। অন্ধত্ব বরণ করেন অনেকে। পঙ্গু হয়ে যান অসংখ্য হেফাজতকর্মী-সমর্থক। ৫ মে লাখ লাখ হেফাজত নেতাকর্মী ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশে অবস্থান নেন। হেফাজত সরকারের অনুমতি নিয়ে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে। শাপলা চত্বরে আসার পথে দুপুরেই পল্টন, গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, বায়তুল মোকাররম এবং আশপাশ এলাকায় তাদের বাধা দেয়া আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনী এবং চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। ইতোমধ্যে কয়েকজন হেফাজতকর্মী শাহাদাতবরণ করেন।

৫ মে দিবাগত রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ নামে অভিযানের মাধ্যমে শাপলা চত্বরে হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করে যে গণহত্যা চালায়, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি কালো রাত্রির জন্ম দিয়েছে। সেদিন ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। পুলিশ-র‌্যাব ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবির যৌথ অভিযানে খালি করা হয় শাপলা চত্বর।

৫ মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে যে ধরনের পৈশাচিকতার কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছে, তা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। ওই দিন হেফাজত নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্পটে অবস্থান নেন। আর আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনী জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট শুরু করে। এর দায় চাপায় নিরপরাধ আলেম-সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর। জালিম সরকার হেফাজতের উত্থাপিত ১৩ দফা দাবির বিরুদ্ধে গলাবাজি করে ঈমানি দাবিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

কিন্তু যুক্তি দিয়ে দাবিগুলো অন্যায্য ও অকল্যাণ তা প্রমাণ করতে পারে না। এই নিরীহ-নিরস্ত্র ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো অচেনা ঢাকায় সরকারের সাথে যুদ্ধ করতে নয়; এসেছিল তাদেরই কিছু ঈমানি দাবি নিয়ে। নাগরিক হিসেবে যে দাবি করার অধিকার সংবিধান তাদের দিয়েছে।

ওই কালো রাতে পুরো মতিঝিল ও এর আশপাশ এলাকার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিয়ে নিরীহ মাদরাসা ছাত্রদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়। অভিযানের পর দ্রুত সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে লাশগুলো অজ্ঞাত স্থানে গুম করে ফেলে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে হাজারো সাধারণ, মাদরাসা শিক্ষক-ছাত্রকে হত্যা করার অভিযোগ উঠে।

সে দিন লাখো জনতা শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। কেউ জিকিরে, কেউ কুরআন তিলাওয়াতে, কেউ নফল নামাজে ব্যস্ত এবং অন্যরা আলেমদের ধর্মীয় আলোচনা শুনছিল। রাত প্রায় আড়াইটা নাগাদ শাপলা চত্বরে গণহত্যার উদ্দেশ্যে ১০ হাজার সদস্যের যৌথ বাহিনী অপারেশন শুরু করে।

কিন্তু রাত গভীর হওয়ার কারণে তাদের পক্ষে শাপলা চত্বর ত্যাগ করা সম্ভব ছিল না। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে আক্রমণের উদ্দেশ্য ওঁৎপেতে থাকে। অন্যদিকে যৌথ বাহিনী দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল ও বাংলাদেশ ব্যাংক চৌরাস্তা হয়ে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। এই বিশাল শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও বোমা নিক্ষেপ করে।

গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। এতেই ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলব, ওই রাত ছিল এক ভয়াবহ ও বিভীষিকাময়।

এরপর একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে। ফলে বেশির ভাগ লোক শাপলা চত্বর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তবে কিছু লোক পার্শ্ববর্তী গলি ও ভবনে লুকাতে গেলে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে অনেকেই নিহত হন এবং হাজার হাজার মানুষ হায়েনার বুলেটের আঘাতে আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের লাশগুলো পরে সিটি করপোরেশনের আবর্জনা পরিবহনকারী ট্রাকে তুলে নিয়ে শহরের বাইরে ফেলে দেয়া হয়।

ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন সকালে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের মাদানি নগর মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও স্থানীয় ধর্মপ্রাণ জনসাধারণ বিক্ষোভ করে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে ২৭ জনকে হত্যা করে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার সামনে পুলিশের গুলিতে ছয়জন শহীদ হন এবং বাগেরহাটে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে একজন হেফাজত সমর্থক শহীদ হন।

২০২৫ সালের ২৫ মার্চ জিটিভির একটি প্রতিবেদনে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ২০১৩ সালের মে মাসের উপাত্তের সাথে তার আগের ও পরবর্তী অন্যান্য মাসের গড় উপাত্তে মৃতের সংখ্যার পার্থক্যের বরাতের ভিত্তিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩০ জন উল্লেখ করা হয়।

হেফাজত নেতাকর্মী তথা আলেমদের নির্মূলের নির্দেশদাতা শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব ডিজিসহ অনেক কর্মকর্তা সেই নিষ্ঠুর নির্যাতন আর খুনের দিনটিতে অপারেশন সফল বলে উল্লাস করেছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে হেফাজত নেতাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেউ কোনো সত্য প্রকাশ করতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জনকে হত্যার তালিকা প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পড়ে। অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান শুভ্রকে নেয়া হয় জেলে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে সংঘটিত দমন-পীড়ন ও গণহত্যার তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষ থেকে একটি আবেদন করা হয়। এতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি গণহত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অভিযোগপত্রে আরো যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাদের মধ্যে রয়েছেÑ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, হাসান মাহমুদ, দীপু মনি, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সালমান এফ রহমান, তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, পুলিশের আইজিপি বেনজির আহমদ এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুসহ কয়েকজন।

আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির যেসব কর্মকর্তা এ ধরনের নিষ্ঠুর কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আসামি করার গণদাবি উঠেছে। হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ওই ঘটনার বিচার দাবি করে আসছে। সংগঠনের নেতারা বলছেন, নিরপরাধ মানুষের ওপর সংঘটিত ওই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

শাপলা গণহত্যা : আওয়ামী লীগের খুনের রাজনীতি

আপডেট টাইম : ০৪:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান ‘শাপলা গণহত্যা’ নামে পরিচিত। নাস্তিক ব্লগাররা যখন মহান আল্লাহ, মহানবী সা., পবিত্র কুরআন অবমাননা ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কটূক্তি করে এবং ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতি ও কুরআন সুন্নাহবিরোধী নারী-নীতিসহ ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির জেরে ওই গণহত্যা চালানো হয়, যাতে বহু মানুষ শহীদ হন, আহত হন হাজারো আলেম-ওলামা, হাফেজ, মুফতি, মুহাদ্দিস। অন্ধত্ব বরণ করেন অনেকে। পঙ্গু হয়ে যান অসংখ্য হেফাজতকর্মী-সমর্থক। ৫ মে লাখ লাখ হেফাজত নেতাকর্মী ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশে অবস্থান নেন। হেফাজত সরকারের অনুমতি নিয়ে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে। শাপলা চত্বরে আসার পথে দুপুরেই পল্টন, গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, বায়তুল মোকাররম এবং আশপাশ এলাকায় তাদের বাধা দেয়া আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনী এবং চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। ইতোমধ্যে কয়েকজন হেফাজতকর্মী শাহাদাতবরণ করেন।

৫ মে দিবাগত রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ নামে অভিযানের মাধ্যমে শাপলা চত্বরে হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করে যে গণহত্যা চালায়, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি কালো রাত্রির জন্ম দিয়েছে। সেদিন ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। পুলিশ-র‌্যাব ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবির যৌথ অভিযানে খালি করা হয় শাপলা চত্বর।

৫ মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে যে ধরনের পৈশাচিকতার কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছে, তা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। ওই দিন হেফাজত নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্পটে অবস্থান নেন। আর আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনী জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট শুরু করে। এর দায় চাপায় নিরপরাধ আলেম-সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর। জালিম সরকার হেফাজতের উত্থাপিত ১৩ দফা দাবির বিরুদ্ধে গলাবাজি করে ঈমানি দাবিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

কিন্তু যুক্তি দিয়ে দাবিগুলো অন্যায্য ও অকল্যাণ তা প্রমাণ করতে পারে না। এই নিরীহ-নিরস্ত্র ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো অচেনা ঢাকায় সরকারের সাথে যুদ্ধ করতে নয়; এসেছিল তাদেরই কিছু ঈমানি দাবি নিয়ে। নাগরিক হিসেবে যে দাবি করার অধিকার সংবিধান তাদের দিয়েছে।

ওই কালো রাতে পুরো মতিঝিল ও এর আশপাশ এলাকার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিয়ে নিরীহ মাদরাসা ছাত্রদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়। অভিযানের পর দ্রুত সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে লাশগুলো অজ্ঞাত স্থানে গুম করে ফেলে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে হাজারো সাধারণ, মাদরাসা শিক্ষক-ছাত্রকে হত্যা করার অভিযোগ উঠে।

সে দিন লাখো জনতা শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। কেউ জিকিরে, কেউ কুরআন তিলাওয়াতে, কেউ নফল নামাজে ব্যস্ত এবং অন্যরা আলেমদের ধর্মীয় আলোচনা শুনছিল। রাত প্রায় আড়াইটা নাগাদ শাপলা চত্বরে গণহত্যার উদ্দেশ্যে ১০ হাজার সদস্যের যৌথ বাহিনী অপারেশন শুরু করে।

কিন্তু রাত গভীর হওয়ার কারণে তাদের পক্ষে শাপলা চত্বর ত্যাগ করা সম্ভব ছিল না। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে আক্রমণের উদ্দেশ্য ওঁৎপেতে থাকে। অন্যদিকে যৌথ বাহিনী দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল ও বাংলাদেশ ব্যাংক চৌরাস্তা হয়ে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। এই বিশাল শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও বোমা নিক্ষেপ করে।

গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। এতেই ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলব, ওই রাত ছিল এক ভয়াবহ ও বিভীষিকাময়।

এরপর একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে। ফলে বেশির ভাগ লোক শাপলা চত্বর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তবে কিছু লোক পার্শ্ববর্তী গলি ও ভবনে লুকাতে গেলে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে অনেকেই নিহত হন এবং হাজার হাজার মানুষ হায়েনার বুলেটের আঘাতে আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের লাশগুলো পরে সিটি করপোরেশনের আবর্জনা পরিবহনকারী ট্রাকে তুলে নিয়ে শহরের বাইরে ফেলে দেয়া হয়।

ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন সকালে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের মাদানি নগর মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও স্থানীয় ধর্মপ্রাণ জনসাধারণ বিক্ষোভ করে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে ২৭ জনকে হত্যা করে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার সামনে পুলিশের গুলিতে ছয়জন শহীদ হন এবং বাগেরহাটে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে একজন হেফাজত সমর্থক শহীদ হন।

২০২৫ সালের ২৫ মার্চ জিটিভির একটি প্রতিবেদনে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ২০১৩ সালের মে মাসের উপাত্তের সাথে তার আগের ও পরবর্তী অন্যান্য মাসের গড় উপাত্তে মৃতের সংখ্যার পার্থক্যের বরাতের ভিত্তিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩০ জন উল্লেখ করা হয়।

হেফাজত নেতাকর্মী তথা আলেমদের নির্মূলের নির্দেশদাতা শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব ডিজিসহ অনেক কর্মকর্তা সেই নিষ্ঠুর নির্যাতন আর খুনের দিনটিতে অপারেশন সফল বলে উল্লাস করেছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে হেফাজত নেতাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেউ কোনো সত্য প্রকাশ করতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জনকে হত্যার তালিকা প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পড়ে। অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান শুভ্রকে নেয়া হয় জেলে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে সংঘটিত দমন-পীড়ন ও গণহত্যার তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষ থেকে একটি আবেদন করা হয়। এতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি গণহত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অভিযোগপত্রে আরো যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাদের মধ্যে রয়েছেÑ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, হাসান মাহমুদ, দীপু মনি, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সালমান এফ রহমান, তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, পুলিশের আইজিপি বেনজির আহমদ এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুসহ কয়েকজন।

আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির যেসব কর্মকর্তা এ ধরনের নিষ্ঠুর কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আসামি করার গণদাবি উঠেছে। হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ওই ঘটনার বিচার দাবি করে আসছে। সংগঠনের নেতারা বলছেন, নিরপরাধ মানুষের ওপর সংঘটিত ওই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ