একদিকে সরকারের দাবি, আগের তুলনায় কমেছে খুন, ডাকাতিসহ গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের মামলা। অন্যদিকে রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক থেকে জেলা শহরের দোকান, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা বাড়ির আঙ্গিনায় প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। অস্ত্রধারীরা কখনও সিএনজিচালিত অটোরিকশায়, কখনও মোটরসাইকেলে এসে লক্ষ্যবস্তুতে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু ঘটনায় হত্যার চেষ্টা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধের অভিযোগও সামনে আসছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে রাজধানীর মগবাজারে সংগীতশিল্পী ও বিসিবির সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি সেই উদ্বেগকে নতুন মাত্রা দেয়। মগবাজারের বিশাল সেন্টারের সামনে রাখা গাড়িটির কাছে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে থামে। সেখান থেকে নেমে অজ্ঞাত ব্যক্তি গাড়ির পেছনের দরজার কাচ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় আসিফ ভবনটির তৃতীয় তলায় নিজ কার্যালয়ে ছিলেন। গাড়িতে কেউ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ গাড়ির ভেতর থেকে গুলির আলামত উদ্ধার করেছে।
এ ঘটনায় শনিবার রাতেই হাতিরঝিল থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন আসিফ আকবর । সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। রবিবার ২৫ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি জানাতে পারেনি পুলিশ। কেন গাড়িটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হলো, শিল্পীর ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল কি না, নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
ঢাকায় সাম্প্রতিক অন্য ঘটনাগুলোও উদ্বেগের কারণ। গত ১৫ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদপুরের বসিলার মহিরগোলা এলাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন কাঁচামাল বিক্রেতা সুমন আলী। একই হামলায় তার ছেলে ফাহিমকে কুপিয়ে আহত করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জে আগের একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম প্রকাশ করায় তাদের ওপর হামলা হয়েছে। এ ঘটনার নেপথ্যে স্থানীয়ভাবে ফুটপাতের দোকান বসানো ও টাকা আদায়ের বিরোধের অভিযোগও ওঠে। তবে পুলিশ হামলার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি। তারও আগে ১২ সেপ্টেম্বর বাড্ডার ময়নারবাগে বাসায় ঢুকে গাড়িচালক রানাকে গুলি করার ঘটনায় চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে।
একই দিনের ঘটনাপ্রবাহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে খুলনায়। শনিবার (২৪ অক্টোবর) পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির সেখানে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সমাবেশে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন। সেদিনই জেলার তেরখাদা উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন স্থানীয় যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস। সেনেরবাজার-মধুপুর সড়কে ভ্যানে বসে থাকার সময় মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলি লাগে তার পাঁজরে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে।
সেদিন সন্ধ্যায় খুলনা নগরের দক্ষিণ টুটপাড়ায় নিজের মুদি দোকানে বসে থাকা ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডুর পেটে গুলি করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ভয় দেখানো বা চাঁদাবাজির সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে তদন্তে তা নিশ্চিত হয়নি। রাত সোয়া ৯টার দিকে বাবুখান রোডের সন্ধানী ক্লিনিকের সামনে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করে একদল দুর্বৃত্ত। একটি জেলায় একই দিনে তিনটি স্থানে এমন হামলা পুলিশপ্রধানের কঠোর বার্তা এবং মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তার বাস্তবতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
খুলনায় এর আগেও গুলির ঘটনা ঘটেছে। ১০ অক্টোবর নগরীর কাশেম সড়কে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আসাদুজ্জামান জনিকে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা গুলি করেন। পুলিশ পরদিন জানায়, সিসিটিভি দেখে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা গেলেও তখন তাদের গ্রেফতার করা যায়নি। ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ায় চায়ের দোকানে বসে থাকা নাসিমুল করিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার মধ্যে ব্যবহৃত অস্ত্র, হামলাকারীদের যোগাযোগ কিংবা অপরাধের উদ্দেশ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আলাদা তদন্ত ছাড়া বলা যায় না।
সন্ত্রাসীরা শুধু আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের মধ্যে নয়— দোকানে বসা ব্যবসায়ী, বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি, চিকিৎসাকেন্দ্রের রোগী কিংবা রাস্তার পথচারীও সন্ত্রাসীদের গুলির ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। প্রকাশ্যে লক্ষ্যভেদী হামলার পাশাপাশি আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে ফাঁকা গুলি চালানোর ঘটনাও রয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি আহত ও নিহতের হিসাব ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয় ব্যবসা, স্বাভাবিক চলাচল ও অপরাধের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার ওপরও চাপ তৈরি করে। কোন এলাকায় কী ধরনের গুলি হচ্ছে, সেটার আলাদা বিশ্লেষণ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নির্ধারণও কঠিন।
খুলনার বাইরেও আছে এমন দৃষ্টান্ত। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৬ অক্টোবর গভীর রাতে মারধরের পর গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী তারেক হোসেন বাপ্পিকে। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন অপর যুবদল কর্মী তাফসির আলম শাওন। সিসিটিভির ফুটেজে কয়েকজনকে মারধরের পর গুলি চালিয়ে পালাতে দেখা যায় বলে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও প্রতিটি হামলার পেছনে ছিল আধিপত্য বজায় রাখা।
সারা দেশের গুলির ঘটনাগুলোর মধ্যে মিল হলো— হামলার স্থান অনেক ক্ষেত্রেই উন্মুক্ত। অপরাধীরা দ্রুত এসে দ্রুত পালাচ্ছে এবং তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশকে পরে ফুটেজ ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ভিন্নতা আছে হামলার উদ্দেশ্যে। কোথাও চাঁদা দাবির অভিযোগ, কোথাও প্রতিশোধ, কোথাও কারণই অজানা।
অবশ্য অপরাধের সরকারি হিসাব অন্য চিত্র তুলে ধরে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে সাত ধরনের অপরাধে মামলার সংখ্যা ১৮ হাজার ৬৬১ থেকে কমে ১৭ হাজার ৩৩৫ হয়েছে। খুনের মামলা কমে দাঁড়িয়েছে ২৯১৩ থেকে ২৬৫৯টিতে। ডাকাতির মামলা ৫৩৮ থেকে ৩৮৭টিতে। সরকার এই পরিসংখ্যানকে পরিস্থিতির উন্নতির প্রমাণ হিসেবে দেখছে। তবে এই হিসাবে সব ধরনের গুলিবর্ষণ, অস্ত্র প্রদর্শন বা চাঁদা দাবির পৃথক তুলনামূলক চিত্র নেই।
এমন অবস্থা দেশে এর আগে কবে ছিল, এই প্রশ্নেরও কোনও জবাব নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, একাধিক বছরের গুলির ঘটনা, ব্যবহৃত অস্ত্র, হামলায় আহত ও নিহত এবং তদন্তের নিষ্পত্তির তথ্য একসঙ্গে তুলনা না করলে বর্তমান সময়কে ‘সবচেয়ে খারাপ’ বলা ঠিক হবে না।
অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতার প্রশ্নও সামনে আসছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এক হাজার ৩০৯টি উদ্ধার হয়নি। নিখোঁজ ছিল বিপুল গোলাবারুদও। তবে সাম্প্রতিক প্রতিটি গুলির ঘটনায় সেই লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কিনা জানা যায়নি।
খুলনায় আইজিপি নিজেও চাঁদাবাজদের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অভিযোগকারী সামনে না এলেও ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার সুযোগ রাখতে নতুন আইন করার উদ্যোগ চলছে। তবে আইন বদলানোর পাশাপাশি অপরাধের আগেই গোয়েন্দা নজরদারি, দ্রুত তদন্ত, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত এবং মামলা শেষে বিচারের অগ্রগতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি স্বীকার না করে অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সন্ত্রাসীদের হাতে অবৈধ অস্ত্র আছে, এটা ঠিক। একইসঙ্গে পুলিশ এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আর এমন বিচ্ছিন্ন গুলির ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিভিন্ন দেশেই ঘটে থাকে। এটাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলা যাবে না।’’
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের পর্যবেক্ষণ ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই সহযোগী অধ্যাপক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি— দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দখলবাণিজ্য ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে বিভক্তি ও সংঘাত তৈরি হচ্ছে। একপক্ষ অন্যপক্ষের ওপর হামলা চালাচ্ছে, গুলি করছে, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘তবে একটি বিষয় ইতিবাচক যে, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত অপরাধের ঘটনা কিংবা মামলা হওয়া ঘটনাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করছে।’’ কিন্তু বিশেষ করে চাঁদাবাজিতে গ্রেফতার ব্যক্তিদের অধিকাংশই দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির অপরাধী বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, মূল হোতা, নির্দেশদাতা ও পৃষ্ঠপোষকেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলে শুধু মাঠপর্যায়ের লোকজনকে গ্রেফতার করে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
বড় অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বা পরিচয়ের সম্পর্ক প্রায়ই দেখা যায় উল্লেখ করে ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা, দুটিই সমানভাবে কার্যকর করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবের কারণে কেউ যেন আইনের বাইরে থাকার সুযোগ না পায়।’’ ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বড় অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা যেন নমনীয়, লোকদেখানো কিংবা সমঝোতামূলক না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন।
গুলির শব্দ থামার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে, আলামত সংগ্রহ হয়, মামলা হয়। কিন্তু তার আগেই কীভাবে অস্ত্রধারীরা নির্ভয়ে লক্ষ্য ঠিক করে সেখানে পৌঁছে যাচ্ছে, সেই বিষয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























