ঢাকা , রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে: রাষ্ট্রদূত মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের রাজনীতির মূল লক্ষ্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৭ বছর স্বৈরাচারী সরকার মানুষকে কথা বলতে দেয়নি : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ক্ষমতাগ্রহণের ৫ মাসে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান সাফল্য রয়েছে: মাহদী আমিন মেসির অভিজ্ঞতা বনাম ইয়ামালের তারুণ্য ফাইনালের মহারণে আর্জেন্টিনা-স্পেন মসজিদুল হারামে নতুন প্রযুক্তি, যেসব সুবিধা পাবেন হাজিরা আগামী মাসে আসছে ‘প্রবাসী কার্ড’, মিলবে ১০ বিশেষ সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের প্রতিটি শর্ত লঙ্ঘন করেছে : ইরান শ’ ছাড়িয়েছে শসা-কাঁচা মরিচ ও টমেটোর দাম ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে ১৫ কৃষিবিদ বন্ধুর ৪৫ বিঘার নিরাপদ ফলের বাগান

মাছ ধরার লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর সাগরে

‘মা, দোয়া কইরো। মাছ পাইলে দুই-তিন দিনের মধ্যে আমি আর আব্বা ফিরমু।’ কারও শেষ ফোনে ছিল ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। কেউ ঘর ছাড়ার আগে বলেছিলেন, ‘এই ট্রিপ থেকে ফিরে এলেই ঋণের বোঝা কিছুটা কমবে। আমাদের দিনও একদিন ফিরবে।’ উপকূলের জেলে পরিবারের কাছে এমন কথাগুলো শুধু বিদায়ের বাক্য নয়, টিকে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ শেষ হয়েছে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পাঁচটি পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায়। সেই অপেক্ষার পাশাপাশি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই। তবু বছরের পর বছর এসব ট্রলার গভীর সাগরে যাচ্ছে। স্বপ্ন ছিল জীবিকা, বাস্তবতা হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা। আর সেই বৈপরীত্যই

নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ভাগ্য কি শুধু বৈরী আবহাওয়া নির্ধারণ করেছে, নাকি দীর্ঘদিনের তদারকির ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা ও আইনের দুর্বল বাস্তবায়নও তাদের না ফেরার গল্পের অংশ?

গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের তরুণ জেলে আবু সায়েম। গত ৫ জুলাই মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপে তিনি দুই-তিন দিনের মধ্যে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে, বৈরী আবহাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে মাছ ধরার ট্রলারটি ডুবে গেছে। আবু সায়েম ও তার বাবা ফোরকান সিকদারের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। সন্ধ্যা নামলে নদীর ঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকেন সায়েমের মা। দূরে ট্রলার ভিড়লেই মনে হয়, ছেলে ফিরবে। প্রতিবারই আশা ভাঙে। স্বামী ও ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। কোনো দিন একবেলা খাবারও জোটে না। ছোট ছেলে ঢাকার ফতুল্লার একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়ে। প্রতি মাসে চার হাজার টাকা পাঠানোর সামর্থ্যও আর নেই। ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগলেও চিকিৎসার টাকা নেই তার হাতে।

নিখোঁজ জেলে আক্কাসের স্ত্রী প্রাপ্তি জানান, প্রায় ৬০ হাজার টাকার ঋণ ও সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে জীবনে প্রথমবার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তার স্বামী। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘এই ট্রিপ থেকে ফিরে এলেই ঋণের বোঝা কিছুটা কমবে। আমাদের দিনও একদিন ফিরবে।’ প্রাপ্তি বলেন, ‘সংসারের অভাবই ওকে সাগরে নিয়ে গেছে। জীবনে কোনোদিন গভীর সমুদ্রে যায়নি। ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। তবুও আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল। এখন আমার ছোট্ট মেয়েটা সারাক্ষণ বাবাকে খোঁজে। আমি ওকে কী বলব? কীভাবে বোঝাব, তার বাবা হয়তো আর কোনো দিন ফিরবে না? প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়, দরজায় কড়া নেড়ে ফিরে এসে বলবে—আমি এসেছি। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, সেই আশাটুকুও ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো দাবি নেই। শুধু আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা—অন্তত ওর মরদেহটা যেন ফিরে আসে। শেষবারের মতো মুখটা দেখে দাফন করতে চাই।’ গত ৫ জুলাই রাত প্রায় ১০টার দিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ১১ জেলেকে নিয়ে মাছ ধরছিল ট্রলারটি। প্রচণ্ড ঝোড়োহাওয়া ও বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে সেটি ডুবে যায়। পরদিন পাঁচ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। চার দিন পর অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হন আল আমিন। এখনো নিখোঁজ হারুন হাওলাদার, এমাদুল, ফোরকান, সায়েম ও আক্কাস। জীবিত ফিরে আসা আল আমিন বলেন, ‘তিন দিন উল্টে থাকা ট্রলারের ওপর ছিলাম। এক দিন পাট আঁকড়ে সাগরে ভেসে ছিলাম।

ওই সময় কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনীর কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ চোখে পড়েনি। সময়মতো কার্যকর উদ্ধার অভিযান হলে নিখোঁজ পাঁচ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব ছিল।’ গলাচিপা উপজেলার একটি ট্রলারেরও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, লাইসেন্স, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, তদারকি ও সমন্বয়ের ঘাটতি উপকূলের জেলেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সামুদ্রিক মৎস্য আইন, ২০২০ অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে লাইসেন্স, নিবন্ধন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জীবন রক্ষাকারী উপকরণ বাধ্যতামূলক। গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। বর্তমানে ১৯০টি অনুমতিপত্র রয়েছে, সেগুলো শুধু উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরার জন্য। সরকারি হিসাবেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ১৪ জেলে নিহত হয়েছেন। এ বছর নিখোঁজ পাঁচজন। একই সময়ে কতটি ট্রলার ডুবেছে, কতজন আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। গলাচিপা উপজেলা আদালত সূত্রে জানা যায়, সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। জেলেরা জানান, গভীর সমুদ্রে টানা ১০ থেকে ২০ দিন থাকতে হয়; বৈরী আবহাওয়া, ঢেউ, ইঞ্জিন বিকল ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাদের ভাষায়, ‘সমুদ্রে গেলে কেউ নিশ্চিত বলতে পারে না, সে আবার ঘরে ফিরবে কি না।’ ট্রলার মালিক মো. আল মামুন মৃধা বলেন, উপজেলা মৎস্য অফিসের অনুমতিপত্রকেই আমরা দীর্ঘদিন লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই।

নিয়মিত তদারকি হলে এক মাসের মধ্যেই সব ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া, জিপিএস ও রেডিও নিশ্চিত করা সম্ভব। ২৫ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরা জেলে বেল্লাল মাঝি বলেন, ‘আমাদের ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া, জিপিএস বা রেডিও—কোনোটিই নেই। আগে কখনো এসব যাচাই করা হয়নি, এখনও হয় না। শুধু মৎস্য বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়েই আমরা গভীর সাগরে যাই, এটাকেই লাইসেন্স মনে করি।’ বাংলাদেশ কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের রাঙ্গাবালী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার মো. ইমরান কবির বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হয়। বিগত বছরের তথ্য এই অফিসে নেই।

তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো নৌকা বা জেলেকে উদ্ধার করা হয়নি। লাইসেন্স ছাড়া ট্রলার সাগরে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সন্দেহ হলে ট্রলার তল্লাশি করা হয়। গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুর নবী বলেন, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ট্রলারডুবিতে নিহত বা নিখোঁজের ঘটনায় মামলা করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রচার করলেই প্রাণহানি কমবে না। বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সরঞ্জাম, নিয়মিত পরিদর্শন, জেলেদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা ও আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি বছর একই শোক ও একই প্রতিশ্রুতি ফিরে আসে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন সীমিত। আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজ নিশ্চিত না হলে জীবিকার সমুদ্র উপকূল হাজারো পরিবারের কাছে বারবার মৃত্যুফাঁদ হয়েই ফিরে আসবে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে: রাষ্ট্রদূত

মাছ ধরার লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর সাগরে

আপডেট টাইম : ১৬ ঘন্টা আগে

‘মা, দোয়া কইরো। মাছ পাইলে দুই-তিন দিনের মধ্যে আমি আর আব্বা ফিরমু।’ কারও শেষ ফোনে ছিল ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। কেউ ঘর ছাড়ার আগে বলেছিলেন, ‘এই ট্রিপ থেকে ফিরে এলেই ঋণের বোঝা কিছুটা কমবে। আমাদের দিনও একদিন ফিরবে।’ উপকূলের জেলে পরিবারের কাছে এমন কথাগুলো শুধু বিদায়ের বাক্য নয়, টিকে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ শেষ হয়েছে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পাঁচটি পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায়। সেই অপেক্ষার পাশাপাশি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই। তবু বছরের পর বছর এসব ট্রলার গভীর সাগরে যাচ্ছে। স্বপ্ন ছিল জীবিকা, বাস্তবতা হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা। আর সেই বৈপরীত্যই

নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ভাগ্য কি শুধু বৈরী আবহাওয়া নির্ধারণ করেছে, নাকি দীর্ঘদিনের তদারকির ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা ও আইনের দুর্বল বাস্তবায়নও তাদের না ফেরার গল্পের অংশ?

গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের তরুণ জেলে আবু সায়েম। গত ৫ জুলাই মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপে তিনি দুই-তিন দিনের মধ্যে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে, বৈরী আবহাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে মাছ ধরার ট্রলারটি ডুবে গেছে। আবু সায়েম ও তার বাবা ফোরকান সিকদারের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। সন্ধ্যা নামলে নদীর ঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকেন সায়েমের মা। দূরে ট্রলার ভিড়লেই মনে হয়, ছেলে ফিরবে। প্রতিবারই আশা ভাঙে। স্বামী ও ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। কোনো দিন একবেলা খাবারও জোটে না। ছোট ছেলে ঢাকার ফতুল্লার একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়ে। প্রতি মাসে চার হাজার টাকা পাঠানোর সামর্থ্যও আর নেই। ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগলেও চিকিৎসার টাকা নেই তার হাতে।

নিখোঁজ জেলে আক্কাসের স্ত্রী প্রাপ্তি জানান, প্রায় ৬০ হাজার টাকার ঋণ ও সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে জীবনে প্রথমবার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তার স্বামী। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘এই ট্রিপ থেকে ফিরে এলেই ঋণের বোঝা কিছুটা কমবে। আমাদের দিনও একদিন ফিরবে।’ প্রাপ্তি বলেন, ‘সংসারের অভাবই ওকে সাগরে নিয়ে গেছে। জীবনে কোনোদিন গভীর সমুদ্রে যায়নি। ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। তবুও আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল। এখন আমার ছোট্ট মেয়েটা সারাক্ষণ বাবাকে খোঁজে। আমি ওকে কী বলব? কীভাবে বোঝাব, তার বাবা হয়তো আর কোনো দিন ফিরবে না? প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়, দরজায় কড়া নেড়ে ফিরে এসে বলবে—আমি এসেছি। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, সেই আশাটুকুও ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো দাবি নেই। শুধু আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা—অন্তত ওর মরদেহটা যেন ফিরে আসে। শেষবারের মতো মুখটা দেখে দাফন করতে চাই।’ গত ৫ জুলাই রাত প্রায় ১০টার দিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ১১ জেলেকে নিয়ে মাছ ধরছিল ট্রলারটি। প্রচণ্ড ঝোড়োহাওয়া ও বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে সেটি ডুবে যায়। পরদিন পাঁচ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। চার দিন পর অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হন আল আমিন। এখনো নিখোঁজ হারুন হাওলাদার, এমাদুল, ফোরকান, সায়েম ও আক্কাস। জীবিত ফিরে আসা আল আমিন বলেন, ‘তিন দিন উল্টে থাকা ট্রলারের ওপর ছিলাম। এক দিন পাট আঁকড়ে সাগরে ভেসে ছিলাম।

ওই সময় কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনীর কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ চোখে পড়েনি। সময়মতো কার্যকর উদ্ধার অভিযান হলে নিখোঁজ পাঁচ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব ছিল।’ গলাচিপা উপজেলার একটি ট্রলারেরও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, লাইসেন্স, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, তদারকি ও সমন্বয়ের ঘাটতি উপকূলের জেলেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সামুদ্রিক মৎস্য আইন, ২০২০ অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে লাইসেন্স, নিবন্ধন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জীবন রক্ষাকারী উপকরণ বাধ্যতামূলক। গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। বর্তমানে ১৯০টি অনুমতিপত্র রয়েছে, সেগুলো শুধু উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরার জন্য। সরকারি হিসাবেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ১৪ জেলে নিহত হয়েছেন। এ বছর নিখোঁজ পাঁচজন। একই সময়ে কতটি ট্রলার ডুবেছে, কতজন আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। গলাচিপা উপজেলা আদালত সূত্রে জানা যায়, সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। জেলেরা জানান, গভীর সমুদ্রে টানা ১০ থেকে ২০ দিন থাকতে হয়; বৈরী আবহাওয়া, ঢেউ, ইঞ্জিন বিকল ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাদের ভাষায়, ‘সমুদ্রে গেলে কেউ নিশ্চিত বলতে পারে না, সে আবার ঘরে ফিরবে কি না।’ ট্রলার মালিক মো. আল মামুন মৃধা বলেন, উপজেলা মৎস্য অফিসের অনুমতিপত্রকেই আমরা দীর্ঘদিন লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই।

নিয়মিত তদারকি হলে এক মাসের মধ্যেই সব ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া, জিপিএস ও রেডিও নিশ্চিত করা সম্ভব। ২৫ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরা জেলে বেল্লাল মাঝি বলেন, ‘আমাদের ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া, জিপিএস বা রেডিও—কোনোটিই নেই। আগে কখনো এসব যাচাই করা হয়নি, এখনও হয় না। শুধু মৎস্য বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়েই আমরা গভীর সাগরে যাই, এটাকেই লাইসেন্স মনে করি।’ বাংলাদেশ কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের রাঙ্গাবালী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার মো. ইমরান কবির বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হয়। বিগত বছরের তথ্য এই অফিসে নেই।

তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো নৌকা বা জেলেকে উদ্ধার করা হয়নি। লাইসেন্স ছাড়া ট্রলার সাগরে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সন্দেহ হলে ট্রলার তল্লাশি করা হয়। গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুর নবী বলেন, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ট্রলারডুবিতে নিহত বা নিখোঁজের ঘটনায় মামলা করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রচার করলেই প্রাণহানি কমবে না। বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সরঞ্জাম, নিয়মিত পরিদর্শন, জেলেদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা ও আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি বছর একই শোক ও একই প্রতিশ্রুতি ফিরে আসে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন সীমিত। আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজ নিশ্চিত না হলে জীবিকার সমুদ্র উপকূল হাজারো পরিবারের কাছে বারবার মৃত্যুফাঁদ হয়েই ফিরে আসবে।