ঢাকা , রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার সড়ক যেন নদী, অন্তহীন দুর্ভোগে নগরবাসী

শনিবার (১১ জুলাই) গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে সকালেই ডুবল রাজধানী। আজ রোববার (১২ জুলাই) কর্মদিবসের প্রথম সকালেও বৃষ্টির বেগ না কমায় ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে থইথই করছে পানি।

স্বল্প সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে তৈরি হওয়া এই জলাবদ্ধতায় দিনের শুরুতেই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে অফিসগামী যাত্রী এবং জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষকে পড়তে হয়েছে তীব্র বিড়ম্বনায়।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে আজ রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মো. তরিকুল নেওয়াজ কবীর জানান, চলতি জুলাই মাসের এই সময়ের মধ্যে রাজধানীতে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি বৃষ্টি হওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যেই গ্রিনরোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মণিপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর এলাকা, মোহাম্মদপুর, কালশী, মৌচাক, মালিবাগ, মতিঝিলসহ বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে।

প্রধান সড়ক ও ভেতরের রাস্তাগুলোতে কোথাও গোড়ালি, আবার কোথাও হাঁটুপানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় থমকে গেছে। অনেক অলিগলি ও সংযোগ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় বাসা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও ফুটপাতের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন।

সবচেয়ে নাজুক ও বেশি জলাবদ্ধতার চিত্র দেখা গেছে শেওড়াপাড়া এলাকায়। সেখানে প্রধান সড়কের পাশাপাশি আশপাশের প্রায় সব অলিগলিই এখন পানির নিচে।

শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী মশিউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সপ্তাহের প্রথম দিনই সাতসকালে এই দশা। মেইন রোডেই হাঁটুপানি, গলির ভেতর তো আরও বেশি। রিকশাওয়ালারা দ্বিগুণ ভাড়া চাচ্ছে, বাসেও ওঠা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই তো ড্রেন পরিষ্কারের কথা শুনি, কিন্তু বৃষ্টি হলেই কেন এভাবে আমাদের ডুবতে হয়?’

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকার চিত্রও ছিল একই রকম। পেছনের সড়কগুলোতে হাঁটুপানি জমে থাকায় বহু যানবাহন বিকল হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

গ্রিনরোড এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়া ব্যবসায়ী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘পান্থপথ পার হওয়ার সময় ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মেকানিকও পাচ্ছি না, অফিসে যাওয়াও আটকে গেল।’

সড়কে পানি জমে থাকায় সকাল থেকেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তায় পানি জমে থাকায় চালকরা স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারছেন না।

অনেক জায়গায় সিএনজি ও রিকশা উল্টে বা বিকল হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি ল্যান্ড সচল রাখতে, কিন্তু পানি না নামা পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন।’

নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার এভাবে তলিয়ে যাওয়ার পুরোনো সংকট থেকে এখনও মুক্তি মেলেনি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুপুর ১২টায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই নগরবাসীর ভোগান্তি আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জলামগ্ন রাজধানীর প্রায় বেশিরভাগ সড়কই পানির নিচে। বাদ যায়নি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ও। ভোর থেকে টানা বৃষ্টিতে সচিবালয়ের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। ধীরে ধীরে পানি বাড়তে থাকে। রবিবার দুপুর ২টার পরও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।

সরেজমিনে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের সামনের সড়ক পানিতে তলিয়ে যেতে দেখা গেছে। তাছাড়া ৭ নম্বর ভবনের পশ্চিম পাশের সড়ক, তথ্য অধিদপ্তরের সামনের সড়ক, ৫ নম্বর ভবনের সামনের সড়ক, ৩ ও ৫ নম্বর ভবনের মাঝখানের সড়ক, ৭ নম্বর ভবন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

তাছাড়া সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এবং প্রেসক্লাবের দিকের গেটেও জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও সেবাপ্রার্থী নাগরিকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ের মতো জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে দেশের বাকি এলাকার কী অবস্থা হবে? যারা দায়িত্বে আছে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।

এক কর্মকর্তার গাড়িচালক বলেন, পানির জন্য সকাল থেকে অনেকের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। হেঁটেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যাচ্ছে না।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকার সড়ক যেন নদী, অন্তহীন দুর্ভোগে নগরবাসী

আপডেট টাইম : ৫ ঘন্টা আগে

শনিবার (১১ জুলাই) গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে সকালেই ডুবল রাজধানী। আজ রোববার (১২ জুলাই) কর্মদিবসের প্রথম সকালেও বৃষ্টির বেগ না কমায় ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে থইথই করছে পানি।

স্বল্প সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে তৈরি হওয়া এই জলাবদ্ধতায় দিনের শুরুতেই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে অফিসগামী যাত্রী এবং জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষকে পড়তে হয়েছে তীব্র বিড়ম্বনায়।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে আজ রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মো. তরিকুল নেওয়াজ কবীর জানান, চলতি জুলাই মাসের এই সময়ের মধ্যে রাজধানীতে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি বৃষ্টি হওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যেই গ্রিনরোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মণিপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর এলাকা, মোহাম্মদপুর, কালশী, মৌচাক, মালিবাগ, মতিঝিলসহ বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে।

প্রধান সড়ক ও ভেতরের রাস্তাগুলোতে কোথাও গোড়ালি, আবার কোথাও হাঁটুপানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় থমকে গেছে। অনেক অলিগলি ও সংযোগ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় বাসা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও ফুটপাতের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন।

সবচেয়ে নাজুক ও বেশি জলাবদ্ধতার চিত্র দেখা গেছে শেওড়াপাড়া এলাকায়। সেখানে প্রধান সড়কের পাশাপাশি আশপাশের প্রায় সব অলিগলিই এখন পানির নিচে।

শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী মশিউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সপ্তাহের প্রথম দিনই সাতসকালে এই দশা। মেইন রোডেই হাঁটুপানি, গলির ভেতর তো আরও বেশি। রিকশাওয়ালারা দ্বিগুণ ভাড়া চাচ্ছে, বাসেও ওঠা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই তো ড্রেন পরিষ্কারের কথা শুনি, কিন্তু বৃষ্টি হলেই কেন এভাবে আমাদের ডুবতে হয়?’

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকার চিত্রও ছিল একই রকম। পেছনের সড়কগুলোতে হাঁটুপানি জমে থাকায় বহু যানবাহন বিকল হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

গ্রিনরোড এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়া ব্যবসায়ী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘পান্থপথ পার হওয়ার সময় ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মেকানিকও পাচ্ছি না, অফিসে যাওয়াও আটকে গেল।’

সড়কে পানি জমে থাকায় সকাল থেকেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তায় পানি জমে থাকায় চালকরা স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারছেন না।

অনেক জায়গায় সিএনজি ও রিকশা উল্টে বা বিকল হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি ল্যান্ড সচল রাখতে, কিন্তু পানি না নামা পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন।’

নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার এভাবে তলিয়ে যাওয়ার পুরোনো সংকট থেকে এখনও মুক্তি মেলেনি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুপুর ১২টায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই নগরবাসীর ভোগান্তি আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জলামগ্ন রাজধানীর প্রায় বেশিরভাগ সড়কই পানির নিচে। বাদ যায়নি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ও। ভোর থেকে টানা বৃষ্টিতে সচিবালয়ের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। ধীরে ধীরে পানি বাড়তে থাকে। রবিবার দুপুর ২টার পরও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।

সরেজমিনে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের সামনের সড়ক পানিতে তলিয়ে যেতে দেখা গেছে। তাছাড়া ৭ নম্বর ভবনের পশ্চিম পাশের সড়ক, তথ্য অধিদপ্তরের সামনের সড়ক, ৫ নম্বর ভবনের সামনের সড়ক, ৩ ও ৫ নম্বর ভবনের মাঝখানের সড়ক, ৭ নম্বর ভবন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

তাছাড়া সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এবং প্রেসক্লাবের দিকের গেটেও জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও সেবাপ্রার্থী নাগরিকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ের মতো জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে দেশের বাকি এলাকার কী অবস্থা হবে? যারা দায়িত্বে আছে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।

এক কর্মকর্তার গাড়িচালক বলেন, পানির জন্য সকাল থেকে অনেকের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। হেঁটেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যাচ্ছে না।