ঢাকা , শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফরহাদের স্ত্রী ৩ দিনের রিমান্ডে নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়াবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার নারীরা কি গাড়ি চালাতে পারবেন, ইসলাম কী বলে এখানে গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত, কর্তার ইচ্ছাই কর্ম হবে: অলি আহমদ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য দিল্লি­ অপেক্ষা করছে: দীনেশ ত্রিবেদী মির্জা ফখরুল আগাগোড়া একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: অর্থমন্ত্রী নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী সৌদির আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশের হাফেজ জাকারিয়া মা-বাবার কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে কারণে ভোট দেননি তারা

কম খরচে ইউরোপে পড়াশোনা, নজরে বাল্টিকের তিন দেশ

ইউরোপে উচ্চশিক্ষার কথা উঠলেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় সাধারণত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স বা নেদারল্যান্ডসের নাম আসে। তবে ইউরোপের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নজরে আসছে। তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচে কিছু প্রোগ্রামে পড়াশোনা, ইংরেজি-মাধ্যমের ডিগ্রি এবং ইউরোপের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হওয়ার সুযোগ দেশ তিনটিকে বিকল্প গন্তব্য হিসেবে সামনে আনছে।

তবে ‘কম খরচ’ মানেই সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব বিষয়ে পড়াশোনা সস্তা এমন নয়। বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর ও শিক্ষার স্তর অনুযায়ী খরচে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই শুধু দেশের নাম দেখে নয়, নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের খরচ ও ভর্তি-শর্ত যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় এগিয়ে এস্তোনিয়া

বাল্টিক তিন দেশের মধ্যে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত এস্তোনিয়া। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার বিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। দেশটির সরকারি ‘স্টাডি ইন এস্তোনিয়া’ প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ১৫০টির বেশি সম্পূর্ণ ইংরেজি-মাধ্যমের ডিগ্রি প্রোগ্রামের তথ্য রয়েছে।

এস্তোনিয়ায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে বেশ পরিবর্তিত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত খরচ হতে পারে। কিছু প্রোগ্রামে টিউশন ফি মওকুফের সুযোগও রয়েছে। আর ডক্টরাল পর্যায়ের পড়াশোনা টিউশন ফিমুক্ত।

প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রে এস্তোনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান টার্তু বিশ্ববিদ্যালয়। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস ২০২৭-এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৩৬৭তম।

এস্তোনিয়ায় পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি আবাসন ও দৈনন্দিন ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারি তথ্যের পুরোনো নির্দেশনায় মাসিক জীবনযাত্রার খরচ আবাসন বাদে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ ইউরো বলা হয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তব খরচ শহর, বাসস্থান ও ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করবে।

লাটভিয়ায় তুলনামূলক কম টিউশন ফি

বাল্টিক অঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ লাটভিয়া। রাজধানী রিগাকে ঘিরে দেশটির উচ্চশিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি রয়েছে। রিগা টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিগা স্ট্রাদিন্স বিশ্ববিদ্যালয় দেশটির পরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে।

লাটভিয়ার সরকারি ‘স্টাডি ইন লাটভিয়া’ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, কিছু স্নাতক প্রোগ্রামের টিউশন ফি বছরে ১ হাজার ৬০০ ইউরোরও কম। কম্পিউটার বিজ্ঞানে সাধারণত বছরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ ইউরো, প্রকৌশলে ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ইউরো এবং ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার থেকে ৬ হাজার ইউরোর মতো খরচ হতে পারে। তবে চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসার মতো বিষয়ে খরচ অনেক বেশি।

জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক থেকেও লাটভিয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। সরকারি হিসাবে শিক্ষার্থীর গড় মাসিক ব্যয় প্রায় ৪৫০ থেকে ৭০০ ইউরো। এর মধ্যে আবাসন, খাবার, ইউটিলিটি ও যাতায়াতের খরচ ধরা হয়।

তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য লাটভিয়ার সরকারি বৃত্তির সুযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সব সরকারি বৃত্তি সব দেশের নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বেসরকারি পরামর্শদাতার তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষের যোগ্য দেশের তালিকা দেখে আবেদন করা উচিত।

লিথুয়ানিয়ায় বাড়ছে ইংরেজি-মাধ্যমের সুযোগ

বাল্টিক অঞ্চলের তৃতীয় দেশ লিথুয়ানিয়াও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। রাজধানী ভিলনিয়াসে অবস্থিত ভিলনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয় দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৫৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগও দিচ্ছে।

লিথুয়ানিয়ার সরকারি ‘স্টাডি ইন লিথুয়ানিয়া’ প্ল্যাটফর্ম অনুযায়ী, দেশটিতে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনার গড় টিউশন ফি বছরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ইউরো থেকে এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ইউরো থেকে শুরু হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় ও শিক্ষার স্তর অনুযায়ী খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

লিথুয়ানিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি-মাধ্যমের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি পর্যায়ে বৃত্তির ব্যবস্থাও আছে। তবে সরকারি বৃত্তির যোগ্যতা আবেদনকারীর নাগরিকত্ব, শিক্ষার স্তর ও প্রোগ্রামের ওপর নির্ভর করে।

বৃত্তি আছে, তবে সবার জন্য নয়

বাল্টিক তিন দেশেই সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন বৃত্তি, টিউশন ফি মওকুফ এবং আর্থিক সহায়তার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি বৃত্তি চালু থাকলেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তাতে আবেদন করতে পারবেন, এমন নয়।

বিশেষ করে সরকারি বৃত্তির ক্ষেত্রে যোগ্য দেশের তালিকা, শিক্ষার স্তর ও নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক শর্ত আলাদা হতে পারে। এ কারণে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তির শর্ত যাচাই করা জরুরি।

এস্তোনিয়াতেও জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি-মাধ্যমের স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদন নেওয়া হয়েছে।

কেন বাল্টিক অঞ্চল বিবেচনায় আসছে

বাল্টিক দেশগুলোর বড় আকর্ষণ হলো পশ্চিম ইউরোপের কিছু জনপ্রিয় গন্তব্যের তুলনায় নির্দিষ্ট কিছু প্রোগ্রামে তুলনামূলক কম টিউশন ফি পাওয়া যায়। পাশাপাশি ইংরেজিতে পড়াশোনার সুযোগ থাকায় স্থানীয় ভাষা না জেনেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেক প্রোগ্রামে আবেদন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য এস্তোনিয়া বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে। অন্যদিকে লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াতেও বিভিন্ন বিষয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোগ্রাম পাওয়া যায়।

তবে বাল্টিক দেশগুলোকে শুধু ‘কম খরচের ইউরোপ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। চিকিৎসা, দন্ত চিকিৎসা, আইন, ব্যবসা বা বিশেষায়িত কিছু প্রোগ্রামে টিউশন ফি অনেক বেশি হতে পারে। লাটভিয়াতেই যেমন দন্ত চিকিৎসায় বছরে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত টিউশন ফি হতে পারে।

ভিসা ও আবাসনের নিয়মেও নজর দিতে হবে

উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিটের নিয়ম পূরণ করতে হবে। প্রয়োজন হতে পারে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, স্বাস্থ্যবিমা, আবাসনের তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি এবং ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ।

আরেকটি বিষয় হলো, কোনো একটি বাল্টিক দেশের শিক্ষার্থী রেসিডেন্স পারমিট থাকলেই অন্য ইউরোপীয় দেশে গিয়ে পড়াশোনা বা কাজ করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি হয় না। অন্য দেশে পড়াশোনা বা কাজ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব অভিবাসন ও শিক্ষাবিষয়ক নিয়ম মানতে হবে।

তাই ‘সহজ ভিসা’ বা ‘ভিসা অ্যাপ্রুভাল রেট বেশি’—এ ধরনের প্রচারণার বদলে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক সামর্থ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নির্দিষ্ট ভিসা শর্ত পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া বেশি নিরাপদ।

আন্ডাররেটেড’ হলেও সবার জন্য নয়

যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা নেদারল্যান্ডসের তুলনায় কম আলোচিত হওয়ায় এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াকে অনেকেই ইউরোপের ‘আন্ডাররেটেড’ উচ্চশিক্ষা গন্তব্য হিসেবে দেখছেন। বাস্তবে দেশ তিনটিতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন প্রোগ্রাম থাকলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য এগুলো সেরা বিকল্প, এমন নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের মান ও অ্যাক্রেডিটেশন, টিউশন ফি, আবাসন ব্যয়, বৃত্তির যোগ্যতা, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের নিয়ম এবং ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিটের শর্ত—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সব মিলিয়ে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইউরোপে উচ্চশিক্ষার পরিচিত গন্তব্যগুলোর বাইরে সম্ভাবনাময় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা এবং ইংরেজি-মাধ্যমের বিভিন্ন প্রোগ্রামে আগ্রহীদের জন্য বাল্টিক অঞ্চলটি নতুন করে বিবেচনার দাবি রাখে।

তবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত ‘কম খরচ’ বা ‘সহজ ভিসা’র প্রচারণা নয়; বরং নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, বৃত্তির সুযোগ, নিজের একাডেমিক যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফরহাদের স্ত্রী ৩ দিনের রিমান্ডে

কম খরচে ইউরোপে পড়াশোনা, নজরে বাল্টিকের তিন দেশ

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

ইউরোপে উচ্চশিক্ষার কথা উঠলেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় সাধারণত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স বা নেদারল্যান্ডসের নাম আসে। তবে ইউরোপের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নজরে আসছে। তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচে কিছু প্রোগ্রামে পড়াশোনা, ইংরেজি-মাধ্যমের ডিগ্রি এবং ইউরোপের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হওয়ার সুযোগ দেশ তিনটিকে বিকল্প গন্তব্য হিসেবে সামনে আনছে।

তবে ‘কম খরচ’ মানেই সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব বিষয়ে পড়াশোনা সস্তা এমন নয়। বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর ও শিক্ষার স্তর অনুযায়ী খরচে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই শুধু দেশের নাম দেখে নয়, নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের খরচ ও ভর্তি-শর্ত যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় এগিয়ে এস্তোনিয়া

বাল্টিক তিন দেশের মধ্যে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত এস্তোনিয়া। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার বিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। দেশটির সরকারি ‘স্টাডি ইন এস্তোনিয়া’ প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ১৫০টির বেশি সম্পূর্ণ ইংরেজি-মাধ্যমের ডিগ্রি প্রোগ্রামের তথ্য রয়েছে।

এস্তোনিয়ায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে বেশ পরিবর্তিত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত খরচ হতে পারে। কিছু প্রোগ্রামে টিউশন ফি মওকুফের সুযোগও রয়েছে। আর ডক্টরাল পর্যায়ের পড়াশোনা টিউশন ফিমুক্ত।

প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রে এস্তোনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান টার্তু বিশ্ববিদ্যালয়। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস ২০২৭-এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৩৬৭তম।

এস্তোনিয়ায় পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি আবাসন ও দৈনন্দিন ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারি তথ্যের পুরোনো নির্দেশনায় মাসিক জীবনযাত্রার খরচ আবাসন বাদে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ ইউরো বলা হয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তব খরচ শহর, বাসস্থান ও ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করবে।

লাটভিয়ায় তুলনামূলক কম টিউশন ফি

বাল্টিক অঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ লাটভিয়া। রাজধানী রিগাকে ঘিরে দেশটির উচ্চশিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি রয়েছে। রিগা টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিগা স্ট্রাদিন্স বিশ্ববিদ্যালয় দেশটির পরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে।

লাটভিয়ার সরকারি ‘স্টাডি ইন লাটভিয়া’ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, কিছু স্নাতক প্রোগ্রামের টিউশন ফি বছরে ১ হাজার ৬০০ ইউরোরও কম। কম্পিউটার বিজ্ঞানে সাধারণত বছরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ ইউরো, প্রকৌশলে ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ইউরো এবং ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার থেকে ৬ হাজার ইউরোর মতো খরচ হতে পারে। তবে চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসার মতো বিষয়ে খরচ অনেক বেশি।

জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক থেকেও লাটভিয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। সরকারি হিসাবে শিক্ষার্থীর গড় মাসিক ব্যয় প্রায় ৪৫০ থেকে ৭০০ ইউরো। এর মধ্যে আবাসন, খাবার, ইউটিলিটি ও যাতায়াতের খরচ ধরা হয়।

তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য লাটভিয়ার সরকারি বৃত্তির সুযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সব সরকারি বৃত্তি সব দেশের নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বেসরকারি পরামর্শদাতার তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষের যোগ্য দেশের তালিকা দেখে আবেদন করা উচিত।

লিথুয়ানিয়ায় বাড়ছে ইংরেজি-মাধ্যমের সুযোগ

বাল্টিক অঞ্চলের তৃতীয় দেশ লিথুয়ানিয়াও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। রাজধানী ভিলনিয়াসে অবস্থিত ভিলনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয় দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৫৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগও দিচ্ছে।

লিথুয়ানিয়ার সরকারি ‘স্টাডি ইন লিথুয়ানিয়া’ প্ল্যাটফর্ম অনুযায়ী, দেশটিতে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনার গড় টিউশন ফি বছরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ইউরো থেকে এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ইউরো থেকে শুরু হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় ও শিক্ষার স্তর অনুযায়ী খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

লিথুয়ানিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি-মাধ্যমের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি পর্যায়ে বৃত্তির ব্যবস্থাও আছে। তবে সরকারি বৃত্তির যোগ্যতা আবেদনকারীর নাগরিকত্ব, শিক্ষার স্তর ও প্রোগ্রামের ওপর নির্ভর করে।

বৃত্তি আছে, তবে সবার জন্য নয়

বাল্টিক তিন দেশেই সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন বৃত্তি, টিউশন ফি মওকুফ এবং আর্থিক সহায়তার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি বৃত্তি চালু থাকলেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তাতে আবেদন করতে পারবেন, এমন নয়।

বিশেষ করে সরকারি বৃত্তির ক্ষেত্রে যোগ্য দেশের তালিকা, শিক্ষার স্তর ও নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক শর্ত আলাদা হতে পারে। এ কারণে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তির শর্ত যাচাই করা জরুরি।

এস্তোনিয়াতেও জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি-মাধ্যমের স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদন নেওয়া হয়েছে।

কেন বাল্টিক অঞ্চল বিবেচনায় আসছে

বাল্টিক দেশগুলোর বড় আকর্ষণ হলো পশ্চিম ইউরোপের কিছু জনপ্রিয় গন্তব্যের তুলনায় নির্দিষ্ট কিছু প্রোগ্রামে তুলনামূলক কম টিউশন ফি পাওয়া যায়। পাশাপাশি ইংরেজিতে পড়াশোনার সুযোগ থাকায় স্থানীয় ভাষা না জেনেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেক প্রোগ্রামে আবেদন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য এস্তোনিয়া বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে। অন্যদিকে লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াতেও বিভিন্ন বিষয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোগ্রাম পাওয়া যায়।

তবে বাল্টিক দেশগুলোকে শুধু ‘কম খরচের ইউরোপ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। চিকিৎসা, দন্ত চিকিৎসা, আইন, ব্যবসা বা বিশেষায়িত কিছু প্রোগ্রামে টিউশন ফি অনেক বেশি হতে পারে। লাটভিয়াতেই যেমন দন্ত চিকিৎসায় বছরে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত টিউশন ফি হতে পারে।

ভিসা ও আবাসনের নিয়মেও নজর দিতে হবে

উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিটের নিয়ম পূরণ করতে হবে। প্রয়োজন হতে পারে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, স্বাস্থ্যবিমা, আবাসনের তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি এবং ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ।

আরেকটি বিষয় হলো, কোনো একটি বাল্টিক দেশের শিক্ষার্থী রেসিডেন্স পারমিট থাকলেই অন্য ইউরোপীয় দেশে গিয়ে পড়াশোনা বা কাজ করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি হয় না। অন্য দেশে পড়াশোনা বা কাজ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব অভিবাসন ও শিক্ষাবিষয়ক নিয়ম মানতে হবে।

তাই ‘সহজ ভিসা’ বা ‘ভিসা অ্যাপ্রুভাল রেট বেশি’—এ ধরনের প্রচারণার বদলে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক সামর্থ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নির্দিষ্ট ভিসা শর্ত পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া বেশি নিরাপদ।

আন্ডাররেটেড’ হলেও সবার জন্য নয়

যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা নেদারল্যান্ডসের তুলনায় কম আলোচিত হওয়ায় এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াকে অনেকেই ইউরোপের ‘আন্ডাররেটেড’ উচ্চশিক্ষা গন্তব্য হিসেবে দেখছেন। বাস্তবে দেশ তিনটিতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন প্রোগ্রাম থাকলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য এগুলো সেরা বিকল্প, এমন নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের মান ও অ্যাক্রেডিটেশন, টিউশন ফি, আবাসন ব্যয়, বৃত্তির যোগ্যতা, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের নিয়ম এবং ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিটের শর্ত—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সব মিলিয়ে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইউরোপে উচ্চশিক্ষার পরিচিত গন্তব্যগুলোর বাইরে সম্ভাবনাময় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা এবং ইংরেজি-মাধ্যমের বিভিন্ন প্রোগ্রামে আগ্রহীদের জন্য বাল্টিক অঞ্চলটি নতুন করে বিবেচনার দাবি রাখে।

তবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত ‘কম খরচ’ বা ‘সহজ ভিসা’র প্রচারণা নয়; বরং নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, বৃত্তির সুযোগ, নিজের একাডেমিক যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা।