ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপন করবে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি টয়োটা লং মার্চ বন্ধ করে সংলাপে বসার আহ্বান শাহবাজ শরীফের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় কার্পণ্য করবে না সরকার : এলজিআরডি মন্ত্রী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এক বছরের মধ্যে লক্ষ্য ৫ হাজার মেগাওয়াট ফ্যামিলি কার্ডের সঠিক ব্যবহারে দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ: বিশ্বব্যাংক শিক্ষার্থীরাই যার সন্তান, কল্যাণী তাদের স্বপ্নসারথি ভিকির পুলসিরাতে মেহজাবীন এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনতে বুধবার চুক্তি সই শিগগির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি, আলোচনায় যারা ৩০ ব্যাংকের কার্ড-এটিএমসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ, কিউ-ক্যাশ কর্তৃপক্ষকে তলব

শিক্ষার্থীরাই যার সন্তান, কল্যাণী তাদের স্বপ্নসারথি

সন্তান নেই, তবু মাতৃত্বের অনুভূতি থেকে বঞ্চিত নন কল্যাণী মিনজি। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এই প্রধান শিক্ষকের কাছে বিদ্যালয়ের ২৪০ শিক্ষার্থীই যেন নিজের সন্তান। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, জীবনদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে শিশুদের পাশে থাকেন তিনি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও কাজ করছেন এই শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের হাসি ও সাফল্যের মধ্যেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন কল্যাণী।
সংসারে অভাব ছিল। ছিল সামাজিক বাধাবিপত্তিও। তবু ৬ বোনের পাঁচজনই পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরেক বোন পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাইও কলেজে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সেই পরিবারেরই একজন কল্যাণী মিনজি। পেশায় শিক্ষক। তবে তার কাছে শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; শিশুদের নিজের সন্তানের মতো বড় করে তোলার দায়িত্ব।
ওঁরাও সম্প্রদায়ের এই নারী এখন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কল্যাণই তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে গিয়ে শিশুদের শিক্ষা, খেলাধুলা, জীবনদক্ষতা ও বিকাশ নিয়ে কাজ করেন তিনি। নানামুখী উদ্যোগে সফলও হয়েছেন। এ কারণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রিয় একজন শিক্ষক।
কল্যাণী মিনজির জন্ম ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর। বাবার বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই গ্রামে। বাবা কমলা মিনজি ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা বাসন্তী রানী ছিলেন গৃহিণী।
সীমিত সামর্থ্যের সংসারে ছয় বোন ও এক ভাইকে বড় করে তোলা সহজ ছিল না। আর্থিক অনটন ও সামাজিক বাধাবিপত্তি পেরিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। তবে, পড়াশোনার প্রতি পরিবারের আগ্রহ ছিল প্রবল।
কল্যাণী ১৯৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরই তার বিয়ে হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। শ্বশুরবাড়িতে এসেও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থামেনি। স্নাতক প্রথমবর্ষে থাকাকালেই প্রেমতলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্নাতকোত্তর শেষ করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন পাঁচবিবি কলেজে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থেকে এত দূরে গিয়ে চাকরি করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে গোদাগাড়ীতে চলে আসেন কল্যাণী। এখানে এসে শিশুদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে এখন তিনি শিশুদের স্বপ্নের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে কল্যাণী বললেন, ‘সব সময় শিক্ষকতা আমাকে টেনেছে। কলেজ-মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু শিশুদের সঙ্গে থাকতেই আমার ভালো লাগে। এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম। আমার কোনো আক্ষেপ নেই।’
বিদ্যালয়ের শিশুরাই তার সন্তান
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন ঠিক সময়মতো বিদ্যালয়ে যান কল্যাণী। বিদ্যালয় থেকে বের হন সবার শেষে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বাড়িতে ডেকে পড়ান। শুধু বইয়ের পড়া নয়, শিশুদের জীবনঘনিষ্ঠ নানা বিষয়ও শেখান তিনি।
শিক্ষার্থীদের সাইকেল চালানো শেখান। চলে সাঁতার শেখানোর কাজও। ছোট ছোট শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন ফুটবল। তার হাত ধরে সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা নিয়মিত খেলাধুলায় যুক্ত হয়েছে।
শুরুতে মেয়েদের ফুটবল খেলানো নিয়েও সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে, কিন্তু সেসব বাধা তাকে থামাতে পারেনি। খেলাধুলার প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরি করতে নিয়মিত উৎসাহ দিয়েছেন।
এর ফলও এসেছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে তার বিদ্যালয় গোদাগাড়ী উপজেলা পর্যায়ে টানা ৯ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শুধু উপজেলা পর্যায়েই নয়, বিদ্যালয়ের ফুটবল দল কয়েকবার জাতীয় পর্যায়েও খেলার সুযোগ পেয়েছে।
কল্যাণী মিনজির কাছে খেলাধুলা শুধু জয়ের বিষয় নয়। তার মতে, খেলাধুলা শিশুদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলারও একটি মাধ্যম।
বর্তমানে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ২৪০ জন। কল্যাণীর দাবি, এই বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে না। নেই বাল্যবিয়েও।
মাতৃভাষায় বই লেখার কাজ
কল্যাণী মিনজির কাজের পরিধি শুধু নিজের বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। ওঁরাও, মুন্ডা, রাজোয়ারসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য সাদরি ভাষায় সরকারি পাঠ্যবই লেখার কাজেও যুক্ত তিনি।
আরও কয়েকজনের সঙ্গে সহজ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের জন্য বই লিখেছেন কল্যাণী মিনজি। নিজের সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষায় শেখার সুযোগ তৈরির এই কাজও তার শিক্ষকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে, পথটা সহজ ছিল না। কল্যাণী জানান, তার বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় শেখার বই পেত না। বিষয়টি দেখে অনেক আগে থেকেই সাদরি ভাষায় বই লেখার কাজ শুরু করেন তিনি।
২০১০ সালের দিকে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা তাকে দিয়ে বই লেখাত। পরে এ খবর পৌঁছে যায় সরকারের কাছেও। ২০১৫ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সাদরি ভাষায় বই লিখতে একটি দল ঠিক করে। সেই দলে ডাক পান কল্যাণী।
ওই বছর প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির বই লেখা হয়। পরের বছর লেখা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির বই। ২০২০ সালে লেখা হয় তৃতীয় শ্রেণির বই।
কল্যাণী জানান, এখন সাদরি ভাষার বই পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে, একটি সমস্যা রয়ে গেছে। সাদরি ভাষার বই নিলে শিশুরা বাংলা বই পাবে না। এ কারণে শিক্ষকেরা এই বই নিতে আগ্রহী হন না।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথা বলেছেন কল্যাণী। তিনি জেনেছেন, আগামী বছর থেকে শিশুদের দুই ভাষারই বই দেওয়া হবে।
তবে তার মতে, শুধু বই দিলেই হবে না, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষকও প্রয়োজন।
এসেছে স্বীকৃতিও
শিক্ষকতা ও বিদ্যালয় পরিচালনায় কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন বারবার। কল্যাণী মিনজি ২০১২ ও ২০১৭ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে তার বিদ্যালয় শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় নির্বাচিত হয়।
শিক্ষা ও শিশুদের নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে বেগম রোকেয়া দিবসে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃতী নারী সম্মাননা পদক পান কল্যাণী মিনজি।
এরপর ২০২৪ সালে রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন তিনি। একই ক্যাটাগরিতে ওই বছরের ৮ মার্চ জাতীয় পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ জয়িতা হিসেবে পুরস্কৃত হন।
কল্যাণীর ব্যক্তিজীবনেও রয়েছে আলাদা এক গল্প। গোপালপুর গ্রামের চিত্তরঞ্জন সরদারের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন। তাদের কোনো সন্তান নেই। তবে, এ নিয়ে কল্যাণী মিনজির কোনো আক্ষেপ নেই, কষ্টও নেই। তার কাছে বিদ্যালয়ের শিশুরাই যেন নিজের সন্তান।
কল্যাণী বলেন, ‘সন্তান হয়নি, এতে কোনো খারাপ লাগে না। আমার স্বামীরও কষ্ট হয় না। বিদ্যালয়ের সব বাচ্চা আমার বাচ্চা। আমি তো স্কুলের বাচ্চাদের সেভাবেই দেখি।’
শিক্ষকতার দীর্ঘ জীবনে তাই নিজের সন্তান না থাকার শূন্যতাকে তিনি আলাদা করে দেখেন না। বিদ্যালয়ের ২৪০ শিশুর হাসি, তাদের শেখা, বেড়ে ওঠা আর সাফল্যের মধ্যেই যেন খুঁজে নিয়েছেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপন করবে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি টয়োটা

শিক্ষার্থীরাই যার সন্তান, কল্যাণী তাদের স্বপ্নসারথি

আপডেট টাইম : ২৫ মিনিট আগে
সন্তান নেই, তবু মাতৃত্বের অনুভূতি থেকে বঞ্চিত নন কল্যাণী মিনজি। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এই প্রধান শিক্ষকের কাছে বিদ্যালয়ের ২৪০ শিক্ষার্থীই যেন নিজের সন্তান। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, জীবনদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে শিশুদের পাশে থাকেন তিনি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও কাজ করছেন এই শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের হাসি ও সাফল্যের মধ্যেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন কল্যাণী।
সংসারে অভাব ছিল। ছিল সামাজিক বাধাবিপত্তিও। তবু ৬ বোনের পাঁচজনই পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরেক বোন পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাইও কলেজে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সেই পরিবারেরই একজন কল্যাণী মিনজি। পেশায় শিক্ষক। তবে তার কাছে শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; শিশুদের নিজের সন্তানের মতো বড় করে তোলার দায়িত্ব।
ওঁরাও সম্প্রদায়ের এই নারী এখন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কল্যাণই তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে গিয়ে শিশুদের শিক্ষা, খেলাধুলা, জীবনদক্ষতা ও বিকাশ নিয়ে কাজ করেন তিনি। নানামুখী উদ্যোগে সফলও হয়েছেন। এ কারণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রিয় একজন শিক্ষক।
কল্যাণী মিনজির জন্ম ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর। বাবার বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই গ্রামে। বাবা কমলা মিনজি ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা বাসন্তী রানী ছিলেন গৃহিণী।
সীমিত সামর্থ্যের সংসারে ছয় বোন ও এক ভাইকে বড় করে তোলা সহজ ছিল না। আর্থিক অনটন ও সামাজিক বাধাবিপত্তি পেরিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। তবে, পড়াশোনার প্রতি পরিবারের আগ্রহ ছিল প্রবল।
কল্যাণী ১৯৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরই তার বিয়ে হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। শ্বশুরবাড়িতে এসেও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থামেনি। স্নাতক প্রথমবর্ষে থাকাকালেই প্রেমতলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্নাতকোত্তর শেষ করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন পাঁচবিবি কলেজে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থেকে এত দূরে গিয়ে চাকরি করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে গোদাগাড়ীতে চলে আসেন কল্যাণী। এখানে এসে শিশুদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে এখন তিনি শিশুদের স্বপ্নের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে কল্যাণী বললেন, ‘সব সময় শিক্ষকতা আমাকে টেনেছে। কলেজ-মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু শিশুদের সঙ্গে থাকতেই আমার ভালো লাগে। এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম। আমার কোনো আক্ষেপ নেই।’
বিদ্যালয়ের শিশুরাই তার সন্তান
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন ঠিক সময়মতো বিদ্যালয়ে যান কল্যাণী। বিদ্যালয় থেকে বের হন সবার শেষে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বাড়িতে ডেকে পড়ান। শুধু বইয়ের পড়া নয়, শিশুদের জীবনঘনিষ্ঠ নানা বিষয়ও শেখান তিনি।
শিক্ষার্থীদের সাইকেল চালানো শেখান। চলে সাঁতার শেখানোর কাজও। ছোট ছোট শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন ফুটবল। তার হাত ধরে সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা নিয়মিত খেলাধুলায় যুক্ত হয়েছে।
শুরুতে মেয়েদের ফুটবল খেলানো নিয়েও সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে, কিন্তু সেসব বাধা তাকে থামাতে পারেনি। খেলাধুলার প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরি করতে নিয়মিত উৎসাহ দিয়েছেন।
এর ফলও এসেছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে তার বিদ্যালয় গোদাগাড়ী উপজেলা পর্যায়ে টানা ৯ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শুধু উপজেলা পর্যায়েই নয়, বিদ্যালয়ের ফুটবল দল কয়েকবার জাতীয় পর্যায়েও খেলার সুযোগ পেয়েছে।
কল্যাণী মিনজির কাছে খেলাধুলা শুধু জয়ের বিষয় নয়। তার মতে, খেলাধুলা শিশুদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলারও একটি মাধ্যম।
বর্তমানে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ২৪০ জন। কল্যাণীর দাবি, এই বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে না। নেই বাল্যবিয়েও।
মাতৃভাষায় বই লেখার কাজ
কল্যাণী মিনজির কাজের পরিধি শুধু নিজের বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। ওঁরাও, মুন্ডা, রাজোয়ারসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য সাদরি ভাষায় সরকারি পাঠ্যবই লেখার কাজেও যুক্ত তিনি।
আরও কয়েকজনের সঙ্গে সহজ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের জন্য বই লিখেছেন কল্যাণী মিনজি। নিজের সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষায় শেখার সুযোগ তৈরির এই কাজও তার শিক্ষকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে, পথটা সহজ ছিল না। কল্যাণী জানান, তার বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় শেখার বই পেত না। বিষয়টি দেখে অনেক আগে থেকেই সাদরি ভাষায় বই লেখার কাজ শুরু করেন তিনি।
২০১০ সালের দিকে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা তাকে দিয়ে বই লেখাত। পরে এ খবর পৌঁছে যায় সরকারের কাছেও। ২০১৫ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সাদরি ভাষায় বই লিখতে একটি দল ঠিক করে। সেই দলে ডাক পান কল্যাণী।
ওই বছর প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির বই লেখা হয়। পরের বছর লেখা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির বই। ২০২০ সালে লেখা হয় তৃতীয় শ্রেণির বই।
কল্যাণী জানান, এখন সাদরি ভাষার বই পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে, একটি সমস্যা রয়ে গেছে। সাদরি ভাষার বই নিলে শিশুরা বাংলা বই পাবে না। এ কারণে শিক্ষকেরা এই বই নিতে আগ্রহী হন না।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথা বলেছেন কল্যাণী। তিনি জেনেছেন, আগামী বছর থেকে শিশুদের দুই ভাষারই বই দেওয়া হবে।
তবে তার মতে, শুধু বই দিলেই হবে না, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষকও প্রয়োজন।
এসেছে স্বীকৃতিও
শিক্ষকতা ও বিদ্যালয় পরিচালনায় কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন বারবার। কল্যাণী মিনজি ২০১২ ও ২০১৭ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে তার বিদ্যালয় শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় নির্বাচিত হয়।
শিক্ষা ও শিশুদের নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে বেগম রোকেয়া দিবসে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃতী নারী সম্মাননা পদক পান কল্যাণী মিনজি।
এরপর ২০২৪ সালে রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন তিনি। একই ক্যাটাগরিতে ওই বছরের ৮ মার্চ জাতীয় পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ জয়িতা হিসেবে পুরস্কৃত হন।
কল্যাণীর ব্যক্তিজীবনেও রয়েছে আলাদা এক গল্প। গোপালপুর গ্রামের চিত্তরঞ্জন সরদারের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন। তাদের কোনো সন্তান নেই। তবে, এ নিয়ে কল্যাণী মিনজির কোনো আক্ষেপ নেই, কষ্টও নেই। তার কাছে বিদ্যালয়ের শিশুরাই যেন নিজের সন্তান।
কল্যাণী বলেন, ‘সন্তান হয়নি, এতে কোনো খারাপ লাগে না। আমার স্বামীরও কষ্ট হয় না। বিদ্যালয়ের সব বাচ্চা আমার বাচ্চা। আমি তো স্কুলের বাচ্চাদের সেভাবেই দেখি।’
শিক্ষকতার দীর্ঘ জীবনে তাই নিজের সন্তান না থাকার শূন্যতাকে তিনি আলাদা করে দেখেন না। বিদ্যালয়ের ২৪০ শিশুর হাসি, তাদের শেখা, বেড়ে ওঠা আর সাফল্যের মধ্যেই যেন খুঁজে নিয়েছেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।