জুলাইয়ে জোয়ার ওঠা শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে পরিণত হয় বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চালায় হত্যাযজ্ঞ। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলি খেয়ে মারা যাওয়ার পর যেন পাল্টে যায় আন্দোলনের চিত্র। সরকারপন্থী কর্মী-রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে ঘটে বহু হতাহতের ঘটনা। ‘আমার ভাই মরলো কেন, জবাব চাই জবাব চাই’– ছাত্র-জনতার স্লোগানে কেঁপে উঠে বাংলাদেশ।
রাজপথ যখন শিক্ষার্থীদের রক্তে লাল, তখন প্রতিবাদে সরব হতে দেখা যায় শোবিজ তারকাদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে তারা বিক্ষোভের তুফান তুলেছিলেন; তেমনি ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’, বিক্ষুব্ধ থিয়েটারকর্মী, ‘গেট আপ, স্ট্যান্ড আপ’ ইত্যাদি ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে রাজপথেও সরব ছিলেন শিল্পীরা।
সারাদেশ তখন চলছে কারফিউ। এমন সময়ে ২৬ জুলাই উদীচীর নেতৃত্বে ৩১টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’ প্রথমবারের মতো কারফিউ ভেঙে রাজপথে নামে। তারা প্রতিবাদী সমাবেশ এবং গানের মিছিল আয়োজন করে। সেই গানের মিছিল স্তিমিত হয়ে পড়া আন্দোলনকে সাহস যোগায়।
সারাদেশে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে তৎকালীন সরকার ৩০ জুলাই ‘শোক’ পালনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এটিকে ‘প্রহসন’ উল্লেখ করে এর বদলে লাল কাপড় চোখে-মুখে বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে প্রচার কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
ফেসবুককে লাল রঙে রাঙ্গানোর এই মিছিলে সামিল হন বহু তারকা বা সেলিব্রেটি। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুক প্রোফাইলে লাল রঙের মাঝে মানচিত্রের একটি ছবি প্রকাশ করেন। একই ছবি প্রকাশ করতে দেখা যায় বরেণ্য সংগীতকার প্রিন্স মাহমুদকেও। নির্মাতা আশফাক নিপুণও ‘ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা’ ক্যাপশনে লাল রঙের একটি ছবি প্রকাশ করেন।
ফেসবুকে প্রোফাইল লাল করা প্রতিবাদকারীদের মধ্যে আরও ছিলেন নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন, খিজির হায়াত খান, প্রযোজক সারা আফরীন, রেদওয়ান রনি, নির্মাতা আকরাম খান, মোহম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ, মাবরুর রশিদ বান্নাহ, আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, রুকাইয়া জাহান চমক, মোস্তফা মনোয়ার, চিত্রনায়ক নিরব, নায়িকা বিপাশা কবীর, সোহেল রানা, শাহনাজ সুমি, সাবিলা নূর, সাফা কবির, পারসা ইভানা, সুনেরাহ বিনতে কামালসহ বহু তারকা।
জুলাইয়ের উত্তাল দিনে অভিনেত্রী জয়া আহসান ফেসবুকে লিখেছিলেন– নৈরাশ্য আমাকে শূন্যতার দিকহীন সুড়ঙ্গে ছুড়ে দিয়েছে। এতো মৃত্যু, এতো কান্না। যে জীবন গেছে, তা আর ফিরে আসবে না। যে ক্ষত আমাদের মনে সৃষ্টি হলো, তা অমোচনীয়। কেমন করে পথ চলব আমরা? অবিশ্বাস-অনাস্থা আর ঘৃণার আবহে পথ হারিয়ে ফেলব কি?
জুলাই পথ হারায় না বরং জোয়ার ওঠায়। ৩০ জুলাই আরেকটি বড় গানের মিছিলের আয়োজন করে ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’। উদ্দেশ্য, গান গাইতে গাইতে জিপিও থেকে বাহাদুরশাহ পার্কে যাওয়া। কিন্তু পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়লে সেখানেই তারা প্রতিবাদী গান আর স্লোগানে মুখরিত করে রাখে চারপাশ। সেই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন সিঙ্গার-সং রাইটার সায়ান, কৃষ্ণকলি, অমল আকাশের মতো শিল্পীরা। একে একে রাজপথে দেখা যায় চলচ্চিত্র ও নাটকের বিভিন্ন স্তরের শিল্পীদেরও।
২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত আয়োজিত হয় বিশাল ‘দ্রোহযাত্রা’। সেই যাত্রায় শিক্ষার্থীদের সাথে সামিল হন বহু শিল্পী। শিক্ষক, আইনজীবী ও নানান পেশার মানুষকেও একাত্ম হতে দেখা যায়। দ্রোহযাত্রায় অংশ নেয় ‘বটতলা’ও, নিষ্পেষণের চোরাবালির গল্প তুলে ধরে একটি পথনাটক পরিবেশন করে তারা।
এসব ব্যানারে কিংবা ব্যানারের বাইরে আন্দোলনের সময় রাজপথে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেওয়া শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন আরও অনেকেই। জুলাই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো র্যাপ গান। সমসাময়িক শেকল পরা পরিস্থিতি তুলে ধরে বেশ কিছু র্যাপ গান বেঁধেছিলেন তরুণ শিল্পীরা। গান বানানো এবং গাওয়ার অপরাধে একাধিক শিল্পী কারাবরণ করেন। শহরের দেয়ালে দেয়ালে শিল্পীদের আঁকা ছবি ও গ্রাফিতি আন্দোলনের ঢেউকে উত্তুঙ্গ করে।
এছাড়া, দেশে ও দেশের বাইরে বহু শিল্পী প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন কিংবা নিথর দেহ শিল্পীদের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল রক্তক্ষরণ। তবে এ কথাও সত্য, আন্দোলনের শুরুতে প্রতিবাদকারী অনেক শিল্পীই নীরব ছিলেন। শত শত প্রাণের বিনিময়ে আন্দোলন যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন তাদের আবারও গণমানুষের মিছিলে মিশতে দেখা যায়।
এ কথা বলাই যায়– একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় শিল্পীরা যেমন রাইফেল হাতে নিয়েছিলেন, গান গেয়ে মুক্তিকামী মানুষের মনে শক্তি যুগিয়েছিলেন; তেমনি চব্বিশের জুলাই আন্দোলনেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে প্রতিবাদ করতে শিল্পীরা কুণ্ঠাবোধ করেননি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























