যেখানে ঢেউ গাইত উৎসবের গান, সেখানে আজ ভাসছে আতঙ্কের নীরবতা; নৌ-ডাকাতির দাপটে থমকে গেছে হাওরের পর্যটন, ভেঙে পড়ছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। বর্ষা একসময় কিশোরগঞ্জের হাওরে শুধু ঋতু হয়ে আসত না, আসত উৎসব হয়ে। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষের হাসি, ট্রলারভর্তি মানুষের গান, জলরাশির বুকে সূর্যাস্তের রঙ, কাশবনের ফাঁকে ভেসে বেড়ানো বাতাসÑসব মিলিয়ে হাওর যেন হয়ে উঠত বাংলার এক জীবন্ত জল-উৎসব। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে শত শত ট্রলার ছুটে যেত দিগন্তের দিকে; ঘাটজুড়ে থাকত পর্যটকদের পদচারণা, মাঝিদের ব্যস্ততা, রেস্তোরাঁয় ধোঁয়া ওঠা মাছের ঝোলের গন্ধ, আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুখে থাকত স্বস্তির হাসি।
কিন্তু সেই হাওর এখন যেন নিজেরই ছায়া। ঢেউ এখনো আছে, আকাশও আগের মতোই বিস্তৃত; নেই শুধু মানুষের উচ্ছ্বাস। জলরাশির বুকজুড়ে আজ ভেসে বেড়ায় এক অদৃশ্য ভয়। অস্ত্রধারী নৌ-ডাকাতদের তাণ্ডবে আতঙ্কিত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন পর্যটকেরা। ভরা বর্ষার মৌসুমেও করিমগঞ্জ, নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনার বিস্তীর্ণ হাওর এখন অস্বাভাবিক নীরব। যেখানে ট্রলারের সারি থাকার কথা, সেখানে ঘাটে বাঁধা পড়ে আছে অলস নৌযান; যেখানে শিশুদের হাসি আর ভ্রমণপিপাসু মানুষের কোলাহল থাকার কথা, সেখানে শোনা যায় শুধু বাতাস আর ঢেউয়ের শব্দ।
গতকাল করিমগঞ্জ, নিকলী ও মিঠামইনের হাওরাঞ্চলে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক নৌ-ডাকাতির ঘটনাগুলো শুধু কিছু পর্যটকের সম্পদ লুট করেনিÑলুট করেছে মানুষের নিরাপত্তাবোধ, ভেঙে দিয়েছে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন অর্থনীতির ভিত্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডাকাতির ভিডিও ও বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত পর্যটক তাদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সম্প্রতি করিমগঞ্জ হাওরে শিশুর লাশবাহী নৌকাও ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। মৃত্যুর শোক বহন করা একটি নৌযানও যখন নিরাপদ নয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক। একই সময়ে নিকলী ও মিঠামইনের বিভিন্ন জলপথে পর্যটকবাহী ট্রলার ও স্পিডবোট থামিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেয়। কেউ প্রতিবাদ করলে মারধর, এমনকি পানিতে ফেলে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকার উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে হাওর দেখতে আসা এক পর্যটকের কণ্ঠে এখনও সেই আতঙ্কের রেশ- তিনি বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্যের স্মৃতি নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে যাচ্ছি ভয় আর দুঃস্বপ্ন নিয়ে। সন্ধ্যার আগে নির্জন জলপথে ডাকাতরা আমাদের ট্রলার ঘিরে ধরে। অস্ত্র ঠেকিয়ে সব নিয়ে যায়। এমন অভিজ্ঞতার পর আর কখনো পরিবার নিয়ে এখানে আসার সাহস হবে না।
পর্যটকদের এই অনুপস্থিতি সবচেয়ে নির্মম আঘাত হেনেছে হাওরের মানুষগুলোর জীবনে। কয়েক বছর ধরে বর্ষা এলেই পর্যটনকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হতো, তা এখন প্রায় স্তব্ধ।
হাওরাঞ্চলের প্রায় সহস্রাধিক ট্রলার ও স্পিডবোট দিনের পর দিন ঘাটে বাঁধা পড়ে আছে। যেসব মাঝি ও চালক প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করতেন, তারা এখন জ্বালানির খরচ তোলার মতো যাত্রীও পাচ্ছেন না। কারও হাতে কাজ নেই, কারও ঘরে বাজার নেই, কারও চোখে ঘুম নেই- কারণ সামনে ঋণের কিস্তি, পেছনে অনিশ্চয়তার অন্ধকার।
মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের অলওয়েদার সড়কসংলগ্ন আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস ও ওয়াটার রিসোর্টগুলোর অধিকাংশ কক্ষ এখন ফাঁকা। যে বারান্দাগুলোতে সন্ধ্যায় পর্যটকদের আড্ডা জমত, সেখানে এখন নেমে আসে বিষণ্ন নীরবতা। বুকিং বাতিলের পর একের পর এক উদ্যোক্তা গুনছেন লোকসানের হিসাব।
হাওরের বিখ্যাত পনির বিক্রেতা, শুঁটকি ব্যবসায়ী, মাছভিত্তিক রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ও ঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও একই সংকটে। সারাদিন দোকান খুলে বসে থেকেও অনেকের একটি বিক্রিও হচ্ছে না। যেন পর্যটকদের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের জীবিকার আলো।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. রুবেল মিয়া বলেন, হাওরের পর্যটন আমাদের হাজারো পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এখন মানুষ ভয় পায়। নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে না পারলে শুধু পর্যটন নয়, এই অঞ্চলের অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়মিত নৌ-টহল, স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি, জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাদের ভাষায়, আশ্বাস নয়Ñএখন প্রয়োজন জলপথে দৃশ্যমান রাষ্ট্রের উপস্থিতি।
জেলা পুলিশ ও নৌ-পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে অতিরিক্ত টহল, অস্থায়ী ক্যাম্প, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে মুসলিমা বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপরাধ বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























