ঢাকা , বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে চলব, প্রয়াত বাবাকে মেসির চিঠি

বাবা হারানোর শোকে এখনো মুহ্যমান লিওনেল মেসি। গত ৮ আগস্ট না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তারকা ফুটবলারের বাবা হোর্হে মেসি। চার দিন পর হোর্হেকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।

একজন বাবার প্রতি সব সন্তানেরই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কাজ করে। মহাতারকা হওয়ার পরও মেসির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ বার্তায় বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর অভাব তুলে ধরেছেন মেসি।

বাবাকে নিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় মেসি যে বার্তা দিয়েছেন, সেটির হুবহু অনুবাদ আপনাদের জন্য তুলে ধরা হলো:

বাবা, এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তুমি চলে গেছ। কিছুতেই যেন বিষয়টা মেনে নিতে পারছি না—বরং সত্যি বলতে, মেনে নিতেই চাইছি না। ভাবতেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যে, তোমাকে আর কোনো দিন দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে পারব না। জানি, তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলে এবং তোমার চলে যাওয়াটাই হয়তো ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলে, পা। আমাদের আরও অনেক কিছু একসঙ্গে উপভোগ করার বাকি ছিল।

তুমি কতবার বলেছিলে, আমি যেন আমার শেষ বিশ্বকাপটা খেলি। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তোমার শরীরটা সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়ে গেল। এই প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে তুমি আমার সঙ্গে থাকতে পারলে না। তবে মা আমাকে বলেছিল, তুমি নিশ্চয়ই ভালো হয়ে উঠবে, ঠিক হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ করে সেখানে আসতে পারবে। আমিও তোমাকে বলতাম, আমরা ফাইনালে উঠব, আর তখন তুমি এসে আমাদের খেলা দেখতে পারবে।

প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি অপেক্ষা করতাম—কখন তোমার মেসেজ আসবে। তোমার বার্তা না পেয়ে, তোমাকে ভীষণ মিস করতে করতে তখনই বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ। তারপরও যতটা সম্ভব দূর এগিয়ে যাওয়ার কথাই ভাবতাম, যাতে তোমার হাতে একটু সময় থাকে, আর তুমি অন্তত একটি ম্যাচ দেখতে পারো।

আমরা ফাইনালে উঠলাম, কিন্তু তুমি আর আসতে পারলে না। আমি চেয়েছিলাম ফাইনালটা জিতে তোমার জন্য সেই ট্রফিটা নিয়ে যাব, তোমাকে নতুন একটা দেখাব। পারলাম না। আমার পা আর চলছিল না। এবার নিজের শরীরের সঙ্গে লড়াই করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। কোনো সময়ই নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ বা স্বস্তিতে মনে হয়নি।

আমি যখন ফিরে এলাম, তুমি তখনও মনে করছিলে আমরা হয়তো পেনাল্টিতে ফাইনাল হেরে গেছি। বিশ্বকাপে যা যা ঘটেছে, সেসব নিয়ে তোমার সঙ্গে আর কোনো কথাই বলা হলো না। তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারলে না। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, কিন্তু তুমি জানো না, প্রতিটি ম্যাচ আমরা কতটা উপভোগ করেছি। আরেকবার তুমি ঠিক প্রমাণিত হলে—তোমার কথা ছিল, আমার সেখানে থাকা উচিত, আমার সেই বিশ্বকাপটা খেলা উচিত।

তোমাকে এসব বলছি, কারণ এই একটিমাত্র বিষয় নিয়েই আমাদের আর কথা বলা হয়ে ওঠেনি। বাকি সবকিছু তুমি এমনিতেই জানো। আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম। আমার ব্যস্ততার ফাঁকে যখনই সুযোগ পেতাম, তখনই দেখা করতাম।

তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে চলব, কীভাবে এগিয়ে যাব—আমি জানি না। আমি তো শুধু ফুটবল খেলতেই জানতাম। অথচ এখন আমার নিজেরই সন্দেহ হচ্ছে, আর কত দিন ফুটবল খেলতে পারব।

শুরু থেকেই তুমি আমার পাশে ছিলে। শেষটা আসতে আর এতটুকুই তো বাকি ছিল। আর একটু কেন অপেক্ষা করলে না, পা? আর একটু থাকলে তো আমরা একসঙ্গে শেষটা দেখতে পারতাম।

আমি জানি, তোমার সবচেয়ে বড় সুখ ছিল তোমার পরিবারকে ভালো থাকতে দেখা—তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানদের। আর সবকিছুর আড়ালে, কাউকে বুঝতে না দিয়ে, আমাকে খেলতে দেখা ছিল তোমার সবচেয়ে বড় আনন্দগুলোর একটি।

ছোটবেলা থেকেই তো এমনটাই ছিল। কাজ থেকে ফিরেই তুমি আমাকে নিয়ে ছুটতে আমার সব অনুশীলনে। অনেক সময় মা আমাকে নিয়ে যেত, কারণ তখন তুমি কাজে থাকতে।

কিন্তু আমার কোনো ম্যাচ তুমি কখনো মিস করতে না। আমাকে খেলতে দেখে তুমি কতটা দুশ্চিন্তা করতে, কতটা কষ্ট পেতে—আবার একই সঙ্গে কতটা আনন্দও পেতে! যদিও আমাকে প্রশংসা করার ব্যাপারে তুমি কখনোই খুব একটা উদার ছিলে না।

তুমি ছিলে আমার বাবা, আমার বন্ধু, আমার প্রতিনিধি। প্রতিটি মুহূর্তে যে মানুষটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তুমি ঠিক সেই মানুষটাই ছিলে। আর কোনো ক্ষেত্রেই তুমি ভুল করোনি। আমাদের মধ্যে কিছু অভিমান, কিছু তর্ক, কিছু ঝগড়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, তুমিই ঠিক ছিলে। শেষমেশ সবকিছুই তোমার বলা পথেই ঘটত।

আমি তোমাকে ভীষণ মিস করব। কিন্তু তুমি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে—বিশেষ করে আমার সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে। আমি তাদের যেভাবে শেখাচ্ছি, যেভাবে মানুষ করছি, ঠিক সেভাবেই, যেভাবে তোমরা আমাকে শিখিয়েছ, মানুষ করেছ।

শান্তিতে ঘুমাও, বাবা। ওপার থেকেও আমাদের আগের মতোই আগলে রেখো। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি বাবা।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে চলব, প্রয়াত বাবাকে মেসির চিঠি

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

বাবা হারানোর শোকে এখনো মুহ্যমান লিওনেল মেসি। গত ৮ আগস্ট না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তারকা ফুটবলারের বাবা হোর্হে মেসি। চার দিন পর হোর্হেকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।

একজন বাবার প্রতি সব সন্তানেরই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কাজ করে। মহাতারকা হওয়ার পরও মেসির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ বার্তায় বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর অভাব তুলে ধরেছেন মেসি।

বাবাকে নিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় মেসি যে বার্তা দিয়েছেন, সেটির হুবহু অনুবাদ আপনাদের জন্য তুলে ধরা হলো:

বাবা, এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তুমি চলে গেছ। কিছুতেই যেন বিষয়টা মেনে নিতে পারছি না—বরং সত্যি বলতে, মেনে নিতেই চাইছি না। ভাবতেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যে, তোমাকে আর কোনো দিন দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে পারব না। জানি, তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলে এবং তোমার চলে যাওয়াটাই হয়তো ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলে, পা। আমাদের আরও অনেক কিছু একসঙ্গে উপভোগ করার বাকি ছিল।

তুমি কতবার বলেছিলে, আমি যেন আমার শেষ বিশ্বকাপটা খেলি। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তোমার শরীরটা সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়ে গেল। এই প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে তুমি আমার সঙ্গে থাকতে পারলে না। তবে মা আমাকে বলেছিল, তুমি নিশ্চয়ই ভালো হয়ে উঠবে, ঠিক হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ করে সেখানে আসতে পারবে। আমিও তোমাকে বলতাম, আমরা ফাইনালে উঠব, আর তখন তুমি এসে আমাদের খেলা দেখতে পারবে।

প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি অপেক্ষা করতাম—কখন তোমার মেসেজ আসবে। তোমার বার্তা না পেয়ে, তোমাকে ভীষণ মিস করতে করতে তখনই বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ। তারপরও যতটা সম্ভব দূর এগিয়ে যাওয়ার কথাই ভাবতাম, যাতে তোমার হাতে একটু সময় থাকে, আর তুমি অন্তত একটি ম্যাচ দেখতে পারো।

আমরা ফাইনালে উঠলাম, কিন্তু তুমি আর আসতে পারলে না। আমি চেয়েছিলাম ফাইনালটা জিতে তোমার জন্য সেই ট্রফিটা নিয়ে যাব, তোমাকে নতুন একটা দেখাব। পারলাম না। আমার পা আর চলছিল না। এবার নিজের শরীরের সঙ্গে লড়াই করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। কোনো সময়ই নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ বা স্বস্তিতে মনে হয়নি।

আমি যখন ফিরে এলাম, তুমি তখনও মনে করছিলে আমরা হয়তো পেনাল্টিতে ফাইনাল হেরে গেছি। বিশ্বকাপে যা যা ঘটেছে, সেসব নিয়ে তোমার সঙ্গে আর কোনো কথাই বলা হলো না। তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারলে না। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, কিন্তু তুমি জানো না, প্রতিটি ম্যাচ আমরা কতটা উপভোগ করেছি। আরেকবার তুমি ঠিক প্রমাণিত হলে—তোমার কথা ছিল, আমার সেখানে থাকা উচিত, আমার সেই বিশ্বকাপটা খেলা উচিত।

তোমাকে এসব বলছি, কারণ এই একটিমাত্র বিষয় নিয়েই আমাদের আর কথা বলা হয়ে ওঠেনি। বাকি সবকিছু তুমি এমনিতেই জানো। আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম। আমার ব্যস্ততার ফাঁকে যখনই সুযোগ পেতাম, তখনই দেখা করতাম।

তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে চলব, কীভাবে এগিয়ে যাব—আমি জানি না। আমি তো শুধু ফুটবল খেলতেই জানতাম। অথচ এখন আমার নিজেরই সন্দেহ হচ্ছে, আর কত দিন ফুটবল খেলতে পারব।

শুরু থেকেই তুমি আমার পাশে ছিলে। শেষটা আসতে আর এতটুকুই তো বাকি ছিল। আর একটু কেন অপেক্ষা করলে না, পা? আর একটু থাকলে তো আমরা একসঙ্গে শেষটা দেখতে পারতাম।

আমি জানি, তোমার সবচেয়ে বড় সুখ ছিল তোমার পরিবারকে ভালো থাকতে দেখা—তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানদের। আর সবকিছুর আড়ালে, কাউকে বুঝতে না দিয়ে, আমাকে খেলতে দেখা ছিল তোমার সবচেয়ে বড় আনন্দগুলোর একটি।

ছোটবেলা থেকেই তো এমনটাই ছিল। কাজ থেকে ফিরেই তুমি আমাকে নিয়ে ছুটতে আমার সব অনুশীলনে। অনেক সময় মা আমাকে নিয়ে যেত, কারণ তখন তুমি কাজে থাকতে।

কিন্তু আমার কোনো ম্যাচ তুমি কখনো মিস করতে না। আমাকে খেলতে দেখে তুমি কতটা দুশ্চিন্তা করতে, কতটা কষ্ট পেতে—আবার একই সঙ্গে কতটা আনন্দও পেতে! যদিও আমাকে প্রশংসা করার ব্যাপারে তুমি কখনোই খুব একটা উদার ছিলে না।

তুমি ছিলে আমার বাবা, আমার বন্ধু, আমার প্রতিনিধি। প্রতিটি মুহূর্তে যে মানুষটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তুমি ঠিক সেই মানুষটাই ছিলে। আর কোনো ক্ষেত্রেই তুমি ভুল করোনি। আমাদের মধ্যে কিছু অভিমান, কিছু তর্ক, কিছু ঝগড়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, তুমিই ঠিক ছিলে। শেষমেশ সবকিছুই তোমার বলা পথেই ঘটত।

আমি তোমাকে ভীষণ মিস করব। কিন্তু তুমি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে—বিশেষ করে আমার সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে। আমি তাদের যেভাবে শেখাচ্ছি, যেভাবে মানুষ করছি, ঠিক সেভাবেই, যেভাবে তোমরা আমাকে শিখিয়েছ, মানুষ করেছ।

শান্তিতে ঘুমাও, বাবা। ওপার থেকেও আমাদের আগের মতোই আগলে রেখো। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি বাবা।