ঢাকা , সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

একটি কণ্ঠ স্তব্ধ : লাখো প্রতিবাদীর জন্ম

ছোট জীবন, কিন্তু বীরের মতো লড়াই করে জীবন দিলেন। শেষ হল তার জীবনের অধ্যায়। কিন্তু যে আগুন তিনি জ্বালিয়ে গেলেন তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল দেশময়। তিনি প্রমাণ করে গেলেন, বিপ্লবীদের একটি জীবনকে নিস্তব্ধ করা যায়, কিন্তু তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা লাভার স্রোত রোখার ক্ষমতা কারো নেই।

বলছিলাম শরীফ ওসমান বিন হাদীর কথা। তিনি ভারতের আধিপত্যবাদ, তার এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে শাহাদাতের সুরা পান করে অমর হয়ে রইলেন ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে। ইনকিলাব মঞ্চ নামক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে তার জ্বালাময়ী কথার বাণ স্বৈরাচার তো বটেই, তার আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। কাপুরুষ সেই ভীরুরা তার দৃঢ়চেতা ও কঠোর মনোভাবকে বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায় দমাতে না পেরে প্রাণে মেরে ফেলে। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সীমারেখার প্রতিটি কোণে। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বিপ্লবী প্রাণে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু তার আদর্শকে স্তব্ধ করা যায় না। তা ছড়িয়ে পড়ে আরো ব্যাপকভাবে। তাই তো দেখা গেছে, শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির নাম পর্যন্ত যারা জানতো না তারাও সমভিব্যহারে তার জানাজায় উপস্থিত। এর ফলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ সাহান বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগে স্মরণকালের দ্বিতীয় বৃহত্তম জানাজায় রূপলাভ করে। জানাজার পর মোনাজাতে আল্লাহর দরবারে তার রূহের মাগফিরাতের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়া প্রমাণ করে বিপ্লবী হাদি মারা গেছে, কিন্তু আদর্শ ছড়িয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষের মাঝে।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ঝালকাঠির নলছিটি থেকে উঠে আসা ওসমান হাদীকে দীর্ঘদিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যায়নি। মাদরাসা শিক্ষক পরিবারের সন্তান হাদী নেছারাবাদ কামিল মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে। ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চারকণ্ঠ। তিনি সর্বদা মৃত্যুর জন্য তার প্রস্তুতির কথা বলতেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অসংখ্য বক্তব্য রেখে গেছেন যা যে কোনো সচেতন যুবকের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। জাতিকে আরো কিছু দেয়ার জন্য তিনি জাতীয় সংসদে যেতে চেয়েছিলেন। কাজ অনেক বাকি ছিল, অনেক পরিকল্পনা ছিল মনে। সেজন্য ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হবার জন্য প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হেঁটে হেঁটে প্রচার চালাচ্ছিলেন। কিন্তু তার শত্রুদের তা পছন্দ হয়নি। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী আততায়ী তাকে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক দুরত্ব থেকে গুলি করে। দেশে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত থাকায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানেই ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্য সামনে রেখে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম- ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই তিনি ভারতবিরোধী অবস্থান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণসহ নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এর দাবিতে শাহবাগে আয়োজিত সমাবেশের মধ্য দিয়ে তিনি আরো বেশি আলোচনায় আসেন। এসব কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় তিনি নিয়মিত টেলিভিশন টকশোতেও অংশ নিতে শুরু করেন।

ভারতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে স্মারকলিপি প্রদান করেন ওসমান হাদী। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতেও তাঁকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।

শরীফ ওসমান বিন হাদি, একটি নাম, যার পেছনে লুকিয়ে আছে নিরব লড়াই, অদম্য সাহস আর সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার এক করুণ অথচ অনুপ্রেরণামূলক গল্প। আলোঝলমলে রাজনীতি বা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থেকেও তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক মানুষের কাছে সহনশীলতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বারবার ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও শরীফ ওসমান বিন হাদি কখনো নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেননি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিগত সংকট-সবকিছু মিলিয়ে তাঁর পথচলা ছিল বন্ধুর। তবু প্রতিটি সংকটে তিনি বেছে নিয়েছেন নীরবতা, প্রতিশোধ নয়, ধৈর্য; হিংসা নয়, মানবিকতা।

যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন-তিনি খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর চোখে জমে থাকে বহু না-বলা গল্প। অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ না হয়েও তিনি নিজের অবস্থান থেকে কখনো সরে যাননি। ক্ষমতার পালাবদলে যখন অনেকেই আদর্শ বদলান, তখন শরীফ ওসমান বিন হাদি থেকে গেছেন নিজের জায়গায় অটল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে তখনই, যখন তাঁর নীরবতাকেই দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো-এই নীরবতার পেছনে ছিল এক দীর্ঘ সহনশীলতার ইতিহাস, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত কষ্টকে আড়াল করে বৃহত্তর স্থিতিশীলতার কথা ভেবেছেন।

সময়ের নিষ্ঠুরতায় হয়তো তিনি আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নন, কিন্তু ইতিহাস সবসময় চিৎকার করা মানুষদেরই মনে রাখে না। কখনো কখনো ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষদের, যারা নিঃশব্দে বোঝা বইতে বইতে পথ চলেছেন-ঠিক যেমন শরীফ ওসমান বিন হাদি।

আজ যখন চারপাশে সুবিধাবাদ আর তাৎক্ষণিক লাভের রাজনীতি, তখন তাঁর মতো মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দেন-সব লড়াই মাইকে হয় না, কিছু লড়াই হয় নিজের ভেতরে। আর সেই লড়াইয়ে জয়ী হওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে গৌরবের।

শরীফ ওসমান বিন হাদি তাই শুধু একজন ব্যক্তি নন-তিনি এক নীরব সময়ের সাক্ষ্য, এক অব্যক্ত কষ্টের প্রতিচ্ছবি, আর অনেক অনুচ্চারিত সত্যের প্রতিনিধিত্বকারী এক নাম।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

একটি কণ্ঠ স্তব্ধ : লাখো প্রতিবাদীর জন্ম

আপডেট টাইম : ০৫:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

ছোট জীবন, কিন্তু বীরের মতো লড়াই করে জীবন দিলেন। শেষ হল তার জীবনের অধ্যায়। কিন্তু যে আগুন তিনি জ্বালিয়ে গেলেন তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল দেশময়। তিনি প্রমাণ করে গেলেন, বিপ্লবীদের একটি জীবনকে নিস্তব্ধ করা যায়, কিন্তু তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা লাভার স্রোত রোখার ক্ষমতা কারো নেই।

বলছিলাম শরীফ ওসমান বিন হাদীর কথা। তিনি ভারতের আধিপত্যবাদ, তার এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে শাহাদাতের সুরা পান করে অমর হয়ে রইলেন ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে। ইনকিলাব মঞ্চ নামক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে তার জ্বালাময়ী কথার বাণ স্বৈরাচার তো বটেই, তার আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। কাপুরুষ সেই ভীরুরা তার দৃঢ়চেতা ও কঠোর মনোভাবকে বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায় দমাতে না পেরে প্রাণে মেরে ফেলে। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সীমারেখার প্রতিটি কোণে। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বিপ্লবী প্রাণে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু তার আদর্শকে স্তব্ধ করা যায় না। তা ছড়িয়ে পড়ে আরো ব্যাপকভাবে। তাই তো দেখা গেছে, শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির নাম পর্যন্ত যারা জানতো না তারাও সমভিব্যহারে তার জানাজায় উপস্থিত। এর ফলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ সাহান বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগে স্মরণকালের দ্বিতীয় বৃহত্তম জানাজায় রূপলাভ করে। জানাজার পর মোনাজাতে আল্লাহর দরবারে তার রূহের মাগফিরাতের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়া প্রমাণ করে বিপ্লবী হাদি মারা গেছে, কিন্তু আদর্শ ছড়িয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষের মাঝে।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ঝালকাঠির নলছিটি থেকে উঠে আসা ওসমান হাদীকে দীর্ঘদিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যায়নি। মাদরাসা শিক্ষক পরিবারের সন্তান হাদী নেছারাবাদ কামিল মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে। ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চারকণ্ঠ। তিনি সর্বদা মৃত্যুর জন্য তার প্রস্তুতির কথা বলতেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অসংখ্য বক্তব্য রেখে গেছেন যা যে কোনো সচেতন যুবকের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। জাতিকে আরো কিছু দেয়ার জন্য তিনি জাতীয় সংসদে যেতে চেয়েছিলেন। কাজ অনেক বাকি ছিল, অনেক পরিকল্পনা ছিল মনে। সেজন্য ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হবার জন্য প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হেঁটে হেঁটে প্রচার চালাচ্ছিলেন। কিন্তু তার শত্রুদের তা পছন্দ হয়নি। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী আততায়ী তাকে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক দুরত্ব থেকে গুলি করে। দেশে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত থাকায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানেই ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্য সামনে রেখে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম- ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই তিনি ভারতবিরোধী অবস্থান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণসহ নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এর দাবিতে শাহবাগে আয়োজিত সমাবেশের মধ্য দিয়ে তিনি আরো বেশি আলোচনায় আসেন। এসব কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় তিনি নিয়মিত টেলিভিশন টকশোতেও অংশ নিতে শুরু করেন।

ভারতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে স্মারকলিপি প্রদান করেন ওসমান হাদী। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতেও তাঁকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।

শরীফ ওসমান বিন হাদি, একটি নাম, যার পেছনে লুকিয়ে আছে নিরব লড়াই, অদম্য সাহস আর সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার এক করুণ অথচ অনুপ্রেরণামূলক গল্প। আলোঝলমলে রাজনীতি বা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থেকেও তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক মানুষের কাছে সহনশীলতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বারবার ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও শরীফ ওসমান বিন হাদি কখনো নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেননি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিগত সংকট-সবকিছু মিলিয়ে তাঁর পথচলা ছিল বন্ধুর। তবু প্রতিটি সংকটে তিনি বেছে নিয়েছেন নীরবতা, প্রতিশোধ নয়, ধৈর্য; হিংসা নয়, মানবিকতা।

যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন-তিনি খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর চোখে জমে থাকে বহু না-বলা গল্প। অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ না হয়েও তিনি নিজের অবস্থান থেকে কখনো সরে যাননি। ক্ষমতার পালাবদলে যখন অনেকেই আদর্শ বদলান, তখন শরীফ ওসমান বিন হাদি থেকে গেছেন নিজের জায়গায় অটল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে তখনই, যখন তাঁর নীরবতাকেই দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো-এই নীরবতার পেছনে ছিল এক দীর্ঘ সহনশীলতার ইতিহাস, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত কষ্টকে আড়াল করে বৃহত্তর স্থিতিশীলতার কথা ভেবেছেন।

সময়ের নিষ্ঠুরতায় হয়তো তিনি আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নন, কিন্তু ইতিহাস সবসময় চিৎকার করা মানুষদেরই মনে রাখে না। কখনো কখনো ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষদের, যারা নিঃশব্দে বোঝা বইতে বইতে পথ চলেছেন-ঠিক যেমন শরীফ ওসমান বিন হাদি।

আজ যখন চারপাশে সুবিধাবাদ আর তাৎক্ষণিক লাভের রাজনীতি, তখন তাঁর মতো মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দেন-সব লড়াই মাইকে হয় না, কিছু লড়াই হয় নিজের ভেতরে। আর সেই লড়াইয়ে জয়ী হওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে গৌরবের।

শরীফ ওসমান বিন হাদি তাই শুধু একজন ব্যক্তি নন-তিনি এক নীরব সময়ের সাক্ষ্য, এক অব্যক্ত কষ্টের প্রতিচ্ছবি, আর অনেক অনুচ্চারিত সত্যের প্রতিনিধিত্বকারী এক নাম।