মানুষ দিনদিন আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পুলিশ ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্যে, বছরে গড়ে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছে। দিনে এ সংখ্যা গড়ে ৪০ জন। গত ছয় বছরে মোট ৮৭ হাজার ৮৮ জন আত্মহত্যা করেছে।
জরিপে পাওয়া তথ্যে, পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রতি মাসে গড়ে ৩৩ জন শিক্ষার্থী নানাবিধ কারণে আত্মহত্যা করছে। মনোচিকিৎসকরা বলছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এ অবস্থায় কাল ১০ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হবে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য-‘চ্যাঞ্জিং দ্য ন্যারেটিভ অন সুইসাইড’।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, দেশে ২০২০ সালে ১৪ হাজার ৫৫৬, ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৫০, ২০২২ সালে ১৫ হাজার ৯৮৭, ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৮৪, ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ৯২০ এবং ২০২৫ সালে (নভেম্বর পর্যন্ত) ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা করে।
আত্মহত্যার কারণ : আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যে, বাংলাদেশে আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই নারী শতকরা ৫৭ ভাগ, আর পুরুষ শতকরা ৪৩ ভাগ। সংগঠনটির জরিপে তরুণদের আত্মহত্যার পেছনের বড় কারণ পারিবারিক কলহ। আর আার্থিক অস্বচ্ছলতায় বছরে বড় একটি অংশ আত্মহত্যা করছে। এ ছাড়া বেকারত্ব, ঋণগ্রস্ত হওয়া, চাকরি ও ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিবেশে অনেক আত্মহত্যা করে। বিভিন্ন অসুস্থতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং বিষণœতা মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করছে। এ ছাড়া প্রেমঘটিত কারণেও অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে। পরিবারের সদস্য ও শিক্ষকদের সঙ্গে অভিমান থেকেও শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরাও এ তালিকায় আছে। এ ছাড়া মাদকাসক্তি, পারসোনালিটি ডিসওর্ডার থেকেও অনেকে আত্মহত্যায় ঝোঁকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম রাব্বানী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন মানুষের চাহিদা বেড়ে গেছে। মানুষ দৈনন্দিন জীবনকে যান্ত্রিক করে তুলছে। দিন দিন মানসিক চাপ বাড়ছে। এতে মানুষের যে অহম তা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে আহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একজন আত্মহত্যায় ঝুঁকে যায়। বিষণœতার কারণে মানুষ ক্রমেই আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। আত্মহত্যার সঙ্গে মানসিক, শারীরিক সমস্যাগুলোও জড়িত। আমার কাছে আসা রোগীদের মধ্যে ১০ জনের মধ্যে একজন আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের অনেকেই সরাসরি আত্মহত্যা করতে চায় বলেও স্বীকার করেছেন।
ঝুঁকিতে আছে যারা : বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে তারা আত্মহত্যা প্রবণ। এ ছাড়া কমবয়সি তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরাও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, উঠতি বয়সি যে তরুণ-তরুণীদের স্বপ্ন পূরণ হয় না, যারা ভালো চাকরি পাচ্ছে না, প্রেমের সম্পর্কে ব্যর্থ হচ্ছে তারা আত্মহত্যা করছেন। আবার যে নারীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তারাও ঝুঁকিতে আছেন। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক সহিংসতার শিকার সেই পরিবারের শিশুটিও ঝুঁকিতে আছে। কম বয়সি যে মেয়েরা বিয়ের পর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তারা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে। তালাকপ্রাপ্ত নারীরাও অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকের স্ত্রীদের কেউ কেউ সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে আত্মহত্যা করছেন।
উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যায় : আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যে, ২০২১ সালে ১০১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ২০২২ সালে ৫৩২, ২০২৩ সালে ৫১৩, ২০২৪ সালে ৩১০ এবং ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা আত্মহত্যা করেন এদের বেশির ভাগের বয়স গড়ে ১৩ থেকে ১৯ বছর। আত্মহত্যাকারীদের ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুল শিক্ষার্থী। আর ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঢাকায় আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরেই এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় ১০ শিক্ষাথী আত্মহত্যা করে। আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তানসেন রোজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যে বিপুল পরিমাণ মানুষ দেশে আত্মহত্যা করেন তার একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী। বছরে গড়ে ৫০০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। এর বাইরেও অন্তত এক থেকে দেড় হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর আত্মহত্যা করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা আত্মহত্যা করছেন, এ-সংক্রান্ত ডেটাবেজ তৈরি ও বিশ্লেষণ করে কোথায় এবং কেন আত্মহত্যা বেশি হচ্ছে তা বের করতে হবে। শিক্ষার্থীরা নিজের মানসিক সমস্যার কথা বলতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করছে। স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে কাজ করতে হবে। যেহেতু দেশে মানসিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জনবল কম, এজন্য অন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনের ভার কমনোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং আত্মহত্যা রোধে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিরোধ যেভাবে : আত্মহত্যা প্রতিরোধে কয়েকটি স্তরে কাজ করার আছে। আত্মহত্যা যে একটি গুরুতর জনস্বার্থমূলক ইস্যু তা সরকারকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি না হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে ভালো কোনো উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সংশ্লিষ্টরা বোধ করবে না। এ সমস্যাকে অন্য স্বাস্থ্য সমস্যার মতোই দেখতে হবে। তা না হলে এটি নীরব মহামারির আকার ধারণ করবে। আত্মহত্যা নিয়ে কথা বললে এটি বেড়ে যাবে এ ধারণা ভুল। বিষয়টিকে যত চেপে বা গোপন রাখাই হোক না কেন তা আত্মহত্যা কমাতে ভূমিকা রাখবে না। আত্মহত্যা বিষয়ে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বের করাসহ কারা ঝুঁকিতে আছে তা চিহ্নিত করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যখন কোনো সমাজে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ অস্থিরতা তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রের এ অস্থিরতা কমানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকে তখন পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষা ও কর্মজীবনে এর প্রভাব পড়ে। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেলে নানারকম মানসিক সমস্যা শুরু হয়। আত্মহত্যা এক ধরনের মানসিক সমস্যা। এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু অপ্রাপ্তি, মানসিক অস্থিরতা।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























